বেদনায় পাথর হলো অভিমানী মুখ। বাঁচার সাধ কর্পূরের মতো নিঃশেষ হলো। তবুও মাধ্যাকর্ষণ প্রেম বারবার পৃথিবীর কারুকার্যময় সবুজের স্বাদ ও গন্ধ নিতে বাধ্য করে। কামার-শালার হাপরের মতো ফুসফুস বাতাস গ্রহণ করছে, বর্জন করছে। অনীহা ও করুণ কষ্টের একটি চিত্র শরীরের প্রতিটি রগে পষ্ট হয়ে জানান দিচ্ছে তার অপারগতা।
শেষ বারের মতো তার কয়েকটি ইচ্ছে টুনটুনি পাখির মতো ছটফট করে ওঠে। একবার মাকে দেখতে ইচ্ছে করে। মা যদি একটু হাত বুলিয়ে দিতো, গেঁথে যাওয়া বুলেটের ক্ষতে! অদ্ভূত আরেকটি ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়। ইচ্ছে হয় বাথরুমে ঢুকে বেশ দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করতে। আজ তিন দিন গোসল করা যায় নি শরীর কেমন কাদা-কাদা ভুটকা গন্ধে ভরে আছে। অবাক লাগে গত দুই দিনে একবারও খাবার গ্রহণ করার বিষয়টি মাথায় আসেনি।
যারা ধরে এনেছে তাদের কথা … ? তাদের ব্যবহারে প্রকৃত মানুষের কোন আচরণ ছিল না, মানুষের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতাও ছিল না, মানুষকে হত্যা করার মধ্যেও একটি ভব্যতা প্রাচিন কালে ছিল। মানুষকে ফাঁসির মঞ্চে নেবার আগে মানবিক বেদনাবোধের গাম্ভীর্যতা দেখানো হয়। অথচ আমার সাথে আইনের বর্মপরা ঐ লোকগুলো নেকড়ের চেয়ে অধিক অশ্লীল-হিংস্র আচরণ করেছে। অথচ আমি জানি, আমি এমন আচরণ পাবার যোগ্য নই। আমি মৃত মানুষ! আমার কথায় কারো কিছু আসবে যাবে না। আমার কথা প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করলেও কারো ক্ষতি হবে না। উপকার না ও হতে পারে, তবুও বলি …।
আমি …, মানে আমি, তার কথার মধ্যে ঢুকে যাই বিনা অনুমতিতে। কারণ মৃত মানুষটি এখন অন্য জগতের। আমার জগতের মানুষকে এভাবে মূল্যায়ন করায় স্বার্থপর হয়ে উঠি। একটি সুচালো খেদ আমার ভেতরে জেগে ওঠে।
যারা আপনাকে ধরে আনলো। তারা কি সবাই সীমার? আপনাকে খেতেও দিল না? সে আমার কথার উত্তর না দিয়ে শরীরের ধুলো ঝড়ে। গালে লেগে থানা মাটি মোছে এবং আমার প্রশ্নের কাছাকাছি এসে অন্যভাবে উত্তর দেয়।
হ্যা, সবাই সীমার- তবে সীমার হলেও সিমার চাইতে ভালো!
তার দৃষ্টির প্রেক্ষনে উদাস ও বিচ্ছিন্নতা। ঘৃণা এবং তিক্ততা ঝড়ে পড়ছে সিমার প্রতি। আমি আবারো প্রশ্ন করি। আপনি যাকে জীবনের চাইতে বেশী ভালোবাসতেন। তাকে, মানে সিমাকে, সীমারের চাইতে বেশি খারাপ ভাবছেন? অথচ তার জন্য অর্থাৎ সিমার জন্য আপনি আপনজনদের কাছ থেকে নিগৃহীত হয়েছেন কোটি টাকা খরচ করেছেন, রাজনৈতিক ভবিষ্যত …
সে হঠাৎ ধ্যানমগ্ন সাধকের মতো ডানহাত উঁচু করে আমাকে থামিয়ে দেয়। আমি থেমে যাই। আমি থেমে যেতেই রাতের মেজাজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাতের একটি বিশেষ গন্ধ আছে, যা আমার নাকে লাগছে। রাতের আলাদা শব্দ আছে, সে শব্দ কথা বলছে ফিসফিস করে- এবং রাত আমার দিকে তাকিয়ে আছে- যেভাবে তাকালে অস্বস্তি লাগে। আমার অস্বস্থি লাগছে। আমি ধ্যানমগ্ন সাধকের দিকে তাকাই। যেভাবে তাকালে দৃষ্টি কথা বলে, সেভাবে।
সে মাথা নাচায়, কষ্ট ফুটে ওঠে কপালের দুপাশের রগে। অতিরিক্ত রক্তের চাপে রাগ ফুলে উঠছে- এতে মুখমণ্ডল রক্তজবার মতো লাল হয়ে ওঠে ক্রমেই।
সে কথা বলে।
হ্যা, মহিলার মিথ্যে কথার বিষ বুলেটের তপ্ত শিশার চেয়ে অধিক বেদনাদায়ক। আহা মানুষ কি করে যে এতটা মিথ্যে বলে? মানুষ কথা বলতে পারে এটাই যেন মানুষের দুর্ভাগ্য।
সিমাকে সিমা বলতেও লজ্জা হয়। মহিলার চোখে মুখে, হাতে নখে ঠোঁটে মিথ্যে বলার তুলি। নিখুঁত শিল্পীর মতো সরল ক্যানভাসে সে মিথ্যে আঁকে। বলে আমি নাকি তাকে জোর করে ধরে এনে…।
এরপর আর তার কথা বেরোয় না, মুক হয়ে যাওয়া মুখে মেঘ জমে ওঠে। শীতে কাঁপা শিশুর মতো তার ঠোঁট কাঁপে, কাপা ঠোঁটের প্রতিটি কথার বুকে পিঠে কষ্টের দারুণ পদ্ম উথলে ওঠে।
… পরপর ছয়টি গুলি! আমি বেদনায় কাতরাতে থাকি। কাতরানোর মধ্যেও সিমার ঐ কথাটি আমাকে চাবুক পেটাচ্ছিল- সে, মানে ঐ মহিলা নির্জলা মিথ্যে বলছিল। সত্য বললেও পরিণতি এমনই হতে পারতো। কারণ, আমার মরণ নিয়ে দাম-দস্তুর হচ্ছিল, শেষপর্যন্ত ক্রেতারা সফলও হলো- কিন্তু ঐ যে মিথ্যেটা…। তপ্ত-গুলি যখন আমার দেহে ঢুকে তখন অব্যক্ত বেদনার মধ্যেও একটি ইচ্ছে জাগে। গেঁথে যাওয়া ক্ষতে একটু হাত বুলিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু আমার হাত পেছন দিক হতে বাঁধা।
ইচ্ছে করছিল রাতের চেহারা মোবারক একটু দেখি, কিন্তু আমার চোঁখ বাঁধা। শক্ত করে চোখ বেঁধে রাখায় অন্য একটি কালো অন্ধকার আমার চোখে সওয়ার হয়ে আছে। আমার চোখ টাটায়! কুরবানির জবাই করা পশুর মতো ছট্ফট্ করি, কাতরাতে থাকি। মাটির সাথে চোয়াল ঘষে ঘষে যন্ত্রণা প্রশমীত করার চেষ্টা করি। দারুণ স্নেহে মাটি আমাকে বুকে তুলে নেয়। প্রবল সোহাগ ও যত্নে তার খুব ভিতরে নিয়ে নেয়।
যারা আমাকে গুলি করেছিল সে পাপিষ্ঠ লোভি লোকগুলো … না লোক নয়, বিপথগামী ডিবি পুলিশেরা, ভীতুমুখে আমার কাতরানোর দৃশ্য দেখে। আমার মাথায় তখন অদ্ভুত একটি চিন্তা পাগলা চেলা মাছের মতো খলবল করে নেচে ওঠে। কি আনন্দ ওদের। আমি মারা যাবার পর ওদের মধ্যে পনেরো লাখ টাকা ভাগাভাগি হবে। আচ্ছা, ওরা কি এখন টাকার কথা ভাবছে? নাকি শুধু মাত্র টাকার লোভে আমাকে হত্যা করে মানবিক কষ্ট অনুভব করছে? ওরা, মানে ঐ লোকগুলো, না লোকগুলো নয় ডিবি পুলিশ।
আমি মারা যাবার আগে এসি আকরাম নামে এক নরাধম পাপিষ্ঠ নোংরা পুলিশ আমার উপর অত্যাচার করেছিল। আমাকে ঝালযুক্ত মরিচের গুলানো পানি পান করতে বাধ্য করেছিল। এবং বারবার প্রস্রাব হবে এমন একটি ঔষধ আমাকে খাইয়ে দেয়। আমি বারবার পেশাব করি আর জ্বলে-পুড়ে যাবার বেদনায় পশুর মতো হাহাকার করেছিলাম। আমি সে দিন রোজা ছিলাম- রোজা মুখে অভিসম্পাত করেছিলাম- এবং কিছুদিন পর রুবেল হত্যার আসামী হয়ে এসি আকরাম নামক নোংরা পুলিশটার পতিত হওয়া আমি নিজের চোখে দেখেছি।
আজ যে লোভীরা আমাকে হত্যা করলো ওদের প্রতি আমার অভিশাপ। ওদের পরবর্তী প্রজন্ম পঙ্গু, নেশাখোর, পশুপ্রকৃতির হবে। ওদের ঘরে, ওদের মনে কোন সুখ থাকবে না। ওরা রক্ষক হয়ে ভক্ষণ করে। সরকারি পোশাক পরে নীরব চাঁদাবাজী-মাগিবাজী-হাইজ্যাক- নিম্ন ও উচ্চংগের সব অপরাধ করে। এই খারাপ লোকেরাই আমাকে হত্যা করলো- এটাই বেদনার।
হঠাৎ করে থেমে, আমার, মানে আমার চোখের দিকে তাকায়। তার চোখে তৃপ্তিকর ঘৃণাবোধ। সে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলে-
আমার খুনির চেয়েও আমি সিমাকে অধিক ঘৃণা করি, মহিলা মিথ্যে বলার পতঙ্গ। সেলিম ভাই হঠাৎ প্রসঙ্গ বদলে ফেলে আমাকে প্রশ্ন করে।
আচ্ছা নিম্নীর খবর কি ?
আমি চমকে ওঠে তার দিকে তাকাই।
সে কি যেন মনে করে হাসে দারুণ হাসির ঝলকে গাকেঁ ওঠে। ঠিক সে সময়ে তার উপরের ঠোঁটের ডানপাশে লুকিয়ে থাকা গ্যাজ দাঁতটি বেরিয়ে উজ্জ্বল বিভা ছড়ায়, সৌন্দর্য্য আছড়ে পড়ে আমার বিছানায়। আমরা পাশাপাশি শুয়ে পড়ি। এক মৃতের সাথে শুয়ে আছি, তার সাথে সাচ্ছন্দে কথা বলছি। তার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। সে রক্ত আমার শরীরে লাগছে এবং একটু পরে সে রক্ত আমার শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছে। এ অলৌকিক রক্ত মিশে যাবার বিষয়টি আমার ভাবনার কেন্দ্রকে উত্তেজিত করতে পারছে না। খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছে।
অথচ আমার চোখ ফেটে অসহায় অশ্রু ঝরে পড়ছে। আমার কান্না দেখে সে আবারো হেসে ওঠে। তার মৃত্যু যেন কোন বেদনার বিষয় নয়। তাই আমার কান্না তার কাছে হাস্যকর।
তার এখনকার এই দীর্ঘ হাসিটি অন্যরকম। যে হাসি রাতকে গাঢ় করে তোলে ঘনকালো নিঝুম করে তোলে। আমি ভয়ের কোন কারণ দেখি না। তাই ভয় পাবার বিশেষ সেলগুলো স্বাভাবিক শান্ত থাকে। আমি মৃত সেলিম ভাইয়ের সাথে বেশ স্বাচ্ছন্দ্বে কথা বলছি।
আমার ভেতরে একটি ধারণা নড়ে-চড়ে, কথা বলে। বলে, দেখো জীবিত মানুষের চেয়ে মৃত মানুষ কত নিরাপদ, কতটা সরল নির্লোভ। দেখ মানুষের জন্য মানুষই হলো সব চাইতে রড় আপদ এবং ভয়ের কারণ দেখ, রাতের ঢাকা শহরে তোমার জন্য শুধুমাত্র মানুষই ভয়ের কারণ।
আমার ভাবনায় হঠাৎই সেলিম ভাই আছড়ে পড়ে। আমি অনাক্ষরিক শব্দে কোঁকিয়ে উঠি। সে লতানো ভালবাসায় তার বুকে টেনে নেয়। তার ক্ষত থেকে তখনো রক্ত ঝরছে- রক্তের লাল বেদনা আমার বুকে লাগে। হৃদয়ে দারুণ কান্না তোলপাড় করে। বাতাসে কাশবন কেঁপে ওঠার মত থরথর কাঁপতে থাকি। বিরল একটি কষ্ট আমার বুক বেয়ে ওপরে ওঠে- আবার নিচে নামে। সেলিম ভাইকে হারানোর বেদনায় আমি যে কষ্ট পাই, সে বোধ কি তার আছে? মৃত মানুষের বোধ নিয়ে আরেকটি ভাবনায় পড়ে যাই।
মৃত সেলিম ভাই আবার কথা বলে, সে আবার তার পূর্বের প্রশ্নে ফিরে যায়।
আচ্ছা ভাবির খবর কি?
আমি বুঝেও না বোঝার ভান করি। বলি কার কথা?
কেন নিম্নী ভাবির কথা।
আমি আহত অনুরোধ করি। তার কথা এখন থাক। আপনি গুলিবিদ্ধÑ গুলি গেঁথে যাওয়া ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে।
সে শরীর নাচিয়ে জীবিত মানুষের মতো হেসে ওঠে। তার দায়িত্বহীন হাসি আমার ভাল লাগে না। তার হাসির ঠমকে কেমন প্রশান্তি এবং সুখের সরল রেখা বেশ স্পষ্ট। তবে কি আমার হিংসা ফুঁসে উঠছে। আমার কপাল কুঞ্চিত হয়। আমি তাকে হাসি থামাতে বলি। সে আরো উৎসাহী হাসির উচ্ছলতায় রাতকে ভয়ানক গভীর করে তোলে। আমার ভয়ের ক্রিয়া সচল হয় আবার স্থবির হয়। আমি তাকে করুন নিবেদনের মতো একটি খবর বলি।
জানেন আপনার মৃত্যু আপনার মা মেনে নিতে পারছে না।
মৃত্যু মেনে না নিতে পারা জীবিত মানুষের আল্লাহ প্রদত্ত দুর্বলতা। সেলিম ভাইয়ের এমন দার্শনিক উত্তরে আমার মনে হয় এ বিষয়ে আর কথা না বলাই শ্রেয়। এমন উত্তর না দিলে সাহানা আপার কথাও বলতাম, ভাইয়ের মৃত্যু তাকে কতটা আহত করেছে তা সে জানতে পারতো।
আমার দৃষ্টি আবার তার বুকের বাম পাশে গেঁথে যাওয়া ক্ষতটার কাছে আটকে যায়। সেখান থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি প্রভুর প্রতি অনুযোগে ঠোঁট ফোলাই। ভাল মন্দ সবার রক্তের রংই এক, এটা কি রকম? ধোকাবাজ স্বার্থপর মানুষ এবং ভাল মানুষের রক্তের রং আলাদা হওয়া উচিৎ ছিল।
আমি এবার সেলিম ভাইয়ের ঠোঁটের দিকে তাকাই। ঠোঁটের কোনায় রক্ত শুকিয়ে আছে। সেও আমার চোখের দিকে- হঠাৎই আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। ভয়ের একটি শীতল আমার মেরুদন্ড বেয়ে উপরে উঠতে চায়। আমি পাত্তা দেই না। মনে মনে একটি দার্শনিক ভঙ্গিমায় অহংকারী হয়ে উঠি। বলি, ভয় পাওয়া হলো জীবিত মানুষের দুর্বলতা- আমি দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলি।
আমি মৃত সেলিম ভায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। আর ইচ্ছে সে সিমার কথা অকপটে বলুক। আমার ধারণা সে আজ সত্য কথা বলবে। মৃত মানুষের মিথ্যা বলে লাভ নেই। মৃতরা লোভ ও লাভের উর্ধ্বে। ভোগ ও স্বার্থের বাইরে।
জানো?
আমি সেলিম ভাইয়ের প্রশ্নে হচকিৎ হয়ে উঠি, কারণ আমি জানি না। জানি না বলেই হয়ত। তার দিকে সমগ্র একাগ্রতা ঢেলে তাকিয়ে থাকি। সেলিম ভাই আমার একাগ্রতায় সন্তুষ্ট। সে বেশ স্বাচ্ছন্দে তার কথা শুরু করে।
সে, মানে সিমা। আমাকে সেই দিন। সেই দিন মানে। আমি মারা যাবার পনেরো দিন আগে, আমাকে ফোন করে। ফোন করে আদেশের সুরে বলে। সেলিম তুমি এক্ষুনি আমাকে নিয়ে যাও। আমি মেঘ না চাইতে বৃষ্টি পেয়ে থমকে যাই। হঠাৎ করেই মনে হয়। দুটি সন্তান আছে সিমার …। ঐ দুটি সন্তানের কথা মনে করে নিজের দাওয়াকে বিসর্জন দিতে চাই। কিন্তু সরাসরি না করে দিলে সিমা কষ্ট পাবে। তাকে কষ্টও দিতে চাই না। তাই ইচ্ছেকে আড়াল করি। তাকে বুঝাতে চাই। বলি সিমা তুমি আরো একশো বার ভাবো।
আমি তাকে, তাকে মানে সিমাকে ভাবতে বলায় সে দারুণ রেগে যায়। উত্তেজনার ঝাঁঝ তার কণ্ঠের আওয়াজকে বারুদ করে তোলে। ও তুমি আসবে না?
আমি বললাম, না সিমা, সে কথা নয়। তোমার দুটি সন্তান
কেন এতোদিন কি জানতে, একটি সন্তানের কথা জানতে?
না সে কথা নয়।
তা হলে কি কথা? আমি তোমাকে এতো দিন বলেছি যে আমি কুমারী নিঃসন্তান
না আসলে সে কথা নয়।
তা হলে কি কথা ?
সিমা চিৎকার করে মোবাইলে গলা-ফাটায়। তার অধৈর্য্য ছটফাটানি আমাকে ভাবিয়ে তোলে।
আমি কোন পথে আগাবো ভেবে হয়রান হই। সিমা আমারে ধরে চিৎকার করে ভেঙে পড়ে এবং পাঁচতলা থেকে লাফিয়ে পড়বে বললে আমি সম্পূর্ণ জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ি। আমি তাকে আশ্বস্ত করি ট্যাক্সিক্যাব নিয়ে এক্ষুনি আসছি বলে।
আমি তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে গভীর ছলনার পাশা খেলায় হেরে যাই। মায়ার জালে আটকে আমি বাঁচার জন্য যতই দাপাদাপি করি ততোই আরো ভয়ানক ভাবে ফেঁসে যাই।
সেলিম ভাই হঠাৎই থেমে যায়। সে আবারো আমার প্রসঙ্গে ফিরে আসতে চায়। আমার হঠাৎই তার প্রতি সন্দেহের একটি বীজ দ্রুত অঙ্কুরিত হয়ে পুস্পিত হওয়া শুরু করে। সেকি সিমার সাথে আমার স্ত্রী নিম্নীর উপসংহার টানতে চায়? আমার ভেতরে স্বার্থের একটি বিষঁ ফনা তোলে- আমি মনে মনে প্রবল প্রতিবাদ করি। আপনার সিমা এবং আমার নিম্নী এক জিনিস নয়।
সে, মানে সেলিম ভাই সত্যি সত্যিই আবার আমাকে প্রশ্ন করে। আচ্ছা নিমনী ভাবির কথা বলো।
আমি কি বলবো, কিছুই বুঝে ওঠতে পারিনা।
সেলিম ভাই স্বাভাবিক হাসির রেখা টেনে আমার স্মৃতির পুকুর হাতরে কিছু উদ্ধার করতে চায়। আবিস্কারের নেশা যেন তাকে পেয়ে বসেছে। সে রুমের ছাদ ভেদ করে আকাশের দিকে দৃষ্টি উড়িয়ে কথা বলে। অনন্ত কথা যেন তার বুকের খাঁচায়। অথচ তার বুকের বাম পাশে একটি ছিদ্র- বুলেটে গেথে যাওয়া চিহ্নটি গোলাকার। সেখান থেকে আবার রক্ত বেরুচ্ছে, লাল রক্ত। রাতের গভীরতা আরো ঝেকে বসেছে। রাতের শ্বাসপ্রয়াসের মিহি শব্দরাজী বেশ শোনা যায়।
সেলিম ভাই আবারো আমার প্রসঙ্গে আগ্রহী হয়। নিমমী এবং তুমি আমার ড্রইং-রুমে সারারাত জেগে কথা বললে- দুজনে মধ্যরাতে নামাজ পড়লে তোমাদের দু’জনার জুটি এতোটা প্রানবন্ত নির্লোভ বেগোনাহ লাগছিল যে আমার চোখে পানি চলে আসছিল এবং আমি দোয়া করছিলাম তোমরা বিবাহিত হও …
আমি হঠাৎ যবাব দিই। আমি তো বিয়ে করেছি। সে ধ্যানির মতো উত্তর দেন। আমি জানি। কিন্তু… আমি মাথা নিচু করি এবং প্রসঙ্গ বদলের রাস্তা বের করি, বলি ছি: সেলিম ভাই আপনার কাছে অবৈধ অশ্র পেল পুলিশ?
সে হো হো করে হেসে ওঠে বলে, তাই নাকি? অশ্র পাওয়া গেছে? আসলে চোখ বাধা থাকার কারণে আমি দেখতে পাইনি। আচ্ছা এক কাজ করো, পত্রিকা আনো আমি দেখি। দেখি আমার লাশের পাশে পরে থাকা অশ্রের ছবি।
দেখি কেমন মানিয়েছি, সব বস্তুরই একটা মানানসই বলে কথা আছে … পুলিশের ক্রোশফায়ারে মৃত ব্যক্তির পাশে পরে থাকা অস্ত্র ও গুলির দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি। পত্রিকার খবরও আমাদের দৃষ্টি কারে। হাত বাধা, চোখ বাধা অবস্থায় নাকি পালাতে গিয়ে …
আমরা পত্রিকার খবর এবং পরে থাকা সেলিম ভাইয়ের লাশের দিকে এবং অস্ত্র ও গুলির দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি। আমাদের দু’জনের দৃষ্টিতে দু’রকম বিশ্বাস ফুটে উঠে। কারণ, সেলিম ভাই মৃত। তার বিশ্বাস এক রকম। এবং আমার বিশ্বাস অন্য রকম।
আমাদের বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের দন্দ্বে মধ্যরাতের গভীরতা এবং কালোর ঘনত্ব ফিকে হয়ে ওঠে ক্রমেই।
আমি সকাল হবার জন্য অপেক্ষা করি। আর মনের সংরক্ষিত কোঠড়ে আত্মীয়ের বিচ্ছিন্ন হবার বেদনা পুষে রাখি।
বিচ্ছিন্ন হবার মানবীক দূর্বলতা জীবিত মানুষের থাকতে হয়। আমি সূর্য ওঠার একটি অপরিচিত শব্দে বিছানা ছেড়ে জেগে ওঠি।