কবিতা নিস্তরঙ্গ হ্রদ

এক একটা বোতাম খুলে আদুরে রাত
শরীর ঢেলে দেয়
আমার রাত বিছানায়।
নাছোড় এক মুদ্রাদোষে আমি জাতুদন্ড খুঁজি,
মেহেন্দিপাতার ক্লান্তিহীন
ঝরে যাওয়ার মিছিলে
আগমন চুপকথার গোপন গহ্বরে
খুঁজি তোমাকে।
উনো কালো অন্ধকার মেঘ আজ
গাঢ়ো অভিমানে এক নিটোল পাহাড়
জলের শূন্যতায় ভিজে যায় জীবনবিমার ডাইরি।
নিস্তরঙ্গ হ্রদের ওপারে দাঁড়ানো
একাকী বাতিঘর ঝাঁপসা;
বিহ্বল কিছু মুখ অসহ্য রূঢ়তার মতো
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় আমার
আজন্ম ভিক্ষাপাত্র।
……………………………………………

ভাঙ্গা সেঁতু

কিছু কিছু দিন
মানুষের একা থাকার অধিকার হরণ করে নেয়,
মুখর করে তোলে, বাইরে, ভিতরে।

জঠিল শেকড় ছড়িয়ে বৃক্ষ-জীবন, একাকী।
একা
একা
অরণ্য গভীরে ভীষণ
এক অদ্ভুত একাকী জীবন।
প্রাগৈতিহাসিক পাথরের গায়ে লেপ্টে থাকা শাওলার মতো বুকের
পাঁজরে লেখা হয় শ্রান্তিহীন
হাজারো বেদনার আখ্যান।

বিবাগী বাষ্পের মত উবে যায় দেহগত সুখ,
বড়ই ক্ষণস্থায়ী
জানি, তবু বহতা নদীর কাছে
অনাদরে ঝরতে থাকা শুকনো পাতার ঘূর্ণের কাছে
ঘামে ভেজা বুকের মায়াঘ্রাণের কাছে
মাটির অন্তর্গত প্রেমের কাছে আমার ঋণ।

নদীর বুকে আঁকা পূর্ণিমার চাঁদ রূপালি ঢেউ
তার আপন হয়েছে কি কখনো, অক্ষয় কিছু?
হয়নি জানি, তা হবার নয়।

প্রতিটি জীবিত মানুষই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে বাঁচে
নিজস্ব জগতে,
অচেনা আঁধার এক
আনমনা রাতের গল্প লিখে যায় কবোষ্ণ জলে, জানি…
প্রবল বর্ষণে বালিভরাক্রান্ত এ মাটি আর শেকড় ভালোবাসা
অবিরাম আলগা হওয়ার গান গেয়ে যায়…

মরণের মতো এক অতলান্ত ঘুমে
তলিয়ে যাবার আগে
একমুঠো আবির রোদ্দুর
সুষুম্নাকাণ্ডের গভীরে
এক অনির্বচনীয় শিহরণ জানিয়ে দেয়
আমার মৃত্যুর দরবেশে
আমি এক পিরামিড।
এবার আমার যাওয়ার সময় এসেছে
খুব সহজেই যন্ত্রনা চিবিয়ে খেতে শিখে গেছি।
……………………………………………

অলংকার

ক্রমশ নিশ্চিতভাবে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পথে
স্মৃতির ভেতরে খেলা করে সূর্যাস্ত ভোর সূর্যোদয়
শ্রীময়ী দুঃখের চিন্ময়ী শরীরে একে একে জমে ওঠে
অহংকারের শব্দময় বর্নালি দ্যুতি ও অলংকার

উপেক্ষিত মন্দিরের দীন ব্রাক্ষ্ণণের অল্মান দৈন্যের কাছে
বিনম্র হাত পেতে আছি জন্ম জন্মান্তর
দুঃখ আমাকে ফিরিয়ে দেয় অক্ষরের অনন্ত অহংকারে।।
……………………………………………

অশ্বারোহী রেবন্ত

দয়া আর পরাজয়ের চক্র
এরই নীচে, অকস্মাৎ চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম,
আর সকলে কাজে ব্যাস্ত, চারপাশে শ্বাস -প্রশ্বাসের জন্য প্রবল আকুতি
কাজ, কাজ, কাজের সারি মেঘের স্তরের মতো অপেক্ষারত
ব্যস্তরসের সঙ্গে অগাধ প্রণয় সর্বজনার;
তার মাঝে, নিষ্কণ্টক এক মুহূর্তে, চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম.
অন্ধ হলে কী হবে, দর্শনভাগ্য ভালো ছিল, দেখলাম
বিনাশকালের পরীদের, আড়ালে চলমান তাদের হিমকান্তি,
চলমানতার আড়ালে সুনিবদ্ধ তাদের দৃষ্টি, অভ্রান্তি তাদের;
রূপ এমনই, নিজেকে প্রবোধ দিই, রূপ এমনই নিষ্ঠুরতাপ্রেমী.
ঘাতকধন হে, প্রণাম, কথা হচ্ছিল জগন্নাথ পন্ডিতের সঙ্গে,
কোনও এক সুদূর অতীতে, তিনিও বিনাশকালের পরীদের দেখেছিলেন –
নির্জন. ভদ্রাসন, দাওয়ার এক কোণে রেড়ির তেলের লম্ফ জ্বলছে,
দাওয়ার পরে উঠোন, উঠোনে বিনাশকালের পরীদের সমাগম,
লম্ফের দীন শিখা কুণ্ঠিত, কোন সাহসে উঠোনে নামবে সে
উঠোনে যে পরীদের গায়ের আলো, খসে-পড়া পালকের মতো ভাসছে,
নামছে, বাতাসের দোল খেয়ে ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে আবার.
লম্ফটি গৃহান্তরাল নিয়ে যাবার জন্য ঠাকুর খড়ম -পায়ে দ্রুত আসছিলেন
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাঁকে, সমুখে সেই দৃশ্য –
হাতের পুথিটি খসে পড়ল মাটিতে, দেওয়ালে ভর দিয়ে
নিজেকে কোনও প্রকারে সামলে নিলেন,
দেওয়াল ধরে -ধরে ফিরে এলেন নিজের ঘরে,
লম্ফ, পুঁথি ওইভাবেই পড়ে রইল.
……………………………………………

শূন্যস্থান

আত্মবিস্মৃত হয়ে বৃক্ষশাখার পানে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকি
বসন্তদিন আসে না,
আত্মবিস্মৃত হয়ে ভাবি, এখন নিভৃতির খুব প্রয়োজন.
এত অস্থিরতা কিসের, বৃক্ষশাখাকে বলি, এবার ঘুমিয়ে পড়ো
এই বলে, মির্জা আসাদুল্লার দুটি পদ মনে জড়িয়ে নিয়ে চোখ বুজলাম.
অনুভব করলাম অন্ধকারকে যেন অবিরাম ডানা ঝাপটাচ্ছে,
কেঁদে বললাম নন্দদুলাল, কেন এমন হল
একে তো নররক্ত আর কাদা, হাহাকারের মধ্যে
ল্যাংটো পাগলের মতো নিরুদ্বেগে ঘুরি,
তার উপরে শূণ্য এই বৃক্ষশাখা, প্রাণ আর কত সইবে?
আত্মবিস্মৃত হয়ে বৃক্ষশাখার নীচে পড়ে রইলাম.
ও দক্ষিণ হাওয়া, ও পলাশবন, হায় মালতীলতা
……………………………………………

দুঃখের আতর

দুঃখ আছে বলে শুধু বেঁচে থাকা
বুকের নিশ্বাস শুধু দুঃখ আছে বলে পরম আরামে
নিতে পারি
কাজের আড়ালে স্বভাবত
ডুবে যাই ডুবে যেতে পারি

ওরা যারা ভাবনাহীন ঘুরছে ফিরছে
দুঃখ. কিছু নেই লালিত শরীর
ছেড়ে দিয়ে ঘুম দেয়. ওরা কতো সুখী
ভেবেছিল মনে
কিন্তু শুধু আলেয়া
হাত ধরে নিয়ে যায় ভিতরে ভিতর
জীবনে অপ্রেম আনে

দুঃখ ব্যতিরেকে সুখ নেই বুকের গভীরে
দুঃখ. আছে বলে সীমাহীন অপারবিস্ময়
চোখ ভরে দুঃখ. মেখে
প্রাণজুড়ে এই বেঁচে থাকা
অন্ধকার. সিঁড়ি ভেঙ্গে সূর্যের সঠিক ঠিকানা
জানতে জানতে রাত্রি নামে

তবু দুঃখে আলো জ্বলে বুকে
……………………………………………

কবিতা সম্পর্ক

সম্পর্কের ভিতর সতত সজাগ
এক অভিমানী অশরীরী

সম্পর্কের ভিতর শুয়ে থাকে
কুন্ডলীকৃত আগ্রাসী অজগর

সম্পর্কের ভিতর কাত হয়
প্রমত্ত পানপাত্র উচ্ছ্বলিত

সম্পর্কের ভিতর ওঠে নামে
ওষ্ঠ অধর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ

সম্পর্কের ভিতর সেজে ওঠে
একজোড়া হলুদ টিউলিপ

সম্পর্কের ভিতর আর যা কিছু
জীবন দিয়ে বোঝা ও বোঝানো

সম্পর্কের ভিতর দিয়ে বারবার
আত্ম ও পর খুঁজে ফেরা
……………………………………………

কবিতা মৃত্যুর দরবেশ

যতোটা নিঃসঙ্গ ভেবে তৃপ্তি পাও
ততোটাই ভরাট আমি আজ।
ফকির রোদ মাখে দরবেশ জীবন
ভেঁপুরমেলা মনের চরা জুড়ে।
সে তুমি বুঝবে না কোনদিন
নিভৃত এই দরগা সুখ।
কাল সারারাত সেতার বেজেছে কানে;
ডুবকি রং ঝর্ণায়।

অলৌকিক এক সূর্য। উঁকি দেয় অন্ধকারে
পাহাড়েরর জঙ্ঘা বেয়ে নামে বিহ্ললতা,
বিনম্র বরফকুচির মতো দুঃখগুলো উড়িয়েছি
নামহীন আকাশের ঠিকানা
চিঠি এসেছিলো – জানিয়ছিলো-
(সে তোমার নয় জেনো
তোমার নয় কখনোই)
তাই
যতটা নিঃসঙ্গ ভেবে তৃপ্তি পাও
ততটাই। ভরাট আমি আজ ….
……………………………………………

নরমুন্ড

আজ আর পারাপার নেই কোন
ক্ষারকীয় শিলা নেই
অনুঘটক নেই
সেতুবন্ধন নেই
আছে শুধু
চারিদিকে মিথ্যার প্রতিশ্রুতি

খোরস্রোতা ঝর্নার কোলাকুলি
পাকস্থলীর মৃত গন্ধে
বুকের অন্তর্গত ঢেউগুলো আজ
ক্রমশ মৃত্যুকে ছুঁয়ে দিতে চায়
বারবার –
মিথ্যা প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যায়
স্বেচ্ছায়,
অঝোরে বৃষ্টি উঠোনের বুক জুড়ে।

আজ আর পারাপার নেই
পাটনি নেই, পারানিও নেই কোন
একাকী ভাসে বিকলাঙ্গ মন,
আজ রুগ্ন সাঁকোটাই গেছে ভেঙ্গে;
অবেলায় সাঁতরে পেরুই নদী।

নদীতে লুকানো থাকে ভয়
আগ্নেয় সুখে বিবশ জীবন।

নরমুণ্ড জমাই বুকে;
মুণ্ডমালায় জীবনের উল্লাস!

সাতকান্ড রামায়ণ পড়া বাকি আজও
কবে যে পেরুবো
এই অনিবার্য নদী আমাদের
……………………………………………

রুদ্র

অদ্ভুত, শীতল কুন্ড ঘিরে শোও প্রবীণ কেউটে
ছটফটে কিন্নরটিকে মধ্যে রেখে অন্ধকার বেড়
আরেকটুকু সংকীর্ণ, ছোট করে আনি
ধুলোর ঐশ্বর্য নিয়ে জেগে আছি আমি
বাতাসের ঘুমের ভিতর. সমাপ্তির
সকল ধূসর প্রস্তাবনা শেষ হলে
আমি যাব রঙের উৎসর্জনে একা
সময়ের ক্ষতচিহ্নগুলি রঙে -রঙে
ভরে দিতে হয়ত তখন সময়ের সিন্ধু থেকে, কালিদাসের রচনা থেকে
ধুলোর বেদনা নিয়ে, কিংবা সুদূর
দিগন্তপারের সেই বিরহী যক্ষের
বিরহের ধুলোময় বার্তাটুকু নিয়ে
উড়ে আসবে কোন আনত সজল মেঘ
বিরহিনীর আকীর্ণ কেশে জমে-ওঠা
ধুলোর আসক্তিহীন নগ্ন মায়াটুকু
ধারামুখরতা দিয়ে পূর্ণ করে দিতে
ধুলো, ছাই যা কিছু অর্চনা কুন্ডের ভিতরে করো, ঘিরে এসো দৃঢ় পৌরাণিক
স্তম্ভের পাথরে, যার ভিতরে নিস্তব্ধ বিষ, জ্ঞান!