সুন্দরবন সুরক্ষায় নানা অবহেলা থাকলেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই বনের আর্থিক অবদান বছরে পাঁচ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। পর্যটন, দুর্যোগ থেকে রক্ষা ও জীবিকার মাধ্যমে এই অবদান রাখছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন।

সম্প্রতি এক সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএফইএসসিইউ) একটি সমীক্ষা চালায়। ইউএসএইড ও উইনরক ইন্টারন্যাশনালের আর্থিক সহায়তায় এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়। আইএফইএসসিইউর ড. এএইচএম রায়হান সরকারের নেতৃত্বে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অর্থনীতিবিদ এম নূর নবী এবং প্রকৃতি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের জিআইএস (ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা) বিশ্নেষক ইমরান হাসান সমীক্ষায় অংশ নেন। চট্টগ্রাম ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪১ শিক্ষার্থী তাদের সহযোগিতা করেন।

সমীক্ষায় দেখা যায়, সুন্দরবন থেকে চার খাতে মোট ২২ ধরনের সেবা মেলে। এর মধ্য থেকে তিন খাতের ওপর জরিপ চালিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দল। তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের পর্যটন খাত থেকে বছরে আসে ৪১৪ কোটি টাকা বা ৫৩ মিলিয়ন ডলার। সুন্দরবন থাকার কারণে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন ও সম্পদ বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। এই বনের কারণে বছরে তিন হাজার ৮৮১ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পায়। জীবিকার মাধ্যমে বছরে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সম্পদ পাওয়া যায় এই বন থেকে।

এ বিষয়ে গবেষক দলের প্রধান ড. এএইচএম রায়হান সমকালকে বলেন, সুন্দরবন পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ২২ ধরনের সেবা দিয়ে থাকে। কিন্তু টাকার অঙ্কে এ সেবার মূল্যমান সঠিকভাবে নিরূপিত হয়নি। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদানকে সব সময় অবহেলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, সময় ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাছাই করা কয়েকটি সেবা নিয়ে জরিপ করা হয়েছে। সুন্দরবনের প্রকৃত আর্থিক মূল্য আরও কয়েকগুণ বেশি। তিনি জানান, কার্বন ক্রেডিটে সুন্দরবনের একটি বড় মূল্য রয়েছে।

বন বিভাগের এক গবেষণায় জানা যায়, সুন্দরবন বছরে ১৬ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ধরে রাখে। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার অনুসারে এর মূল্য পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার।

সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব ডা. আবদুল মতিন নতুন সমীক্ষার ফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, মূল্য জানা না থাকায় বিভিন্ন সময়ে সরকারের কাছে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন প্রশ্নে সুন্দরবন অপেক্ষা মংলা বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প কারখানা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার মনে করে, এসব খাতে বিনিয়োগ করলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়। কিন্তু সুন্দরবনের আর্থিক মূল্য জানা থাকলে নীতিনির্ধারকদের এর গুরুত্ব বোঝানো সহজ হয়। তিনি সুন্দরবনের সার্বিক অর্থমূল্য নির্ধারণে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বিশ্বঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই বনের মোট আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে পড়েছে, বাকিটা ভারতের অংশে। এই বনে রয়েছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪২৫ ধরনের প্রাণী এবং ২৯১ জাতের মাছের আবাসস্থল। প্রায় ৩৫ লাখ জনগোষ্ঠী জীবন-জীবিকার জন্য এই বনের ওপর নির্ভর করে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবন।

পর্যটন সেবা :জানা যায়, বন ও বন্যপশুর আকর্ষণ এবং ধর্মীয় উৎসব যেমন রাসমেলা ও বনবিবির মেলা দেখতে দেশি- বিদেশি পর্যটকরা সুন্দরবন ভ্রমণ করেন। সমীক্ষার উদ্দেশ্য দৈবচয়ন ভিত্তিতে ৪২১ ভ্রমণকারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। জরিপে দেখা দেখে গেছে, পর্যটকের বড় একটি অংশই দেশি (৮৭.৬ শতাংশ)। দেশীয়দের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই খুলনা অঞ্চলের। পর্যটকের ৮৪ শতাংশ আসেন আনন্দ ভ্রমণে আর ১২ শতাংশ ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে। পর্যটকের ৮৭ শতাংশ পুরুষ ও ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী। বন রক্ষার জন্য অতিরিক্ত ফি দিতে রাজি আছে ৭০ শতাংশ পর্যটক। বছরে সুন্দরবনের পর্যটন খাত থেকে আয় হয় ৪১৪ কোটি টাকা।

দুর্যোগ সুরক্ষা : গত ১০০ বছরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ৫০৮টি সাইক্লোন আঘাত হেনেছে। সুন্দরবন থাকায় উপকূলের জান ও মাল এসব সাইক্লোনের একটি বড় অংশের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। শুধু ২০০৭ সালের সিডরে উপকূলে তিন হাজার চারশ’ লোক মারা যায়। সিডরে এক দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সুন্দরবন না থাকলে যা আরও কয়েকগুণ বাড়ত।

এই সমীক্ষায় সিডরের আঘাতকে বিবেচনায় নেওয়া হলেও সব ক্ষতিকে হিসাবে আনা হয়নি। শুধু বসতবাড়ি, শস্য, গবাদিপশু ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষতি এবং আবার আবাস গড়ে তোলার ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। বনের নিকটবর্তী ৯ উপজেলার এক হাজার ২৫টি পরিবারের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়েছে, যারা উপকূল রক্ষা বাঁধের এক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। সমীক্ষার ফল অনুসারে সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮০ হাজার ৬৪১ ডলার বা ৬৪ লাখ ৫১ হাজার টাকার সম্পদ রক্ষা পায়। পুরো বনের হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৮১ হাজার কোটি টাকা।

জীবিকার উৎস : প্রায় ৩৫ লাখ দরিদ্র মানুষ জীবিকার জন্য পুরোপুরি বা আংশিকভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। ৯টি উপজেলায় এ বিষয়ে সমীক্ষা চালানো হয়, যার ছয়টি সুন্দরবন লাগোয়া আর তিনটি বরগুনা জেলার। উপকূলরক্ষা বাঁধের এক কিলোমিটারের মধ্যে ৩৬১টি পরিবারের তথ্য নেওয়া হয়।

সমীক্ষায় পাওয়া যায় সুন্দরবন ও এর আশপাশের পেশাজীবীরা প্রধানত আটটি পণ্য বন থেকে সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। বন থেকে কাঠ আহূত হলেও তা অনুমোদিত নয়। চোরাপথে কাঠ কাটা হয়। তাই সমীক্ষায় এটি বাদে সাতটি পণ্যকে হিসাবে নেওয়া হয়। পেশাজীবীদের মধ্যে ৩১ শতাংশ জ্বালানি কাঠ, ৬.৩ শতাংশ মধু ও মোম, ৯.৪ শতাংশ গোলপাতা, ৫৪.৮ শতাংশ মাছ, ১৮ শতাংশ চিংড়ি ও চিংড়ি পোনা এবং ২৯ শতাংশ কাঁকড়ার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। এই সাত পণ্যের মাধ্যমে বছরে এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থিক সম্পদ পাওয়া যায় সুন্দরবন থেকে।

জরিপে সুন্দরবন রক্ষায় কিছু সুপরিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম পরিবেশবান্ধব ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলা, সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় তহবিল গঠন করা, বনের ওপর নির্ভরতা কমাতে আশপাশের জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক জীবিকার উদ্যোগ নেওয়া, পর্যটনভিত্তিক গ্রাম গড়ে তোলা, তাদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ দিয়ে স্বনির্ভর করে তোলা, পর্যটকদের প্রবেশ ফি বাড়ানো, নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়া স্পর্শকাতর প্রতিবেশ ও পরিবেশের এলাকাগুলোতে পর্যটকের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা, ধারণের অতিরিক্ত পর্যটক প্রবেশ করতে না দেওয়া, কৃত্রিম অবকাঠামো না বানিয়ে বনের আকার বাড়ানো, চিংড়ি ঘের বাড়তে না দেওয়া এবং বন রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ করা ইত্যাদি।