রহস্য অনুসন্ধানী আনাস খুব বন্ধু বৎসল। ছোট বেলায় অনেক সময় একসাথে কাটাতাম। বয়সে আমার চেয়ে বছর তিনেক কম হবে। ক্লাস সিক্স-সেভেনে যখন পড়ে, প্রচন্ড ঘুম কাতর ছিল। তাকে জাগাতে হলে অনেক্ষণ ধরে জ্বালাতন করতে হয়। গল্পের ভক্ত ছিল আনাস। আর এটাই ঘুম তাড়াবার হাতিয়ার। অনেক গল্পের চরিত্রও তৈরী হয়েছে তাকে ঘিরে।
খুব দীর্ঘ সময় আগে, আনাসের বাবা-মা ছোট ছেলে-মেয়ে ছিলেন। তার দাদু এবং দাদি অনেক অল্প বয়সে বিয়ে করেছেন। প্রথম বছরেই আনাসের বাবার জন্ম। আদর করে নাম রাখা হয় বরকত। প্রতিবেশী এক লন্ডনী পরিবার ছিল। তাদের একমাত্র কন্যা ফারিহা। তখনকার সময়ে বাবা লন্ডন এলেও পরিবারের সবাই দেশেই থাকতেন। বরকত ও ফারিহা প্রায় সমবয়সী। একই স্কুলে পড়ালেখা করেছেন।
আনাসের গ্রামের বাড়ি অনেক বড়। অসংখ্য গাছপালায় ভরপুর। বর্ষা এলেই প্রকৃতি শ্যামল সবুজে সাজে। ফল-ফুলের গাছ ছাড়াও নানা ধরনের সবজি। এই বাগান থেকে শাক-সবজি তুলতে গিয়ে বরকত ও ফারিহা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সবজি বাগানে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। আবার ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতি যাতে না হয়, সেভাবে পানি নিষ্কাশন করতে হয়। মাটি যেন ঝুরঝুরে থাকে।
দৃষ্টিনন্দন শহুরে আদলের গ্রামীন বাড়িতে আনাসের বাপ-চাচা মিলে মিশে বসবাস করেন। সবার জন্য একটি আলাদা দ্বিতল বাংলো। বিশেষ অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। শয়ন কক্ষে পৃথক বিছানার উপর সাদা দেয়ালে বাঁধাই করা দুটি ছবি লটকানো। সিলেটের সুরমা ব্রিজ ও লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ। সুন্দর ভাবে সাজানো বিছানা, বাড়ির কেউ ব্যবহার করেনা। মেহমান-মুসাফির এলে থাকতে দেয়া হয়।
বাংলোর সামনের দিকে দুটি উইন্ডো। ঠিক মাঝখানে একটি দরজা। বেশ প্রশস্ত এবং যথেষ্ট উচ্চ। ঘরের ভেতরে সাজানো সোফা, ডাইনিং রুম ও একটি সিঁড়ি। উপরে মেহমান কক্ষ। নিচে বিশাল ঘরের মাঝখানে দীর্ঘ টেবিল। একপাশে চারটি চেয়ার, অপর দিকে আরো চারটি। অন্য দু‘দিকে দুটি। দশজনকে এক সাথে খাবার পরিবেশন করা যায়। দশটি প্লেট, দশটি কাঁটা চামচ, দশটি ছুরি সাজানো থাকে। অনেকটা বিলেতের রেস্তেুারাঁর মত।
প্রাতঃরাশ শেষে ব্যবহৃত বাসনগুলি নিয়ে যায় কাজের বুয়া। পূর্ব দিকের সূর্য তখন সামান্য উত্তাপ ছড়াচ্ছে। জানালার দিকের রোদেলা আয়েশে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মেহমান চা খাচ্ছেন, সাথে সিগারেট।
চোখে একটা ঝাপসা ভাব হল। গা ছমছম করে, কেমন ভয় ভয় অনুভূত হয়। এক সময় এটিকে ভুতের বাড়ি বলা হত। এখানে শুধু গাছপালা ছিল। থাকার কোন ঘর ছিলনা। অনেক কাল পরে আবাদ হয়েছে। ভৌতিক কান্ড নিয়ে এখনও নানা কল্প-কাহিনী বলবত আছে।
হঠাৎ একটি মাকড়সা ছুটে আসে বিছানার দিকে। মেহমান এটাকে তাড়াতে গিয়ে নিজের অলক্ষে সিগারেটের আগুন বালিশে লেগে যায়। মাকড়সা সিড়ির দিকে দৌড়ালে মেহমানও ছুটে যান নিচের দিকে। ততক্ষণে দ্রুত জ্বলছে বিছানাপত্র।
রাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে হারিকেন দেয়া হয়েছিল। কেরোসিন তেলে আগুনের গতি আরো বেড়েছে। দাউ দাউ করে জলতে থাকে সব কিছু। সে এক ভীতিকর দৃশ্য। বাড়ির সকলে মিলে আগুন নেভাতে গিয়ে ভয়াবহ কান্ড ঘটিয়েছেন। মশা মারতে গিয়ে কামান দাগার মতই অবস্থা।
আরেকবার তাদের লন্ডনের বাড়িতে আগুন লেগেছিল। ছোট কাঠবিড়ালি জানালা দিয়ে ঘরে হানা দেয়। এপাশ ওপাশ করতে গিয়ে গ্যাসের চুলা থেকে কিচেন টাওয়ালে আগুন ধরে যায়। দ্রুত সিলিন্ডারে ছড়িয়ে পড়ে। আনাসের বাবা তখন বাথরুমে শাওয়ার করছিলেন। অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছেন। এসব নিয়ে এক ধরণের ভূতুড়ে ভাবনা আনাসকে তাড়া করে সবসময়।
অনুসন্ধানী মানুষ আনাস। জগতের রহস্যময় কাহিনী তার খুব পছন্দ। ভৌতিক বিষয় নিয়ে এক ধরণের আগ্রহ ও ভীতি রয়েছে। নীল আকাশের গল্পের চেয়ে মাটির নীচের বিষয়ে বেশী পুলকিত হয়। স্বর্ণ-রৌপ্য, কয়লা-পাথর সবই মাটির নিচে পাওয়া যায়। খনিজ সম্পদের প্রতি একটা আলাদা ভাল লাগার ব্যাপার আছে!
আনাস মনে করে বাংলাদেশ এক সময় মধ্যপ্রাচ্যের মত হবে। আরবের মাটির সাথে সিলেটের মাটির মিল রয়েছে। হয়রত শাহ জালালের মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবীর তাকে এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলেন, স্বাদে বর্ণে গন্ধে এই মাটির মতো মাটি যেখানে পাবে, সেখানে বসতি স্থাপন করবে। শাহ জালাল সিলেটে আরবের মাটির মিল পেয়েছেন। এটি খুবই তাৎপর্যবহ। এই অঞ্চলে তেল ও গ্যাসের আবিষ্কারে তা প্রমাণিত হয়েছে।
আনাসের মতে, খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পৃথিবীর সম্ভাবনাময় একটি দেশ। খনিজ পদার্থের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি করা সম্ভব। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা যাবে। বাংলাদেশের প্রথম খনিজ তেলক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয় সিলেটের হরিপুরে। দেশে এ পর্যন্ত ২২টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। পরিমাপকৃত গ্যাস মজুতের পরিমাণ প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বৃহত্তর সিলেটে পেট্টল ও গ্যাস ছাড়াও রয়েছে উন্নতমানের বালু, চুনাপাথর, নুড়িপাথর ও কয়লা। সারা দেশে আনুমানিক ১০ হাজার কোটি মেট্রিক টন চুনাপাথর থাকার সম্ভাবনা আছে। বৃহত্তর সিলেটের টেকেরঘাট এলাকায় ইয়োসিন যুগীয় চুনাপাথর পাওয়া গেছে। কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে হাজার হাজার কোটি টাকার খনিজ পদার্থ রয়েছে। খনিজের প্রাক্কলিত মজুদের পরিমাণ ৪৪ লাখ টন। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মূল্যবান খনিজ, বালি জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট ও রুটাইল উত্তোলন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে অতি মূল্যবান খনিজ সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এরমধ্যে রয়েছে ইউরোনিয়াম ও থোরিয়াম। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সুবাদে ১৭ লাখ জনসংখ্যার দেশ কাতার মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ। আমরা নিজেদের শক্তি, সম্পদ, ঐতিহ্য ও গৌরবের কথা নিজেরাই খবর রাখিনা।
আনাস একবার হযরত শাহ জালালকে স্বপ্নে দেখেছে। সেদিন একজন মহৎ মানুষ তাদের মেহমান ছিলেন। তিনি এই স্বপ্নের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তখন থেকে আনাস নিজেকে আরবীয় শেখদের মতই চিন্তা করে। যত বিলম্বেই হোক পরিস্থিতি বদলাবে বলেই তার প্রত্যাশা।
আরেকবার বন্ধুর সাথে বাংলোতে রাত কাটিয়ে ছিল। মাঝরাতে লম্বা ধূসর দাড়িওয়ালা সুদর্শন লোক চামড়ার এপ্রোন পরে তার কাছে এসেছিলেন। বন্ধুর নড়াচড়ায় ঘুম ভেঙ্গে গেলে আনাস আর কিছুই দেখতে পায়নি।
সেদিন ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ সে শুনতে পেয়েছে। নক, নক, নক! আঙ্গুলের শব্দ দরজার দিক থেকে আসছিল। দুর্দান্ত আওয়াজ! তারপর একটি উজ্জ্বল আলোতে চোখ ঝলকিয়ে উঠে। লোকটির হাতে অলৌকিক আলো জলছে। পেছনে লিকলিকে গড়নের আরো লম্বা দুজন যেন তাকে অনুসরণ করছে। এদের হাতে ছিল স্বর্ণ, রৌপ্য, হীরা, রুবি সহ অনেক ধরণের মূল্যবান পাথর!
বাংলোতে এখন ঘুমালেও সুদর্শন সেই লোকটিকে আর দেখতে পায়না আনাস। তবে একবার কে যেন ভ্রূকুচি করে বলেছে, তুমি নিতান্তই হতভাগ্য, সঙ্গদোষে বঞ্চিত হয়েছো। সৌভাগ্যের প্রসূতি তোমার জন্য স্বর্ণ সুড়ঙ্গের সন্ধান নিয়ে এসেছিল। আনাস আজো ভাবে, সত্যিই কী তাই ছিল!