সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২) এমন একটি নাম যাঁকে একটি বা দু’টি বিশেষণে আবদ্ধ করা যায় না। আবদ্ধ করা তো যায়ই না, তাঁর ‘প্রকাশিতকে’ ধারণ করা, তূল্যমূল্য বিচার করা একটি দুরুহ কাজ। তাই, সে কাজ যিনি করতে প্রয়াস পাবেন তাকে বরণ করতে হবে ব্যর্থতার অভিধা। সেই অভিধাকে প্রাপ্য জ্ঞান করেই বক্ষ্যমান প্রবন্ধের বিস্তৃতি।
আগেই বলেছি, তাঁকে একটি কিংবা দু’টি বিশেষণে সনাক্ত করে মূল্যায়ন করা যায় না। সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন এমন এক ‘বটবৃক্ষ’ যার বিশালত্ব প্রত্যক্ষ করতে পরিমাপ করতে বেশ সময় স্বাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্যও বটে। ‘গবেষণা’ বলতে আমরা যাকে বুঝি (যা এখানে অনুপস্থিত) এবং আমাদের কালে ক্রমশ বিলোপ পাচ্ছে তা ছাড়া সৈয়দ আলী আহসানকে স্পর্শ করা, উদঘাটন করা মোটেই সম্ভব নয়।
সৈয়দ আলী আহসান তিরিশোত্তর কালের কবি প্রতিনিধি। বাংলা কাব্যের ধারায় ‘তিরিশ’ দশকটি নানা কারণে খুব আলোচিত। রবীন্দ্র প্রভাবকে কাটিয়ে একটি আধুনিক কাব্য-ধারা সৃষ্টির এই টার্নিং পয়েন্টটি ছিল ‘একটি মাতাল ঘুর্ণি’ । সেই ঘুর্ণির রেশ কাটিয়ে চল্লিশ দশকের কবিদের নিজস্ব পাটাতনে দাঁড়াতে শিরদাঁড়াকে শক্ত করতে হয়েছিল। সৈয়দ আলী আহসান কবি ফররুখ আহমদ কিংবা সুকান্ত ভট্টচার্যের মতো আদর্শ নির্ভর এবং ঐতিহ্যিক সম্বন্ধ আবিষ্কার করতে না গিয়ে একটি স্বতন্ত্র পথ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। যা এ দুইয়ের এক ভারসাম্যপূর্ণ নিজস্ব ধারা । তাই কবি হিসেবেই তিনি লাভ করেন উজ্জলতা যা দৃষ্টি ফেরাতে কাব্য রসিক বাধ্য । কবির কাব্য বিচার বাড়ন্তে যাবো।
সৈয়দ আলী আহসান একজন অত্যন্ত সফল শিক্ষাবিদ ছিলেন। কী পরিচয়ে তাকে সনাক্ত করি, কবি, সাহিত্যিক, সাহিত্যের ইতিহাস বেত্তা, শিল্প সমালোচক, অনুবাদক, দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ব্জ্ঞ, সাহিত্য-সংস্কৃতির সকল ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছেন তিনি। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতোই সৈয়দ আলী আহসানও ইংরেজী ভাষায় ডিগ্রী অর্জন করেও সাহিত্যে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার শিক্ষকতা করে সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। শহীদুল্লাহর সঙ্গে পার্থক্য হলো- তিনি সংস্কৃত ভাষায় ডিগ্রী নিয়ে বাংলা ভাষার শিক্ষক ছিলেন।
সৈয়দ আলী আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাবস্থায় একটি কলেজে ইংরেজী ভাষার শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের (১৯৪৪) যে সূচনা হয়, জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি ‘দারুল ইহসান ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (১৯৯৯) ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে কিছুকাল দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে অর্ধশতাব্দীর বেশি বর্ণাঢ্য শিক্ষাবিদের এক বিশাল সফল জীবন বৃত্ত রচনা করেন। এ ছাড়া সাহিত্য-সংস্কৃতি-দার্শনিকতা- আত্মবিশ্লেষনাত্মক পান্ডিত্যপূর্ণ অদ্ভুত বাচনিকতা সৈয়দ আলী আহসানের বহুমুখী ও বিস্তারিত বিচরন তাঁর মনীষাকে এক বিশাল মহীরূপ দিয়েছে। সেই মহীরুহের ছায়ায় আশ্রয় পেয়েছে আমাদের দেশের কতো জ্ঞানী-গুণী, সাহিত্যিক-শিক্ষাবিদ-কোবিদ এবং বিকাশিত বুদ্ধি বৃত্তিক সবুজ বৃক্ষরাজি, তার হিসেব রাখা দুস্কর।

১. সৈয়দ আলী আহসান ২৬শে মার্চ ১৯২২ সাল অবিভক্ত ভারতে তৎকালীন যশোরের (বর্তমানে মাগুরা) আলোকদিয়া গ্রামের একটি সম্ভ্রান্ত সূফী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত শাহ আলী বোগদাদী দিল্লীতে সৈয়দ আলাউদ্দিন আযম শাহর শাসনামলে বাগদাদ থেকে আগমন করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম সৈয়দ আলী হামেদ, মাতার নাম সৈয়দা কামরুন্নেগার খাতুন। তাঁর শৈশব জীবন গড়ে উঠেছিল নদীর তীরে। নদীর নাম মধুমতী। নদী সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি- ‘নদীর তীরে দাঁড়িয়ে অথবা বর্ষাকালে সর্বকালে সর্বকূলপ্লাবী নদীর বিস্তার দেখে আমি বিচিত্র শব্দ শুনেছি নদীর স্রোতধারার অগ্রযাত্রার। আমার তখন মনে হয়েছে যে এ নদী একটি বিম্ময়কর অলৌকিক অসম্ভবের দিকে ছুটে চলেছে যার কোনো শেষ নেই।’
শৈশবে (১৯২৬-৩১) বাড়িতে গৃহ শিক্ষকের হাতে বিদ্যাচর্চার হাতেখড়ি এবং ধামরাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। পরে ১৯৩৮ সালে কৃতিত্ত্বের সাথে প্রথম বিভাগে ম্যাট্টিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৪১এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে ভর্ত্তি হন। এখান থেকে তিনি ১৯৪৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ছাত্র থাকাকালীন ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। পরে ১৯৪৫-৪৭ সালে হুগলী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ইংরেজীর অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৬ সালে ৭ জুলাই কমর মুশতারীকে বিবাহ করেন। প্রোগ্রাম এসিষ্ট্যান্ট হিসেবে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যোগ দিয়ে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা রেডিওতে বদলি হন। ১৯৪৯ সালে সাহিত্যে খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার কথা বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি দেওয়া হয়। এখানে থাকা অবস্থায় তিনি ১৯৫৪ সালে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে চলে যান। ১৯৬০ সালে তিনি বাংলা একাডেমীর পরিচালক পদে যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন এবং কলা অনুষদের ডীন নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হন। ১৯৭৫ সালে ১ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদান করেন। ১৯৭৭ সালে ২৬ জুন বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা সংস্কৃতি ক্রীড়া ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালের ২৪ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে জানুয়ারী মাস থেকে APPROACH নামক একটি ইংরেজী ষান্মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ১৯৮৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়াম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৯৯ সালে ছোট ভাই ডঃ সৈয়দ আলী আশরাফ এর মৃত্যুর পর দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার দরুন পরে তিনি ঐ দায়িত্ব ত্যাগ করেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী বহু মাত্রিক ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ প্রজ্ঞাবান, জ্ঞান তাপস, শতাব্দীর অন্যতম মনীষী সৈয়দ আলী আহসান ২০০২ সালের ২৫ জুলাই তাঁর জৈষ্ঠ্য কন্যার বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। আগেই বলেছি সৈয়দ আলী আহসানের জীবন ছিল বর্ণাঢ্য ও বহুমুখীন কর্মতৎপরতায় বর্ণিল এবং সমৃদ্ধ। তাই খুব সহজে তা স্পর্শ করা যায় না- বিধৃত করা, ব্যাখ্যা করাও কঠিন।

২. সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে অংশগ্রহন
সৈয়দ আলী আহসানের সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবন ও খুব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। তিনি ১৯৩৯- ৪০ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময় তিনি ভারত বিভক্তির আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৩ সালে র্পূব পাকিন্তান সাহিত্য সংসদের সম্পাদক হিসেবে প্রথম বার্ষিক সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এই সম্মেলন সলিমুল্লাহ মুসলিম হল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৫ সালে সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে মহাকবি কায়কোবাদকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। ১৯৪৮ সালে আব্দুল গনি হাজারীর সঙ্গে ঢাকার ‘আর্ট ইনষ্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে আন্তর্জাতিক পি.ই.এন পাকিস্তান শাখার সেক্রেটারী জেনারেল নিযুক্ত হন। এর আগে তিনি পূর্ব পাকিন্তান পি.ই.এন এর সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪১-৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে হিন্দু ও মুসলিম ছাত্রদের মাঝে দাঙ্গা হয়। এ সময় নজির আহমদ নামে একজন মুসলিম ছাত্র শহীদ হন। ‘নজির আহমদ’ নামক পুস্তকটি তিনি সম্পাদনা করেন। ১৯৫৯ সালে আন্তর্জাতিক কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডম এর পাকিস্তান শাখার উদ্যোগে ISLAM IN THE MODERN WORLD বিষয়ক সেমিনারের আয়োজন করেন। ১৯৬৩ সালে বাংলা বানান সংস্কারের জন্য একটি উপসংঘ গঠন করেন। তিনি ছিলেন সভাপতি। অন্যান্য সদস্যগণ হোলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল হাসানাৎ, মুহাম্মদ আবদুল হাই, মোঃ ওসমান গনি, মোঃ ফিরদৌস খান, মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। বাংলা একাডেমীতে থাকাকালীন তিনি বাংলার সঠিক মান নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহন করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে দেশের খ্যাতিমান পন্ডিতদের নিয়ে উপসংঘ গঠন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।
৩. তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থপঞ্জি :
১৯৩৭ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রথম ইংরেজী কবিতা THE ROSE প্রকাশের মধ্য দিয়ে লেখায় পদার্পণ ঘটে। এরপর দীর্ঘ লেখক জীবনের সঞ্চয় প্রকাশিত গ্রস্থের সংখ্যা-১০৫ টি।
১. OUR HERITAGE (১৯৪৮), ২. STEPS TO ENGLISH নামে ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর জন্য ইংরেজী পাঠ্য পুস্তক ঢাকা বোর্ড (১৯৫০-৫১), ৩. ইকবালের কবিতা (১৯৫২) সম্পাদনা, ৪. গল্প সঞ্চয়ন (১৯৫৩) ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সহযোগে যৌথ সম্পাদনা, ৫. নজরুল ইসলাম (১৯৫৪) সমালোচনা গ্রন্থ, করাচী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক ষান্মাসিক সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা (১৯৫৪), ৬. অনেক আকাশ (১৯৫৯) কাব্য, ৭. ক্লেয়ার ও ইভানগল এর ‘ÔPOEMES D’ AMOUR’ এর অনুবাদ (১৯৫৯) ৮. কবি মধুসূদন (১৯৫৯) সমালোচনা গ্রন্থ, ৯. কোরআন শরীফের আমপারা মাওলানা আবদুর রহমান বেখদ এর সহযোগিতায় অনুবাদ (১৯৬২) ৯. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (১৯৬৪) ১০. পদ্মাবতী (১৯৬৮) গবেষণা, ১১. আধুনিক বাংলা কবিতা : শব্দের অনুষজ্ঞ (১৯৭০) সাহিত্য গবেষনা, ১২. রবীন্দ্রনাথ উপরে গ্রন্থ (১৯৭৪) গবেষণা, ১৩. মধুমালতি (১৯৭৩) সম্পাদনা, ১৪. রবীন্দ্রনাথ : কাব্য বিচারের ভূমিকা (১৯৭৪) সাহিত্য সমালোচনা, ১৫. কাব্যসমগ্র(১৯৭৪), ১৬. জার্মান সাহিত্য: একটি নিদর্শনী (১৯৭৬) সম্পাদনা ১৭. আধুনিক জার্মান সাহিত্য (১৯৭৬) সম্পাদনা, ১৮. সতত স্বাগত (১৯৮৩) মূল্যায়ন ও স্মৃতিকথা, ১৯. স্রোতোবাহী নদী (১৯৮৯) আত্মজীবনীমূলক, ২০. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত : আধুনিক যুগ, ২১. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত: প্রাচীন যুগ, ২২. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: মধ্যযুগ (২০০৩) প্রভৃতি।

৪. ভ্রমণ, সংবর্ধনা, পদক ও পুরস্কার
সৈয়দ আলী আহসান পৃথিবীর অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯৫৬ সালে লন্ডনে ২৮তম আন্তর্জাতিক পি-ই-এন সম্মেলনে এবং ১৯৫৭ সালে টোকিওতে ২৯তম আন্তজাতিক পি.ই.এন সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরে এশিয়া ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণক্রমে ম্যানিলায় যান এবং ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপিনোজএ বক্ততা করেন। ১৯৫৭ সালে হংকং গমন করেন। ১৯৫৮ সালে ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন। ইরান, বৈরুত, বাগদাদ, ইস্তাম্বুল, আংকারা, কায়রো ও অন্যান্য শহরে অবস্থান করেন।
১৯৫৯ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টে ৩০তম পি.ই.এন কংগ্রেসে পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে জুন মাসে পশ্চিম বার্লিনে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী সম্মেলনে পাকিস্তারের প্রতিনিধিত্ব করেন। এ সময় তিনি লন্ডন, প্যারিস, ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, ডুসেলডর্ফ, লিসবন, দক্ষিণ আমেরিকার রায়ো ডি জেনিরোতে যান। সেখানে আন্তর্জাতিক পি.ই. এন সম্মেলনে যোগদান করেন। অতপর বার্লিন হয়ে ‘হাঙ্গেরিয়ান রাইটার্স ইন এক্সাইল’ নামক দেশত্যাগী হাঙ্গেরীয় লেখকদের সম্মেলনে যোগদানের জন্য ডুলেসডর্ফে গমন করেন এবং ব্রাজিলের রিসিফে রায়ো ডি জেনিয়ো শহর ব্রাসিলিয়া ভ্রমণ করেন। ১৯৬১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আমন্ত্রণে লিডারশীপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে আমেরিকা গমন করেন। এ সময় তিনি নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, মিসিগন, ইন্ডিয়ানা শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো, লসএঞ্জেলীস, উইলিয়াম্স, আলবুকার্কি, নিউঅরলিন্স, বোষ্টন, নিউইয়র্ক, প্যারিস ভ্রমণ করেন। ১৯৬২ সালে ডিসেম্বর মাসে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত এশীয় পি.ই.এন সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে প্যারিসে ‘বুলভার্ড হোমসানে’ কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রীডমের অনুষ্ঠনে যোগদান। এসময় তিনি লন্ডন, বৈরুত গমন করেন। তেহরানে অনুষিঠত শিশু-সাহিত্য সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ পর্বের একটি সেমিনারে যোগদান করেন। ১৯৭২ সালে ১৬ এপ্রিল কোলকাতায় বাংলাদেশের উপর অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি সমূহের সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মান সরকারের আমন্ত্রণক্রমে জার্মানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট, হাইডেলবার্গ, মিউনিখ, টুবিঙ্গো, ষ্টুটগার্ড, ওয়েষ্ট বার্লিন, হামবুর্গ প্রভৃতি শহর ভ্রমণ করেন। ১৯৭৫ সালে ভারতে নাগপুরে বিশ্বহিন্দী সম্মেলনে হিন্দী গবেষণা কর্মে বিশেষ ব্যক্তি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। ১৯৭৫ সালে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কিত সেমিনারে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালে বুলগেরিয়ার জাতীয় ভাষা সাহিত্য ও লিপি দিবসে যোগদানের উদ্দেশ্যে মস্কো হয়ে সোফিয়ায় যান।

১৯৭৫ সালে ৪ অক্টোবর মস্কোয় অনুষ্ঠিত ২৫ তম প্যালেনারি এ্যাসেম্বলী অব ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ইউনাইটেড ন্যাশনাল এসোসিয়েশন- এ যোগদান করেন। ফেরার পথে বাগদাদ ও বোম্বাইয়ে গমন করেন। ১৯৭৭ সালে জুলাই মাসে জেনিভায় অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর শিক্ষা বিষয়ক অধিবেশনে যোগদান করেন । ফেরার পথে লন্ডন গমন করেন। ১৯৭৮ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের আমন্ত্রণক্রমে লন্ডন গমন করেন। ১৯৭৮ সালে কুয়েত সরকারের আমন্ত্রণক্রমে কুয়েত গমন করেন। ১৯৭৯ সালে আন্তর্জাতিক প্রকাশন সংস্থার আমন্ত্রণক্রমে সিঙ্গাপুর গমন করেন। ১৯৮০-৮১ সালে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত এশীয় লেখক সম্মেলনে যোগদান করেন।
১৯৮২ সালে ষাটতম জন্মবার্ষিকীতে ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ১৯৮৯ সালে জাতীয় অধ্যাপক নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে ফরাসী সরকার তাঁকে দিয়েছেন OFFICER DE LORDRE DES ET DES LETTERS-এর সনদ। এছাড়া তিনি একুশে পদক, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক, মাইকেল মধুসূদন সাহিত্য পুরস্কার তিনি লাভ করেন।

৫. কবি
সৈয়দ আলী আহসান চল্লিশ দশকের অন্যতম কবি। সময়টা সাহিত্য এবং রাজনৈতিক উভয় দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের সান্বন্তর, ১৯৪৬ এর মারাত্মক মম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭এ ভারত দ্বিখন্ডিত হবার ডামাডোল, ১৯৪৮এর ভাষা আন্দোলন এবং সাহিত্যে তিরিশের কবিদের দুর্দান্ত প্রতাপ- গোটা বাংলা সাহিত্যের এক মোড় পরিবর্তনের টান টান উত্তেজনা। এ সব কিছু সৈয়দ আলী আহসানের কাব্য মানস গঠনে প্রভাব ফেলেছে।
তিরিশের পঞ্চপান্ডব কবিবৃন্দ- জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬০), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-৮৬), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-) ও বিষ্ণু দে ( ১৯০৯-) তখন রবীন্দ্রনাথকে হেস্থনেস্থ করে বাংলা কাব্যের স্রোতস্বিনীতে নতুন পাল উড়িয়ে নৌকায় হাল ধরেছেন। এ সময় ইংরেজী ভাষা পন্ডিত অধ্যাপক- কবিবৃন্দের একাংশের বাংলা কাব্যে শাসনকে অস্বীকার করে এমন পুঙ্গব কোথায়। চল্লিশের কবিদেরও এ সময় সমঝে পা ফেলার! অভ্যাস রপ্ত করতে হচ্ছিল। শুধুমাত্র ব্যতিক্রম ফররুখ আহমদ ও সুকান্ত ভট্টাচার্য। একজন ইসলামী ঐতিহ্য এবং আদর্শকে ধারণ করে পুঁথি সাহিত্য থেকে আহরণ করে নতুন পথ রচনা করলেন। অপরজন বাংলা কাব্যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে উপজীব্য করে শ্রেণী সংগ্রামের আওয়াজ বুলন্দ করলেন। এই দুজন ছাড়া চল্লিশ এবং পঞ্চশ দশক পর্যন্ত অধিকাংশ কবিদের ঘাড়ে তিরিশের কবিদের ভূত তাড়া করেছে।
সৈয়দ আলী আহসানের সমকালীন কবিরা হোলেন- আহসান হাবীব (১৯১৭-৮৫), সিকান্দার আবু জাফর (১৯৯৮-৭৫), তালিম হোসেন (১৯১৮-৯৯), গোলাম কুদ্দুস (১৯২০-) , আবুল হোসেন (১৯২১-) হাবীবুর রহমান (১৯২২-৭৬) , সানাউল হক ( (১৯২৩-) সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯২০-) সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-৪৭) প্রমুখ।
সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন ইংরেজী ভাষায় সুদক্ষ। তাই বিশ্ব সাহিত্যের বিশাল ভুবনে প্রবেশ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ে পন্ডিত হওয়ায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক কারণে তিনি পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণের সুযোগ লাভ করেন। ফলে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের গতি প্রকৃতি সম্পর্কে খোঁজ খবর করা সম্ভব হয়েছে তাঁর পক্ষে।
এ প্রসঙ্গে ডঃ আলী আশরাফ বলেন , ‘ ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স এবং এম. এ করার ফলে ইংরেজী সাহিত্যের দরজা তাঁর কাছে খুলে যায়- সেই সঙ্গে বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে অবাধ গমনের অধিকার অর্জন করেন।’
তিনি শেক্সপীয়র, কীটস, ইয়েটস এজরা পাউন্ড, রিলকে, ভালটার হ্যোয়লারার, গ্যুনটার হেরবুর্গার, হরস্ট বিয়েনেক, সিলভিয়া প্লাথ সহ বিভিন্ন ভাষার কবিতার সঙ্গে পরিচিত হন। আর তিরিশের কবিরা যা নিয়ে খুব মাতামাতি করেছেন সৈয়দ আলী আহসান তা সচেতনভাব্ এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। তিনি ফররুখ আহমদ এর প্রভাব থেকে বেঁচে চলারও সচেতন প্রয়াসী ছিলেন। সৈয়দ আলী আহসান চেয়েছেলেন একটা বড় রাস্তা না হোক, ছোট্ট গলি দিয়ে অন্তত তাঁর কাব্যযাত্রাকে একটা নিদিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যেতে। এ ক্ষেত্রে তাঁর সফলতাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে বক্ষ্যমান প্রবন্ধে-
সৈয়দ আলী আহসান বহুপ্রজ কবি নন। তিনি নিরলস কাব্য সাধনা করেননি। তাঁর বহুমুখীন কর্ম তৎপরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের ভারে কাব্য প্রয়াস বিরতিহীন হতে পারেনি। তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র সাতটি। এর মধ্যে রয়েছে একটি ‘কাব্য সমগ্র’ যা প্রকাশিত হবার পর আরো দু’টু কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। সে গুলো হলো-
১. অনেক আকাশ (১৯৫৯)
২. একক সন্ধ্যায় বসন্ত (১৯৬২)
৩. সহসা সচকিত (১৯৬৬)
৪. উচ্চারণ (১৯৬৮)
৫. আমার প্রতিদিনের শব্দ (১৯৭৪)
৬. কাব্য সমগ্র (১৯৭৪)
৭. সমুদ্রেই থাবো (১৯৮৫) এবং
৮. চাহার দরবেশ ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯২)
সৈয়দ আলী আহসান কবিতাকে দেখেছেন দু’টি মৌলিক ধারায়। একটি -তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতায় জীবন- বিশ্বাসের আশ্রয় থাকতে হবে। তাঁর মতে- পৃথিবীর সকল মহৎ কবিতাই বিশ্বাসকে অবলম্বন করে, বিশ্বাসের মাহত্মেই পৃথিবীর কবিতা হচ্ছে বিশ্বাস । মধ্যযুগের দীর্ঘ কয়েকশত বৎসর বাংলা কবিতায় বিশ্বাসের প্লাবন নেমেছিল।’ (কবিতায় বিশ্বাসের বিভূতি)
দ্বিতীয় যে বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দিতেন তা হলো- কাব্য সৌন্দর্য। তাঁর মতে ‘কবিতাকে কবিতা হতে হবে, যেমন একটি চিত্রকর্মকে যথার্থ চিত্রকর্ম হতে হবে। আমরা যেমন একটি চিত্রকর্মকে প্রশংসা করি তার সৌন্দর্যের জন্য, একটি কবিতাকে প্রশংসা করব- তার বক্তব্যের জন্য নয়, কিন্তু অন্তর্নিহিত স্বরূপের প্রকাশ ভঙ্গির জন্য।”
এই দুই মৌলিক বিষয়ের দিকে সৈয়দ আলী আহসান নজর দিয়েছেন সর্বতোভাবে। এরপর তিনি আরেকটি বিষয় কবিতার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করতেন তা হলো কবিতায় শব্দ। তিনি বিশ্বাস করতেন “কবিতা হচ্ছে শব্দের শিল্প।” এ ব্যাপারে তাঁর মত হলো- “কবিরা শব্দ যেখান থেকেই আহরন করুন না কেন কবিতায় ব্যবহারের ফলে শব্দগুলোর একটি “সামুদ্রিক’ পরিবর্তন ঘটে। শেকস্পীয়র এটাকে ‘সীচেঞ্চ’ বলেছেন। অর্থাৎ একটি মৃতদেহ যখন বহুদিন পর্যন্ত সমুদ্রের অতলে থাকে তখন তার অস্থিগুলো প্রবাল হয় এবং চক্ষু দু’টি মুক্তা হয়। কেননা সামুদ্রিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মৃতদেহটি অন্যরূপ ধারণ করে। কবিতার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনি। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলো যে ক্ষেত্র থেকে এবং যে ব্যবহার বিধি থেকেই আসুক না কেন, কবিতার রূপকল্পের মধ্যে তার একটি ‘সামুদ্রিক’ পরিবর্তন ঘটে।’
এই দৃষ্টি সৈয়দ আলী আহসানের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায়। সামুদ্রিক অতলান্ত দেখার গভীর দৃষ্টি ছিল তাঁর যেমন-
ঘনিষ্ট আশ্লেষে এসে মৃত্যু দেখি তোমার নয়নে
নির্ণিমেষ নীল শিখা তন্দ্রাহীন সমুদ্র জোয়ার,
আকাক্সিক্ষত মুগ্ধ তনু- তনু নয়, অরণ্য প্রদেশ
যেখানে নক্ষত্র লুব্ধ বিড়ম্বিত পাতার আড়ালে
যেখানে রাজস্ব-দান সংগুপ্ত প্রহরে
অথবা একান্ত কেন্দ্রে সব একাকার।
(অনেক আকাশ / নায়িকা-তিন)
সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মানসম্পন্ন শিল্প রূচিবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি। শিল্পকে তিনি স্থান দিয়েছেন সবার উপরে। আবার শিল্পের জন্য শিল্প- এ মতকে প্রশ্রয় দিয়ে তিনি অতিনান্দনিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না । জীবন বিশ্বাস, মানুষের পার্থিব আকাঙ্খা চলমানতাকে একসঙ্গে গেঁথেই তিনি শিল্পের জয়গান গাইতে অভ্যস্থ ছিলেন। সে জন্য চল্লিশের অন্যান্য কবি যেমন ফররুখ আহমদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে খানিকটা তাঁর অনীহা ছিল।
ফররুখ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক বার তাকে বলেছি যে, দোভাষী পুঁথিতে একমাত্র কাহিনী বিন্যাসই লক্ষ্যযোগ্য। দোভাষী পুুঁথির শব্দ ব্যবহার এবং সেখানকার অর্থবহতা আমাদের আলোচ্য বিষয় হতে পারে না। তার কারণ শব্দের অর্থ নির্ণয় তাদের লক্ষ্য ছিল না। পুঁথিকারগণ তাদের কাহিনী বর্ণনার ব্যস্ততায় নিমগ্ন ছিলেন। ফররুখ আমার কথা মানতেন না।’ (ফররুখ সম্পর্কে)
তাই কবিতাকে রাখতে চাইতেন স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ পরিবেশে। Yeats-এর মতো তিনি বিশ্বাস কবতেন- “The modern world is more powerful than any propaganda, that no nation can isolate itself from the crises of the modern world.”
কিন্ত শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আলী আহসান তাঁর চিন্তাধারার পরিবর্তন করেছিলেন। এই পরিবর্তনের স্পষ্ট পরিচয় মেলে তাঁর ‘চাহার দরবেশ এবং অন্যান্য কবিতা’ কাব্যগ্রন্থে।

১. প্রাণ-সম্পদ এখনো অনেক দূরে
অনেক দূরেতে জীবন- সৈাধ আলোর অন্তঃপুরে
এখানে রাত্রি কালো কুয়াশাড ঢাকা
তমিশ্রা পথে মৃত্যুর ছবি আঁকা। (চাহার দরবেশ)

২. রেগমে গাঁথিয়া বসরাই গুল শোনাবো প্রেমের গান
ঝড়ের মতন উড়ে যাবে দুরে আমার প্রণয় কথা
পাখির পাখায় লিখিব আমার প্রণয়ের মত্ততা
বসরা দেশের কুসুমিত মাটি গোলাপী গন্ধে পাঠালো আমন্ত্রণ।
(চাহার দরবেশ)
আগেই বলেছি সৈয়দ আলী আহসান অসম্ভব শিল্প সচেতন কবি। তাই কবিতায় ছন্দ ব্যবহার, শব্দ নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়ে তিনি ছিলেন নিপুণ কারিগর। তিনি বিশ্বাস করতেন কবিতাকে মেধা দিয়ে নয় হৃদয় দিয়ে নির্মাণ করতে হয়। তিনি এও বিশ্বাস করতেন ছন্দের জন্য কবিতা নয়- কবিতার জন্য ছন্দ। আর প্রথাবদ্ধ ছন্দই একমাত্র কবিতা নয়- ছন্দ ভেঙ্গেও কবিতার জয় নিশান উড়ানো সম্ভব। একটি আধুনিক ঝকঝকে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর। তিনি যেভাবে অক্ষর বৃক্ত, মাত্রাবৃত্ত, পয়ার ছন্দ ব্যবহার করে সিদ্ধতা প্রমাণ করেছেন তেমনি অদ্ভুত গতিময় গদ্যাকারে অসমাপিকা ক্রিয়াপদ ব্যবহার ও বাক্য বিন্যাসে অসাধারণ যাদু দেখাতে পেরেছেন বাংলা কবিতার একক নিদর্শন ‘আমার পূর্ব বাংলা’ কবিতা নির্মাণ করে। কবিতাটি বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কবিতা। তিরিশের কবিরা অনেকেই যে ঘরে প্রবেশের জন্য মাথা খুঁটে মরছিলেন- সৈয়দ আলী আহসান সে ঘরে অনায়াসে প্রবেশ করে দেখিয়ে দিলেন সেই ঘর। কী এক আশ্চর্য দেহ সৌষ্ঠর কী এক মেজাজ! কী এক সম্মোহনী শক্তি কবিতার! উদাহরণ দিচ্ছি-

আমার পূর্ব-বাংলা কি আশ্চর্য
শীতল নদী
অনেক শান্ত আবার সহসা
স্ফীত প্রাচুর্যে আনন্দিত
একবার কোলাহল, অনেক বার
শান্ত শৈথিল্য
আবার অনেকবার স্তিমিত কন্ঠস্বরের
অনবরত বন্যা
কতবার বক আর গাঙ শালিক
একটি কি দু’টি মাছরাঙা
অবিরল কয়েকটি কাক
বাতাসে বাতাসে প্রগল্ভ কাশবন
ঢেউ-ঢেউ নদী প্রচুর কথার
কিছু গাছ- আর নারকেল শন পাতার
ছাউনির ঘর নিয়ে
এক টুকরো মাটির দ্বীপ
(আমার পূর্ব বাংলা)

এই যে একটি গতিময়তা, চিত্রকল্প, শব্দের অনুরজ্ঞন, ব্যাঞ্চনা যা বাংলা কবিতায় এক বিরল ঘটনা। হৃদয়কে টানতে টানতে এমন এক পৃথিবীতে নিয়ে যায়- যেখানে মানবিক বোধ আর থাকে না।
সৈয়দ আলী আহসানকে কবি হিসেবে এখনো তেমন মূল্যায়ন করা হয়নি। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদা পান্ডিত্যপূর্ণ উপস্থিতি জীবদ্দশায় তাঁকে উপেক্ষা করতে কেউ পারে নি সত্য কিন্তু তাঁর যথার্থ মূল্যায়নে তেমন উৎসাহী হয়নি। অনেকটা ইচ্ছাকৃত অবহেলা এবং বলয়কেন্দ্রিক পরিবেশ তাঁকে একপাশে সরিয়ে রেখেছে। তাই সাহিত্য সমালোচক বৃন্দের (আমাদের দেশে সংখ্যায় আঙ্গুলিমেয়) সৈয়দ আলী আহসান মনোযোগ কাড়তে পারেন নি। এখানে আমরা বিভিন্ন সাহিত্য সমালোচকদের দৃষ্টিতে সৈয়দ আলী আহসান- এই বিষয়টি দেখার প্রয়াস পাবো।

১. ত্রিশের কাব্যাদর্শের সঙ্গে আমাদের যে সকল কবি সংলগ্ন হতে পেরেছিলেন, সৈয়দ আলী আহসান তাঁদেরই সমসাময়িক হলেও, এ- কথা মনে করার কারণ আছে যে, ত্রিশের ধারাকেই তাঁর কাব্যের নিশ্চিত স্থিরীকৃত উৎস হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া তাঁর পক্ষে কখনো পুরোপুরি সম্ভব হয় নি।’
(আধুনিক কবি ও কবিতা। হাসান হাফিজুর রহমান পৃঃ ২৬১)

২. সৈয়দ আলী আহসান অভিজাত মনোভাবের কবি। বস্তুতঃ এই অভিজাত মনোভারের প্যাটার্ন আন্তর্জাতিক কাব্য-নিরীক্ষায় যেমন নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, বাংলা কাব্যের যজ্ঞশালায় এর তেমন পরীক্ষা হয়নি।
(ঐ)

৩. -সৈয়দ আলী আহসান সম্পূর্ণভাবে ‘স্বাতন্ত্র্য ধর্মী’। কবি সৈয়দ আলী আহসানকে বুঝতে হলে আমাদের কালের আমাদের সমাজ, সংস্কার, ধর্মীয় চেতনা, শিক্ষা সংস্কৃতি ও সাহিত্যের পরিবেশ পরিমন্ডলের সুষ্পষ্ট ইতিহাস পরিচয় আবশ্যক। (ড. কাজী দীন মুহম্মদ)

৪. আমার বিচারে তিনি প্রেমের কবি। এই প্রেম শুধু কবিপুরুষের আস্বাদ করবার বিষয়বস্তু নয়। এ যেন কোনো এক অজ্ঞেয়কে আবিষ্কারের ঐকান্তিকতায় ব্যাকুল। যখন তিনি নারীকে আহবান করেন তখন জগৎ ব্যাপী মানবকূলের মধ্যে যত যুবতী আছে, হোক তারা পদ্মাপারের ধীবরকুলের মধ্যে যত যুবতী আছে। হোক তারা পদ্মাপারের ধীবরকন্যা অথবা সিনাই পর্বতের ছাগচরানী যাযাবরী একই আহবানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।
(সৈয়দ গভীরতম আমার অন্বিষ্ট / আল মাহমুদ।)

৫. -তিনি কবিতায় শব্দ ব্যবহারকে শব্দের প্রয়োগকে সর্বাধিক মূল্য দিয়েছেন। এই বিষয়ের আলোচনায় ধর্ম-পাগল মানুষ যেমন ধর্ম নিয়ে, রাজনীতি-পাগল মানুষ যেমন রাজনীতি নিয়ে, সঙ্গীত-পাগল মানুষ। যেমন সঙ্গীত ও সুর নিয়ে, ভোজনরসিক যেমন খাদ্য নিয়ে, কৃষক যেমন কৃষি নিয়ে অক্লান্তভাবে কথা বলে যান সৈয়দ আলী আহসান তেমনি ঘুরে ফিরে শব্দের প্রতি তাঁর অনুরাগকে প্রকাশ করেন।
(তিনি শুধু এক কবি। শাহাবুদ্দীন আহমদ)

৬. সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২) আমাদের জৈষ্ঠ কবিদের একজন। তাঁর কবিতায় ভাবুকতা ও দার্শনিকতা খুব বেশি। জীবনের অর্ন্তস্বরুপের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা তিনি করেন। কিন্তু ভাববাদী, অলোক ধ্যানে তদ্গত কবি রূপে এ রহস্যালোকের অনির্দেশ পরিক্রমণেই তাঁর আনন্দ। তিনি প্রধানত মধুর রসের কবি, সফল যত্মবান কবি।’
(আমাদের কবিতা / বশীর আল হেলাল)

৭. একজন কবির পরিচয় নির্ভর করে তার কাব্য ভাষা ও নন্দনতত্ত্বের প্রকর্ষের উপর। এজন্য একজন কবিকে প্রচন্ড মেধাবী, সাহিত্যের প্রাজ্ঞ পাঠক নিয়ন্ত্রিত আবেগি এবং নির্মোহ সমালোচক হওয়া প্রয়োজন। সৈয়দ আলী আহসানের মধ্যে এ গুণের সমাহার ঘটেছে যথার্থভাবে।
(সৈয়দ আলী আহসানের কাব্য সৌন্দর্য/ হাসান আলীম)

৮. চল্লিশের শক্তিশালী কবিদের একজন সৈয়দ আলী আহসান। বাংলা-কবিতায় তাঁর কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ নতুন এবং সবার থেকে স্বতন্ত্র। কিন্তু তিরিশের দশক থেকে একটা মজার ব্যাপার বাংলা ভাষায় পরিলক্ষিত হয়ে আসছে যে, নানা কৌশলে ও চতুরতায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল কবিরাই এখানে সদর্পে নেতৃত্বের আসনে আসীন।’
(সৈয়দ আলী আহসান : তাঁর কাব্যলোক/ সায়ীদ আবু বকর)

উপরিউক্ত মন্তব্যসমুহের মধ্য দিয়ে আলী আহসানের কবিত্বকে পুরো উপলব্ধি করা সম্ভব না হলেও কবির কাব্য-মেজাজ, ভাষা এবং ধারা সম্পর্কে খানিকটা ষ্পর্শ করা যেতে পাওে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, চল্লিশের এই কবি সাহিত্য সমালোচকদের কেন যে আকর্ষণ করতে পারেননি তা বোধগম্য নয়। বলা যায় দারুণভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন।এ ব্যাপারে তাঁর ছোট ভাই চল্লিশের আরেক পন্ডিত কবি ডঃ সৈয়দ আলী আশরাফের বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য।‘তাঁর কাব্য বিচার সেই ব্যক্তিই সুষ্ঠুভাবে করতে পারবেন যিনি বিশ্ব সহিত্য সম্বন্ধে সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল’।
যদি তাই হয়, তবে কি এ কথা মানতে হবে, সৈয়দ আলী আহসানকে মূল্যায়ন করার মতো বিশ্বসাহিত্য জ্ঞান সমৃদ্ধ সমালোচক আমাদের দেশে বরাবর অভাব পড়েছে ? বিষয়টি এভাবে নাও হতে পাওে। বরং আমার অভিমত হচ্ছে কবি বরাবর প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা অলংকৃত করেছেন, নিজস্ব ভূবনে থেকেছেন রাজাধিরাজ হিসেবে, শুচিগ্রস্ত মানুষের মতো আর সাহিত্যকে রাখতে চেয়েছেন সকল মত ও পথের বাইরে আলাদা জগতে। সেটা কি এই দেশ ও মাটির বাইরের কোন ভূবনে? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে? এই যে একটি সংশয় এই যে একটি দ্বিধা এর সঠিক জবাব পেতে হলে আমাদের আরো গভীরে যেতে হবে। সৈয়দ আলী আহসানের জীবন ও সাহিত্যের মর্মমূলে প্রবেশ করতে হবে। এখানে সেই প্রায়স চেষ্টা সঙ্গত কারণেই করছি নে।

৬. সাহিত্য গবেষক
ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এবং সাহিত্য সম্পর্কিত গভীর অন্বেষা এ গবেষণায় আমাদের সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন সৈয়দ আলী আহসান। আবদুল হাই এব সঙ্গে যৌথভাবে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্তঃ আধুনিক যুগ’ এককভাবে ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: প্রাচীন যুগ’ এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস মধ্যযুগ’ গ্রন্থ তিনটি তার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসভিত্তিক এক মূল্যবান গবেষণা। এক্ষেত্রে তাঁর অবদান হচ্ছে তিনি বাংলা ভাষার ইতিহাস এবং মুসলমানদের অংশগ্রহণকে অত্যন্ত নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে হিন্দু সাহিত্য গবেষকরা যেখানে বাংলা সাহিত্যেও মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন ডঃ মুহম্মদ শহীদল্লাহ এবং সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ গবেষণার মাধ্যমে মধ্যযুগে সমৃদ্ধ সাহিত্যের নিদর্শন তুলে ধরেছেন। সৈয়দ আলী আহসান ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: মধ্যযুগ’ গ্রন্থে আলাওল, আরাকান রাজ সভায় বাংলা ভাষা চর্চা, ‘লাইলী -মজনু প্রণয়োপাখ্যানের দৌলত উজীর বাহরাম খান, দোনা গাজী,মালে মুহাম্মদ শাহ মুহাম্মদ সগীর, আবদুল হাকিম প্রমুখ মধ্যযুগীয় মুসলিম প্রতিনিধিদের সাহিত্য কর্মকে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করেন।
এটা র্দ্বিনিধায় বলা যায় সৈয়দ আলী আহসানের সাহিত্য গবেষণায় মধ্যযুগীয় মুসলিম প্রতিনিধিবৃন্দ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।
এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আলী আহসানের অভিমত ‘বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের আরম্ভ ধরা যায় ইষতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয় থেকে। সে সময় থেকে আরম্ভ করে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। হিন্দু সাহিত্যে যেমন তেমনি বাংলা সাহিত্যেও মধ্যযুগে ধর্মীয় সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। আবার হিন্দী অবধি সাহিত্যের প্রভাবও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে পড়েছিল। এ সাহিত্যের ব্যাপকতা বিপুল, কিন্তু এ সাহিত্যের সকল অংশ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যেমন- পদাবলী সাহিত্যে। অজস্র পদাবলী রচিত হয়েছে মধ্যযুগে-তার অধিকাংশই বিশেষত্বহীন। সেজন্য আমি আমার আলোচনায় চৈতন্য দেবের জীবন কথা আলোচনা করেছি এবং বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের কাব্য কুশলতা নিয়ে কিছুটা ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছি মধ্যযুগে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাব্য কথা অনেক লিখিত হয়েছিল। আবার মুসলমানদের ধর্মীয় কথা নিয়েও কাব্য রচিত হয়েছিল। আমি উভয়কেই সমান মর্যাদা দিয়েছি। এপর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের যে সমস্ত ইতিহাস রচিত হয়েছে তাতে মুসলমানদের রচিত সাহিত্য বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। আমি আমার এই গ্রন্থে সেই গুরুত্ব দেবার চেষ্টা করেছি।
(প্রাসঙ্গিক/বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস : মধ্যযুগ)

৭. শিক্ষাবিদ
সৈয়দ আলী আহসানের জীবনের অর্ধ শতাব্দী জুড়ে রয়েছে একজন সফল শিক্ষাবিদের অধ্যায়। যিনি ইংরেজীতে এম.এ ক্লাসের ছাত্র থাকা অবস্থায় ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (১৯৪৪) শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন। এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক পদে অধিষ্ঠান থেকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষাবিদ হিসেবে বিরল ইতিহাস গড়েছেন তিনি। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য। ভারত বিভক্তির পর স্কুল পর্যায়ের ইংরেজী পাঠ্য বইয়ের দারুণ সংকট মোচনে সৈয়দ আলী আহসান এগিয়ে আসেন। এছাড়া তিনি ইসলামী শিল্পকলা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং চারু ও কারু কলা ইনষ্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমীতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর বহুমুখী বর্ণাঢ্য ও সফল শিক্ষক জীবনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সুকৃতির স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা লাভ করেন।
সৈয়দ আলী আহসানের শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর অবদান পূর্বে সংক্ষিপ্ত জীবন-বৃত্তান্তে উল্লেখ করার প্রয়াস পেয়েছি।

৮. অনুবাদক ও সম্পাদনা
সৈয়দ আলী আহসান জার্মান ও ফ্রান্স ভাষায় সুদক্ষ ব্যক্তি ছিলেন। জার্মান সাহিত্যকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের পরিচিত করার তাঁর প্রয়াস খুবই তাৎপর্যবহ। তিনি ‘আধুনিক জার্মান সাহিত্য’ এবং ‘জার্মান সাহিত্য একটি নিদর্শনী’ গ্রন্থ দুটির কিছু অনুবাদ, সম্পাদনা ও ভুমিকা লিখেছেন যা মূল্যবান কাজ হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়া তিনি ‘ইকবালের কবিতা’ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন।

৯. ধর্ম তত্ত্বজ্ঞ
সৈয়দ আলী আহসান সুফী পরিবারের সন্তান হওয়ায় এবং পরিবারে ইসলামী আদর্শের চর্চা থাকায় শৈশব থেকে ধর্ম বিষয়ে তিনি সচেতন এবং অনুসারী ছিলেন। তিনি আমপারা অনুবাদে হাত দেওয়া ছাড়া হযরত মুহম্মদ স. এর একটি পুর্নাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ (মহানবী) রচনা করেন। তিনি একজন উদারনৈতিক ধর্মীয় আদর্শের অনুসারী ছিলেন।

সৈয়দ আলী আহসানের আরেকটি অবদানের কথা এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা উচিত তা হলো প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ কর্তৃক গঠিত ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংস্কৃত কমিশনের (১৯৮৯) তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান। উক্ত কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যে নিপোর্ট পেশ করেন তা আমাদের জাতীয়সত্তার দলিল ও দিক নির্দেশক হতে পারতো। সৈয়দ আলী আহসানের পান্ডিত্য, প্রজ্ঞা ও সুদুরপ্রসারী দৃষ্টির পরিচয় এই কমিশন নিপোর্টে পাওয়া যায়। দুঃখজনক যে এই কমিশন রিপোর্ট পৃথিবীর আলো বাতাসে পায়নি। তাই, এই মূল্যবান দলিলটিও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে।
আগেই বলেছি সৈয়দ আলী আহসান একজন বিরল প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। একটি জাতি যেমন কৃতি ব্যক্তিদের নিয়ে গৌরবান্বিত হয়। তিনি তেমনি এক মনীষী পুরুষ- তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিক্ষা দীক্ষা মুগ্ধ বাচনিকতাকে দেশে-বিদেশে, বিশষত: তার শত্রুরাও সমীহ করতে বাধ্য হতো ।সমঝে চলতো তারা। অথচ দূঃখজনক ব্যাপার এই মনীষীকে আমরা চিনতে পারিনি। চিনতে ভুল করেছি। এ আমাদের অজ্ঞানতা, জ্ঞানের দীনতাই বলব।