সুন্দরবন রক্ষার জন্য সবার আগে প্রয়োজন সুন্দর মনের। আমাদের মন সুন্দর না হলে আমরা সুন্দরবনকে বাঁচাতে পারব না। সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে নিজেদের বাঁচার প্রয়োজনে। এ উপলব্ধিটা সবার আগে প্রয়োজন। কেননা এই সুন্দরবন মায়ের মতো করে আগলে রাখছে আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলকে। ভুলে গেলে চলবে না যে, টর্নেডো, হারিকেন, সিডর, আইলার মতো প্রাকৃতিক হায়েনার কবল থেকে বুক পেতে এই সুন্দরবন বাঁচিয়ে রাখছে আমাদের। তাই সুন্দরবনের জন্য আমাদের ভালোবাসা খুব প্রয়োজন। আর তার জন্য প্রয়োজন সুন্দর মনের। আমাদের সুন্দর মানসিকতাই পারে সুন্দরবনকে বাঁচাতে। সে জন্য আমাদের সবার আগে ভালোবাসা থাকতে হবে প্রকৃতির প্রতি। গাছপালা, বৃক্ষরাজিকে ভালোবাসতে হবে। হরিণ, বাঘ, কুমির, ডলফিন, অন্যান্য পশু ও পাখির জন্য ভালোবাসা থাকা চাই। আর তা না হলে সুন্দরবন বাঁচবে না। মরব আমরাও। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারপ্রধানরা হবেন সুন্দরবনবান্ধব মানসিকতার। আমরা জানি আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুন্দর মনের অধিকারী। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুন্দর মনের অধিকারী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির প্রধান দুজনই সুন্দর মনের মানুষ। তাই আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে চাই যে, সুন্দরবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়ে তারা এই বন রক্ষা এবং বিস্তারে ইতিবাচক সব কিছুই করবেন। সবার কাছে একটা অনুরোধ রাখতে চাই যে সুন্দরবন মায়ের মতো আগলে রেখে মনুষ্য জাতিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচায়, সেই মানুষ যেন সুন্দরবনের শত্রু না হয়ে যাই।

আমাদের প্রতিনিয়ত প্রশ্বাসের বাতাস যে বিষমুক্ত রাখছে, জলের দূষণ যে আত্মস্থ করছে, আবহাওয়ার সামঞ্জস্য যে বজায় রাখছে, উপকূল এলাকাকে যে সুরক্ষিত রাখছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জন্য আয়ের উৎস হয়ে আছে, আমাদের আবাসনের ব্যবস্থায় যে ভূমিকা রাখছে সে হলো আমাদের সুন্দরবন। দেশের যে ২ শতাংশ আদিম অরণ্যানী রয়েছে, তার প্রধান দাবিদার সুন্দরবন। আমাদের মতো ছোট এলাকার দেশ যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে হাজারের বেশি মানুষ, গৃহপালিত পশু বাস করছে, যে দেশের বিশাল অংশ বিলঝিলে পূর্ণ এখানে কার্বন নিঃসরণ, মিথেন-সালফারসমৃদ্ধ গ্যাস মাটি থেকে প্রতিনিয়ত বের হয়ে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরেক রকম মানবসৃষ্ট বায়ুদূষণ। এসব দূষণ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের জোরালো ফুসফুস দরকার। একমাত্র সুন্দরবনই এখনো স্বাস্থ্যকর ফুসফুসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এ সুন্দরবন ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ছয়বার তার রূপ বদলায়। খুব ভোরে এক রূপ, দুপুরে অন্য রূপ, পড়ন্ত বিকালে আরেক রূপ, সন্ধ্যায় সাজ নেয় ভিন্নরূপে। মধ্য ও গভীর রাতে সৌন্দর্য আরেক রকম। আর যদি চাঁদনি রাত হয়, তবে তো কথাই নেই। সুন্দরবনে প্রায় ৩৩০ প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুন্দরি, কেওড়া, পশুর, ধুন্দল, আমুর, গরান, গর্জন, খোলশী, বলা, হেতাল, গোলপাতা, টাইগার ফার্ন, হারগোজা ইত্যাদি। স্থানীয় ও পরিযায়ী মিলে সুন্দরবনে প্রায় ২৭০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। এর মধ্যে বড় সাদা বক, সি ঈগল, বাজ, মাস্ক ফিঙ্কফুট, বিভিন্ন প্রজাতির মাছরাঙা, ফিঙে, সুইচোরা, কাঠঠোকরা, বনমোরগ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া প্রায় ৪০০ রকম মাছ পাওয়া যায় সুন্দরবন এলাকায়।

সাগরের পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা বাড়ায় কমে যাচ্ছে সুন্দরি গাছ, কমছে বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। নিষেধাজ্ঞা না মেনে বনের ভেতর দিয়ে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল অব্যাহত আছেই। চোরাকারবারিরা কেটে নিচ্ছে গাছ। শিকার করা হচ্ছে বাঘ ও হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। হুমকির মুখে রয়েছে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবী হরিণ, অজগর, কুমির, বানরসহ প্রায় ১ হাজার প্রজাতির পশু, ৩৫০ প্রজাতির পাখি ও ৩৫০ প্রজাতির সুন্দরি, গরান, গেওয়া, কেওড়া, ধুন্দল, গোলপাতাসহ নানা প্রজাতির গাছ। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের থাবায় সংকটে পড়েছে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে হারিয়ে যাবে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ। অসচেতনতা, অবহেলা আর মানুষের অত্যাচারে অস্তিত রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ‘সুন্দরবন’। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি যে, ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সাড়ে ৩ লাখ লিটার ফার্নেস তেল নিয়ে ট্যাঙ্কারডুবির কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে সুন্দরবন। ২০১৫ সালের মে মাসে পটাশ সার নিয়ে সুন্দরবনের ভোলা নদীতে একটি কার্গো ডুবে যায়। সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর বনের পশুর নদে ৫১০ টন কয়লা নিয়ে ডুবেছে আরেকটি কার্গো। রামপালে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে নৌযানে করে সেখানে প্রতি বছর নেয়া হবে ৪৫ লাখ টন কয়লা। এতে বনের প্রতিবেশের ওপর চাপ বাড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের আইলার ক্ষত এখনো রয়েছে সুন্দরবনে।

বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময় সুন্দরবন নানামুখী সংকটে বিলীন হচ্ছে। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৪০ বছর ধরে সুন্দরবনের এ ধ্বংসাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, তবে তখন এ প্রবণতা ছিল ক্ষীণ। সুন্দরি গাছের প্রায় সবই কালো হয়ে মারা যাচ্ছে। বনের প্রায় ৭৩ শতাংশই সুন্দরি গাছ। বর্তমানের এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ৫০ বছরে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ভূমিই গাছশূন্য মরুভূমিতে পরিণত হবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনের ওয়ার্কিং গ্রুপ দাবি করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভেঙে পড়েছে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম। সুন্দরবনের সাতটি নদীর পানি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে তাতে অ্যালকোহলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে; যা জলজ প্রাণী ও মাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত মাছ থেকে শুঁটকি, কাঁকড়া, বাগদা ও গলদা চিংড়ি আহরণ করে রপ্তানি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন ১০ লক্ষাধিক জেলে। ৩৩৪ প্রজাতির গাছ, ১৫৬ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড আজ হুমকির মুখে। নিষেধাজ্ঞার পরও সুন্দরবন থেকে প্রতিদিন সুন্দরি, গেওয়া ও গরানসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে নিয়ে বিক্রি করছে চোরাকারবারিরা। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও এর সঙ্গে জড়িত। চোরাকারবরিদের পাশাপাশি কিছু জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়াল গাছ কেটে নিচ্ছে। সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারিরা এখনো বেপরোয়া। সর্বশেষ বাঘশুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০৬টিতে। সুন্দরবনের ঢাংমারী, চাঁদপাই ও দুধমুখী এলাকাকে ডলফিনের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও ওই এলাকার প্রায় ৩১ কিলোমিটার নদীতে রয়েছে সংকটাপন্ন ইরাবতী ও শুশুক ডলফিনের বিচরণ। বনের মধ্য দিয়ে চলাচলকারী ভারী নৌযানের পাখার আঘাতে মারা পড়ছে ডলফিন। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে দীর্ঘদিন ধরে বিষ দিয়ে মাছ শিকার করছে একটি চক্র। ফলে বিভিন্ন মাছের পোনা, কাঁকড়া ও জলজ প্রাণীও মারা যাচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে এ সুন্দরবনই বাংলাদেশকে রক্ষা করে আসছে। এ কথা বিনা হিসাবেই বলা যায় যে, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বলয়শক্তি ধ্বংস করলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। এ সুন্দরবন না থাকলে ঝড়-ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, আইলা, সিডর কোনো কিছু থেকেই বাংলাদেশের মহাবিপর্যয় ঠেকানো যেত না। অন্যভাবে বলা যায়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নির্মম পরিণতির হাত থেকে সুন্দরবন যদি বাংলাদেশকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হতো, তাহলে প্রথমত উপকূলীয় এলাকার অস্তিত্ব থাকত বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। সেখানে কোনো জনবসতি, জনমানব এমনকি পশুপাখিও টিকে থাকতে পারত কিনা সন্দেহ। ২০০ বছরে ৩০ বার বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো সামুদ্রিক দুর্যোগ আঘাত হানে এ বনের ওপর। এর ফলে গাছপালা ধ্বংস হয় প্রচুর, বন্যপ্রাণীও মারা যায় বিশাল সংখ্যায়।

সর্বশেষ সিডর, আইলা, লায়লা, মহাসেনের ব্যাপক বিপর্যয়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ অঞ্চল সুন্দরবন, যার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশের পক্ষে। এখন প্রশ্ন হলো আমরা সুন্দরবনকে কেন রক্ষা করব না।