সিডর কিংবা আইলার তাণ্ডবের কথা মনে পড়ে? ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হানে।
সিডরের চোখের আয়তন ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার। তবে ভয়াবহতার দিক থেকে সিডরের কারণে যে পরিমাণ ক্ষতির আশঙ্কা ছিল, বাস্তবে হয়েছে তার অনেক কম। কারণ সিডরের প্রথম বাধা ছিল সুন্দরবন। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের বাধা পেয়ে সিডর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সুন্দরবন না থাকলে সিডরের ধাক্কা লাগত খোদ রাজধানী পর্যন্ত। সুন্দরবনের গাছপালায় বাধা পেয়ে সিডরের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার কমে গিয়েছিল। ঠিক একইভাবে ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র সামনেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রকৃতির এই অপার বিস্ময়। এক সমীক্ষা বলছে, সুন্দরবনের কারণে আইলার গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার ও জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা চার ফুট কমে গিয়েছিল। এভাবেই বারবার নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়ে প্রকৃতি ও জীবনকে বাঁচিয়ে যাচ্ছে নীরব এই বিস্ময়। আচ্ছা কেন নীরব বিস্ময় বলা এই বনকে? কেনই–বা বাংলাদেশের গর্বের জায়গা সুন্দরবন? চলুন জেনে নেওয়া যাক সুন্দরবনের গল্প।

নামের রহস্য
সুন্দরবনের নাম ‘সুন্দরবন’ হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ যায় না। তবে প্রচলিত ধারণা মতে, এই বনে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা সুন্দরীগাছের (Heritiera fomes) নামানুসারে এই বনের নামকরণ। তবে অনেকের মতে, স্থানীয় আদিবাসীরা এই বনকে ডাকতো ‘চন্দ্র-বান্ধে’ নামে। এই নামটিই পরবর্তী সময়ে বর্তমান রূপ পেয়েছে।

একটুখানি ইতিহাস
সুন্দরবনের উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, তবে ধারণা করা হয়, হিমালয়ের ভূমিক্ষয়জনিত পলি, বালু ও নুড়ি হাজার বছর ধরে বয়ে চলা পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র কর্তৃক উপকূলে চরের সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে, সমুদ্র তীরবর্তী হওয়ায় লবণাক্ত জলের ধারায় সিক্ত হয়েছে এ চর এবং জমা হয়েছে পলি। কালাতিক্রমে সেখানে জন্ম নিয়েছে বিচিত্র জাতের কিছু উদ্ভিদ এবং গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা লবণাক্ত পানির বন। সম্ভবত ১২০৩ সালে মোগল এক রাজা পুরো সুন্দরবন ইজারা নেন। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুন্দরবনসহ পুরো বাংলার দায়িত্ব নেওয়ার আগে মোগল রাজাদের অধীনেই ছিল এই বন। এই কোম্পানিই প্রথম সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরি করে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে, যা বাংলাদেশের সমগ্র বনভূমির ৪৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সুন্দরবনে তিনটি অভয়ারণ্য ও ২০১২ সালে তিনটি ডলফিন অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনের ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেসকো।

রয়েল বেঙ্গল টাইগারকী নেই সুন্দরবনে
পৃথিবীর অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বনভূমির উদ্ভিদের তুলনায় সুন্দরবনের উদ্ভিজ্জের মধ্যে ব্যাপক পরিমাণে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। কেননা, সুন্দরবনের বুক চিরে শুধু নোনাপানি নয়, ক্ষেত্রবিশেষে প্রবাহিত হয় স্বাদু পানির ধারা। এই বৈশিষ্ট্যই সুন্দরবনকে পৃথক করেছে বিশ্বব্যাপী অন্যান্য ম্যানগ্রোভ বন থেকে। এ বনের পূর্বাঞ্চলীয় অভয়ারণ্যে গাছপালার বৈশিষ্ট্য কিছুটা বেশি। এখানে জন্মে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর, কেওড়া, আমুর, গোলপাতা। পশ্চিমাঞ্চলীয় অভয়ারণ্যে বেশি দেখা যায় গেওয়া, গরান, হোন্তাল। দক্ষিণাঞ্চলীয় অভয়ারণ্যে বেশি দেখা যায় গেওয়াগাছ। এই অঞ্চলের লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় অন্যান্য সাধারণ গাছ তেমন একটা জন্মাতে দেখা যায় না। সুন্দরবনে সঠিক কত প্রজাতির গাছ আছে বলা মুশকিল। সর্বশেষ ১৯০৩ সালের জরিপ বলছে, ৩৩৪ প্রজাতি। ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্য ৩৫টিরই দেখা মেলে এই বনে।
প্রাণীবৈচিত্র্যের কথা লিখতে গেলে প্রথমেই আসে অনিন্দ্যসুন্দর বেঙ্গল টাইগারের (Panthera tigris) কথা। সুন্দরবন তথা গোটা বাংলাদেশেরই অহংকার জাতীয় এই পশু। একটা সময় সুন্দরবনজুড়ে অসংখ্য বিচরণ চোখে পড়ত এই বাঘের। কিন্তু অবৈধ শিকার, খাদ্যের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনে দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের জরিপে পুরো সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ১৭০টি, এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে আছে ১০৬টি। বাঘ ছাড়াও সুন্দরবনে আছে প্রায় ৩১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। যার মধ্যে চিত্রাহরিণ, মায়াহরিণ, রেসাস বানর, বনবিড়াল, লেপার্ড, বন্য শূকর উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আছে প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ, ৩০০ প্রজাতির পাখি, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী। সুন্দরবনে সাপের প্রচুর আনাগোনা দেখা যায়। এর মধ্যে আছে শঙ্খচূড়, রাসেলস ভাইপার, অজগর ও ব্যান্ডেড ক্রেইট।

অর্থনীতিতে সুন্দরবন
পর্যটনের এক আদর্শ স্পট সুন্দরবন। প্রতিবছর এই খাত থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা। প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ এই বনের ওপর নির্ভরশীল। এই বনের জ্বালানি, নদীগুলোর বিশাল মৎস্যসম্পদ, মধু ও মোম এবং বন্য প্রাণী থেকে বাংলাদেশের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ১ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের রক্ষা করে যাচ্ছে সুন্দরবন। গবেষণা বলছে, এই বন প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে ৩ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার সম্পদ। আরও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, সুন্দরবন বছরে গড়ে প্রায় ১৬ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম, আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার।

কেমন আছে সুন্দরবন?
২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে এই বনের ৪০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আজও লড়াই করে যাচ্ছে সুন্দরবন। গত বছরে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর শক্তি যখন সর্বোচ্চ মাত্রায় ছিল, তখন ঘণ্টায় দেড় শ কিলোমিটার গতির বাতাস নিয়ে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল এ ঝড়। তবে উপকূল অতিক্রম করার আগে আগে এর শক্তি কিছুটা কমে আসে। সুন্দরবন ঘেঁষে খুলনার কয়রা দিয়ে যখন অতিক্রম করছিল ঝড়টি সে সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯৩ কিলোমিটার ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ এই গতি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সুন্দরবনের বাঁধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা বলছেন।
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈন উদ্দিন খান বলেন, বুলবুলের কারণে সুন্দরবনের খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।
এমন করে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বন। নিজে ক্ষতবিক্ষত হয়, হারায় অসংখ্য উদ্ভিদ আর প্রাণীর জীবন। বাঁচিয়ে দেয় খুব স্বার্থপর এই আমাদের।

প্রায়ই এই বনের নদীগুলোয় তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে করে নদীগুলো দূষিত হয়ে যাওয়ায় মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের কাছে সরকারের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগে বিভিন্ন পরিবেশবাদী দল আন্দোলন করছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সুন্দরবনের ইউনেসকো হেরিটেজ থেকে প্রকল্পটি যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত। তাই এই প্রকল্পের জন্য বনের ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই।
প্রতিবছর সুন্দরবনে হেক্টরপ্রতি গড়ে ২৭ হাজার ৭৫০ চারা উৎপন্ন হয়। এ কারণেই এত সব বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করেও সুন্দরবন বেঁচে আছে প্রকৃতির নিয়মে। মানুষের কল্যাণের স্বার্থেই এই বনের বেঁচে থাকা জরুরি। কারণ সুন্দরবন বেঁচে থাকলেই বাঁচবে বাংলাদেশ, বাঁচবে এ দেশের জীববৈচিত্র্য আর এ দেশের মানুষ।
তথ্যসূত্র: আবহাওয়া বিভাগ, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, বন বিভাগ ও গুগল।

লেখক: শিক্ষার্থী, পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়