সুন্দরবন
দেশের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের অবদান প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (আইএফইএস) পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। মূলত পর্যটন সেবা, জীববৈচিত্র্যের নির্ভরতা ও সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই সুন্দরবনের আর্থিক অবদানের এই হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিবেশের ওপর সুন্দরবনের মতো শ্বাসমূলীয় বন বা ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের অবদানের প্রকৃত আর্থিক মূল্য বের করা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে ওই জরিপ প্রতিবেদনে।

জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্যটনের মাধ্যমে বছরে ৪১৪ কোটি টাকা, সাইক্লোন প্রতিরোধ করে বসতবাড়ি রক্ষার মাধ্যমে তিন হাজার ৮৮১ কোটি টাকা এবং সুন্দরবনের সম্পদের ওপর জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয়দের নির্ভরশীলতার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার অবদান রাখে সুন্দরবন।

উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, ইউএসএইড এবং জন ডি রকফেলার ফাউন্ডেশনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় এই জরিপ পরিচালিত হয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মধ্যে জরিপটি পরিচালনা করেন প্রখ্যাত বন্যপ্রাণী বিষয়ক জীববিজ্ঞানী ড. এ এইচ এম রায়হান সরকার, পরিবেশ অর্থনীতিবিদ এম নূরনবী এবং ভৌগোলিক তথ্য বিজ্ঞান (জিআইএস) বিশ্লেষক এমরান হাসান।

বাংলাদেশ ও ভারত মিলিয়ে মোট ১০ হাজার ২৯ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে সুন্দরবনের বিস্তৃতি। ৩০০ প্রজাতির জলজ ও ৪২৫ প্রজাতির স্থলজ উদ্ভিদ এবং ২৯১ প্রজাতির মাছের অভয়ারণ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।

সুন্দরবনের বড় অংশই বাংলাদেশে। তিন উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে এর বিস্তৃতি। এই তিন জেলার মানুষ সুন্দরবন থেকে ২২ ধরনের সেবা পেয়ে থাকে বলে জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব সেবাকে মোটাদাগে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়— খাদ্যসংস্থান, সাংস্কৃতিক, সুরক্ষামূলক ও সমর্থনকারী সেবা।

সুন্দরবনের মাধ্যমে পর্যটনসেবা

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রতিবছর দেশি ও বিদেশি অনেক পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ‘রাস মেলা’ ও ‘বন বিবির মেলা’ উপলক্ষে লাখো পর্যটকদের সমাগম ঘটে এখানে। পর্যটন খাত থেকে সুন্দরবনের আয়ের প্রধান খাত হলো দর্শনার্থীদের (পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও গবেষক) কাছ থেকে প্রবেশ ফি আদায়। বন বিভাগ এই অর্থ আদায় করে থাকে। এছাড়াও সুন্দরবনের ভেতর ঘোরাফেরা, খাবার ও বাসস্থান বাবদ বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানও আয় করে থাকে।

সুন্দরবনের মানচিত্র
জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যটন খাতে সুন্দরবনের অবদান ৪১৪ কোটি টাকা। জরিপ দলটি জরিপ এলাকার মোট ৪২৫ জন পর্যটক ও তীর্থযাত্রীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ দেশি ও বাকি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ বিদেশি পর্যটক। গড়ে এসব পর্যটকের প্রতিজনের কাছ থেকে মাসে আয় হয় ৬৫ হাজার ৭৪৬ টাকা।

জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পর্যটকদের মধ্যে ৮১ শতাংশই প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ভ্রমণে আসেন। তাদের মধ্যে আবার ৯০ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যটক আসেন প্যাকেজ ভ্রমণে। ৫৯ দশমিক ১ শতাংশ পর্যটক আসেন শুধু চিত্তবিনোদনের জন্য। আর ১২ দশমিক ৪ শতাংশ আসেন ধর্মীয় উদ্দেশ্যে। জরিপে আরও জানানো হয়, ৮৫ শতাংশ পর্যটকই তিন থেকে সাত দিনের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— জরিপে অংশ নেওয়া ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যটক সুন্দরবনের বিনোদন ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সুন্দরবনের সাংস্কৃতিক মূল্য বাড়াতে জরিপে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো— সুন্দরবনের ইকো-ট্যুরিজম ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার সমন্বিত উন্নয়ন। সুন্দরবনে প্রকৃতিনির্ভর স্থিতিশীল পর্যটনের জন্য কো-ম্যানেজমেন্ট কমিটিসহ (সিএমসি) সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বাংলাদেশ বন বিভাগকে এই উন্নয়নের কাজ করতে হবে। এছাড়াও, পর্যটকদের সংখ্যা ন্যূনতম পর্যায়ে নিতে সুন্দরবনে প্রবেশ ফি বাড়ানো, বন্যপ্রাণী আইন-১৯৭৪ অনুযায়ী বাসস্থান স্থাপনের উদ্দেশ্যে বনের ভেতর কোনও অবকাঠামো নির্মাণ না করা এবং ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে গ্রাহকদের ভালো সেবা নিশ্চিত করতে খুলনায় একটি ‘ইকো ট্যুরিজম ট্রেনিং সেন্টার’ স্থাপন করার সুপারিশও করা হয়েছে জরিপ প্রতিবেদনে।

সুন্দরবনের মাধ্যমে সুরক্ষাসেবা

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সাইক্লোন থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দিচ্ছে সুন্দরবন। গত একশ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৫০৮টি সাইক্লোনের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ সাইক্লোন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। সাম্প্রতিক দুই বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ ও ‘আইলা’র ধ্বংসযজ্ঞ থেকেও বাংলাদেশকে অনেকটা রক্ষা করেছে সুন্দরবন।

জানা গেছে, সাইক্লোন সিডর ঘণ্টায় ২২৩ কিলোমিটার বেগে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বড় একটি অংশ প্লাবিত হয়। সিডরের আঘাতে তিন হাজার ৪০৬ জন ব্যক্তি প্রাণ হারান এবং ৫৫ হাজার ২৮২ জন আহত হন। প্রলয়ঙ্করী এই ঘূর্ণিঝড়ে ওই এলাকার প্রায় ৮৯ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিডরের আঘাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মোট ক্ষতির পরিমাণ একশ ৬৭ কোটি মার্কিন ডলার।

জরিপে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বায়ুপ্রবাহ প্রতিহত করতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে সুন্দরবনের ঘন সবুজ বেষ্টনী। এই বেষ্টনী বাতাসকে কয়েকশ মিটার ওপরে ঠেলে দেয়। ফলে উপকূলীয় সুরক্ষায় সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে উপকূলীয় এলাকার বাড়িঘর ও সম্পদ সুরক্ষা করে সুন্দরবন প্রতিবছর অর্থনীতিতে তিন হাজার ৮৮১ কোটি টাকার অবদান রাখে। উপকূলীয় এলাকায় বনায়ন কার্যক্রম বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত বলেও সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সুন্দরবনের মাধ্যমে সুরক্ষা সেবা বাড়াতে জরিপে আরও কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে— উপকূলীয় এলাকার চারদিকে সুন্দরবনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিকল্পনা করে ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের আয়তন বাড়ানো, যেসব এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট জন্মানোর ব্যবস্থা নেই সেইসব এলাকায় বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া, ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণ এলাকায় অবৈধ কার্যক্রম কমাতে বিদ্যমান আইন-কানুনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং ম্যানগ্রোভ বনের কোনও ক্ষতি না করে চিংড়ি চাষ করার ব্যবস্থা করা।

সুন্দরবনের সম্পদের ওপর মানুষের নির্ভরতা

স্থানীয় লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস সুন্দরবন। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে কাঠ (আসবাবপত্রের কাঠ, জ্বালানি কাঠ এবং গোলপাতা) এবং বনজ সম্পদের (মৎস্য, মধু, কাঁকড়া ও ঔষধি গাছ) ওপর নির্ভরশীল স্থানীয়রা।

সুন্দরবন
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন থেকে সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ হয় মধু, মোম, গোলপাতা, মাছ, চিংড়ি, চিংড়ি রেণু, কাঁকড়া ও জ্বালানি কাঠ। গত ২০ বছর ধরে সুন্দরবন থেকে জ্বালানি কাঠ ও চিংড়ি রেণু সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও স্থানীয়দের অনেকেই এই নিষেধাজ্ঞা মানেন না। স্থানীয়দের জীবিকা সরবরাহ করে সুন্দরবন অর্থনীতিতে বছরে প্রায় এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার অবদান রাখছে।

জরিপ দলের প্রধান গবেষক ড. এইচ এম রায়হাম সরকার বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন থেকে আমরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২২ ধরনের সেবা পেয়ে থাকি। এর ব্যাপকতা সহজে বোঝানো যাবে না।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্সের (আইএফইএস) সহযোগী অধ্যাপক ড. রায়হান বলেন, ‘সংক্ষেপে সুন্দরবনের সেবার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব না। তাই দেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদানকে সবসময়ই ছোট করে দেখা হয়। তবে তহবিল ও সময়ের অভাবে আমরা সুন্দরবনের নির্দিষ্ট কয়েকটি সেবা নিয়ে গবেষণা করতে পেরেছি।’

জরিপ দলের অন্যতম গবেষক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক নূর নবী বলেন, ‘সুন্দরবনের প্রকৃত মূল্য জরিপের সম্ভাব্য মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সংরক্ষণে বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে আমাদের এই জরিপ নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করবে।’