জীবন মানে’ই ছোটো-বড়ো স্বপ্নে’র বুনন৷ বড়ো স্বপ্ন-গুলো অ-ধরা’ই থাকে, বেশী’র ভাগ- মানুষে’র ক্ষেত্রে ৷ কখনো কখনো- ছোটো ছোটো স্বপ্ন-গুলোও কারও কারও জীবনে- মরিচিকা হয়ে, ধরা দেয়৷ তবু- মাুনষ বেঁচে থাকে, অ-পূরণে’র ব্যথা-কলি নিয়ে ৷ তখন- স্বপ্ন-গুলো স্মৃতি’র আসর হয়ে, বাসর নির্মাণ করে, বসে যায়- মনে’র এক-কোণে৷ অ-পূরণীয় তকমা হয়ে, হেঁটে যায়- জীবনে’র সাথে, চলমান সারথী হয়ে৷ কখনো কখনো- জীবন্ত হয়ে, এসে- ঠোকর মেরে যায় ৷ আবার- কখনো কখনো- সুপ্ত স্মৃতি-রেখা’র মতো- পরম স্বস্তি’র সাক্ষী হয়ে- জুড়ে রয়৷

অন্য আট দশ-টা কিশোরে’র মতো- সজীবে’র মনেও ছিলো- নানান ছোটো ছোটো স্বপ্ন-বোনা৷ তার মধ্যে এক-টি হলো- সাইকেল৷ তার নিজে’র এক-টি সাইকেল ৷ সপ্নে’র অপার দিয়ে, বোনা- সাইকেল৷ কিন্তু- তার এই ক্ষুদ্র ও স্বাভাবিক বায়না-টা কখনো পূরণ হয়-নি৷ কেউ পূরণ করে-নি, কোনো-দিন৷ না তার বাবা, না তার আত্মীয়-স্বজন ৷ দারিদ্র-পীড়িত স্বপ্নে’র রাত-গুলো গুমরে কেঁদে কেঁদে মরে যায়- ভোর হতে হতে৷ সজীবে’র ঐ অ-বুঝ কিশোর মন কী- তখন বুঝতো- সপ্ন লালন-ব্যতীত, দু-মুঠো খেয়ে পড়ে, বেঁচে থাকা’র নামও জীবন হয়৷

সজীব’ ছাড়াও ওদের পরিবারে মা, বাবা-সহ আরো- পাঁচ সদস্যে’র উপস্থিতি ছিলো৷ ওদের মধ্যে চার-বোন, এক-ভাই৷ সবার ছোটো বোনে’র বড়ো ভাই-টা মাত্র পাঁচ বছর বয়সে, অকাল-প্রয়াণে’র দায়ে- বিদ্যুত্-স্পৃষ্ট হয়ে, পরপারে চলে যাওয়ায়- ভাই হিসেবে, এক-মাত্র হয়ে যায়৷ কিন্তু- হলে কী- হবে? সংসার’- এর কিছু কিছু ক্ষেত্রে, সজীব’- এর প্রতি অন্যে’র আদিখ্যেতা বেড়ে গেলেও ঐ পর্যায়ে গিয়ে পৌছয়-নি, যে- তার স্বপ্ন পূরণে’র হালাল হবে৷

সজীব’- এর বাবা এক-জন সামান্য সরকারী কর্মচারী ছিলেন৷ যে স্তরে থেকে, জীবন-কে শুধু- দু-বেলা পেটে-ভাতে’র যোগান দেয়া যেতো৷ কোনো, কারো স্বপ্ন পূরণে’র কাবিলিয়াত ভ্রমর সেখানে, উপলব্ধ ছিলো-না৷ মৌ-তো আর- এমনি এমনি হয়-না৷ এক-টা দক্ষ টিম লাগে৷ সজীব’- এর স্বপ্ন বুননে সেই ফোড়ন দেওয়া’র সামর্থ্য- তার বাবা’র ছিলো-না৷ তাই বায়না’র ঘরে জমেছে, বার-বার না’ না’ পারতাম-না’ শব্দে’র গুঞ্জন৷ সেই গুঞ্জন’- এর প্রতিধ্বনি- সজীবে’র চল্লিশ উর্ধ্ব জীবনে, মনোভাবে’র ঘরে, তাক বানায় এখনো৷

এ কথা সতত যে- সজীব’- এর স্বপ্ন পূরণে’র আর্জি-তে বায়না হয়-তো ছিলো৷ কিন্তু- তাড়পানো ছিলো-না৷ মা-বাবা’র অ-সামর্থ্য-কে তার নম্র পেবলতা দিয়ে ঢেকেছে, বোধে’র সাদ্ধি৷ এই ক্ষুরে কখন যে- চোখ ঝাপসা করে, সজীব’- এর স্বপ্ন পলায়ন-পর হয়, সে টের’ই পায়-না৷ অবশ্য- সজীব’ কিশোরী অবস্থা’র তার বোন-দের স্বপ্নে’র কথা জানে-নি, কোনো-দিন!

দুঃখ নয়, মিশেল বৈধব্যতায় জীবন পার হয়ে যায়- তার খবর কেউ রাখে-না৷ পালা-বদলে’র খেলা’ই-তো জীবন৷ সজীবও তার আবাহন৷

শহরে’র যে প্রান্তে, মোবারক সাহেবে’র বাসা৷ সেখানে, হঠাৎ বলা নেই কয়া নেই’- এর মতো- তার পত্নী-বোন’- এর সংসার পাতা’র অবগাহন হয়ে যায়৷ গ্রাম হতে আগমন৷ মানে- সজীব’- এর খালা’র সংসার৷ তার খালু- টি এন্ড টি-তে চাকুরি করতো৷ বলতে এ-রকম’ই বলতো ৷ অবস্থা মোটা-দাগে, মোবারক সাহেব হতে, পনেরো পার্সেন্ট ভালো৷ যে কালে সাইকেলে করে, তিনি অফিস করতেন, সে কালে’র কথা’ই বলা হচ্ছে৷ মানে- সজীব’- এর স্বপ্নে’র ঘরে, তালা-চাবি লাগা’র প্রায়- ঘনাঘন পূর্ব মুহূর্তে’র কথা এ-টা ৷ পরে অবশ্য- তিনি অবস্থা’র উন্নতি’র কবলে পরে, মোটর-সাইকেলে উত্তীর্ণ হয়েছেন৷ সে কথা- ভিন্ন৷

যে-দিন মুকতার সাহেব- কোনো কারণ-বশতঃ সাইকেল নিয়ে, অফিসে যেতেন-না৷ সে-দিন ছিলো- সজীব’- এর দুরন্ত হবার পালা৷ তা-ছাড়াও সুযোগ মিললে’ই চলতো- হানা৷ ডুবলিকেট চাবি বানিয়ে নিয়েছিলো- সজীব’ সুবিধা’র খাতির৷ বার-বার চাবি চাওয়া’র লজ্জা আর- স্বাধীনতা’র নিরব হাতিয়ার স্ব-রূপ৷

শহর’- এর অলি-গলি চষে ফিরতো- সজীব’ সকাল-সন্ধ্যা’র তোয়াক্কা না করে! ‘না পেয়ে পেয়েছে ধন, বাপে-পুতে কীর্তন’- এর মতো৷ শহরে’র এ-প্রান্ত হতে, ও-প্রান্ত ছুটেছে, সজীব’ নির্বন্ধ৷ না করেছে- দূর্ঘটনা’র ভয়, না করেছে- অপ-ভূমিকতা’র ভয়৷ কেবল- ছুটেছে, ছুটেছে আর- ছুটেছে৷ জেনেছে, পথ পাড়ি দেয়া’র নাম’ই জীবন৷ পুরো-টা’ই স্বপ্ন নয়৷ স্বপ্ন থাকে হৃদয়ে ৷ জীবন থাকে অনুধাবনে৷

এভাবে’ই স্বপ্ন না পূরণে’র ব্যর্থতায় নয় ৷ স্বপ্ন-কে চালিত রাখা’র প্রবণতা-কে অবলম্বণ করে, সজীব’ হাঁটে পৌঢ়-তা’র পথে ৷ কেউ দেখে- আলিঙ্গন, কেউ দেখে- বিচক্ষণ৷৷