গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র এই তিন নদী অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত বনভূমি সুন্দরবন। বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ বহু পেশার সঙ্গে যুক্ত। আজ আলোকপাত সেদিকেই।

বাওয়ালি/বাউলে
সুন্দরবনে কাঠুরিয়া ও গোলপাতা সংগ্রহকারীদের বলা হয় বাওয়ালি৷ বনবিভাগ থেকে পাস নিয়ে সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাওয়ালিরা সুন্দরবনে অবস্থান করেন৷ তবে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর সুন্দরবনে কাঠ কাটার (ঘের) সময় আর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি গোলপাতা কাটার সময় ছিল।
ভারতীয় সুন্দরবনে বর্তমানে এই কাঠ কাটা ও গোলপাতা সংগ্রহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া ভারতীয় সুন্দরবনের বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত দলের সঙ্গে একজন গুনিন বা ওঝা থাকেন। তাঁকেও বাউলে বলে এবং ভারতীয় সুন্দরবনের মানুষ বাউলে বলতে গুনিন বা ওঝাই বোঝে।

বন্ধ কাঠ কাটা
স্বাধীনতা পরেও সুন্দরবন থেকে গরান, হেতাল, গেওয়া, সুন্দরী, পশুর, ধুন্দল, গোলপাতা ও বাইন কাঠ কাটার অনুমতি দিত বনবিভাগ৷ আশির দশকে অনুমতি বন্ধ করে দেয় ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
বাংলাদেশ ধাপে ধাপে বন্ধ করে চলেছে, এখনও সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারেনি।

জেলে স্থানীয় ও পরিযায়ী (ত্রিবেণী)
সব সময়ই জেলেরা সুন্দরবনে মাছ শিকার করে থাকে৷ তবে শীতের সময়ে সবচেয়ে বেশি জেলে সুন্দরবনে আসেন মাছ ধরতে (বাংলাদেশে)৷ বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জেলেরা সুন্দরবনের ভেতরের নদী ও খালে মাছ শিকার করেন৷

ভোঁদড় জেলে (বাংলাদেশ)
সুন্দরবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে বহুকালের ঐতিহ্য ভোঁদড় জেলে৷ নড়াইলের চিত্রা নদী তীরের একদল মৎস্যজীবী ছোট ছোট নৌকায় চেপে সুন্দরবনের ভিতরে উদ্ববিড়াল বা ভোঁদড় দিয়ে মাছ ধরেন৷ জাল পেতে পোষা ভোঁদড়দের তাঁরা ছেড়ে দেন নদীতে৷ জলের মধ্য থেকে মাছ তাড়িয়ে আনলে জাল তুলে ফেলেন তাঁরা৷ এটি তারা বংশ পরম্পরায় করেন সুন্দরবনে (বিলুপ্ত প্রায় পেশা)।

কাঁকড়া শিকারি
এক শ্রেণির বনজীবী আছেন, যাঁরা কেবল সুন্দরবনে যান কাঁকড়া শিকার করতে৷ ছোট ছোট নৌকাযোগে এসব মানুষ সুন্দরবনের খালে, নদীতে কাঁকড়া শিকার করেন৷ সপ্তাহের চাল ডাল বাজার সহ তাঁরা জঙ্গলে চলে যান এবং এক সপ্তাহ ধরে সংগ্রহ করে ফিরে আসেন। এটি ভারত ও বাংলাদেশে এখনও চলছে। তবে ভারতীয় সুন্দরবনে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে শুধু প্রবেশের অনুমতি মেলে।

রেণু শিকারি বা মীন সংগ্রহ
সুন্দরবনের নদী-খালে এরা মাছের পোনা সংগ্রহ করে কৃষকদের নিকট বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন (ভারতে বাগদামিন সংগ্রহ জনপ্রিয় ছিল)৷ সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোর অনেক নারী ও শিশু এ পেশায় নিযুক্ত ছিল। বর্তমান ভারতে এই পেশা বিলুপ্তপ্রায়।

মৌয়াল/মৌলে
সুন্দরবনের গভীরে মধু সংগ্রহ করেন এঁরা৷ এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে বনবিভাগ থেকে অনুমতি নিয়ে মধু সংগ্রহ করে থাকেন। এঁরা একেক যাত্রায় সাধারণত পনেরো দিন বনের ভেতর মধু সংগ্রহ করেন৷ এই পেশাটিই সবথেকে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। যেটিতে জীবনহানির সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ। ভারত ও বাংলাদেশে এখনও চলে এই পেশাটি।

ছন কাটা (বাংলাদেশ)
সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে অনেক তৃণভূমিতে জন্ম নেয় প্রচুর ছন গাছ৷ ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে এসব ছন কাটার জন্য একদল বনজীবী সুন্দরবনে যান৷ ছন গাছ বিভিন্ন এলাকায় ঘরের ছাউনি ছাড়াও পানের বরজে ব্যবহৃত হয়৷
সুন্দরবনের জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ৷ এরকম নানান হিংস্র বন্য প্রাণীকে মোকাবিলা করে বছরের বড় একটা অংশ জঙ্গলে কাটিয়ে দেন সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল বনজীবীরা৷ প্রতিবছর এসব বনজীবীদের অনেকেই প্রাণ নিয়ে আর ফিরে আসতে পারে না৷ নিজেদের খাবারের সন্ধানে গিয়ে বাঘের খাবার হন তাঁরা।

(লাহিড়ীপুর, গোসাবা)