মোহাম্মদ আবদুল মান্নান একজন ইতিহাসবিদ ও গবেষক। পেশাগত জীবনে একজন ব্যাংকার। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ছিলেন। ইতিহাসের উপর লিখেছেন বেশী। শিশু-কিশোরদের জন্যে তাঁর রচিত ‘এই আমার বাংলাদেশ’ শিশু কিশোরদের হৃদয়ে বাংলাদেশের একটি পরিচিতি তুলে ধরেছে। আর আলোচ্য বই ‘সোনার দেশ বাংলাদেশ বইটি বাংলাদেশকে গভীরভাবে জানতে শেখাবে তাদের। তারা বাংলাদেশকে নিয়ে গর্ববোধ করতে শিখবে। তাদের প্রাণে জাগিয়ে তুলবে স্বদেশ প্রেমের দীপ্ত মশাল। তিনি নিজেই বলেছে ‘এদেশকে মিছে মিছেই সোনার বাংলা বলা হয়নি। এদেশের সোনালী ইতিহাস জানার পর থেকে আমি বুক ফুলিয়ে চলি। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা, জেদ্দা, কুয়েত, ওমান কিংবা জাপান, সিঙ্গাপুর গিয়েও আমার মাথা লজ্জায় নীচ হয়নি। বরং গৌরবের সাথে এসব নৌকা, কাগজ, নীল, মসলিন, রেশম, পাট, চিনি ও লাক্ষার কথা বলে তাদের চমকে দিয়েছি’

সত্যিই চমকে যাওয়ারই কথা। এখনকার শিশু-কিশোররা যদি শোনে একসময় আমাদের দেশে এক টাকায় আটমন চাল পাওয়া যেতো, তাহলে কি তারা রূপকথার গল্প মনে করে চমকে যাবেনা! কী ছিলোনা আমাদের দেশে। ছিলোনা শুধু অভাব অনটন। আমরা ধনী ছিলাম বলেই তো দেশ বিদেশ থেকে বণিকরা এসেছে এদেশে। এদেশের বন্দরে ভিড়িয়েছে নৌকা, জাহাজ। আবার লুটেরারাও এসেছে লুট করতে। ধনীর বাড়িতেই তো ডাকাত আসার সম্ভাবণা থাকে। খনিজ তেল উৎপাদনের আগে সেসময় মধ্যাপ্রাচ্যও এতো ধনী ছিলোনা। এখন যেমন এদেশের মানুষ জীবিকার সন্ধানে বিদেশ পাড়ি জমায়। তখন বিদেশ থেকে লোকজন আমাদের দেশে আসতো জীবিকার সন্ধানে। বিভিন্ন সময় দশ্যু-ডাকাতেরাও এসে হানা দিয়েছে। বেণিয়া ইংরেজ জলদশ্যু, পর্তুগীজ, ডাচ, বর্মী লুটেরারা এদেশে এসে লুটতরাজ করতো। বিভিন্ন সময়ে এদেশের শাষকরা জনগণকে সাথে নিয়ে এসব দশ্যুদেরকে শাস্তিও দিতো।

লেখক তার বইয়ে বর্ননা করেছেন আমাদের তাঁত শিল্প, রেশম শিল্প, কাগজ শিল্প, চিনি শিল্পের ইতিহাস। আমাদের দেশের মসলিন কাপড় ছিলো বিশ্ববিখ্যাত। শিশু কিশোর রা শুনে আশ্চর্য হবে একসময় বিরাট বিরাট জাহাজ তৈরী হতো আমদের দেশে। আর কত ধরণের নৌকা যে তৈরী হতো তার ইয়ত্তা নাই। জাহাজ এবং নৌকা বোঝাই করে মালামাল যেতো ইরান, তুরান, চীন, মালাবার। আবার সেসব দেশ থেকে নানা রকম জিনিষ নৌকা বোঝাইকরে ফিরে আসতো। বৃটিশ তথা ইংরেজ ডাকাতরা আমাদের দেশ দখল করে নিয়েছিলো এবং দুইশত বছর শোষণ করেছিলো। তারা আমাদের মসলিন শিল্প ধ্বংশ করে দেয়, তাতিদের হাতের আঙুল কেটে দেয় যাতে তারা মসলিন কাপড় না বানাতে পারে। কেননা মসলিন কাপড় থাকে তাদের কলে তৈরী কাপড় বিশ্ববাজারে বিক্রয় হবেনা।

পাটকে সোনালী আঁশ বলা হতো। আমাদের পাট শিল্পের ইতিহাসও আজকের শিশু কিশোরদের কাছে গল্পের মতো শোনাবে। আর নীল চাষের ইতিহাস নির্মম জুলুমের ইতিহাস। এই জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এদেশের মানুষ। এসব নানা কাহিনী গল্পের মত করে আছে বইটিতে। পলিপ্লাবিত, শস্য শ্যমলা, ছবির মতো সবুজ সুন্দর সমৃদ্ধ এক দেশের ছবি পাঅয়া যায় এই বইতিতে। ১৫৬ পৃষ্টার এই বইটির পাতায় পাতায় রয়েছে ছবি বইটির প্রচ্ছদ আকর্ষণীয়।

বইটির প্রকাশক : গিয়াসউদ্দিন খসরু। ঝিঙ্গেফুল, ৩৪ নর্থব্রুক হল রোড,বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : আজিজুর রহমান, গ্রন্থস্বত্ব : লেখক, প্রকাশকাল : বইমেলা-২০০৭, মূল্য : ২৯০ টাকা।

বইটি শিশু কিশোরদের প্রিয় হয়ে ওঠবে আশা করি।

[রিভিউটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত কিশোর নিউজলেটার পত্রিকায়]