একথা সত্য যে, প্রত্যেক মৌলিক কবির বিশিষ্টতার বা স্বাতন্ত্রিকতার পেছনে কিছু বিষয় কাজ করে। সেইসব বিষয় বা কারণ কবিকে অন্যান্য কবি থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করে রাখে। এ সত্য বর্তমান বাংলা ভাষার প্রধান কবি এবং বাংলাদেশের সত্যিকার প্রতিনিধিত্বশীল কবি আল মাহমুদের ক্ষত্রে বেশি করে সত্য। অনন্য সাধারণ কবি হবার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাঁর আঞ্চলিক বা লোকজ শব্দরাজির ব্যবহার। এই ব্যবহারে তিনি নকশি কাঁথার শিল্পীর মত এতটাই দক্ষতা ও যথার্থতার পরিচয় দিয়েছেন যে, কোনো কোনো কবিতায় সেইসব ভীষণ চেনা অথচ অব্যবহৃত শব্দগুলো নাক্ষত্রিক উজ্জ্বলতা নিয়ে দীপ্তি ছড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর ‘সোনালি কাবিন’ কবিতাগুচ্ছ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রসঙ্গত একথা বলা প্রয়োজন: লোকজ শব্দের ব্যবহার আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসে যা কবিতাকে করেছে আরো বেশি জনজীবন ও মৃত্তিকাসংলগ্ন । কারণ এই শব্দগুলো কাঁচা আনাজের মতো সজীবতা নিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বত্র হয় উচ্চারিত। অনেকদিন এগুলো ছিলো আধুনিক কবিতায় অনাদরের পাত্র। যদিও লোকসাহিত্যের বিশাল জগতে এগুলোর স্বচ্ছন্দ ব্যবহার বহুকাল ধরেই প্রচলিত। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় চোখ মেললেই এর সৌন্দর্য ও দীপ্তি পাঠককে মুগ্ধ না করে পারে না। কারণ নিজ ব্যবহৃত শব্দের কাব্যিক রূপ দেখে সে আনন্দিত না হয়ে কি থাকতে পারে?
জীবনানন্দ দাশ ও জসীম উদ্দীনই সম্ভবত প্রথম সচেতনভাবে বাংলা কবিতায় লোকজ শব্দের ব্যবহার করেন এবং সার্থকভাবেই করেন। যার ফলে রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশোত্তর কবিদের বহু ব্যবহৃত ও ক্ষয়িত বাংলা শব্দভান্ডারের বাইরে একটি বিশাল ব্যাপক শব্দদিগন্ত খুলে যায়। ফলে বাংলা কবিতার শরীরে জাগে নতুন পুলক। আধুনিক বাংলা কবিতায় সেই ধারায় আহসান হাবীবের নাম উল্লেখযোগ্য। তারই এক সফল উত্তরাধিকার বহন করছেন আল মাহমুদ। তিনি নিজেই কয়েকটি প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে এ রকম মন্তব্য প্রকাশ করেন।
আল মাহমুদের আঙ্গিক চেতনায় প্রথম থেকেই আঞ্চলিক শব্দের সামঞ্জস্যপূর্ণ ও চমৎকার প্রয়োগ লক্ষণীয়। ‘লোক লোকান্তর’-এ এর শুরু; ‘কালের কলস’-এ বিকাশ এবং ‘সোনালি কাবিন’-এ পূর্ণতা; অতঃপর আজাবধি সতত বহমান। আমার ব্যক্তিগত ধারণা: আল মাহমুদের এই দেশীয় শব্দের বিচিত্র কারুকাজের পেছনে রয়েছে তাঁর স্বদেশের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা; এই জনপদের মানুষের প্রতি আন্তরিক মমতা এবং তাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনাচারের প্রতি বিশ্বাস। এই বিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয় ও চালচিত্রেরই অসামান্য কবিতাগুচ্ছ ‘সোনালি কাবিন’।
‘সোনালি কাবিন’ নামটির মধ্যেই রয়েছে চমক। আধুনিক বাংলা কবিতায় সম্ভবত ‘কাবিন’ শব্দটি আল মাহমুদই প্রথম ব্যবহার করেন। এই শব্দের ভেতর রয়েছে নারী-পুরুষের একাত্ম হবার অঙ্গীকার। বহু বছর ধরে মৌখিকভাবে ও লিখিত আকারে ব্যবহৃত এ শব্দটি আধুনিক কবিতায় ব্যবহার করে তিনি যে তাৎপর্যের পরিচয় দিয়েছে তা সত্যিই বিরল।
এখন দেখা যাক এই কবিতাবলীর শরীরে লোকজ শব্দাবলী কতটা পুষ্টি যুগিয়েছে, কতটা প্রাসাঙ্গিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।
ক. সোনার দিনার নেই, দেন্মোহার চেয়ো না হরিণী
যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি,

খ. হাত বেয়ে উঠে এসো হে পানোখী, পাটিতে আমার
……………………………………………….
দরবিগলিত হয়ে ছলকে যায় রাত্রির মরণ,

গ. কোন সামন্তের নামে কোন দিন রচিনি শোলক
……………………………………….
বিবেক বিক্রয় করে বানাতেন বাক্যের খোয়াড়;

ঘ. হারিয়ে কানের সোনা এ বিপাকে কাঁদো কি কাতরা?
……………………………………….
সে কানেট পরে আছে হয় তো বা চোরের ছিলান!

ঙ.তারো বেশী ঢেলে দেবো আন্তরিক রতির দরদ,
সুকন্ঠি কবুল করো, এ অধমই তোমার মরদ।

চ. বাতাসে ভেঙেছে খোঁপা, মুখ তোলো, হে দেখন হাসি
……………………………………..
গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।

ছ. বৃষ্টির দোহাই বিবি তিলবর্ণ ধানের দোহাই
দোহাই মাছ-মাংস দুগ্ধবতী হালাল পশুর,
……………………………………..
হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোন কবি করে না কসুর
কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক …
অতএব দেখা যাচ্ছে এই কবিতাগুচ্ছতে লোকজ শব্দগুচ্ছ- দিনার, দেনমোহর, কাবিন,পানোখী, ছলকে, শোলক, খোয়াড়, কাতরা, কানেট, ছিনাল, দরদ, মরদ, দেখনহাসি কবুল, বিবি, হালাল, কসুর, খেলাপ, জবান, নাপাক; ব্যবহৃত হয়েছে কবিতার অন্তরাত্মার সাথে- ছন্দ-মিলের সাথে তা একাকার হয়ে গেছে। কোনো ধরনের অস্বস্তি বা অসুবিধে হয় না এ শব্দরাজি পাঠে। কারণ শব্দগুলো আরোপিত নয়, স্বতঃস্ফূর্ত। বরং দেশজতার স্বাদ পাওয়া যায় এতে। মাটি-জল-হাওয়া-কাদা মাখা এইসব শব্দের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কের মতো আবহমান বাঙালি জীবনের প্রতিদিনের যোগাযোগ।
সেজন্যে এইসব শব্দের বিকল্প ব্যবহারে অর্থাৎ বহু ব্যবহৃত শব্দের প্রয়োগ করার চিন্তা করলেই কবিতার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। যেমন ধরা যাক, কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক- এই লাইনটির ‘খেলাপ’, ‘জবান’, ‘নাপাক’ শব্দ তিনটিতে যদি বাংলা কাব্যের প্রচলিত শব্দ বসাই তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে, আর কি রকম অর্থ বোঝাবে, সুর ঝংকৃত হবে তা সহজেই অনুমান করা সম্ভব। অর্থাৎ কাব্যের বিষয়বস্তু ও প্রকাশ-প্রকরণ অনুযায়ী যথাযথ শব্দ ব্যবহার আল মাহমুদের কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এক কথায়, নিখুঁত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ লোকজ শব্দ ব্যবহারে আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় সফল ব্যক্তিত্ব। লোকজ শব্দ তার কবিতার ভাষাভঙ্গির অপরিহার্য অংশ, যা তাঁর কবিতার সাথে একাকার হয়ে গেছে। সে জন্যে এই শব্দগুলো কবিতার জন্যেও অবধারিত। এর ব্যতিক্রমে সম্পূর্ণ কবিতার মৃত্যু সুনিশ্চিত।
জীবনানন্দ ও জসীম উদ্দীনের মাধ্যমে প্রাণময় আঞ্চলিক শব্দের যে ব্যবহার বাংলা কবিতায় বৈচিত্র্য ও নতুন জীবন এনে দিয়েছে, আল মাহমুদে এসে তার নতুন দিগন্ত খুলে গিয়েছে অনায়াসে। অন্য এক আকাশের সন্ধান পেয়েছি আমরা। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো- আমাদের হাতের কাছেই এই শব্দরাজির ভাণ্ডার অর্থাৎ ঘড়া ভর্তি মোহর লুকিয়ে ছিলো, আমাদের সীমিত দৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টির জন্যে আমরা তা আবিষ্কার করতে পারিনি।
সৃজনশীল কাব্যপ্রতিভার সাহায্যে গ্রাম-বাংলায় যুগ যুগ ধরে লালিত যে লোকসংস্কৃতি বিরাজ করছে, যেখান থেকেই পরম বিস্তশ্বতার মাধ্যমে একান্ত নিজের করে সবার জন্যে আল মাহমুদ এই লোকজ শব্দের নিখুঁত প্রয়োগ করেন। এই অসাধারণ কাজটি সাবলীলভাবে সম্পন্ন করে তিনি বাংলা কবিতার সীমাকে যেভাবে আরো প্রসারিত ও বিস্তৃত করেন, তেমনি নিজের মৌলিকত্ব ও শক্তির সুস্পষ্ট ব্যক্তিত্বসবল চিহ্ন রাখেন। এই পথ এখন বাংলা কবিতায় অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।