সেলিম আউয়াল salim awal লেখক সংগঠক সাংবাদিক। জন্ম ১৯৬৪-এর ১০ জানুয়ারি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম গৌরিপুর ইউনিয়নের খুজগিপুর মোল্লাবাড়ি গ্রামে। পিতা মরহুম মো. আবদুল ওয়াহিদ, মাতা মিরযা সমর উন নিসা। পিতামহ মো. মোশাররফ হোসেন, মাতামহ মিরযা মোহাম্মদ আরসাদ। সিলেট শহরেই শৈশব কৈশোর যৌবনের দিনগুলো অতিবাহিত করেন এবং ঐতিহ্যবাহী মদন মোহন কলেজ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে গ্র্যাজুয়েশন লাভ। কলেজে ছিল বিপুল ছাত্রপ্রিয়তা, নির্বাচিত হন কলেজ ছাত্র সংসদে স. সাহিত্য ও বিতর্ক সম্পাদক পদে। তারপর আইন পেশায় যোগ দেয়ার স্বপ্নিল ইচ্ছে থেকে সিলেট আইন কলেজে অধ্যয়ন শুরু। কিন্তু আইন অধ্যয়নের সফল সমাপ্তি হয়নি। দেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত বার্ষিক সাধারণ সভায় সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীকে সভাপতি ও কবি রাগিব হোসেন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে কার্যকরি কমিটি গঠণ করা হয়। সেই কমিটিতে সেলিম আউয়াল সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। কমিটির মেয়াদ ছিল জুলাই ১৯৯৬-জুন ১৯৯৮। তিনি জুলাই ৯৬ থেকে ডিসেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত ১৮ বছর ৬ মাস সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক, দেশের প্রাচীনতম সাহিত্য সাময়িকী আল ইসলাহ’র সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭-২০১৮ এবং ২০১৯-২০২০ সেশনে সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২১-২০২২ সেশনের আল ইসলাহ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত শিশু কিশোর যুব কল্যাণ সংগঠণ সাইক্লোন গ্রুপ ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সেলিম আউয়াল বাংলা একাডেমির সদস্য, সিলেট ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের জীবন সদস্য, প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের জীবন সদস্য, অপরাধ সংশোধন ও পুর্নবাসন সংস্থা সিলেট-এর জীবন সদস্য এবং মোহাম্মদ উবেদ আহমদ চৌধুরী শিক্ষা ট্রাস্টের ট্রাস্টি।
২০০২ সালে সিলেটের ভাষা সৈনিকদেরকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সম্ভবত ২০০২ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারী তাদেরকে ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রি মাঠে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। সেলিম আউয়াল ছিলেন ‘ভাষাসৈনিক সম্বর্ধনা পরিষদ সিলেট’-এর অন্যতম সদস্য।
বিভিন্ন সময় নানা পেশার সাথে সম্পৃক্ত হলেও সাংবাদিকতাই মুল পেশা। সেই কৈশোরে ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে ক্লাস এইটের ছাত্র থাকাকালে সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা’র রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতার সূচনা। তারপর সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন হবিগঞ্জের সাপ্তাহিক দৃষ্টিকোণ পত্রিকায়। দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকায়ও স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেন। সাপ্তাহিক সিলেটের সকাল’র নির্বাহী সম্পাদক, পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারি ২০০১ থেকে দৈনিক সিলেটের ডাক-এর সাহিত্য সম্পাদক, পরবর্তীতে বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মধ্যে কিছুদিন বিরতির পর সর্বশেষ দৈনিক সিলেটের ডাক পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফেব্রুয়ারি ২০০২ থেকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বাসস এর সিলেট প্রতিনিধি দায়িত্ব পালন করেন। সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট সিফডিয়া ডটকম’র (পরবর্তী নামকরণ সিলেট এক্সপ্রেস ডটকম) যাত্রা তার হাত দিয়ে। অনলাইন টিভি সিলেট-সুরমা টিভি ও সিলেট এক্সপ্রেস টিভি’র যাত্রাও তার হাত দিয়ে। তিনি সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য, স্থানীয় সরকার সাংবাদিক ফোরাম সিলেট জেলা শাখার সভাপতি। সিলেট প্রেসক্লাব কর্তৃক প্রবর্তিত সিলেট প্রেসক্লাব ফেলোশিপ ২০১৮-২০১৯ লাভ করেন। এছাড়া ম্যাস-লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) সুইস এজেন্সী ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন (এসডিসি)’র সহায়তায় পরিচালিত ‘সিটিজেন ভয়েস ফর ইমপ্রুভমেন্ট লোকাল পাবলিক সার্ভিসেস’ (সিভিআইপিএস) প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় সরকার বিষয়ক ফেলোশিপ ২০১৪ লাভ করেন। তিনি প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), মাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রদান করেন। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় মিডিয়া সিন্ডিকেট, নিউজ মিডিয়া এ ধরনের ছোট আকারের সংবাদ সংস্থা গড়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। সেই সময় সিলেটেও জালালাবাদ মিডিয়া নামে একটি সংবাদ সংস্থা গড়ে তোলা হয়। এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সেলিম আউয়াল।
সেলিম আউয়াল একসময় ‘তারুণ্য’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। শৈশবে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রের শিশুদের অনুষ্ঠান ‘কিশলয়’-এ অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার বেতার অনুষ্ঠানজীবন শুরু। পরবর্তীতে তরুণদের অনুষ্ঠান ‘আমরা নবীন’-এ প্রায় নিয়মিত অংশগ্রহণ। এরপরের দিনগুলোতে প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত কথিকা পাঠ করেন। এছাড়া প্রায় দেড় দশক বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রে বেতার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। বেতারে পদটির নাম ছিলো ‘সংবাদ অনুবাদক’। তবে সংবাদ অনুবাদ নয়, তাদেরকে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রস্তুত করতে হতো। তিনি বেতার সাংবাদিকদের সংগঠন ‘সংবাদ অনুবাদক সংসদ, রেডিও বাংলাদেশ, সিলেট’-এর সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সেলিম আউয়াল কৈতর প্রকাশন নামে একটি প্রকাশনী গড়ে তুলেন ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে। প্রকাশনীটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বর্তমানে চালু হয়েছে এবং এ পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক বই বের করেছে। তিনি কৈতর-সিলেট নামে একটি সাহিত্য সংগঠন গড়ে তুলেছেন। সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতি ঐতিহ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। তিনি সংলাপ সাহিত্য সংস্কৃতি ফ্রন্টের এসিসট্যান্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন।
সেলিম আউয়াল কবি রাগিব হোসেন চৌধুরী সংবর্ধনা পর্ষদ-এর আহবায়ক, শেকড় সন্ধানী ধ্যানী গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল সংবর্ধনা পরিষদ-এর সদস্য সচিব, ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মাসউদ খান সংবর্ধনা পরিষদ-এর যুগ্ম সদস্য সচিব, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী সংবর্ধনা পরিষদ’র আহবায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
ছড়া দিয়ে লেখালেখির জগতে পা রাখলেও এখন মূলত কথাসাহিত্যে পদচারণা। শিল্পতরু প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে গল্পগ্রন্থ ‘আমি এবং সে’।
সাপ্তাহিক রোববার ঈদ সংখ্যা ২০০১-এ প্রকাশিত উপন্যাস ‘কুকুরের লাশ’ ঢাকার মৌলি প্রকাশনী বের করেছে ‘যুবতীর লাশ’ শিরোনামে। এই উপন্যাসটির দ্বিতীয় সংস্করণ কেমুসাস বইমেলা মার্চ ২০১২-এ বের করে সিলেটের পানশী।
সিলেট বিষয়ক লেখাজোখা তার তৃতীয় গ্রন্থ। তার চতূর্থ গ্রন্থ শেকড় সন্ধানী ধ্যানী গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল (জীবনী), পঞ্চম গ্রন্থ মরা গাঙে জল (ছোট গল্প), ষষ্ট গ্রন্থ সাংবাদিক সংগঠক মো. বশিরুদ্দিন (জীবনী), সপ্তম গ্রন্থ গানের পাখি হাসন রাজা এবং তার পুত্র দৌহিত্র প্রপৌত্র কথা (গবেষণা), অষ্টম গ্রন্থ আবাবিল হয়ে দিয়ে যাই চুম (ভ্রমণকাহিনী), নবম গ্রন্থ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বেদারুদ্দিন স্যার কবিতা শুনেন (গল্প), দশম গ্রন্থ চ্যাঙের খালে ব্যাঙের ফাল (ভ্রমণকাহিনী), একাদশ গ্রন্থ বই নিয়ে বই (গ্রন্থ সমালোচনা) দ্বাদশ গ্রন্থ বিষয়: সাংবাদিকতা ও সংবাদ (সাংবাদিকতা বিষয়ক)। তিনি ডা. এ রসুল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ এবং আলোর অন্বেষণ সুয়েব চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার ২০২১, কলম-হাসান আলী সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ লাভ করেন।
গল্পকার সাংবাদিক সংগঠক সেলিম আউয়ালকে তার চল্লিশ বছর পূর্তিতে ২০০৪ সালের ১৬ এপ্রিল সিলেটের লেখক সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক শহিদ সোলেমান হলে সংবর্ধনা ও সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়। লেখক পরিবার সিলেট’র ব্যানারে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে লেখক-সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী, সরকারী-বেসরকারি ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক-ছাত্র-সুধীজনের বিশাল সুহৃদ সমাবেশে পরিণত হয়। একইভাবে ২০১২ সালে নগরীর অভিজাত হোটেল হলিসাইডে তার ৫০ বছর পূর্তিতে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
চার ভাই দু‘বোনের মধ্যে সেলিম আউয়াল সবার বড়। সহধর্মিনী আফিয়া সুলতানা, স্কুল শিক্ষিকা। কন্যা ডা. নাদিরা নূসরাত মাসিয়াত (এমবিবিএস) এবং পূত্র জুন্নুরাইন কদর তাজিম।