সুন্দরবনের প্রত্যেকটি উপাদানেরই রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব। সুন্দরবনের বৃক্ষের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো পশুর গাছের কাঠ। এ ছাড়া সুন্দরী, গেওয়াগাছের কাঠেরও দেশে-বিদেশে সুনাম রয়েছে। এসব গাছের কাঠ দিয়ে পেন্সিল, দিয়াশলাইয়ের কাঠি, নিউজপ্রিন্ট কাগজ, দৈনন্দিন আসবাবপত্র, নৌকা প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া সুন্দরবনের মৎস্যকুল ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের আয়ের একটি বড় উৎস, যেখান থেকে কোনো প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই প্রচুর অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। সুন্দরবন থেকে মৌয়ালরা প্রচুর মধু ও মোম সংগ্রহ করে, যা দেশের মধু চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এগুলো ছাড়াও সুন্দরবন নানা ধরনের পশু-পাখির জন্য বিখ্যাত।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি আমাদের এই সুন্দরবন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও ঐশ্বর্যমন্ডিত বনগুলোর মধ্যে প্রথমে যে কয়েকটি বনের নাম আসে তার মধ্যে সুন্দরবন অন্যতম। চিরসবুজ-নিস্তব্ধ এই বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী; এই বৃক্ষের নামানুসারে সুন্দরবনের নামকরণ। সুন্দরবন Mangrove Forest বা উপকূলীয় বন নামেও পরিচিত। সুন্দরবন সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধশালী হওয়ায় ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো (UNECO) বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে সুন্দরবনকে স্বীকৃতি দেয়।

বৃহত্তর সুন্দরবনের বাংলাদেশে ও ভারতীয় অংশ একই নিরবছিন্ন ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে তালিকাভুক্ত হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন ও সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান। প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বাংলাদেশে অবস্থিত এবং এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ভারতে অবস্থিত। বন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার যা দেশের আয়তনের ৪.১৩% এবং ৩৮.১২% বনভূমি বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার সর্বশেষ ২০১৫ সালের তথ্যমতে ২০০ বছর পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গ কিলোমিটার। সে সময় এ বনের নিয়ন্ত্রণ ছিল জমিদারদের হাতে, ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সর্বপ্রথম সুন্দরবনের স্বত্বাধিকার অর্জন করে। ১৮৩০ সাল থেকে সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশ লিজ দেয়ার প্রচলন শুরু হয় এবং সর্বপ্রথম ১৮৩১ সালে সুন্দরবনের মানচিত্র প্রকাশিত হয়। ইউরোপিয়ানরা এই লিজ গ্রহণ করে অমূল্য এ বনাঞ্চলকে আবাদি জমিতে রূপান্তর করতে থাকে। রূপান্তরের সময় তারা বৃক্ষ ও ছোট ছোট গুল্ম কেটে ফেলতে শুরু করে। ফলে সুন্দরবনের আয়তন ব্যাপক হারে কমতে থাকে, পরবর্তীতে ১৮৭৮ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয় ও ১৮৭৯ সালে সুন্দরবনের দায়-দায়িত্ব বন বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়।

সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের মোহনায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই বিস্তীর্ণ বন। দেশে সংরক্ষিত বনের শতকরা ৫১ ভাগই সুন্দরবন বনাঞ্চল। বাংলাদেশের দক্ষিণের ৩টি জেলা যথা: খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় সুন্দরবন অবস্থিত। এ ছাড়া বৈজ্ঞানিক, নৃতত্ত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় সুন্দরবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। বিশ্ববিখ্যাত বিরল প্রজাতির রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই বনের প্রধান আকর্ষণ। অসংখ্য নদী-নালা ও খাল জালের মতো জড়িয়ে আছে এই বনের মধ্যে যা বন প্রকৃতির এক অপরূপ চিত্তাকর্ষক ও বিস্ময়কর অবদান। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

২০০৪ সালে টঘউচ, বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বাঘের পদচিহ্নের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের বন বিভাগের একটি জরিপ পরিচালিত হয় এবং ওই জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। পরবর্তীতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ ও ভারতের সহায়তায় ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ক্যাপচার ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে জানা যায় সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটারে বাঘ আছে ১০৬টি যা ১০ বছর আগের জরিপের চার ভাগের এক ভাগেরও কম। এ ছাড়া হরিণের সংখ্যা ১ লাখ থেকে দেড় লাখ, বানরের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার, বন্য শুকরের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার, কুমিরের সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ শতাধিক, উদ্বিড়ালের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ হাজার ও অন্যান্য প্রাণী বিদ্যমান। বিলুপ্ত প্রায় গন্ডার, চিতাবাঘ, ওলবাঘ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত সুন্দরবন। সুন্দরবনে প্রায় ২৭০ প্রজাতির আবাসিক এবং ৫০ প্রজাতির বিচরণশীল পাখির দেখা মেলে। ৯ প্রজাতির মাছরাঙাসহ সুন্দরবনে রয়েছে কাঠঠোকরা, ভগীরথ, পেঁচা, মধুপায়ী, বুলবুল, শালিক, ফিঙে, বাবুই, ঘুঘু, বেনে বৌ, মুনিয়া, টুনটুনিসহ নানা ধরনের ছোট ছোট গায়ক পাখি।

এ ছাড়া সুন্দরবনের বুক চিরে বয়ে চলেছে ৪০০ নদীনালা এবং ২০০ খাল। এসব নদী ও খালে রয়েছে প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ২০ প্রজাতির চিংড়ি, ৭ প্রজাতির কাঁকড়া, ৬ প্রজাতির ঝিনুকসহ আরও অন্যান্য প্রজাতি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে রক্ষায় নদীগুলোর ভূমিকা অন্যতম। কিন্তু বর্তমানে সুন্দরবনের আশপাশের নদীগুলোতে কয়লা ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল নদীর পানি দূষণের অন্যতম কারণ। ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার তেল নিয়ে সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ ডুবে যায়। এই দুর্ঘটনায় সুন্দরবনের ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তেল, যা পরবর্তীতে জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। প্রস্তাবিত রামপাল বিদু্যৎকেন্দ্রও ভবিষ্যতে সুন্দরবনের জন্য হুমকি হতে পারে। কারণ বিদু্যৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল যেমন- কয়লা নদী দিয়ে বহন করতে হবে। এ ছাড়া বিদু্যৎ উৎপাদনের বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও বা গরম পানি নদীর পানির সঙ্গে মিশে নদীর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বন বৃক্ষে আচ্ছাদিত সুন্দরী, গেওয়া, গরান, গোলপাতা, কেওড়া, বাইন, গরান, খলসি ইত্যাদি সুন্দরবনের সৌন্দর্য আঁকড়ে রেখেছে। এ বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী যা ৫১.৭০ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সুন্দরবনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ যেমন- শন, নলখাগড়া এবং গোলপাতার অবদান অন্যতম।

সুন্দরবনের প্রত্যেকটি উপাদানেরই রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্ব। সুন্দরবনের বৃক্ষের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো পশুর গাছের কাঠ। এ ছাড়া সুন্দরী, গেওয়াগাছের কাঠেরও দেশে-বিদেশে সুনাম রয়েছে। এসব গাছের কাঠ দিয়ে পেন্সিল, দিয়াশলাইয়ের কাঠি, নিউজপ্রিন্ট কাগজ, দৈনন্দিন আসবাবপত্র, নৌকা প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া সুন্দরবনের মৎস্যকুল ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের আয়ের একটি বড় উৎস, যেখান থেকে কোনো প্রকার বিনিয়োগ ছাড়াই প্রচুর অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। সুন্দরবন থেকে মৌয়ালরা প্রচুর মধু ও মোম সংগ্রহ করে, যা দেশের মধু চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। এগুলো ছাড়াও সুন্দরবন নানা ধরনের পশু-পাখির জন্য বিখ্যাত।

দিন দিন সুন্দরবনের প্রাণী সম্পদ কমে আসছে, কমে আসছে বনের পরিমাণ। মানব কল্যাণের স্বার্থে সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখা অতীব জরুরি। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই সুন্দরবন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে আসছে। সুন্দরবন বাংলাদেশের ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশকে বিশ্ব বাজারে পরিচিতিও দিয়েছে। কিন্তু আমরা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে পারছি না। আমরা নিজ হাতেই বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করছি যেমন- নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন থেকে শুরু করে বাঘ নিধন এবং হরিণ শিকার করে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছি আইন অমান্য করে।

এই অবক্ষয়ের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রম্নয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নেতৃত্বে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রম্নয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়। তাই প্রতিবছর এই দিনে সুন্দরবন রক্ষার দাবিতে পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর ৬ ধারা মোতাবেক ‘এই আইনের তফসিলে উলিস্নখিত বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী শিকার বা বন্যপ্রাণী, মাংস, ট্রফি, অসম্পূর্ণ ট্রফি, বন্যপ্রাণীর অংশবিশেষ অথবা এসব থেকে উৎপন্ন দ্রব্য দান, বিক্রয় বা কোনো প্রকারে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে’। আইনের ৪১ ধারা মোতাবেক আরও উলেস্নখ রয়েছে যে, ‘কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করলে বা ওই অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা প্রদান করে থাকলে এবং ওই সহায়তা বা প্ররোচনার ফলে অপরাধটি সংঘটিত হলে, ওই সহায়তাকারী বা প্ররোচনাকারী তাহার সহায়তা বা প্ররোচনা দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য নির্ধারিত দন্ডে দন্ডিত হইবেন’।

ওই আইনের ৩৬ ও ৩৭ ধারায় ‘বাঘ, হাতি, চিতাবাঘ ইত্যাদি শিকার বা হত্যার অপরাধ করলে আইনের ৩৬ ধারায় দন্ড- সর্বনিম্ন ২ বছর, সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদন্ড ও সর্বনিম্ন ১ লাখ, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদন্ড ও সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে’। সংরক্ষিত উদ্ভিদসংক্রান্ত ৬নং ধারা লঙ্ঘন করলে- ‘৩৯ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি এক বছরের কারাদন্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং পুনরায় একই অপরাধ করলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে’।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের আরও কঠোর ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতাই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার: বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ kamrul_sub@hotmail.com