বাংলা সাহিত্য জগত যখন ম্রিয়মান আঁধার আবর্তে আর্তনাদ করছে প্রায় ঠিক এমনি এক ক্ষণটে সাহিত্যের আলোক বর্তিকা হাতে ধারণ করে সবুজ শ্যামল এই বাংলাদেশের কালিগঞ্জ জেলার বড়গাঁও গ্রামে পয়লা জানুয়ারি ১৯৫৮খ্রিস্টাব্দে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে এ দেশের শক্তিমান কবি আসাদ বিন হাফিজ জন্ম গ্রহন করেন।কবির পিতার নাম ছিলো হাফিজ উদ্দীন মুন্সী এবং মাতার নাম ছিলো জুলেখা বেগম। চার ভাইয়ের মধ্যে কবি হচ্ছেন তৃতীয়।সাহিত্য জীবনের পাশাপাশি কবি বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকও ছিলেন।বর্তমানে অবসর জীবন অতিবাহিত করছেন এবং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সরব ভূমিকা পালণ করছেন।জীবনে টুকরো টুকরো রঙে রঙিন হয়ে কবি মহাআবিরময় সমুদ্রে অবগাহন করে নিজকে রঙের বর্ণালী আভা ঢেলে মনোরাজ্যকে সৌন্দর্যের ঝর্ণাধারায় নিয়ে গেছেন।সত্য ও সুন্দরের মুঠো মুঠো সাহস কবিকে এক নতুন মাত্রার দিকে ধাবিত করছে।ভয়হীন চিত্তে বিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রে জীবনের অভিষ্ঠ লক্ষ্যার্জনে নৌকোর মাঝি হয়ে শক্ত হাতে ধরেছেন বৈঠা।আর নির্বিগ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন সেই নৌকো।কোন ঝড়ের তান্ডবে তাঁকে থামাতে পারেনি আজ অবধি।ক্ষয়িষ্ণুতা তাঁর ধারে আসতে আপারগতা পোষণ করছে।নির্ভিক এই কলম সৈনিক একের পর এক সমুদ্র মহাসমুদ্র পাড়ি দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর বলীষ্ঠ পেশীর মধ্য দিয়ে।”TIME IS TIED WAIT FOR NONE”বাণী মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে কবি সময়কে জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে অবহিত করতে কার্পণ্য করেননি।ইংরেজ কবি LORD BYRONএর কন্ঠে যেন সেই সুর শুনি—
“IT IS THE HOUR WHEN FROM THE BOUGHS
THE NIGHTINGALS HIGH NOTE IS HEARD,
IT IS THE HOUR–WHEN LIVERS VOWS
SEEM SWEET IN EVERY WHISPEARED
WORDS,”

কবি সময়কে সুসময় বলে মনে করেছেন।তাইতো তাঁর হাতের স্পর্শে জেগে ওঠেছে এক অন্যন্য সাধারণ কবিতার বাণী যা মানুষের হৃদ সাম্রাজ্যে মনোমুগ্ধকর হয়ে ধরা দিয়েছে।কবির বর্ণনায়—-
“পুলিশ এলে বাত্তি নিভে
কোরান আসে উইড়া
এর মাজেজা সবাই বুঝে
শিশু যুকব বুইড়া।”
[নড়ছে ধর্মের কল
১৯|১০|২০২১]
তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উক্ত স্বরবৃত্ত ছন্দের কবিতার মাত্রা৪+৪+৪+2 ধারণ করে রচনা করার সুপ্রয়াসী হয়েছেন। বাস্তবতার কঠিন চিত্র তিনি তাঁর অনুপম তুলির আঁচড়ে প্রকাশ করেছেন।মিথ্যের বেসাতিকে তিনি মানুষের কাছে সুললিত ছন্দে উপস্থাপন করে শ্লাঘনীয় হওয়ার প্রয়াসী হয়েছেন মানুষের মনের মণিকোঠায়।মিথ্যের বেসাতি ধারণ করে যারা ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করে মানুষকে ধোকা দিয়ে স্বীয় সিদ্দি হাসিল করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে যা মানুষ মনে প্রাণে গ্রহণ করতে অপারগতা পোষণ করছে বৈকী।তাদের সেই কঠিন আগলে কবি কুঠারাঘাত করছেন আলোচ্য কবিতার মধ্য দিয়ে।শক্তিমান কবি আসাদ বিন হাফিজ একজন রোমান্টিক কবিও।রোমান্টিকতা তাঁর প্রত্যহিক জীবনের এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে।পুষ্পবনবিহারী কবি কাজী নজরুল ইসলমা এর “A ROMANTIC YOUNG MAN,”কবিতায় তিনি তারুণ্যেকে নিয়ে যেভাবে দেখেছেন ও একেঁছেন তারই চিত্ররুপ কবি আসাদ বিন হাফিজের লেখায় শতধারে উৎসারিত হয়েছে।কবির বর্ণনায়——
“সাদা সাদা কাশফুল আকাশ ছুঁতে চায়
পথিককে হাত নেড়ে ডাকে আয় আয়।
হেলে দুলে খেলা করে, মধুর হাওয়ায়
তাকে দেখে মেঘ হাসে, দূর নীলিমায়।”

(সাদা সাদা দীল
১৬|১০|২০২১)
মাত্রা বৃত্ত ছন্দের এই কবিতায় তিনি মানুষের ভিতর যে আগুন আছে,তা বর্ণিত কবিতার মাধ্যমে পানি ঢেলে দিয়ে তাদের অশান্ত মনকে শান্তি দেয়ার সুপ্রয়াসী হয়েছেন।ঘর্মাপ্লুত জীবনে একঘেয়েমীতে মানুষ সত্যি হাফিয়ে ওঠে আর তাই সে একটু শান্তির সুবাতাস পেতে চায় অহরাত্রি।কবি তাঁর কবিতায় মানুষকে সেই বারতাই এনে দিয়েছেন তাদের দীলে।জঞ্জালতার আবর্তে প্রায়শ প্রতিটি মানুষ বেদনাক্লিষ্ঠ হয়ে প্রায় জরাক্লিষ্ঠ হয়ে পড়ে আর তখনই সে এক মুঠো আনন্দের সুবাতাস চায়।এই চিরায়াত চাওয়া সর্বকালের এবং সর্ব মানুষের চাওয়া।সৌন্দর্য উপভোগ করা ও এর রুপ গ্রহণ করতে মানুষ সত্যি ব্যাকুল হয়ে ওঠে।মানুষের সেই আকুতি কবি তাঁর কবিতার পরতে পরতে অঙ্কন করে ধন্য হয়েছেন।তাঁর “কি দেখছো দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর”একটি রোমান্টিক কাব্য গ্রন্থ যা পাঠে মানুষের হৃদয় সুশান্ত হয়।নান্দনিক ইংরেজ কবি WILLIAM WORDSWOTH এর কবিতার মতো যেন হয়ে ওঠেছে—-

“BEHOLD HER, SUNGLE IN THE FIELD
YON SOLITARY HIGHLAND LASS,
REAPING AND SUNGING BY HERSELF,
STOP HERE OR GENTLY PASS.”
জীবনকে সুন্দর ও সুখময় করার নিমিত্তে আলস্যকে পায়ে পিষে কর্মপ্রবাহে একটি পাহাড়ী নারী মনের সুখে গান গেয়ে গেয়ে শষ্য কর্তন করছে আবার বেঁধেও নিয়ে যাচ্ছে বাড়ি।এখানে গ্রাম বাংলার চিরায়াত এক শ্বাসত রুপ ফুটে ওঠেছে যা বীর কবি আসাদ বিন হাফিজের চিত্র কল্পে পরলক্ষিত হয়।আসাদ বিন হাফিজ মনে প্রাণে একজন খাঁটি মুসলমান।”তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আকড়িয়ে ধরো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইওনা”এই বাণী মন্ত্রে তিনি সত্যিই উজ্জীবিত একজন মানুষ একজন সুবীর কবি।আল্লাহ রসূলকে নিয়ে যারা কটুক্তি কিম্বা আল্লাহর সংবিধানের অবমাননা করে প্রকিশ্যে বা নীরবে তিনি তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার।তাইতো দেখি—

“পোলাহারা মা জননী দাওয়ায় বসে কাঁদে
কেউ দিওনা পা ওরে, ইবলিসী ওই ফাঁদে।
নাস্তিকেরা আস্তিক সেজে ধর্ম নিয়ে খেলে
ধার্মিকরা সেই জিলিপি প্রসাদ ভেবে গেলে।”
(ধর্ম দ্রোহী নিপাত যাক
১৫|১০|২০২১)

বীর কবি আসাদ বিন হাফিজ মাত্রাক্ষর ছন্দে উক্ত কবিতাটি লিখেছেন।ধর্মের বুকে যে বা যারা আঘাত হানে কবি তাদের কুট কৌশল অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ফুটে তুলেছেন মোমিন বান্দার আঁখি সম্মুখে।এই ধর্মকে রক্ষা করার মানসে অনেক বীর মুজাহীদ
দেশের তারুণ্য সমাজ তার প্রতিবাদ করেছে তাঁদের কথা গান ও কবিতায়।প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তাঁদের কিছু আর তাঁদের সেই জননীরা পুত্র শোকে দিশেহারা হয়েছেন।নাস্তিক মুনাফিক যোগসাজে আস্তিকের আস্তানায় গিয়ে গীত গায় আর মূল খবর পৌঁছায় নাস্তিকের কাছে।তারা সেই কারণে পদ পায় টাকা পায় আবার ওদের দ্বারা ওরা সম্মানিতও হয়ে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।কবি সেই মুনাফিকদের মূল উৎপাটন করার মানসে তাঁর অভিপ্রায় আলোচ্য কবিতায় ব্যক্ত করেছেন কবিতার প্রতিটি ছত্রে ছত্রে।বীর কবি আসাদ বিন হাফিজ মনে প্রাণে একজন প্রতিবাদী কবি ও সুমানুষ।তিনি যেমনি নাস্তিকদের ঘৃণা করেন তেমনি আবার সুমানুষ মোমিন মুসলমানদেরকে প্রাণ খুলে ভালোও বাসানে।তাই বলা যায় তিনি মোমিনদের জন্য আল্লাহর রহমত বটে।তাইতো স্বাপ্নিক কবি ফররুখ আহমেদকে নিয়ে তাঁর যুগ শ্রেষ্ঠ লেখা।কবির বর্ণনায় শুনি——
“টানা টানা চোখ আর মায়া ভরা মুখ
সকলের প্রিয় কবি নাম ফররুখ।
ছোটদের বড়দের সকলের তিনি
এই মাটি, এই দেশ তাঁর কাছে ঋণী।”
“সকলের তিনি”কবিতায় তিনি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ফররুখ আহমেদের গুণগান গেয়েছেন।কবি ফররুখকে এ দেশের সকল ঈমানদার মুসলমান ভালোবাসেন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়া(রা)এর ন্যায় যিনি ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে বলীষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন।ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান কবি কারো কাছে কখনও মাথা নত করেননি।কবি আসাদ বিন হাফিজের মমত্ববোধ স্নেহ ও ভালোবাসার ফল্গুধারা সৎ সাগর জলে প্রবাহিত করার ন্যায় বীর কবি WILLIAM WORDSWOTH এর মতো তাই শুনি—-
“ALL THOUGHTS, ALL PASSIONS,ALL DELIGHTS
WHATEVER STIRES THIS MORTAL FRAME,
ALL ARE BUT MINISTERS OF LOVE
AND FEED THIS SACRED FLAME,”
বীর কবি আসাদ বিন হাফিজ সাহিত্য জগতের একজন অধ্যাপকও বটে।অশ্লীল জগত তিনি কৈশোরই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন হৃদ জমিন থেকে।তিনি নান্দনিকতার সুবাসে সুবাসিত ও সৌন্দর্যের ধ্বজাধারী একজন সুমানুষ একজন খাঁটি মুসলমানও।ধর্ম জ্ঞানে বরিষ্ঠ একজন মোমিন মুসলমানও বটে।তিনি সৃষ্টির সৃষ্টি কর্তাকে প্রেমিক হিসেবে উপলব্ধি করেন।তাইতো শুনি—-

“আমারে কাঁদায়ে তুমি কোন সুখ পাও
আমারে একা রেখে কোন খানে যাও।
আমি চাই সারাক্ষণ, সঙ্গ তোমার
তোমার পরশ চাই, অশেষ অপার”
কবির এই আত্মোপলব্ধি যেন ইংরেজ কবি WILLIAM BLAKE এর মতো ধরা দেয়—
“IN EVERY CRY OF EVERY MAN
IN EVERY INFANTS CRY OF FEAR
IN EVERY VOICE, IN EVERY BAN,
THE MIND FORG’D MANACLES I HEAR”
জাতিকে সঠিক পথ দেখাবার প্রক্ষাপটে কবি আসাদ বিন হাফিজ দু’হাতে রচনা করেছেন কালজয়ী উপন্যাস, গল্প, ছড়া,কবিতা,,প্রবন্ধ ও নিবন্ধ।শুধু কি তাই?তিনি একজন সফল গীতিকারও।কয়েক শত গান তিনি রচনা করেছেন যার অনেকটা এখন ইউটিউবে ছড়িয়ে রয়েছে।তাঁর লেখা সঙ্গীত শুনে মানুষ আল্লাহর পথে ধাবিত হতে শুরু করেছেন।আল্লাহ প্রেমিক হওয়ার কারণে এই শক্তি মান কবি কারারুদ্ধও হয়েছেন।ছিন্ন ভিন্ন করেছে তাঁর বই ও প্রীতি নামক প্রকাশনী।তাইতো শুনি—-
“অবশেষে ভালোবেসে কি আমি পেলাম
মধু ভেবে এ আমি, কি বিষ খেলাম।
উড়ে গেল পাখি কোন দুর নীলিমায়
আমি কেন বসে আছি বটের ছায়ায়”
[রচনা:২১|১০|২০২১]
শকুন দানবের দেয়া সেই দু:খ কষ্টের কথা কবি আজো ভোলেননি।জীবনের রাঙা প্রভাত যেন নিষ্ঠুর বৈরী বাতাসে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে কবির কাঙ্খিত জীবনের সব স্বপ্নগুলো।ঘৃণার বাণী তাই বারবার উচ্চারিত হয় কবির কবিতাও গানে।তিনি নিজের আমিত্বকে বিকিয়ে দেননি।জীবন শূন্যতার ক্ষণটে অনেকেই পাশে থাকে না,কাছে আসে না ও শুনতে চায় না কোন কথামালা কেননা ধাবমান সময় কাউকে কোথায়ও পৌঁছে দেয় না নিজের লক্ষ্য ছাড়া।নীরবতায়ক্লিষ্ঠ কবি তাই বলেছেন-

পাহাড়ের কান্নাগুলো ঝরণা হয়ে যায়
তোমার কান্না কেউ দেখে না রে হায়
পাষাণ ডেকে কয়
এ ধরণী বড় নির্দয়
ঝরণার নোনা জলে সাগর ভরে যায়”

মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এই কবিতার ভিতর কবির আত্মার আহাজারি সফলভাবে ফুটে ওঠেছে।জীবন থেকে যৌবন সাগর থেকে উত্তাল তরঙ্গ যদি খসে পড়ে তাহলে জীবনে আসে জড়তা আর সাগর হয়ে যায় মন্দা। আলোচ্য কবিতার কবির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।তবু তিনি ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান এক কালজয়ী শ্রেষ্ঠ পুরুষ কবি ও সুমানুষ।তাই কোন অপশক্তি তাঁর গান ও কবিতা লেখা বন্ধ করতে পারেনি আর পারবেওনা।সুহাসিনী ভোরের কবি আসাদ বিন হাফিজ একজন স্বপ্নচারী কবি,স্বপ্নবিহারী কবি যাঁর অনুপম তুলির আঁচড়ে প্রকৃতি জীবন ও ভালোবাসার চিত্র পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে চিত্রিত হয়েছে আমাদের মনসপটে।সুকবি আসাদ বিন হাফিজের সুদীর্ঘ জীবন ও নেক হায়াত কামনা করি।।