পোড়া মরিচ আর কাঁচা পেয়াজ দিয়ে দু’মুঠো পান্তা ভাত সাহরি হিসেবে খেয়ে খুব ভোরেই শহরে চলে আসেন মফিজ মিয়া।গতকাল ফেনী শহরের বড় মসজিদের উত্তর পাশে খাজা আহমদ সড়কের গলির মুখে একটি মুদি দোকানের সামনে চার বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়েছেন মৌসুমী ফল বিক্রি করার জন্য।দোকানের মালিককে দৈনিক দু’শ টাকা ভাড়ার চুক্তিতে এই জায়গা নিতে হয়েছে।অগ্রীম জামানত হিসেবে দিতে হয়েছে বিশ হাজার টাকা। মফিজ মিয়া ভাবে, গ্রামে কত জায়গা পরিত্যক্ত পড়ে আছে অথচ শহরে এই সামান্য খালি জায়গাও দৈনিক দু’শ টাকা হিসেবে মাসে ছয় হাজার টাকা ভাড়া গুনে যেতে হবে।ঘরদোর কিছুই নেই, খোলা একটুকু জায়গার ভাড়াও এত টাকা! শহর এখনো ফাঁকা।লোকজন তেমন নেই।যতসামান্য লোকজন ডাক্তারি নির্দেশনায় বাঁচা ও সুস্থ্য থাকার তাগিদে হাঁটছেন। মফিজ মিয়া নানা ভাবনার মাঝে নিজের ফলের দোকানে ফলের পসরা সাজাচ্ছেন। চরম আর্থিক বেকায়দায় পড়ে এই ব্যবসা। ঘরে একমাত্র পাঁচ বছরের ছেলে মাসুম জন্ম থেকেই অসুস্থ। তার হৃদযন্ত্রে জন্মগত তিনিটে ব্লক।অপারেশন করতেই হবে।তাও আবার ভারতের ব্যাঙালোতে।দেশে এই চিকিৎসা নেই। মফিজ মিয়ার চোখে মুখে কেবল ধোঁয়াই দেখছেন। ভাবছেন এই ফলের মৌসুমে ফল ব্যবসা করে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারলে ছেলেটাকে ভারতের ব্যাঙালোতে নিয়ে যাবেন।তাই একমাত্র আবাদি জমি ও বউ’র গয়না বন্ধক ও আত্মীয় স্বজন থেকে ধার দেনা করে হাজার পঞ্চাশেক টাকা নিয়ে শহরে আসেন।দোকানের জামানত বিশ হাজার টাকা দিয়ে বাদ বাকি ত্রিশ হাজার টাকা আড়তে জমা দিয়ে এক নিকটাত্মীয়ের সুপারিশে আড়ত থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার ফল আনেন মফিজ মিয়া।মফিজ আনমনে ফলের পসরা সাজাচ্ছেন এমন সময় একটা দেড়শ সিসি মটর সাইকেলে দুজন আরোহী এসে দাঁড়ায় মফিজে মিয়ার ফল দোকানের সামনে।
-ওই ব্যাটা এই শহরে নতুন নাকি? বললো মোটর সাইকেল ড্রাইভিং করা লোকটি।
-জ্বি ভাই, আজই আসছি।
-এই ভাই বলছিস কেন? আমি কী তোর ভাই নাকি? এ শহরের সব ব্যবসায়ী আমাদের বস বলে ডাকে।আর কোন দিন যেন বলে দিতে না হয় খুব ঝাঁঝালো কন্ঠে কথাগুলো বলে চলল আগের লোকটি।
-জ্বি বস, মনে থাকবে।
-এবার আসল কথায় আয়।ব্যবসা করবি ভালো কথা কিন্তু আমাদের দৈনিক দুশ টাকা চাঁদা দিতে হবে। সব ফল দোকানদারের উপর এটা ধার্য। ওকে চিনে রাখ। ওর নাম ছোট মুন্না। ও প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আসবে।বেচা কেনা হোক আর না হোক আমাদের চাঁদা দিতে কোন রকম ভুল করবে না।এই কাজে খানিক গড়িমসি হলে কিন্তু খবর আছে বলে দিলাম। মফিজ মিয়া কোন কথা না বলে হা করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।কি কোন কথা বলছিসনা যে?
-ভাই, আপনাদের দৈনিক দুশ টাকা দিলে আর দুশ টাকা জায়গা ভাড়া দিলে আমরা কিভাবে চলবো আর কত টাকা ব্যবসা করবো?
-আবার ভাই বলছিস?
-সরি, বস।
-গেলাম, ও সন্ধ্যায় আসবে।দ্বিতীয়বার যেন কোন কথা বলতে নাহয় বলে মোটর সাইকেল সেলফ স্টার্ট দিয়ে তারা সামনের দিকে চলে যায়।মফিজ মিয়া ফল সাজাচ্ছেন আর অঙ্ক মিলাচ্ছেন।দৈনিক কত টাকার ফল বিক্রি করলে সব খাদকের চাহিদা মিটাতে পারবে?

দুই.
মফিজের এক শুভাকাংখি বলছেন ব্যবসায় লাভ কম করলে বেচা বিক্রি বেশি হয়।আর বেচা বিক্রি বেশি মানেই লাভও বেশি। মফিজ মিয়া সকাল থেকে সব আইটেমে অন্যদের চেয়ে আট দশ টাকা কমে বিক্রি করছে। ফলে তার দোকান থেকে কোন খরিদদার ফেরত যাচ্ছে না।কিন্তু এই অবস্থা বেশিক্ষণ চলতে পারেনি।ক্ষুদ্র ফল ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা এসে বাঁধ সাঁধে যে নিজের মর্জি মাফিক বেচা কেনা করতে পারবে না। সিন্ডিকেটের দাম অনুযায়ী বেচতে হবে।প্রতিদিন সকালে সমিতি বা সিন্ডিকেট দাম ঠিক করে দেবে আর সবাইকে ঐ দামেই পণ্য বিক্রি করতে হবে।আর এখানে ব্যবসা করতে হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য হতে হবে।সমিতিতে দৈনিক পঞ্চাশ টাকা হারে চাঁদাও দিতে হবে।আচ্ছা ঠিক আছে বলে মফিজ মিয়া তাদের কথায় সায় দেয়।এর বিকল্প কিছুতো আর করার নেই।আগে শুনতো শহরে ব্যবসা করতে অনেক টাকা চাঁদা দিতে হয় আজ তা নিজ চোখে দেখার সুযোগ হল মফিজ মিয়ার।সিন্ডিকেট দামে বিক্রি করায় খরিদদার কিছুটা কমছে এই বেলায়।অনেক খরিদদার দামাদামি করছে কিন্তু তার হাত পায়েতো সিন্ডিকেটের শেকল বাঁধা।বিকেলে আসলো আরেক গ্রুপ।তারা মাসিক একশ টাকার চাঁদার একটা নোটিশ দিয়ে গেল।এরা শহর পরিচ্ছন্নতার নাকি লিজ নিয়েছে।দিন শেষে মফিজ মিয়া অঙ্ক মিলিয়ে দেখলেন দোকান খরচ চাঁদা পরিশোধ সব মিলে বিক্রি আর দায়দেনা সমানে সমান। লাভের খাতা শূন্য।বিক্রি বাড়লে হয়তো লাভের মুখ দেখা মিলবে এই আশায় প্রহর গুনছে মফিজ মিয়া।

তিন.
ঈদের বাজারে শহরে মানুষের উপচে পড়া ভীড়। বেচা বিক্রিও বাড়ছে কয়েকগুন। মফিজ মিয়া সকালে আসতে দূর সম্পর্কীয় এক ভাতিজাকে নিয়ে আসেন। সে বেচা বিক্রিতে কিছুটা সহযোগিতা করবে। ইফাতারির পর ভাতিজাকে হোটেলে পাঠিয়ে খাইয়ে আনলেও নিজে খাওয়ার সুযোগ পায়নি এখনো।খরিদদার এখন কিছুটা কম।তাই ভাতিজাকে বসিয়ে পাশের হোটেলে খেতে যায় মফিজ মিয়া।হোটেলে সবাই গরু খাসি মুরগীর গোস্ত ও রকমারী মাছ দিয়ে যার যার রুচি ও চাহিদা মাফিক খাচ্ছে। মফিজের মিয়ারও মন চাচ্ছে গরুর গোস্ত খেতে কিন্তু অসহায় অসুস্থ একমাত্র ছেলের চিকিৎসার কথা মনে পড়তেই নিমিষেই সেই ইচ্ছে ফানসে হয়ে যায়। অবশেষে একটা ডিম ভাজি আর ফ্রি পাতলা ডাল দিয়ে কয়টা ভাত খেয়ে তারাতারি আসতে গিয়ে দেখে দোকানের সব ফল ফরমালিনের অযুহাতে ভ্রাম্যমান আদলতের হাতে বুলডোজারের নিচে পিষ্ট।মফিজ মিয়া ঋণ করা আর আড়ত থেকে বাকি আনা ফলের পসরার করুণ পরিণতি আর অসুস্থ একমাত্র ছেলের ছবি কল্পনায় এনে বুলডোজারের নির্মম পিষ্টের দিকে ফ্যালফ্যাল চাহনিতে তাকিয়ে আছেন।