নীল ঊর্মিমালার কলতানে মুখরিত বঙ্গোপসাগরের নিবিড় উপকণ্ঠে প্রকৃতি-লক্ষ্ণীর নিপুণ হাতের সবুজ আলপনায় সাজানো রূপসী রাজকন্যার মতো, বিপুল বিচিত্র বৃক্ষসম্ভারে সমৃদ্ধ, বহুবর্ণিল পক্ষীকুলের কল-কাকলি মুখর, চিত্রল হরিণ আর বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণ-সাম্রাজ্য ভয়-ভক্তি-ভালোবাসা মেশানো মায়াময়-ছায়াময় সুন্দরবন নিজেই যেন প্রকৃতির এক মহাকাব্য, রহস্যময় ছবি এবং বিচিত্রভাবে গান। সৌন্দর্যরসিক কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক এবং পর্যটকের এক চিরন্তর দুর্বার আকর্ষণ এই সুন্দরবন। তারাঁ সুন্দরবনকে নিত্য নতুন শিল্প সুষমা দান করেছেন তাঁদের শিল্পকর্মে। লিখেছেন কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক-গান, একেঁছেন ছবি। বাংলাসাহিত্যে প্রতিনিধিত্বকারী এমন কবি-গল্পকার-ঔপন্যাসিক-নাট্যকার-গীতিকার খুজেঁ পাওয়া কঠিন হবে যিনি কোনো না কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে সুন্দরবনকে তারঁ সৃষ্টিকর্মের বিষয়বস্তু করেননি। এমনকি ব্রিটিশ রাজকবি টেড হিউজেস এশীয় কবিতা উৎসবে যোগ দিতে বাংলাদেশে এসে সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তারঁ নীল চোখে সুন্দরবন যে মায়াকাজল পরিয়ে দিয়েছিল তারও প্রতিফলন ঘটেছিল তারঁ কয়েকটি কবিতায়। সুন্দরবনের যেন এক সম্মোহনী শক্তি আছে। আছে এক দুর্বার আকর্ষণ। সেই আকর্ষণে মানুষ ঘর ছাড়ে। প্রতি পদে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা সত্ত্বেও মানুষ পিছুটান ভুলে সুন্দরবনে যায়। এ কারণেই বোধ করি কোনো এক অজ্ঞাত গীতিকার গান বেধেঁছিলেন- যে খেয়েছে কেওড়ার ঝোল সে ভুলেছে মায়ের কোল। কথিত আছে, সুন্দরবন অঞ্চলে এক সময়ে পীর-দরবেশ গাজী ও কালুর বিশেষ আধিপত্য ছিল। সুন্দরবনের বাঘ-কুমিরও নাকি তাদের বশ্যতা স্বীকার করতো। সে কারণে বাওয়ালি, মৌয়াল, জেলে কিংবা কাঠুরিয়ারা সুন্দরবনে প্রবেশের মুখে বাঘ-কুমিরকে ভয় দেখিয়ে দূরে তাড়াবার জন্য-গাজী-কালুর নামে বিভিন্ন মন্ত্রধ্বনি উচ্চরণ করত গগন বিদারী চিৎকার। এবং এই রীতিটি এখনো প্রচলিত। তাই সুন্দরবন এলাকায় নৌকাচালকরা আজো ভক্তিভরে গায়- গাজী কালু পুণ্যবান খোয়াজ খিজির নেগাবান মুখে বল আলস্নাহ আলস্নাহ বদর বদর। সুন্দরবনকে সুন্দরীবন, স্থানীয় ভাষায় বাদা বা বাদাবনও বলা হয়ে থাকে। সুন্দরবন বহু মানুষের জীবিকার বিচিত্র অবলম্বন। সেখানে কাঠুরিয়া যায় কাঠ ও গোলপাতা সংগ্রহ করতে, মৌয়াল যায় মধু সংগ্রহে, জেলে যায় মাছ ধরতে। নদী-খাল-ভূমিসহ সুন্দরবন প্রকৃতির অকৃপণ এক সম্পদ ভাণ্ডার। সুন্দরবনের নদীখালে প্রচুর পরিমাণ পাঙ্গাস মাছ ধরা পড়ে। এই পাঙ্গাস মাছ নিয়ে বেশ মজার একটি গান আছে। জেলে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কৃত্রিম অভিমান ভরা উচ্চারণ। কওদিন তুমি বাদাবনে পাঙ্গাস মাত্তি কবে যাবা আমি এমন কইরে রাইন্ধে দেব ঝোল থুয়ে তুমি হাত চাইটে খাবা। প্রথমেই আমরা প্রমিত বাংলাভাষায় রচিত সুন্দরবনভিত্তিক কয়েকটি গানের উলেস্নখ করতে চাই। কবি-সাহিত্যকরা যেমন গল্প-উপন্যাস-কবিতায় বিভিন্ন কাহিনী বর্ণনার সাথে সাথে সুন্দরবনের ভৌগোলিক রূপের বিবরণ দিয়েছেন তেমনি সঙ্গীত রচয়িতারাও তাদের গানে সুন্দরবনকে নতুন মাহাত্ম্য দান করেছেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুন্দরবন যেমন তৎ সংলগ্ন বহু মানব গোষ্ঠীর জীবন যাত্রাকে প্রভাবিত করেছে তেমনি প্রভাবিত করেছে শিল্পপ্রেমীদেরকেও। এই সুন্দরবন, নদী, সাগর কখনও হিংস্র, কখনো শান্ত। কখনো জীবন-ঘনিষ্ঠ, কখনো জীবন বিচ্ছিন্ন। এরা যেমন আশীর্বাদ, কখনো আবার অভিশাপও। তবু সবরকম বিরুদ্ধতা বিরূপতা উপক্ষো করেও শিল্পীর সতৃষ্ণ নয়নে সুন্দরবন চিরসুন্দর। মহাকবি কালিদাস তারঁ অভিজ্ঞানম শকুন্তলম্ নাটকের নায়িকা শকুন্তলার রূপ বর্ণনা করেছে সারি সারি বৃক্ষসম্ভারে পরিবেষ্টিত এক আশ্রমের নিবিড় সান্নিধ্যে। অর্থাৎ শকুন্তলার অপার্থিক সৌন্দর্যের উৎসারিত আলো যেমন আশ্রমের বৃক্ষলতা প্রকৃতিকে এক অলেকিক হিরণ্য-দীপ্তি দান করেছিল তেমনি আশ্রমের চারদিকে ঘিরে থাকা কুঞ্জবীথিও যেন শকুন্তলার পূর্ণরূপ বিকাশের পটভূমি হয়ে উঠেছিল এবং শকুন্তলাকে স্বামীগৃহে প্রেরণের প্রাক্কালে আশ্রমসুলভ পত্রপুষ্প দ্বারা অলংকৃত করা হয়েছিল। সুন্দরবনের ক্যানভাসে এমনই একটা চিত্র অঙ্কন করেছেন কবিয়াল বিজয় সরকার। সুন্দরবনের লতা-গুল্ম-পত্র-পুষ্প দ্বারা তিনি তার মানস প্রতিমাকে সাজাতে চেয়েছেন। বিজয় সরকার গেয়েছেন। আমি সুন্দরবনে দেখে এলাম গো-সুন্দরী এক মেয়ে। আছে এলো চুলে সাগর কূলে অপলক নয়নে চেয়ে কর্ণে তাহার দুলিতেছে কেওড়া ফুলের দুল, নাসিকার বেসাতি তাহার বনলতার ফুল, তার রূপের ছটায় সাগরের কূল বনভূমি গেছে ছেয়ে লাফিয়ে ওঠে ভোরের সুরুয পূরবের অঙ্গে। কত ঢেউয়ের নাচন রঙে রঙে চলে কলগীতি গেয়ে বেলাভূমি সাজায় কন্যা চিত্র আল্পনায় বিধাতা বিমুগ্ধ যেন শিল্পীর শিল্পনায়। ইহা বলা চলে না কল্পনায় দেখ, সাগর স্নানে যেয়ে সুন্দরী মেয়ের রূপরাশি জাগিলে মনে, পাগল বিজয় বলে, মন মানে না গৃহ বন্ধনে, আমি ছুটে চলি সুন্দরবন মানসতরীখনি বেয়ে বিজয় সরকারের গানে সুন্দরবনের শান্ত স্নিগ্ধ রূপটাই প্রতিভাত হয়েছে কিন্তু চারণ কবি নিশিকান্ত সরকারের গানে সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর দিকটিই ফুটে উঠেছে। স্নিগ্ধতা যেন হিংস্রতায় পর্যবসিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন- সুন্দরবনের সুন্দর শোভা দেখতে এসে শেষে, বাঘের ডাকে পরান কাঁপে মরি যে তরাসে আমার সুখের আশা, বুকের ভাষা শুকায় হা-হুতাশে দেখি বৃক্ষরাজি আছে সাজি পশর সুন্দরী বনদেবীর সুন্দর ছবি অপরূপ মাধুরী সেথায় নাচিছে বনের বানরী, হরিণী হরষে কেওড়া, গেওয়ার মাঝে আছে কেয়াকাঁটার বন বাঘিনী ওৎঁ পেতে আছে মেলিয়া নয়ন লো-লো রসনা বিকট বদন ভীষণ লালসে শিবসা নদীর লিপ্সা মনে ছিল চিরকাল ভদ্রা নদী পার হতেই আজ ঘটিল জঞ্জাল সেথা হাঙ্গর কুমির দুরন্ত ভয়াল, মানুষ খায় নিমিষে নিশি বলে একটা জিনিস দেখলাম বড়ো ভাল এমন নোনা জলে বন জঙ্গলে সোনা ফলাইল বুঝি তাইতে মানুষ ভুল রল মানুষ খাওয়ার দেশে চারণ কবি অনাদি সরকার তারঁ গানে সুন্দরবন সংলগ্ন সাগরে অগ্রহায়ণ মাসে রাসপূর্ণিমার মেলার বর্ণনার মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করেছেন। ক্ষণস্থায়ী এই পার্থিব জীবনটাকে তিনি রাসপূর্ণিমার মেলার নিছক কোলাহলের মতো মনে করেছেন। মেলা ভাঙলে সবাই যেমন ঘরে ফিরে যায় তেমনি জীবন বেলা শেষ হলে মানুষকেও স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতে হয়। নদীর খোয়া পার হতে যেমন কড়ি লাগে তেমনি পুণ্য সঞ্চয় লাগে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পেতে। তাই অনাদি সরকার সমুদ্ররূপ জীবনের তীরে দাঁড়িয়ে সেই পরম পুরুষের কৃপা ভিক্ষা করেছেন। বসে আছি কূল হারা এই সাগর কিনারায় পশুর নদীর ভাটির শেষে, আসিয়া এই জংলা দেশে হায়। রাসপূর্ণিমার যোগে যেদিন মিলেছিল মেলা বন্ধু বান্ধব নিয়ে আমি করতে ছিলাম খেলা এসেছিলাম পানসি করে, আমার নৌকা দিল নোনায় মেরে একা পড়ে বালুচরে করিরে হায় হায়, দুদিন পরে ভাঙল মেলা দেখতে পেলাম শেষে সহায় সম্বল ছিল যাদের ফিরে গেলো দেশে। একা আমি সাথে নাই কেউ, আমার সম্মুখে ঐ সাগরের ঢেউ পিছনে ওই সাগরের ঢেউ কি করি উপায় কেমন করে যাবো আমি আপন ভবন সম্মুখে অকুল বারিধি ভীষণ তুফান অন্য হেরি সাগরের তীর, পরান আমার হলো অস্থির উপরে বাঘ জলে কুম্ভীর কি করি উপায় অনাদি কয় এমন দেশে আসিয়াছি বটে এত সুন্দর পানি তবু পিপাসা না মেটে কূলহারা এই সাগরের কূল, আমি বসে আছি সাগরের কূল কেউ যদি হও আমার বলে উদ্ধারে আমায় যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থে শ্রী সতীশচন্দ্র মিত্র লিখেছেন- এতদ্দেশীয় লোকেরা সুন্দরবনের ভ্রমণ করিবার অবসর পাইলে, তাহার নদীনালা সুন্দরভাবে মনে করিয়া রাখে এবং সময় সময় স্বভাবজাত কবিতার রসে উচ্ছ্বসিত হইয়া গীত রচনা দ্বারা পথের পরিচয় স্মরণ-পথে রাখে। তাহাদের সেই সকল সরল গানে তাহাদের যেমন সরল প্রাণের প্রমাণ পাই, তেমনি এ দ্বারা অন্য অনেক নিরক্ষর ভ্রমণকারীর পথভ্রান্তির সম্ভাবনা কমাইয়া দেয়। এখানে এই জাতীয় একটি দেশীয় গান উদ্ধৃত করিয়া দিলাম। এই গীত-রচয়িতা বাড়ুলির পূর্ববর্তী চেচেঁা গ্রামে বাস করিতেন, এবং তথা হইতে নৌকাপথে সুন্দরবনে যাইতেন। জঙ্গলা ভাষারও কতকটা দৃষ্টান্ত এই গানে পাওয়া যাইবে। চেচেঁার গ্রামে বাস করি খোসনবীশে পূর্ব অংশে তুলে দিলাম, নিমাই খালির ভাটি। হাড়ে বাসে ছোট নদী ত্রিমোহানা ভারী সেখানেতে বায়ে দিলাম মনসুখের তরী। বাঁকের মাথায় কোদার গাঙ্গ জানে সর্বজনা বায় থাকিল দেলুটির গাঙ্গ ডানি সোলাদানা। মাদুর পাল্টা, হাড়ার গাঙ্গ, তাতে বড় টান পূর্বের দিকে চেয়ে দেখ তিল ডাঙ্গার গাঙ্গ। তিল ডাঙ্গার পশ্চিমের ভাই আছে গড়খালি সেইখানেতে চেয়ে দেখি কুচিয়া আর চাদঁখালি। সুন্দরবনের গান রচনার প্রধান পত্রিকৃৎ মনোরঞ্জন সরকার। তার বাড়ি খুলনা জেলার দাকোপ থানার সাহেবের আবাদ গ্রামে। জিতেশ্বর দেওয়ান নামে একজন বনকর্মকর্তার পারিবারিক চিকিৎসক হয়ে তিনি সুন্দবনের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করেন। সুন্দরবনের রূপবৈচিত্র্য, পাখ-পাখালি, জীবজন্তু, জেলে-বাওয়ালিদের জীবন সংগ্রাম তার শিল্পী মনে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। এছাড়াও তিনি লক্ষ্য করেন সারা দিনের কর্মক্লান্তি ভোলার জন্য জেলে-কাঠুরিয়া-মৌয়ালরা তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় গান গায়। কিন্তু এসব গানে তিনি খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় উপস্থিতির অভাব লক্ষ্য করেন। তার জেদ চেপে গেলো। তিনি কলম তুলে নেন হাতে। লিখতে শুরু করেন সুন্দরবনকে বিষয়বস্তু করে খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় গান। তিনি নিজেই এসব গানে সুর সংযোজন করে গেয়ে গেয়ে রীতিমতো সাড়া ফেলে দেন। অনুসন্ধানী লেখক মৃত্যzঞ্জয় রায়ের ভাষ্য মতে : তিনি মনোরঞ্জন সরকার বাদা সুন্দরবন নিয়ে অনেক গান লিখে সুর দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বেতারে গেয়ে সেগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। খুলনার অসংখ্য আঞ্চলিক গানের মধ্যে বাদার গানগুলে যেন স্বাতন্ত্র্য খুজেঁ পেয়েছে, যেখানে বাদাবনের পরিবেশ, জীবন ও জীবিকার ছবি উঠে এসেছে অকৃত্রিমভাবে। বলা যায়, শিল্পী মনোরঞ্জন সরকারই বাদার গানের পথিকৃৎ। সুন্দরবনকে নিয়ে তার রচিত গানের সংখ্যা পঞ্চাশের মতো। তার একটি গান এ রকম- স্ত্রী : তোমার দুকোন পায়ে পড়ি বাদায় যাইয়ে না। ঐ সুন্দরবনের নাম শুনলি ধড়ে পেরান রয় না বাওয়ালি : যাত্রাকালে ও তারাজনা বাধা দিয়ে না। কনতে আসপে প্যাটের ভাত শাড়ি আর গয়না যাত্রাকালে ও তারাজান বাধা দিয়ে না স্ত্রী : জোঙ্গোলের কাজ ছাড়ান দিয়ে মানষেলায় কাজ ধরো। নিশ্চিন্তে নিরভাবনায় যাইচ্ছে তাই করো। জানে শুনে বিপদের ঝুকিঁ মাথায় আর নিয়ে না তোমার দুকোন পায়ে পড়ি বাদায় যাইয়ে না বাওয়ালি : আড়াই হাজারমুনি লুকোয় যাব পাচঁ ছয় জন, সোবাই গেরামে পিত্তিবাস আত্মীয় স্বজন। মাস খানেক পর আসপো ফিরে অধৈর্য হয়ে না যাত্রাকালে ও তারাজান বাদা দিয়ে না স্ত্রী : গাছে সাপ জলে কুমোর অতি হিংয়োচ্ছোর। ডাঙ্গায় আবার দারুণ বাঘ আর দাঁতালে শোর। উগে সামনে পলি কারো রেহাই থায়ে না। তোমার দুকোন পায়ে পড়ি বাদায় যাইয়ে না বাওয়ালি : হায়াত মউত রিজিক জানো সবাই আলস্নার হাতে তার হুকুম বিনে গাছের পাতাডাও পড়েনা তলাতে আলস্নার পরে ভরসা রাইও কুডাক ডায়ে না উভয়ে : আলস্না নবীর নাম যেন ভুলে যাইয়ে না তুমি আলস্না নবীর নাম যেন ভুলে যাইয়ে না এ ছাড়াও তার উলেস্নখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে অন্যতম- দুবলার চরে মেলা বসে রাসপূর্ণিমার, সুন্দরবনে বাঘের কোথা কী যে কব আর, মা বোনবিবি রলি কনেরে তোর সন্তান আলো সুন্দরবোনে, ভদ্রার চরে ঘর আমার, আমি সুন্দরবনের জেলে, বাউলি গেছে কাট কাটতি গহন সুন্দরবনে, গাছ দোয়ায়ে বান্দরের দল হরিংগে পাতা খাওয়ায়, মৌভাংতি যাবা মৌওলরে ও মৌওল ঝামটা গরান বনে, সুন্দরবোনের ওষুধ নেওড়া সব মানুষি খায়, টেপা মাছ খায়ে না বাউলি বাদাবোনে যায়ে প্রভৃতি। সুন্দরবন সংশিস্নষ্ট জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকার নিরন্তর সংগ্রাম, নিত্যকার হাসি-আনন্দ প্রেম-বিরহ-মান অভিমানের পাশাপাশি ঝড়-ঝঞ্চা-জলোচ্ছ্বাস, বাঘ-কুমিরের আক্রমণ, প্রচলিত বিশ্বাস লোকাচার প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাত রচয়িতাদের সুন্দরবনের গানে। সুন্দরবন ঘনিষ্ঠ মানুষের দিন যাপনের একটি চিত্র পাওয়া যায় নিম্নোক্ত দুটি গানে- মাছ-কাকঁড়া মারতি আমি যাবো সুন্দরবনে। রাত থাকতি ভাত রান্ধার কথা রাইহো তোমার মনে পের্থম্ ভাটি লাগলি তহোন ছাড়বো আমার নাও, দরকারি যা জিনিস-পত্তর গোছ গাছ এরে দাও, বহর ধরেই যাতি হবেনে অন্য লোকের সনে মেলা মাছ ধরতি পারলি যে পাবানি বেশ টাকা, দেইহো তহোন যাবেনে ঘুরে এই জীবনের চাকা, ফিরে আসপেনে শান্তি তহোন এই দুঃখের জীবনে বাঙালির চিরনতর পরণকথায় ঢঙে দাদু নাতিকে সুন্দরবনের গল্প শোনাবার একটি চিত্র পাওয়া যায় এই গানে গানটিতে আঞ্চলিক ভাষায় চমৎকার ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। সমবেত কণ্ঠের গান/ তাল-ঝুমুর দাদুর ঠাই যে সুন্দরবনের গল্প শুনিছি শুনে ভয়তে কাঁপছি, স্বপ্নে কত চেচাঁইছি দাদুর ঠাইঁ যেৃ আন্ধার গোন পলিস্ন অমনি বাঘ চলে আসত গুয়োলিত্তে গরুছাগল, ধরে নিয়ে যাতো, ও! কত মানুষ-গরু-ছাগল, খাইছে আনতালি ট্যার পাতিছি দাদুর ঠাইঁ যে পোঁড়ায় বলে নকল গলায় নাম ধরে ডাক্ তো, তাইতি তিন ডাহের পর ডাক শোনতো কতা না কতো, তারা বেলা থাকতি ভয়তে উঁচো টোঙ্গে উঠে যাতো, ক্যাবল ঢালুম মালুম চাতো। হরিং মোষ আর বুনো শুয়োর, ধান খাতি আসতো ওরে খান খাতি আসতো সুংখী মানুষ পালি গুতোঁয়, ফাঁড়ে ফেলার দেতো, ও তহন,, গাঙখালে কুমোর আসতো, গরুরপালে হরিং থাকতো একতাডাও জানিছি দাদুর ঠাইঁ যে সুন্দরবনের গল্প শুনিছি। সুন্দরবনের বনজীবী মানুষেরা জীবন বাজি রেখে জীবিকার সংগ্রামে অবর্তীণ হয়। সুন্দরবন থেকে বিভিন্ন উপকরণ আহরণ করে তারা নিরাপদ জনপদের মানুষের চাহিদা পূরণ করে। বনজীবী- মানুষের শক্র একদিকে যেমন বাঘ-কুমির অন্যদিকে বনবিভাগের কর্মকর্তারা। কখনো কখনো অসাধু বনকর্মকর্তাদের অহেতুক হয়রানির শিকার হয় তারা। বিশেষত বাওয়ালি এবং কাঠুরিয়াদের বঞ্চনার চিত্র ফুটে উঠেছে অজ্ঞাত রচয়িতার এই গানে- আমার কি ভাই, স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ নই রে। মোদের দুঃখ কেউ দেখে না কার কাছে জানাইরে- বন জঙ্গল কুড়ায়ে এনে সবার ঘর-বাড়ি সাজাইয়ে এমন সোনার বনভূমি। আর কোথাও নাই রে। পূর্ব বাংলার কলকারখানা আমার বানাই বালাখানা মোদের পরে জুলুম চলে কেউতো ফিরে দেখে না সুন্দরবনের ব্যাঘ্রকুমির সব সময়ে করছে ফিকির সুযোগ পেলে প্রাণটি যাবে মানে না রাজা, উজির। এদের চেয়ে বড় বাঘ বন করের ঐ দারোগা সাব দিনে রাতে শিকার করে বাওয়ালি হাজার হাজার। নজর ছাড়া কয় না কথা সেলাম দিলে নাড়ে না মাথা মানবতা ভুলে গেছে। মোদের বলে ধরো ছাতা। নালিশ করলে হয় না বিচার পাশ করে ভাই, বন্ধ সবার পেটের জ্বালায় কইনে কথা সদাই ফেলি অশ্রুধার। সুন্দরবন সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে অনুন্ধান করলে স্থানীয় ভাষায় রচিত জ্ঞাত-অজ্ঞাত অনেক গীতিকারের গানের খোজঁ পাওয়া যাবে- সেগুলো সংগ্রহ করে সংকলিত গ্রন্থ প্রকাশ করতে পারলে বাংলা গানের আঞ্চলিক ধারাটি পুষ্ট হবে নি:সন্দেহে। তখন দেখা যাবে, সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদেই ভরপুর নয়, সঙ্গীতেরও এক বিপুল বিচিত্র উৎস। পরিশেষে বলা যায়, সুন্দরবনের গান আঞ্চলিক বা লোকগানের একটি অংশ হলেও এই সব গানের ভব-বিষয়বস্তু আঞ্চলিক ধারার অন্তর্ভুক্তি এড়িয়ে নিজেই গানের স্বতন্ত্র একটি ধারা হয়ে উঠতে পারে।”