আমার কলেজের বন্ধু টিটো হঠাৎ করে একদিন কথা প্রসঙ্গে বলে ফেলল,তার নাকি সুন্দরবন দেখার বড় শখ।কথাটা আমার মনে খুব নাড়া দিল। ভাবলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন এ পর্যন্ত একবার দেখা হলোনা। সবাই মিলে একবার ঘুরে আসলে মন্দ কি?টিটো আর আমি মিলে অন্যসব বন্ধুদের রাজি করলাম। তারপর আমাদের কলেজের অহেদ স্যারকে গিয়ে ধরলাম। স্যার আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করলেন।সবাই মিলে নির্ধারিত দিনে প্রথমে বাসে মোংলা হয়ে তারপর লঞ্চযোগে রওনা হলাম সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে। তখন শীতের মাঝামাঝি সময়। কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি।পশুর নদীর মাঝ দিয়ে আমরা ভেসে চলেছি। নদীর পানি ঘোলাটে। সুন্দরবনের মুখ দেখার আগে দেখলাম “বাংলার মুখ”; উত্তর দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের এই জাহাজটি।এ রপর যে জাহাজখানি দেখলাম, সেটি একটি বহর জাহাজ। নাম লং গং বং। ইতোমধ্যে আমরা মধ্যহ্ন ভোজন সেরেছি কিছুটা স্বাদহীন ডাউল আর মাছের ঝোল দিয়ে। খাওয়ার পরে কেউ কেউ একেবারে লঞ্চের ছাদের উপরে তাস খেলতে বসেছে। কিছুক্ষণ পর স্রোতের সাথে ভেসে আসতে দেখলাম কেওড়া আর ওড়ার পাতা। বুঝলাম অচিরেই সুন্দরবন, এ তারই পূর্বাভাস। উত্তর দিক থেকে যেখানে বনের শুরু,সেখানে নদীটি দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। আমরা পূর্ব শাখা দিয়ে এগিয়ে চললাম।

প্রথম পদার্পনেই টের পেলাম বাঘের বিকট গর্জন, হরিণের আর্তনাদ আর পাখির কলকাকলি থাকা সত্বেও কেন সুন্দরবনকে নিস্তব্ধতার বন বলা হয়। বিকেলের অস্তগামী সূর্যটা তখনও বনভূমির অন্তরালে যায়নি। আমরা কয়েকজন-বন ভূমির অপরূপ সৌন্দর্য্য দুচোখ ভরে শুধু দেখেই চলেছি। বৃক্ষের সারিগুলো এখানে কিছুটা উচু নিচু। অধিকাংশ বৃক্ষ বাইন এবং কেওড়া। মাঝে মাঝে সুপারি সদৃশ্য হেতাল বৃক্ষ। একস্থানে কিছুদুর বিস্তৃত নলখাগড়া গাছ। বন বিভাগের লঞ্চ এম,ভি, আর পাঙ্গাসিয়া দেখা হলো একখানে।একটা বাচ্চা হরিণ দেখলাম নদীর চরে বাঁকা হয়ে আসা গাছের পাতায় মুখ বুলাচ্ছে। এখানে একটা জেলে নৌকা হতে কিছুটা দুরে নদীতে একটি কুমির দেখলাম। সে তার পিটটি ভাসিয়ে দিয়ে স্রোতের বিপরীতে
এগিয়ে চলেছে।

আমরা সুন্দরবনের কটকা দ্বীপে পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা গভীর হয়েছে। আমাদের লঞ্চ নোঙর করল। এখানে রেস্ট হাউজ আছে। স্যার মেয়েদের এবং আরো কিছু লোক নিয়ে রেস্ট হাউজে গেলেন। বাকিরা লঞ্চেই শুয়ে থাকলাম। পরদিন সকালে খিচুড়ি ভাত খেয়ে আমরা রওনা হলাম সি বীচ এর দিকে। সি বীচে পৌঁছে আমরা বিশাল সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর রূপ প্রত্যক্ষ করলাম। কেউ কেউ ঝিনুক কুড়ালো। কেউ কেউ চরে ফুটবল খেললাম। অবশেষে পরিশ্রান্ত হয়ে চরে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। হঠাৎ মনে হল সমুদ্রের এই অভূতপূর্ব দৃশ্যের কথা ফোনে মাকে একটু জানাই।কিন্তু ফোনটা হাতে নিতেই বিষণ্নতায় ভরে গেল মনটা। মাকে কি করে জানাবো,এখানেতো ফোনে নেটওয়ার্ক পাচ্ছেনা। তাই অগত্যা আর মাকে জানানো হলো না। বেলা একটার দিকে লঞ্চে ফিরে দুপুরের খাবার খেলাম। বিকেলে বনের মধ্যে দল বেঁধে অনেকক্ষণ হাটলাম। বনে গর্তের মধ্যে এক বিশাল অজগর দেখলাম। সন্ধ্যা হওয়ার কিছুক্ষণ আগে রেস্ট হাউজের সামনে ফিরে আসলাম। রেস্ট হাউজের সামনের ফাঁকা জায়গায় আগে থেকে সেখানে দায়িত্বরত লোকেরা গাছের ডালপালা কেটে বিছিয়ে রেখেছিলো। সেখানে শত শত হরিণ দেখলাম এসে সে ডালের পাতা খাচ্ছে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।আমরা হরিণ দলের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি উঠলাম। একটু পরে বন বিভাগের লোকেরা আমাদেরকে গোল গাছের ফল খেতে দিলো। ছোট তালের শাসের মতো এ ফল খেয়ে খুবই তৃপ্তি পেলাম। রাতে ওদের সহায়তায় একটা ছোট খাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলাম।

তৃতীয় দিন অর্থাৎ আমাদের বিদায় নেওয়ার দিন বন বিভাগের লোকেরা আমাদের কান্না জড়িত কন্ঠে বিদায় দিলেন। তারপর বনের অপূর্ব শোভা পুনরায় দর্শন করতে করতে আমাদের লঞ্চ ফিরে চলল ফেরার ঠিকানায়।

পঞ্চানন মল্লিক
মোবাইল-০১৭৩৩-০৭৩৩৪১