নাগরিক রাত্রির চুপিসার চাপাকান্না কতোবার যে একা একা কেদেছি, বনদেবীর আঁচল ছোঁয়া চরাচর ভাসানো জ্যোৎস্নায় অরণ্য নিঝুম শান্ত জলাশয়ে মুখ ডুবিয়ে, ঠিকরে পড়া চাঁদের আলো ভেঙে ভেঙে যাওয়া তৃষ্ণার জলে চিত্রাহরিণীর ঝাঁকের সাথে মিশে।লুকানো সে চোখের জল গভীর মমতায় বুকে ধারণ করতে পারে, আফ্রিকা-আমাজন-হিমালয়-আল্পসের কোনো অরণ্য ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া জলের সে রকম নিবিড় আত্মিক চেনাশোনা পরিচয় নেই আমার সাথে।মনের গভীরে এক অরণ্যচারী জীবন যাপন করে যাই নিশিদিন আমারই নিজ হাতে গড়া কল্পনার গোলপাতা ছাওয়া যে পাতার কুটিরে, সাকিন ঠিকানা তার রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পদচ্ছাপ মাখা সুন্দরবন জেনো। ওখানেই পাঠিয়ে দিও না লেখা কোনো চিঠি আমার নামে মেঘপিওনের হাতে। পেয়ে যাবো ঠিক, পড়বো বসে পশুর নদীর জলে পা ডুবিয়ে আনমনা সন্ধ্যাতারা লগনে।

শখ এবং সঙ্গতির মেলবন্ধন ঘটায় ঘোরাঘুরি আমার একেবারে কম হয়নি নানা দেশের নানা প্রান্তে। কিন্তু যতোদূরে যাই আমার শ্যামলা মেয়ে বাংলাকে ভুলে থাকিনি একনিমেষও। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের ভলকানোর আগ্নেয় শিলার বুকে গজিয়ে ওঠা সবুজ ঘাস দেখে ভেবেছি চিম্বুকের রূপ, থাইল্যান্ডের চিয়াং মাইয়ের অচেনা নদীর স্রোতে ব্যাম্বু র্যাফটিং মনে করিয়ে দিয়েছে দেশের বানভাসি মানুষের ভেলায় বন্দী জীবন।মালয়েশিয়ার গেন্টিং হাইল্যান্ডের রাইডের সাথে তুলনা করেছি নন্দন বা ফ্যান্টাসি কিংডমের। জাপানের বৌ্দ্ধ মন্দিরের বাঁশঝাড়ে বওয়া সরসর হাওয়ার কাঁপনের পটে কামাকুরা গ্রেট বুদ্ধাকে দেখে, রামু কিংবা কক্সবাজারের টিনের কারুকাজ খচিত চালার নীচে আমার দেশের স্বর্ণরঙা বুদ্ধের চেহারায় কিঞ্চিৎ বাঙালীয়ানার ছাপ খুজেছি। সিঙ্গাপুরের নিরিবিলি কোনো সড়কে মনে পড়েছে ধানমন্ডীর বনেদী বাড়ীর সামনের রাস্তাকে। কুয়ালালামপুর টুইন টাওয়ারের কোনায় এক পোর্ট্রেট শিল্পীর তাৎক্ষনিক মুখচ্ছবি আঁকার দক্ষতায় চারুকলার শিক্ষানবীশের ছায়া দেখেছি। পূর্ব তিমুর সাগর পাড়ের ম্যানগ্রোভের পাদদেশে জমা জলের বুকে রঙ-বেরঙ মাছের ঝাঁক এক নিমেষে মনকে টেনে নিয়ে গেছে সুন্দরবনের সীমানায়। এমনকি আমার চার বছরের নিবাস নিউজিল্যান্ডের ডুনেডিন শহরের বাড়ীর ঠিক পেছনের, একা পড়ে থাকা কনকনে হাওয়ার সীবীচের নোনাজল মনে করিয়ে দেয় আমা্য় হামেশাই, হুল্লোড় প্রিয় বাঙালী পর্যটকদের রৌদ্রমাখা সমুদ্রস্নানের হুটোপুটি মেলা।

সে ২০০৭ সালের এপ্রিল মাস।গরমের ছুটিতে সপরিবারে বেরিয়েছিলাম দেশের বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল ঘুরে দেখবো বলে। পরিচ্ছন্ন সাজানো গুছানো খুলনা শহরের রয়েল হোটেলের রাস্তায় রয়েল বেঙ্গলের মূর্তি দেখতে দেখতে লোভনীয় খাবারের স্বাদ আস্বাদন, খুলনা নিউ মার্কেটের প্রচুর চোখ জুড়ানো ইন্ডিয়ান শাড়ি-থ্রী পিসের সমারোহ, চিত্রকর সুলতানের স্বপ্নতরী ও সমাধি, দক্ষিন ডিহি গ্রামে রবি ঠাকুরের বালিকা বঁধু মৃণালিনীর পিতৃনিবাস (সে মেয়েটির জন্য আমার মনে বরাবরই মায়া জাগে, নতুন বৌঠান কাদম্বরীর পাশে প্রথিতযশা স্বামীর মনে কতোখানি জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন ভেবে)। এছাড়াও দেখা হয়েছিলো নিভৃত যশোর বিমানবন্দরের শম্বুকগতি বিমান শিডিউল। এতো সব কিছু ছাপিয়ে খুব করে মনে আছে মংলা থেকে বড় নৌকায় চেপে পশুর নদী বেয়ে সুন্দরবন দেখার স্মৃতি। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের পশুর হোটেলের পাশের ঘাট থেকে সুন্দরবন যাত্রাশুরু। তার আগে পশুর হোটেল ঘুরে দেখে তার আলো হাওয়া খেলা পুরণো স্থাপত্যশৈলীর প্রশস্থ ঘরগুলো আর কেয়ারী করা রঙবেরঙ ফুলের বাগানও আমার ভালো লেগেছিলো।তবে সেখানকার লবনাক্ত পানীয় জলের সমস্যার কথাও মনে পড়ছে।

ডাঙার মানুষ আমরা, নৌকোয় চেপে ভেসে বেড়ানোর মাঝে সবসময়ই হাওয়া আর রুচি বদলের স্বাদ পাই। তার উপর সে যদি হয় দীঘল নৌকো করে প্রশস্থ পশুর নদীর বুকে ঘন্টাখানেকের নদীপথ সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়া, তবে তার রোমাঞ্চই আলাদা। কতো প্রাচীন ঘাটের বুকে ঝুঁকে থাকা বটগাছের ছায়া ঘেসে, সে বেলা জেলেদের পাতা জালে কি মাছ ধরা পড়লো সেদিকে চোখ রেখে, গাঢ় নীল আকাশের বুকে খন্ড খন্ড সাদা মেঘের প্রতিফলন জলের আয়নায় দেখতে দেখতে, নতুন জেগে ওঠা চরে ধ্যানমগ্ন বকের সারির বৈঠার ছপছপ শব্দে মৌ্নব্রত ভেঙ্গে দিগন্তে উড়ে যেতে দেখে, আর আমার শান্ত মায়াবতী মেয়ে অদিতার সাথে চিপস-চানাচুর-বিস্কুট খেতে খেতে খুনসুটি আলাপে মেতে পাড়ি দিয়েছিলাম সে নদীপথ। বেশকিছু মুহূ্র্ত ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক বন্দীও হয়েছিলো নিজেদের আর প্রকৃ্তি বিলাসের।

ছোট্ট শহর জামালপুরের রক্ষনশীলতার বেড়াজালে বড় হয়েছি আমি। শহরের একপ্রান্তে নিষিদ্ধ পতিতাপল্লীর অস্তিত্ত্ব আছে জানতাম। কিন্তু কখনো চোখে দেখিনি। কিশোরী বেলায় হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়তো সন্ধ্যার সদর রাস্তায় রিক্সা আরোহিনী দু’ একজনের একটু বেশী রঙের প্রলেপ মাখা উদ্ভিন্ন যৌবনা সস্তা শাড়ী-চুড়ি-ফিতা-লিপস্টিকের সজ্জা আভরণ। কোনো এক অজ্ঞাত অনুভবে না জেনেই বুঝে নিয়েছিলাম তাদের রূপপোজীবিনী জীবনের ইতিকথা। কিন্তু পতিতাদের মূল ব্যবসাকেন্দ্র ফুলমন্ডী না কি যেন নাম, শহরের ঠিক কোন রাস্তায় কখনো জানা হয়ে ওঠেনি। এমনকি আমাদের পুরো পরিবারের ঘনিষ্ঠ আমার বড় বোনের এক সহপাঠীর বাসায় বাল্যকাল থেকেই খুব যাতায়াত ছিলো দু’পরিবারেরই। সেই ব্যবসায়ী পরিবারটি শহরের ব্যস্ত কথাকলি মার্কেটের নিজস্ব দোকানের উপরকার দোতলা বাসা ছেড়ে সেই পতিতাপল্লীর আশেপাশে কোথাও নতুন বাড়ী বানিয়ে উঠে গিয়েছিলো বলে, আব্বা আর কোনোদিন তাদের বাসায় বেড়াতে যাবার অনুমতি দেননি আমাদের পরিবারের কাউকে।

সুন্দরবনের পানে নদীপথে যাত্রাকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পতিতাপল্লী দেখেছিলাম নদীর উঁচু পাড়ের এক গ্রামে। খুব তাগড়া শরীর বর্ধক ভিটামিন খাওয়া চেহারার ওড়নাবিহীন টাইট পোশাকের যুবতী মেয়েরা কেউ কেউ তখন ভরদুপুর রোদ মাথায় নিয়ে খদ্দেরের আশায় নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তাদের কেউ কেউ আবার নদীর জলে স্নান করছিলো। বড় যাত্রীবাহী নৌকাগুলো থেকে নিষিদ্ধ ইশারার খদ্দেরেরা ছোটো ছোটো ডিঙি নৌকায় করে মাঝগাঙ থেকে তীরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছিলো। মনে হলো দালাল টাইপ কিছু লোকের সাথে তাদের দর কষাকষিও হচ্ছিলো। মেয়েগুলোর উচ্চকিত হাসিতে মনে হচ্ছিলো খুবই উপভোগ্য তাদের এ রঙ্গলীলার জীবন। আসলে খদ্দেরের চোখ টানার প্রয়াসমাত্র সে তামাশা। সেইসব নারী মাংসলোভী ব্যাটাছেলেদের মধ্যে আমার কেন যেন হঠাৎ একজনকে কোনো এক ভদ্র পরিবেশে দেখেছি মনে হলো। মনের বিভ্রমও হতে পারে।তবে কারো না কারো তো পরিচিতই তো তারা।হয়তো কোনো গৃহবঁধু মমতার ব্যঞ্জন সাজাচ্ছে সেই মুহূর্তে এইসব নিম্ন মানসিকতার মানুষগুলোর কোনো একজনের জন্য। শরীরি বিভঙ্গ প্রকটিত করে দাঁড়িয়ে থাকা ওই নিষীদ্ধপল্লীর মেয়েগুলোর জীবনকে করুণ বললে, তাদের খদ্দের পুরুষগুলোর মা-বোন-বউ-ঝিদের জীবনকে করুণতর বলতে হয়। প্রথমোক্ত মেয়েরা বিক্রি হচ্ছে অভাবের তাড়নায় আর শেষোক্ত মেয়েগুলো প্রতারিত হচ্ছে বিশ্বাসের বেদীমূলের যূপকাষ্ঠের বলি হিসাবে। খুব বেশী অচেনা ঠেকেছিলো আমার চোখে নদীপাড়ের সেই মেয়েগুলোর শারিরীক ইশারা-ইঙ্গিত, হাসাহাসির ফোয়ারা।

আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এরকম নতুন মাত্রা যোগ করেও নৌকো তো আর থমকে রইলো না। সে রাজহাসের মতো তরতর করে বয়ে চললো গন্তব্যের দিকে। সুন্দরবনের যে জায়গাটায় পর্যটকদের নৌকো ভেড়ে সেখানটায় একটা বাঁক। জায়গাটার নাম চাঁদপাই রেঞ্জ।আকাশের চাঁদ সেখানে না পাওয়া গেলেও, আকাশ ছোঁয়া আরণ্যক জীবনের স্বাদ মেলে। সেখানে পশুর নদী দু’ভাগে ভাগ হয়ে ডানে-বায়ে দু’পাশে বয়ে গেছে। গোলপাতা আর নানা অরণ্যরাজীর জঙ্গল একটু টারজান শিহরণ বুলিয়ে গেলো মনে। ছেলেবেলায় চাচাতো-ফুফাতো ভাই আর পাড়ার বান্ধবীদের দুষ্টুমি খেলায়, অন্যতম প্রধান স্থান দখল করে ছিলো ওঁ-ওও-ওঁ-ও- ধ্বনি মুখরিত টারজান হয়ে, নীচু এক পাঁচিলের উপর ঝুলে পড়া নারকেল পাতার ডাল ধরে শূন্যে ভেসে অন্তত হাত ৭/৮ হাত দূরের টেলিগ্রামের লোহার থামগুলোর উপর অবতরণ। কখনো দূর্ঘটনাও ঘটেনি কোনো। নির্বিঘ্নেই খেলেছি সে ছেলেখেলা।

মাঝে মাঝে ভাবি, নাগরিক কোলাহলে না জন্মে যদি দূর কোনো গাঁয়ের বঁধু অথবা এরকম অরণ্যের বনচারিনী বালিকা হয়ে জন্মাতাম, হাওয়ায় পাতা ঝরবার সরসর শব্দ কি আরেকটু সুরেলা হয়ে বাজতো কানে? রৌদ্রতাপে দগ্ধ মাটির বুকে বৃষ্টির প্রথম ফোটা পড়বার সোঁদাগন্ধ কি আরো সুবাতাস ছড়াতো প্রাণে? চাঁদের রাতে ঘরভোলানো কোনো বাঁশীর সুর কি ডেকে নিতো আমায় কুয়াশার এক বিজন প্রান্তরে?

বাওয়ালীদের সাহসিকতা শুধু গল্পেই পড়েছি।তাদের ধোঁয়া জ্বেলে মৌ্মাছি তাড়িয়ে মৌচাক ভেঙ্গে আনা, বাঘের কবলে পড়ে অরণ্যেই হারিয়ে যাওয়া, কিংবা ব্যঘ্রসম্রাটকে মল্লযুদ্ধে হারিয়ে বিজয়ী হলেও শরীরে মনে তার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার কথা। সে আমাদের শহুরে ফুলবাবু জীবন নয় গো। পর্যটকদের জন্য সেখানে বনবিভাগ তৈরী করেছে কাঠের দু’পাশে রেলিং দেয়া পায়ে হাটার লম্বা ব্রীজের মতো স্বল্প উচ্চতার কাঠসড়ক। সেই বাঁধানো পথের বাইরে যেয়ে বনের সীমানায় পা দেওয়া নিষেধ সাধারণ পরিব্রাজকের। বাঘমামা যে কোনো সময় উনার ভাগ্নে-ভাগ্নীদের মরণ আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলার জন্য অতর্কিত হামলা চালাতে পারেন। নির্দেশিত পথের বাইরে পা ফেলার শখ হলেই। তবুও আমরা পরিবারের ৩ জন এবং আরো ২/৩ জন পরিব্রাজক সাহস করে একটুখানি হেটেছিলাম সেদিন সুন্দরবনের গহীনে। পেছন থেকে যে কোনো সময় মৃত্যুদূতরূপী বাঘের হামলার গা ছমছমানি আতংক টেরই পেতাম না জীবনে, সেদিন ওই একটুকু অরণ্যপথ না হেটে এলে।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারের এতো সুবিখ্যাত বিচরণক্ষেত্র সুন্দরবন আমাদের সাথে প্রহসনে মেতেছিলো শুধু গাছে গাছে গোটা বিশেক হনুমান-বাদরের দাত কেলিয়ে বাদরামো দেখার সুযোগ করে দিয়ে।বাদরগুলো কি ভয়ানক রকমের বাদর রে বাবা! এই গাছে দোল খায়, তো পরক্ষনে কারো মাথার ক্যাপ নিয়ে চড়ে বসে গাছের মগডালে, এরপর ঠাই নেয় কারো কাঁধের উপর। জন্মগত বৈশিষ্ট্য উনাদের। তবে আমাদেরও তো পূর্বপুরুষ উনারাই বলে কথিত, কাজেই খুব বেশী অচেনা ঠেকলো না চোখে তাদের কর্মকান্ড।

দু’একটা চিত্রাহরিণ মনে হয় দ্রুতবেগে ছুটে গেলো গাছগাছালির ফাঁকে, নাকি চোখের ভুল?তবে দূরে কোথাও হরিণের ডাক শুনতে পেলাম বিলক্ষন।কর্কশ তারস্বরে ডাক। এতো সুন্দর প্রাণীগুলোর সাথে একটু বেমানান বটে। তবু সুন্দর আর অসুন্দরের মেলবন্ধনেই তো জগতের ভারসাম্য নিহিত। আমাদের বনবিভাগকে কৃ্তজ্ঞতা না জানিয়ে পারা যায় না এ ব্যাপারে যে, কাঠের সেই মাইলখানেক বাঁধানো রাস্তার শেষে তারা খুব শৈল্পিক চারদিক খোলা খড়-বাঁশ-কাঠে বানানো, দেয়ালঘেষা বসার বেঞ্চসহ কয়েকটি কুঁড়েঘর তৈরী করে রেখেছে খোলামতন একটা গাছ গাছালি ঘেরা পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলধারার কিনারে। এমনটিও হতে পারে গাছ কেটে পরিষ্কার করে জায়গাটা প্রস্তুত করা হয়েছে বসার জন্যই। তা যাই হোক , খুব ভালো লাগছিলো সেখানের বনরাজি ঘেরা উপরের গোলাকার নীল আকাশ দেখতে। জলের তীরে কাদায় নানা রকমের জন্তুর পদচ্ছাপ। আমার আনাড়ি চোখে সবকটাকেই হরিণের পায়ের ছাপ মনে হলেও, বাঘসহ অন্যান্য প্রাণীর পায়ের ছাপ হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়।

এরকম ঘন নিবিড় বনের মধ্যে বয়ে চলা জলধারার পাশে বানানো ছোট্ট কুঁড়েতে বসে, বুনো ঘ্রাণে মাতাল বাতাসে বুকভরে শ্বাস নেবার সা্ধ, মনে হয় সকলেরই মনে মনে রয়ে যায় হাজার বছর মনের কোনে লালিত অধরা স্বপ্নকথায়।সেখান থেকে ফিরে চলে এলেও, একখন্ড মন আমরা পিছু ফেলে আসি সেই নির্জনতার কোলে, নাগরিক যান্ত্রিক-যন্ত্রণার কোলাহলে আটকে পড়া সময়ে বসে চুপিসারে আনমনে হারিয়ে যাবার জন্য।আমিও তাই কল্পনায় ফিরে ফিরে যাই সে গহীন সুন্দরবনের আলো-ছায়ায় বারেবার।

যাহোক, ফেরার পথে ফিরলাম সেই একই কাঠ বাঁধানো সড়কপথে।এরপর, সুন্দরবনস্থঃ বনজ প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ঘুরে দেখার পালা। কুমির, ঘড়িয়াল, অজগর, হরিণ, ময়ুর নানাবিধ পশু পাখির সমাবেশ সেখানে।মোটামুটি খোলা জায়গায় নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরী করে জীবগুলোকে কিছুটা স্বাধীনতা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে দেখে ভালো লাগলো। ঘুরে ফিরে দেখে মনে হলো, প্রজনন কার্যে কুম্ভীর কূলের আগ্রহই বেশী। তাই বেশ কিছু ক্ষুদে কুমির ছানার সাক্ষাৎ মিললো সেখানে।

আরো অবাক কান্ড, আমার মেয়ে অদিতা তখন উত্তরা মাস্টারমাইন্ড স্কুলে পড়তো। ক্লাশে ওর প্রিয় বান্ধবী আরিশা। আরিশার মা হুমা আর আমিও একসাথে ইন্টেরিয়র ডিজাইন পড়ছিলাম।আমরাও বেশ বন্ধু। উত্তরা লেক ড্রাইভ রোডে ৭/৮ বাসা পরপর আমাদের বাস। অথচ, বলা নেই, কওয়া নেই, কোনো পূর্বপরিকল্পনা নেই, ওদের পরিবারের সাথে দেখা হয়ে গেলো সুন্দরবন বনজ প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে হঠাৎ করে। যেন, চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্য্যে”। অদিতা-আরিশা দুই বন্ধুই খুব মজা করে হরিণ-ময়ুরেরে সাথে খেলা করলো বেষ্টনীর বাইরে থেকে। কচি ঘাস পাতা জোগাড় করে খেতে দিলো হরিণ ছানাদের। কুমির, ময়ূর, অজগর দেখে উচ্ছসিত হলো। আমি আর হুমাও গল্পে গল্পে অনেকটা সময় পার করলাম।

তারপর ছায়ারা আরেকটু দীঘল, আরেকটু গাঢ় হয়ে এলে, সবুজ বনরাজি আরো স্নিগ্ধ রূপে সাজিয়ে নিলো নিজেকে। বিকেলের হাওয়া একটু শিরশির কাঁপন তুলে খোলা নদীর হু-হু বাতাস বুলিয়ে দিলো অরন্যের ঋজু শরীরে। আমরা শহুরে মানুষ, দিনের বেলাতেই অরণ্যের গহীনে পা ফেলা নিষেধ। সেখানে অন্ধকারে তো টেকার প্রশ্নই আসে না।এ জীবন তো নয় সপ্তডিঙা মধুকরের, বনদেবীর জোছোনায় বাওয়ালী মনের স্বপনের ঘোরে মৌ মৌ ঘ্রাণ খোঁজা ধোঁয়াশার মৌচাক। তাই বেলাবেলি ফিরতে হয় সভ্যতার পাদপীঠে।

তাই সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ঘাটে বাঁধা খোলা ডেকের উপর চেয়ার বসানো নৌকোগুলো নোঙর তুললো মংলার লোকালয়ের উদ্দেশ্যে। ভরদুপুরের রৌদ্রের নদী ও জীবন ধারার সাথে অপরাহ্নের ছলছল ঢেউভাঙ্গা গোধুলীবেলার নদীপথের বিস্তর ফারাক। দুপুরের নদী আকাশের সবটুকু নীল অঙ্গে মেখে নীলাম্বরী সাজে জলকে চলে, আর অপরাহ্নে সে ঘোমটা টানা নোলকে লাজনম্র গাঁয়ের বঁধুর মতো মায়ার কাজলে শিহরিত। তাই যে পথ বেয়ে গেছি সুন্দরবনের সৌন্দর্য্য সুধাপানে, সে পথ আর ফেরার পথ, অভিন্ন হয়েও দুই রূপে ধরা দিলো মনের আয়নায়।

কনে দেখা লগ্নে নদীতীর গাঁয়ে কোনো এক না দেখা কৃষ্ণকলি কুমারীর চোখের কাজলের মতো লেপটে নেমে এলো প্রগাঢ় রাত্রির অন্ধকার। জেলে নৌকাগুলো ফিরে গেলো ঘাটে। দূরে কাঁপাকাঁপা টিমটিমে প্রদীপের আলোগুলো জ্বলে উঠলো। এবেলা হাতের তালপাখা নেড়ে ক্ষুধার অন্নে পরিবার পরিজনকে তৃপ্তির আহার করিয়ে, তবেই হবে শ্রান্ত বঁধুদের দিনাবসান। তারপরও কূপির আলোয় গুটিকয় পাঠনবীশ সুর করে পড়বে মাস্টারমশায়ের বাড়ির কাজ। সূক্ষ্ম সূচীকর্মের কাঁথায় মুড়ি দিয়ে নামবে শ্রান্তির ঘুমপরী। রাতের আকাশের তারারা ফুটে রবে নীরব স্বাক্ষী হয়ে।

সেই সাথে আমাদের গর্বের সুন্দরবন, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজকীয় বাসস্থানের স্মৃতিমালা মনের মুকুরে গেঁথে নিয়ে, আমাদের পথিক মন ও ফিরে এলো চেনা চৌহদ্দির শহুরে যাপনের ঘেরাটোপে।