আমার বাবা একজন শিক্ষক। তাকে নিয়ে খুব গর্ব হয়। বুকটাও আনন্দে ভরে যায়। ভেতরে ভেতরে মানুষটা সে অনেক ভালো। কিন্তু বাইরে ধরা দিতে চায় না। কারো উপকার করতে পারুক আর নাইবা পারুক ক্ষতি সে করে না। তার উপকারের ধরণটা অন্যরকম। দানের ক্ষেত্রে সে এক ভিন্ন মানুষ। লোক দেখানো মোটেই পছন্দ করে না। মানুষকে সহায়তা করতে গিয়ে যদি তাকে ছোট করা হয় এমন দান করার চেয়ে না করাই উত্তম। নিজেকে প্রকাশ করতে মোটেই পছন্দ করেন না তিনি। আমি তার বড় মেয়ে আয়মান। বাবাকে কিছুটা বুঝতে পারি। অনেক কাছ থেকে তাকে দেখেছি। জেনেছি তার কাজের ধরণ। অনেক ভালোলাগে বাবাকে। পছন্দ হয় তার প্রতিটি কাজ। মন উজার করে বাবাকে বলতে ইচ্ছে হয়, বাবা আমি ধন্য হয়েছি। তুমি আমার বাবা এটাই আমার গৌরব। এজন্য খোদার কাছে কৃতজ্ঞ। সম্পদ দাওনি তাতে কী হয়েছে। সুখে তো রেখেছো।
বাবাকে আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। যে কথা বলে বোঝাতে পারব না। কোথাও থেকে ফিরে এলে মা বলে মিষ্টি কণ্ঠে ডাকেন। এদিকে আয় মা। আমি অধীর আগ্রহে বাবার পানে ছুটে যাই। মনটাও শীতল হয়ে যায়। শুনেছি, বাবার বিয়ের বারো বছরের মাথায় জন্ম হয়েছে আমাদের। আমাদের বলার একটি কারণ আছে। আমরা জমজ দুইবোন। অন্যজন আনজুম। দেখতে বেশ ঘ্যানা-ক্যাতরা। তাই আমি ওকে পাতলু বলে ডাকি। এ নিয়ে বাবা খুব রাগ করেন। তিনি প্রায়ই বলেন, কারো নাম বিকৃত করতে নেই। তার মূল নাম বাদ দিয়ে অন্য নামে ডাকা অনেক বড় অন্যায়। এতে সে কষ্ট পায়। কখনো কখনো এমন ভুলে গুনাহ হয়। নামের অর্থ বদলে যায়। আমি একটু কৌশলী হয়ে পাতলু নামটি বেছে নিয়েছি। এ নামে ওকে ডেকে দেখেছি, ও রাগ করে না। তবে অভিমান যে একদমই হয় না, তা নয়। এই মিষ্টি অভিমানের মধ্যে একটা ভালোবাসা আছে। যে ভালোবাসা আল্লাহ তায়ালা একই মায়ের উদরে থেকে আমাদের মাঝে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। যা কখনো ভোলার না। আর ভুলতেও পারবো না।
বাবার ত্যাগের অনেক গল্প আমি জানি। মানুষ হিসেবেও তাকে চিনি। জানি তার ভিতরের হাহাকার। একদিন বাবা আমাকে কাছে নিয়ে বললেন- দেখ মা,‘জীবনের সময়টা বড়ই আনন্দময়। মর্যাদাপূর্ণ। তবে সবই ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। সে তার সুন্দর জীবনটাকে কোন পথে নিয়ে যাবে। সবই তার বিষয়। কেউ অনেক কিছু পেয়েও সন্তুষ্ট হতে পারে না। আবার কেউ অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যায়। সবাই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারে না। তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়াও অনেক বড় ভাগ্যের বিষয়।’ আমাদের চারপাশের মানুষগুলো কত অসহায়! কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারছি না। আর যারা পারছে তারা ওদের দিকে ফিরেও তাকায় না। নিজেদের নিয়ে মত্ত ওরা। ভাবছে শুধু নিজেদের ভোগ-বিলাসের কথা। ভুলে গেছে মানুষের অধিকার। আপনজনের কষ্টেও হৃদয় ব্যথিত হয় না। আকাশছোঁয়া সম্পদেও ওদের পেট ভরবে না। ক্রমেই বেড়ে যাবে মনের চাহিদা।
বল মা, আমরা কীভাবে পেটপুরে খেয়ে থাকি? যদি আমাদের প্রতিবেশী অনাহারে থাকে। তার চেয়ে আমাদের যা আছে তা দিয়ে ওদের পাশে দাঁড়ানোই মানুষের কাজ। আল্লাহও একদিন আমাদের বিপদে সাহায্য করবেন। আর যদি না-ও করেন, পুণ্য থেকে কখনোই বঞ্চিত করবেন না। সেইদিন আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে একথা বলতে পারবো, আমি ইমানের পরিচয় দিয়েছি। নিজে একা ভালো থাকিনি। সাধ্যানুযায়ী অন্যকে ভালো রাখার চেষ্টা করেছি। আজ তুমি আমায় পুরস্কৃত করো। এটাই ছিল তোমার ওয়াদা। জানি, তুমি তোমার ওয়াদার কোনো বরখেলাপ করো না। তোমার চেয়ে সত্যবাদী আর কেউ নেই। করুণাময় বর সেদিন আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দান করবেন। যা আমরা আজ কল্পনাও করতে পারি না।
প্রত্যেক বাবা-মার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা থাকতে হয়। তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করাই সন্তানের কর্তব্য। ছোটবেলা থেকেই বাবা এই শিক্ষা আমাদের দিয়ে আসছেন। আমরা যখন রাতে বাবার কাছে ঘুমোতে যেতাম, তিনি বায়জিদ বোস্তামি (রহ:) এর মাতৃভক্তির কথা বলতেন। বলতেন নবী মাতা দুধমা হালিমা কথা। আমরা মনোযোগ সহকারে সে কথা শুনতাম। মায়ের দোয়ায় তিনি অনেক বড় দরবেশ হয়েছিলেন সে কথা বাবার মুখে প্রথম শোনা। এসব শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আর ভাবতাম, আমরাও তো ভালোমানুষ হতে পারি। আব্দুল কাদির জিলানি (রহ:) ডাকাতদের সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যাননি। মা মিথ্যে বলতে নিষেধ করেছেন, তাই মায়ের কথা রেখেছেন। ডাকাতরা খুঁজে স্বর্ণমুদ্রা পায়নি। তিনি নিজে বের করে দিয়েছেন। তবুও বলেননি, আমার কাছে কিছু নেই। এই হলো মহানুভবতার ধর্ম ইসলামের শিক্ষা। তাই ভাবছি, আমরা কেন সেই পথ পরিহার করে অন্যায়ের পথে হাঁটছি। শয়তানের অনুসরণ করে জাহান্নামের দিকে ধাবিত হই। আল্লাহ আমাদের সামনে দুটোই রাস্তা খোলা রেখেছেন। তাই মনে মনে ভাবলাম, বড় হয়ে আল্লাহর প্রিয় মানুষ হবো। বোনদেরও ভালোমানুষ হতে শেখাব। কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেবো না।
বাবার মাঝে কখনো সামান্যতম অখুশিও লক্ষ করিনি। আমরা তিনটি বোন। বেশ আদরেই রেখেছেন আমাদের। তবে মাঝেমধ্যে মায়ের একটু কষ্ট হতো। এটা আসলে অসন্তুষ্টি নয়। মনের প্রত্যাশা। মায়ের এ চাওয়া অযৌক্তি নয়। মাঝে মাঝে মা বলতেন, একটি ছেলে হলে মন্দ হতো না। মেয়েদের মানুষ করে একদিন অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে। তখন আমরা সেই আবারও একা হয়ে পড়ব। আমাদের যখন কোথাও থেকে ফিরতে একটু দেরি হয় খুব দুশ্চিন্তা পড়েন মা। মনে ভয় জাগে। আমাদের সমাজটা মেয়েদের অনুকূলে নয়। বরং বৈরীতায় ভরা। যদি বদলে যেতো সমাজ কোনো ভয় থাকতো না মেয়েদের নিয়ে। খুব আক্ষেপ হয় পুরুষশাসিত সমাজ নিয়ে। যেখানে মেয়েদের অবাধ বিচরণ নিরাপদ নয়। যে সমাজে নারীর মর্যাদা নেই, পদে পদে সেখানে তাদের লাঞ্ছিত হতে হয়। থাকে সম্মান হারানোর ভয়। একটা ছেলে মাঝরাতে ঘরে ফিরলেও সে লাঞ্চনার শিকার হয় না। কিন্তু একটা নারী কখনো নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে না। হজরত ওমর (রা.) এর সময়ে মেয়েরা মক্কা থেকে মদিনায় রাতের আঁধারে বিচরণ করেছে, কেউ তাদের বিরক্ত করেনি। বিপদেও পড়েনি। কারণ মানুষগুলো বেড়ে উঠেছিল প্রিয় নবীর আদর্শে। অন্তরে ছিল কোরআনের শিক্ষা। আল্লাহর ভয়। সমাজটা ছিল ইসলামি। নবী নেই, কিন্তু সেই আদর্শ রেখে গেছেন। এখনো কোরআন আছে। আছে তার শিক্ষা। নেই সেই ইমানি শক্তি। শুধু বদলে নিতে হবে আমাদের মনটা। মাকে বললাম- মা, তুমি ভয় কোরো না। আল্লাহ আমাদের সহায়। তোমার মেয়েদের ন¤্রতা, শালীলনতা ও ইমানিশক্তি তাদের সমূহ বিপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। তুমি দোয়া করো মা। ভয় করো না।
আমাদের আশেপাশে অনেক পরিবারেই মেয়েদের একটু ছোট করে দেখা হয়। ছেলের চেয়ে দুর্বল ভাবা হয় মেয়েদের। আমি অনেকদিন ধরে নিবিড় পর্যক্ষেণ করেছি বাবাকে। আসলে কি আমাদের পেয়ে তিনি সন্তুষ্ট? নাকি আমাদের কথা ভেবে নিজেকে আড়াল করে রাখছেন। কিন্তু আমার নিবিড় পর্যবেক্ষণ বাবার মাঝে কোনো কৃত্রিমতার ছাপ দেখেনি। পেয়েছে সরলতা। দেখেছে উদারতা। বাবা আমাদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। অনেক আশার কথা বলেন। আমাকে একদিন বলেই ফেললেন, মেয়ে হয়েছো বলে কখনো কষ্ট পেয়ো না। সবসময় আল্লাহর শুকর আদায় করো। তোমার মর্যাদা কম নয়। মনে রেখো, মেয়েরাও অনেক ক্ষেত্রে ছেলেদের ছাড়িয়ে যায়। আমি চাই জ্ঞান-দক্ষতায় বেড়ে ওঠো তোমরা। মেরুদ- সোজা করে বাঁচতে শেখো। নারীত্বকে খোদার আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করো। তোমরা গর্বিত নারী জাত। যারা একটি সমাজ নয়, নয় শুধু একটি দেশ, পুরো একটি জাতিকে বদলে দিতে পারো। সেই শক্তি, সেই প্রেরণা, আল্লাহ তোমাদের দান করেছেন। আমি বাবার মুখে দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার দৃঢ়তাকে দেখলাম। মনে হলো, বাবা আমাদের উদ্দেশে কিছু বলতে চান।
বাবা কিছু বলতে চাইলে আমি বুঝতে পারি। বাবার কাছাকাছি থেকে সে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম, বাবা কিছু বলবে। তবুও বললাম, কিছু বলবে বাবা। আমার দিকে তিনি আরেকবার তাকালেন। বাবার এই একটা সুন্দর অভ্যেস। যখন তিনি কাউকে কিছু বলতে চান তার মনের অবস্থা যাচাই করে নেন। মুখের দিকে তাকান। বাবা সবসময় বলেন, মুখটা মনের আয়না। এজন্য কারো সাথে কথা বলার আগে তিনি মুখের দিকে তাকিয়ে নেন। বুঝে নেন তার মনের অবস্থা। সেই চিরায়ত অভ্যেস তিনি সবসময় স্মরণ রাখেন। আমি বিষয়টা বুঝতে পারলাম। আর একটু হেসে দিলাম। বাবাও তা লক্ষ করলেন। বললেন- মা আয়মান, এবার তাহলে কথায় আসি। আবার একটু দম নিলেন। কী যেন ভাবলেন। কিন্তু তা বুঝতে দিলেন না। ইতোমধ্যে আনজুমও এসে পড়ল। বাবা ওকে দেখে বললেন, তুই এসেছিস মা। ভালো হয়েছে। ছোটন কোথায়? ওকেও ডেকে নিয়ে আয়। একসাথে সবাইকে দেখি। অনেকদিন একসাথে বসা হয় না। তাছাড়া তোদের কিছু কথা বলব বলব করে ভাবছি। কেন জানি ভয় হয়, মৃত্যুটা নিশ্চিত, কিন্তু সময়টা অনিশ্চিত। তাই অনির্ধারিত এই সময়টাকে অবাক লাগে। মৃত্যুটা বড় কথা নয়। ইমান নিয়ে মরাটাই মুমিনের সার্থকতা। এই বলে বাবা কাঁদতে লাগলেন।
আমি বাবার কাছে বসা। এ সময় ছোটন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল- আপু, আমাকে দশটা টাকা দে। আমি বললাম, মাত্র দশ টাকা দিয়ে কী করবি। ও বলল, পথের ধারে এক বৃদ্ধা বসে আছে। ওর ছেলেরা ওকে খেতে দেয় না। তাই ভিক্ষে করে। সকাল থেকে বেচারি কিছু খায়নি। তাকে দেখে আমার খুব মায়া হয়েছে। তাই আমি বলে এসেছি- বুড়িমা, তুমি এখানে অপেক্ষা করো। আমি তোমার জন্য দশ টাকা নিয়ে আসছি। বাবাকে কিছুই বলার সুযোগ দিলাম না। আমিই ওকে দশটা টাকা বিদায় করলাম। আর বললাম, যা দিয়ে আয়। যদি পারিস, সাথে করে খাবার টেবিল থেকে ক’টা রুটি আর একটু ডাল ভাজা নিয়ে যাস। বুড়ি এটা পেয়ে দারুণ খুশি হবে। তখন ছোটন বলে উঠল, তাহলে তো টাকা দশটা বেঁচে যাবো। আমি বললাম, তাতে কী হয়েছে। অন্য কোনো কাজে ব্যয় করবে। তুই খুব ভালো রে। এই বলে ছোটন আমার কপালে একটা চুমু এঁেক দিলো।
বাবা যা বলবেন সে বিষয়ে এখনো তিনি আসেননি। অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। আজকে বাবাকে অন্যরকম লাগছে। এভাবে অশ্রুসিক্ত নয়নে কখনো দেখিনি। বাবার এই অবস্থা দেখে আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল। অধীর আগ্রহে আমরা দুইবোন অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাবা কী বলে তা মন দিয়ে শুনব। কেন এত বিমূর্ষ হয়ে পড়েছেন তিনি। এরই মধ্যে ছোটন এসে হাজির। ওর ছোটন হবার রহস্য- তিন বোনের মধ্যে ও সবথেকে ছোট তাই আমরা ওকে ছোটন বলে ডাকি। ওর প্রকৃত নাম জাহিন। আদর করে বাবা ওর এই নামটি রেখেছে। বুদ্ধিমত্তায় ও সেরকমই হয়েছে। আদরও সবার থেকে একটু বেশি পায়। জাহিন বাবার এ অবস্থা দেখে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাবা ওকে কাছে টেনে নিলেন। ও বাবার চোখের পানি মুছিয়ে দিতে লাগল। আনজুম বলল-বাবা, তুমি কেঁদো না। আমার খুব কষ্ট হয়। মেয়ে হয়ে বাবার কান্না দেখা যায় না।
আনজুমের কণ্ঠ ভালো। মাঝেমধ্যে গানও করে। স্কুল প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকবার ফাস্ট হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় হয়েছে দুবার। আর জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হয়েছে একবার। খুব ভালো গায় ও। তবে ভারি চমৎকার করে গাইতে পারে দেশের গান। আর ইসলামি সংগীতে ওর মতো গাইয়ে খুব কমই আছে। আনজুম জানে, বাবার ইসলামি সংগীত খুব পছন্দ। তাই তার মনটাকে ভালো করতে জন্য ও একটি ইসলামি সংগীত গাইতে শুরু করল। ওর সাথে আমি আর জাহিন তাল মিলাতে শুরু করলাম। বাবাও গুন গুন করে গেয়ে উঠলেন। বাবা নিজেই আনজুমের অনেক গানের সুর করেছেন। এমনকি ওর অনেক গান বাবার লেখা। আমরা বুঝতে পারলাম, আনজুমের প্রচেষ্টায় কাজ হয়েছে। কাজ না হয়ে উপায় কী। গানটা যে ওর। যে একবার ওর সংগীত শুনছে সে মুগ্ধ হয়েছে। ওর সুরের ঝংকার আর কথামালায় যে নিজস্বতা ও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, তা ওর নিঁপুণ শিল্প দক্ষতা। আনজুমের গানের সুরে মাও ছুটে এলো। আমরা সবাই বিমুগ্ধ হয়ে ওর গান শুনছি। ঐ দিকে মায়ের ডালের চচ্চরি আর ডাল নেই। পুরো ভাজা হয়ে গেছে। গন্ধ পেয়ে, মা গান ফেলে ডালের পিছে ছুটল। আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। গানের একটি কলি মাত্র বাকি ছিল। তাহলেই গানটি শেষ হতো। কিন্তু এ মজাও কম নয়। বাবা বিছানা ছেড়ে উঠলেন। হাত-মুখ ধুয়ে কিছুটা ফ্রেশ হলেন । মা আমাদের জন্য চা নিয়ে আসলেন। সাথে মায়ের বানানো স্পেশাল বিস্কিট। দেখে খুশিতে মনটা ভরে গেল।
আমাদের মা এক অন্যরকম মানুষ। এই সংসারে একটি মাত্র প্রাণি যার কোনো অভিযোগ নেই। সে আমাদের মা। এই পরিবারকে আগলে রাখার পেছনে মায়ের চেয়ে বড় অবদান আর কারো নেই। তাই বাবা প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, তোর মায়ের উপর আমি অনেক অবিচার করেছি। সে কোনোদিন আমার দিকে অভিযোগ তোলেনি। এই সংসারে আমি আয় করেছি ঠিকই, কিন্তু সংসার ধরে রেখেছে সে। তোদের মানুষ করার পেছনে তোর মায়ের অবদান আমার থেকে অনেক বেশি। কত বিনিন্দ্র রজনি আমি তাকে কাটিয়ে যেতে দেখেছি। তবুও তোদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেনি। আমি অসুস্থ ছিলাম, এই কারণে আমি পার পেয়েছি। কিন্তু তোর মায়ের এই অভিযোগেরও কোনো সুযোগ ছিল না। সব কষ্ট তাকে মেনে নিতে হয়েছে।
বাবাকে আমরা কখনো ছোট ভাবি না। না কথায়, না কাজে। মাও বাবাকে প্রচ- ভালোবাসেন। যতটা সময় বাবা বাসায় থাকেন কোনো-না-কোনো কাজে মাকে সাহায্য করেন। ব্যস্ত থাকের ঘরের কাজ নিয়ে। ছেলেদের কাজ আর মেয়েদের কাজ এই ভিন্নতা বাবা কখনো করেন না। কিন্তু মা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় তার কখনো ছিল না। এখনো নেই। এমনকি নিজেও কখনো অবাঞ্ছিতভাবে সময় নষ্ট করেননি। বাজে কোনো অভ্যেসও তার নেই। একটা জিনিসই খুব বেশি ভালোলাগে বাবার, নিরিবিলি থাকা। প্রত্যেকটা লেখকের এটিই সবচেয়ে সংকীর্ণতার জায়গা। এখানেই যত অভিযোগ। যে বিশ^টাকে নিজের মতো করে ভাবতে ভালোবাসে। আলাদা একটা ভুবন তৈরি করে নেয়। নিজে কষ্ট পায়। তবু অন্যকে সুখ দেয়। বেছে নেয় এক জনবিচ্ছিন্ন জীবন।
যখন আমরা বুঝতে শিখেছি, বাবা মায়ের কষ্টটা আমাদের কাছে শেয়ার করতেন। আর বলতেন, আমরা যেন কখনো মাকে কষ্ট না দেই। ঘরের বা বাইরের কোনো সিদ্ধান্তই মায়ের অংশগ্রহণ ছাড়া হতো না। এটাই ছিল বাবার নির্দেশ। আমাদের প্রতি তার ভালোবাসার দাবি। যা আমরা কখনো উপেক্ষা করি না। মায়ের বিচার অত্যন্ত সূক্ষ্ম। যে বিষয়ে মা জানেন না তা আমাদের উপরই ছেড়ে দেন। আলোচনা করে আমরা সবথেকে ভালো সিদ্ধান্তকেই বেছে নিই। এরকম একটি নিয়মের মধ্যে থেকে খুবই ভালো লাগে আমাদের।
আমরা চা বিস্কিট খাওয়া শেষ করলাম। মা কাজের প্রয়োজনে উঠে যেতে চাইলেন। বাবা বললেন, আজ তোমার থাকা খুবই দরকার। তোমাকে বসতে হবে। মা বসলেন। বাবাও বলতে শুরু করলেন।

ওরা তিনজনেই আমার সামনে বসা। আর ওদের মা। এ এক বিশেষ মুহূর্ত। হয়তো জীবনের একটি উত্তম সময়। কত সময় হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। হারিয়ে গেছে কত মিষ্টি-মধুর মুহূর্ত। এভাবে নিজের কাছের মানুষদের নিয়ে সময় পার করা সে-ও অনেক আনন্দের। পরিবার-পরিজন নিয়ে এভাবে খুব কমই সময় কাটিয়েছি। আজকে ওদের নিয়ে বসার বিশেষ একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রত্যেক বাবা-মারই উচিত তার সন্তানকে নিজের মনের কথা জানিয়ে দেওয়া। আসলে তারা সন্তানকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন। কতটা ভাবেন। আর তারা কী করছে। আর তাদের এমন কিছু দায়িত্বের কথা বলা, যা তারা জীবনভর মনে রাখবে। হয়তো এই উত্তম উপদেশ তাদের চিন্তায় অনেক পরিবর্তন আনতে পারে। মনোযোগী হতে পারে তাদের পিতামাতার ইচ্ছে পূরণে। মা-বাবাকে শুধু জাগতিক বিষয় নিয়ে ভাবলে চলে না। দীন ও দুনিয়া উভয়ের মাঝে সন্তানকে নিবিষ্ট করানোর প্রচেষ্টা রাখতে হয়। সন্তানটিকে পার্থির স্বপ্নে এতটা বিভোর করে না দেই, যেন সে আখিরাতকে ভুলে যায়। হয়তো এ কারণে আমি কিছু দুনিয়াবি শান্তি লাভ করতে পারবো। কিন্তু আমার সন্তনটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিলাম। এই সন্তানের কারণে আমাকে একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সন্তানও আমাকে ছাড়বে না। তার চেয়ে আমি আমার প্রিয় সন্তানটিকে মানুষ হতে বলি। যে মানুষ আমল ও আখলাকে খোদার প্রিয় বান্দা হয়ে যাবে। এটাই একজন বাবা-মার থেকে সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার। যে অনুগ্রহ তাকে সারাজীবন বাঁচিয়ে রাখবে। মনে করিয়ে দেবে বাবা-মার কথা।
আয়মান আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ও আমার কথাগুলোকে যেন চিবিয়ে হজম করছে। আনজুমের কাঁদো কাঁদো অবস্থা। দুষ্টুটা মিষ্টি মিষ্টি হাসছে। আসলে জাহিন বয়সে অনেক ছোট। তাই গাম্ভীর্যপূর্ণ এই কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারছে না। আর ওর মাকে মনে হচ্ছে একবারে অন্যরকম। মেয়েরা চলে গেলে বোধহয় সে আমাকে অনেক কিছু বলবে। তার চোখ সেই কথাই বলছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, তোমার শরীরটা খারাপ লাগছে বুঝি? ও বলল, কই নাতো।
জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা ঘিরে জন্ম হয়েছে তোমাদের। জানো নিশ্চয়ই, আনজুম আর তুমি জমজ বোন। জন্মের পর আনজুম খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। মনে করেছিলাম, এবার বোধহয় আয়মান একা হয়ে যাবে। আনজুম আর বেঁচে রইবে না। এমনি এক পরিস্থিতি হয়েছিল। কিন্তু না, আল্লাহর ইচ্ছে ছাড়া কিছুই হয় না। চাইলে তিনি যে মৃত্যুকেও জীবিত করে দিতে পারবেন তা আমরা বুঝতে পারলাম। কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর কুদরতী কদমে লুটিয়ে পড়লাম। সেদিন সারারাত মসজিদে কাটিয়েছি। সেই ইবাদত কী যে মধুর ছিল! সে কথা মনে পড়লে এখনো ভালো লাগে। মনের সাথে চাওয়ার কত যে মিল ছিল সে দিনের। তাই ইবাদতের ষোলো আনা স্বাদ বুঝেছি সেদিন।
কিছুদিন অসুস্থ থেকে আনজুম সেরে উঠল। মনে মনে অনেক কিছু ভাবলাম। সন্তান আল্লাহর নেয়ামত। এই নেয়ামতকে কখনোই ভুল কাজে ব্যবহার করবো না। সঠিক রাস্তাটি তাকে দেখিয়ে দেবো। যাতে সে নিজেকে বিকশিত করতে পারে। বুঝে নিতে পারে দ্বীন-ইসলামকে। বুঝতে পারে জীবনের গুরুত্ব। যে যেন জীবনের প্রতিটি কাজ ও সময় সুস্থধারায় ব্যয় করে। জীবনকে সার্থক করে তোলে। প্রায়ই শুনি, ইবাদত বলতে নাকি নামাজ, রোজা এসব মৌলিক বিষয়গুলো বোঝায়। আমি একথার সাথে কখনোই পুরোপুরি একমত হইনি। কারণ আমি বিশ^াস করি, সকল পুণ্যই ইবাদত। যদি তা সঠিক নিয়মে করা হয়।
তাই তোমাদের একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছি। শুরুতে হাতে তুলে দিয়েছে কোরআন। তোমরা কথা বলতে শিখেছ, আমি কোরআনের বর্ণ শিখেয়েছি। তোমরা গান শুনতে চেয়েছো আমি ইসলামি সংগীতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। তোমরা গল্প শুনতে চেয়েছ আমি ইসলামের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো তোমাদের বলেছি। এসবের একটিই উদ্দেশ্য- যাতে ইসলামের প্রতি তোমাদের ভালোবাসা তৈরি হয়। বড় হয়ে যেন তোমরা ইসলামের পথ থেকে দূরে সরে না যাও। ইসলামের কোনো অবমাননা দেখলে তোমার মনটা যেন কেঁদে উঠে। আজকাল ছেলেমেয়েরা আধুনিকতার নামে এমন সব কথা বলে যা শুনলে দুঃখ হয়। ভাবতেও কষ্ট হয়, এই ছেলেটির বাবা-মা মুসলমান। সে মুসলিম পরিবারের সন্তান। আসলে এর দায়ভার ছেলেটির একার নয়, কিছুটা পরিবারেরও।
জীবনযুদ্ধে টিকতে হলে একজন মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হতে হবে। আর এটা তখনি সম্ভব যখন দ্বীনের পাশাপাশি দুনিয়ার জ্ঞান তার জানা থাকবে। তাহলে ইসলামের মাহাত্ম্য সে বুঝতে পারবে। জ্ঞানের প্রতি তোমাদের যে আগ্রহ আমি লক্ষ করেছি- তাতে আমার ধারণা স্পষ্ট হয়েছে, তোমরা সময়ের সাথে সংগতি রেখে চলতে পারবে। তবুও তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ থাকবে, বেশি করে কোরআন পড়বে। কোরআন বুঝবে। দেখবে তোমাদের জ্ঞান আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। কোরআনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান আর কিছুই হতে পারে না।
কথাগুলো বলতে বলতে হৃদয়টা নরম হয়ে এলো। আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়লাম। বয়স হয়েছে। আজো এই অভ্যেসটা মুছে দিতে পারলাম না। মা প্রায়ই বলতেন- খোকা, যে মন মানুষের দুঃখ-ব্যথায় কেঁদে না উঠে সে পাথরে গড়া মানুষ। আর পাথরের কান্না খোদাও শুনতে চান না। আল্লাহও তাদের পছন্দ করেন না। মার কথাগুলো আজো আমার খুব মনে পড়ে। আমি সেই মায়ের ¯েœহ ও ভালোবাসা খুঁজে পাই আমার মেয়েদের মাঝে। ওরাও আমাকে প্রচ- ভালোবাসে। ছোট মেয়েটাকে কাছে ডেকে নিলাম। ও আমার বুকের সাথে মিশে রইল। আর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি অনুভব করলাম, রক্তের বন্ধন কতটা ঘনিষ্ঠ হয়! মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে মনে হলো হৃদয়ের কোনো বিচ্ছন্ন অংশ পুনরায় জোড়া লেগেছে। আমার চেয়ে সুখী মানুষ এই মুহূর্তে বোধহয় আর কেউ নেই।

যে কথাগুলো বলব বলব করে এতটা সময় অতিবাহিত করেছি, এখন বলার সময় হয়েছে। সবকিছুর জন্যই একটা পরিবেশ দরকার। যতক্ষণ না সেই পরিবেশ তৈরি হয়, সে কথা বলে নিজেও শান্তি পাওয়া যায় না। আর অন্যেরও ভালো লাগে না। মনোযোগ পাওয়া যায় না। আয়মানকে ইশারা করে বললাম, মানুষের জীবন একদিন ফুরিয়ে যায়, কিন্তু সে নিঃশে^ষ হয়ে যাবে না। অনন্ত পথের যাত্রী হয়ে সে এক নতুন জীবনের পথে এগিয়ে যায়। এটাই জীবন। সেই জীবনের প্রস্তুতি এই দুনিয়া। আয়মান আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, আনজুম আমাকে অনেক বড় শিক্ষা দিয়েছে। জীবনকে বুঝিয়ে দিয়েছে নতুন করে। সেদিন থেকে আমি পণ করেছি, যা কিছু করবো জীবনের জন্য করবো। কষ্ট করব তবু অন্যায়ের পথে যাব না। কম খাব তবু হারাম খাবো না।
তোমাদের নিয়ে আমি এক স্বপ্ন বুনেছি। সে স্বপ্নের নির্মাতা আমি। কিন্তু সেই স্বপ্নের চাকা তোমাদের হাতে। আল্লাহর উপর উপর ভরসা সেই পথে এগিয়ে যাবার পরিকল্পনা করেছি। আশা করি তোমরা সফল হবে। বান্দা যখন কোনো সঠিক নিয়তে হাঁটতে চায় আল্লাহও তাকে নিরাশ করেন না। বরং তার চলার পথ মসৃন করে দেন। সে ঐ পথ বেয়ে জান্নাতের দিকে এগিয়ে যায়। কোরআনের যে শিক্ষা তোমাদের অন্তরে রোপিত হয়েছে, তা তোমাদের অন্তরকে অবশ্যই প্রশস্ত করবে। আল্লাহর উপর ভরসা মানুষের শক্তিকে আরো বাড়িয়ে দেয়। কাজেও গতিশীলতা আসে।
নারীদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে মুসলিম পরিবারে এখনো একধরণের অনীহা কাজ করে। বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে আহত করে। যদিও এখন আর এই কথা বলা হয় না নারী শিক্ষার প্রয়োজন নেই। আমার বোন রুকসানা মারা যায় অল্প বয়সে। আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। ভালো অবস্থা দেখে বোনের বিয়ে দিতে পারেননি। একটি সাধারণ ছেলের সাথে বিয়ে হয় ওর। প্রথমবার যখন ওর বাড়িতে যাই আমার মনটা কষ্টে হুঁ হুঁ করে উঠল। আমাকে পেয়ে কত আনন্দ ওর! নিমিষেই যেন সব হারিয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, অভাবের সংসার। এই ভেবে ওর মুখখানা মলিন হয়ে গেছে। তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পায় না। পরনের জামাকাপড় এতই মলিন যে, আমারও দেখে কান্না পাচ্ছে। কিন্তু করারও কিছু ছিল না। তখন আমি ছাত্র। কলেজে পড়ছি। আয়-ইনকাম বলতে কিছুই নাই। টিউশনি করে দু-চার পয়সা যা পেতাম তা আবার নিজের প্রাইভেটের পেছনে ব্যয় করতাম। অভাব দেখতে দেখতে কেটে গেল রুকসানার জীবন।
অল্প বয়সে বাচ্চা নেয় রুকসানা। যে বয়সে ওর স্কুলে থাকার কথা, সে বয়সে ও সংসার করছে। অকাল গর্ভধারণ একসময় কেড়ে নিলো রুকসানার জীবন। সেদিন এক চিকিৎসকের কাছে ছুটে গিয়েছি। যে আমাদের প্রতিবেশী। ফি দিতে পারবো না বলে সেদিন সে আসেনি। রুকসানার চিকিৎসা হলো না। মারা গেল ও। পেটের বাচ্চাটাও বাঁচলো না। আজ আমার বোনের স্মৃতি বলে কিছু নেই। এ নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। তবে আক্ষেপ ছিল অনেক। মানুষের মাঝে কীভাবে এত পশুত্ব বিরাজ করে। কেন মানুষ আরেক মানুষের আর্ত চিৎকার শুনতে পায় না। বুঝতে চায় না মানুষের কষ্ট।
যবে থেকে তোমাদের জন্ম হয়েছে, আমি খোদার কাছে প্রার্থনা করছি, হে খোদা! তুমি ওদের নেক সন্তান হিসেবে কবুল করো। ওরা যেন ভালো মানুষ হতে পারে। ওদের জ্ঞানকে তুমি বৃদ্ধি করে দাও। যা ওরা মানুষের কাজে লাগাবে। তোমার পথে চলার জন্য ওদের মনে দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করো। মানুষের বিপদ দেখলে যেন ওদের অন্তর কেঁদে উঠে। যে চিকিৎসার অভাবে আমার বোনটি মারা গেছে, এই শহরের সব মানুষকে বাঁচাতে না পারলেও কিছু মানুষের বিপদে যেন ওরা পাশে দাঁড়াতে পারে। গরিব-অসহায়ের বন্ধু হয়ে থাকে। মানুষ মানুষকে বাঁচাতে পারে না। বাঁচিয়ে তোলার ক্ষমতা স্বয়ং আল্লাহর। কিন্তু মানুষতো মানুষের সাহায্যকারী হতে পারে। যে সাহায্য আসে আল্লাহর তরফ থেকে। যাকে মাধ্যম করে আল্লাহ আরেকজনকে ভালো রাখেন। এই মানবতাই তো ইসলামের বাণী।
আমি আয়মানকে বললাম- মাগো, তোর যে অনেক দায়িত্ব। যদিও তোরা দুই বোন জমজ। তবুও আমরা তোকে বড় বলে জানি। ওরাও সেভাবেই তোকে মানে। ছোটদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বড়কে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তোকেও ওদের স্বার্থে অনেক ইচ্ছেকে হাসি মুখে ছেড়ে দিতে হবে। আয়মান আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিল। ও জানে, আমি অনেক ভালোবাসা দিয়ে ওর কাছে আবদার জানাই। যা ওরও ভালো লাগে। আমিও আনন্দ পাই।
মারে! তোকে যে ডাক্তার হতে হবে। মনুষ্যত্বের অধিকারী সম্পন্ন ডাক্তার। যে মানুষকে সম্মান করবে। মানুষের সেবায় এগিয়ে যাবে। অর্থবিত্ত সে উপার্জন করবে ঠিকই, তবে মানবতাকে বিকিয়ে দিয়ে নয়। নইলে তোর ফুফির মতো আরো কত অসহায় প্রাণ অকালে ঝরে যাবে। তোদের মতো মেয়েরা যদি এই মানবিক পেশাকে গ্রহণ করে, তবে মানুষ অনেক শান্তি পাবে। প্রাণ খুলে তোদের জন্য দোয়া করবে। যে দোয়ায় জান্নাতের দরজা তোদের জন্য খুলে যাবে। মানুষকে ভালোবাসবি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মানুষও তোকে ভালোবাসবে। একজন মানুষের জন্য এইতো অনেক। এ জীবনে এর চেয়ে বেশি আর কী চাই। যে মানুষ টাকার পাহাড় গড়ে মুক্ত আকাশটাকে দেখে, কিন্তু মানুষ হয়ে মানুষকে বুঝতে পারে না, তাদের সাহায্যে এগিয়ে যায় না, দুর্ভাগ্য সেই মানুষের।
বাবা, আমি চেষ্টা করবো তোমার স্বপ্ন পূরণের। তুমি বাবা হয়ে দু’হাত তুলে আমার জন্য দোয়া করো। এই আয়মান যেন তোমার ইচ্ছে পূরণ করতে পারে। মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখে। কিন্তু অনেকের স্বপ্ন অধোরাই থেকে যায়। তবে তুমি যে স্বপ্ন আমাকে দেখিয়েছো আমি তা অন্তর দিয়ে মেনে নিয়েছি। যা এখন আমার স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। কারণ আমি আমার ইচ্ছের মাঝে তোমার স্বপ্নকে লালন করতে চাই।
ওর কথা শুনে আমি খুব আনন্দ পেলাম। মনটা জুড়িয়ে গেল। এতটা প্রশান্তি আমি অনুভব করলাম- বাবা হিসেবে আমাকে খুব সার্থক মনে হলো। আমি শুকরিয়া আদায় করলাম। হে প্রভু! তুমি আমাকে অনেক দিয়েছে। আমি অর্থ চাই না। যে রতœ তুমি আমায় দিয়েছে তাকে মানুষ করার দাওফিক দিয়ো। ওদের তুমি কবুল করো। আমি ঐ সন্তান কখনো চাইনি, যে সন্তান মাকে সম্মান করতে জানে না। বাবার কথা শোনে না। আমি চেয়েছি, নেক সন্তান।
বাইরে প্রচ- বৃষ্টি হচ্ছে। সময়টাও ভালো যাচ্ছে আমাদের। হঠাৎ করে ক্বারী সাহেব এসে হাজির। ওদের কোরআন পড়াবেন। আমি বললাম- জনাব, আজকে এত বৃষ্টির মধ্যে না আসলেও পারতেন। অবশ্য আমাদেরও ভুল হয়েছে। আপনাকে জানিয়ে দিলেই ভালো হতো। এসেই যখন পড়েছেন। চা-বিস্কিট খান। এরপর না হয় অন্য কথা হবে। আমি হুজুরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, উনিও হয়তো আসতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু মাস শেষের হিসেবটা নিয়ে বড় চিন্তিত। তাই একবার দিনের গণনাটা করে গেলেন। আমি ক্বারী সাহেবের হাত ধরে বললাম- ভাই, তুমি ওসব নিয়ে কখনো ভাববে না। আমি ঐ মানুষ নয়, যে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বাচ্চার জন্য ইংরেজি শিক্ষক রাখতে পারে। আর কোরআন শিক্ষা দিতে গিয়ে মাওলানা সাহেবকে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে বলবো অনেক হয়েছে। না ভাই, তুমি এমনটি ভেবো না। আমি তোমায় যথাযোগ্য সম্মান করবো। ক্বারী সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে এমন এক মায়ার হাসি দিলেন, আমার খুব ভালো লাগল। আমি শুধু এইটুকু বললাম- ভাই, তুমি আমার মেয়েদের সুন্দর করে তালিম দেবে। যেন তোমার মৃত্যুর পর ওদের কণ্ঠে তোমার সুর ধ্বনিত হয়। তোমার সুরেলা কণ্ঠের জাদু ওরা ধরে রাখতে পারে। যেন তোমার কাজটি পরিণত হয় সদকা হিসেবে। ক্বারী সাহেব আমার কথায় অত্যন্ত খুশি হলেন। আমিও ওনাকে প্রচ- ভালোবাসি। কারণ আমল-আখলাকে তিনি অত্যন্ত চমৎকার মানুষ।
ক্বারী সাহেব চলে গেলেন। আমি আবারও ঘরে ফিরে এলাম। ওরা সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আনজুমকে কাছে ডেকে আবারও ঐ কথায় ফিরে যেতে চাইলাম, মাঝপথে যেটুকু আমি ছেড়ে দিয়েছি। আনজুমের সংগীত পরিবেশ নিয়ে ওর মা বারবার আপত্তি করে আসছিল। আমার কারণে সে আপত্তি আর টেকেনি। বিষয়টি নিয়ে এখন আমি একটু ভাবছি। মেয়ে বড় হয়েছে। ইতোমধ্যে একটা সমস্যাও হয়েছে। তাই আমি ওকে কাছে ডেকে বললাম- মা, তুই গান করিস এটা আমার বেশ ভালো লাগে। তাছাড়া তুই মানুষকে সত্যের পথে ডাকিস। তা আরো ভালো। কিন্তু তোর লেখার হাত যে অনেক ভালো। তুই তো চাইলে ভালো লেখক ও হতে পারিস। গান না হয় মাঝেমধ্যে করাই যাবে।
ও আমাকে আর কিছু না বলে চলে গেল। বুঝতে পারলাম, ও রাগ করেছে। পেছন পেছন আমিও ওর ঘরে ঢুকলাম। আস্তে করে ওর মাথার পাশে বসলাম। মাথায় হাত রেখে বললাম- মা, তুই রাগ করেছিস। আমার দিকে তাকিয়ে বলল- বাবা, আমি তোমার কথায় রাগ করতে পারি? বাবা হয়ে তুমি আমার অমঙ্গল নিশ্চয়ই চাইবে না। তাই বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবতে চাই। মনকে বুঝাতে পারাই সবচে বড় প্রশান্তি। তাহলে আর কষ্ট পেতে হবে না। আমিও বুঝতে চাইছি মনের সেই চাওয়া। যদি সে রাজি না হয়। তাকে বোঝাবো, আসলে তুই যা ভেবেছিস তার সঠিক নয়। আমার বাবা কখনো ভুল বলতে পারে না। তাই একটু সময় দাও। নিজের সিদ্ধান্ত যেন নিজেই নিতে পারি। আমি ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। বুঝতে পারলাম, ও যা করতে চাইছে ওখানেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। কারণ ওর সিদ্ধান্তের জায়গাটি ভুল নয়।
রাতে শুয়ে শুয়ে আমিও অনেক কিছু ভাবলাম। নিজের মত কারো উপর চাপিয়ে দেওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি বোধহয় একটু বেশিই করে ফেলেছি। হোক না আমার মেয়ে। তাতে কী এসে যায়। চিন্তা করলাম, ওকে ভারমুক্ত করাটাও আমার দায়। ভাবছি, ওকে বলব- মা, তোর সিদ্ধান্ত তুই নিবি। এই বাবাকে সবসময় কাছে পাবি। সারারাত এই চিন্তায় ঘুম আসেনি। কারণ আমি আমার মেয়েদের বড্ড ভালোবাসি। ওদের কষ্ট দিয়ে আমি কী করে ঘুমাই। বাবা হিসেবে আমার চোখে ঘুম আসে না। মনটা বিষন্নতায় ভরা।
ভোরবেলায় দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। একটুও ভালো লাগছে না। ভাবলাম, এই অসময়ে আবার কে এলো। এমনিতেই মনের অবস্থা ভালো নেই। কে হতে পারে? তবুও অনিচ্ছা সত্ত্বেও দরজাটা খুললাম। অবাক! আনজুম এই সাজ সকালে আমার দরজার সামনে! আমি ভাবতেই পারছি না। যে মেয়ের ঘুম ভাঙ্গে দিনের এক প্রহর হলে। সে আমার এখানে সাজ সকালে। আমি বললাম, কী? রাতে ঘুমাসনি? না বাবা, চোখে ঘুম আসেনি। তাইতো তোমার কাছে এলাম। কী এত চিন্তা? যা তোকে সারারাত জাগিয়ে রাখল। আমি তোমার কথা সারারাত ভেবেছি। মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েও ফেলেছি। এখন থেকে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দেবো। তুমি যে কাজটি করতে পারোনি। সে শূন্যতার জায়গাটা আমি পূরণ করার চেষ্টা করব। আমি অবাক হলাম, ও কী বলছে? কী আমার শূন্যতা?
বাবা তুমি অনেক বড় হতে চেয়েছিলে। কিন্তু সংগ্রামী জীবন তোমার পথে কিছুটা হলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই নিজের মতো চলতে পারোনি। একসময় আশাহত হয়েছো। তবুও ভেঙ্গে পড়োনি। ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছো ঠিকই মনের আশা পূর্ণ হয়নি। তাই আমি ভেবে নিয়েছি, তোমার ইচ্ছেকে আমি পূর্ণ করবো। আমি গান করবো ঠিকই তা মনের আনন্দে। যে গান মানুষকে ভালো দিকে নিয়ে যাবে। যে গানে মানুষ খুঁজে পাবে বাঁচার প্রেরণা।
ওর কথা শুনে আমার দারুণ আনন্দ হলো। মনে হলো আমি এক স্বপ্ন জয়ের আনন্দ ভোগ করছি। আমি ওকে কাছে ডেকে বললাম, তুমি এতকিছু জানলে কী করে? কেন বাবা? তুমি আমাদের খবর রাখবে, আর আমরা তোমার খবর রাখবো না, তা কি হয়? তাইতো মায়ের কাছে সব জেনেছি। মা যে তোমায় প্রচ- ভালোবাসে। আমি মনে মনে এ কথাই ভাবছিলাম। ঘরের খবর কোথা থেকে বেরিয়ে এলো। নিশ্চয়ই ওর মা বলেছে। ভাবলাম, ভুল করেনি সে। কারণ বাবা-মার ইচ্ছে-অনিচ্ছে সন্তানকে জানাতে হয়। সন্তানইতো বাবা-মার ইচ্ছে পূরণ করবে। যে কাজটি আমি করতে পারিনি, সে কাজটি করেছে ওর মা। আমি আনজুমের উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলাম। মন ভরে দোয়া করলাম ওর জন্য।
বেশ কিছুদিন হলো ঘরোয়া আড্ডা আর জমে উঠে না। যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। সবাই আপন লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমিও লেখালেখি নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। নতুন একটা উপন্যাসের কাজ চলছে। বইমেলায় বইটি ধরাতে হবে। হাতেও খুব বেশি সময় নেই। প্রায় বছর খানেক কেটে গেছে একই উপন্যাসের পেছনে। প্রকাশকের হাতে তুলে দিতে পারলেই আমি এখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। কাজের সময় আমার ছোট মেয়েটি পাশে এসে বসে । কখনো একটু মুচকি করে হাসে। ওকে কোলে নিয়ে আমিও একটু আদর করি। এটুকু পেতেই বোধহয় ও আমার কাছে ছুটে আসে। এই সামান্যতে আমারও মন ভরতো না। মন চাইতো ওকে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে আসি। কিন্তু আমি তা পারিনি। এভাবে হিসাব করে আমার দিন চলে যায়। কষ্ট হয় খুব। তবুও লেখক জীবনের সত্যটাকে মেনে নি। মানুষকে আনন্দ দি। কিন্তু নিজে লোক চক্ষুর অন্তরালে থেকে যাই। নিজের কষ্টগুলো কাগজের সোনালি পাতায় ছেপে দেই। খুব মিস করি ওদের। মনটা কেঁদে মরে। কখনো মনে হয়, ওদের নিয়ে দূর কোনো অজানায় হারিয়ে যাই। আবার ভাবি, লেখকের এত আনন্দের সুযোগ কই। সে তো কখনো সাবলীল জীবনের সুখ পেতে পারে না। তার সুখতো আলাদা। তার ভুবন যে ভিন্ন। তার ভাবনাগুলো তাকে এক ভিন্ন জগতের মানুষ বানিয়ে দেয়। এ কারণেই হয়তো বলতে হয়, কবি সাহিত্যিকরা যুগের ব্যতিক্রমী মানুষ।
স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলেছে সবার জীবন। কেউই থেমে নেই। বহুদিন বাদে আবারও আমাদের সেই ঘরোয়া আড্ডাটা জমে উঠেছে। মেয়েরা সবাই বড়। আমরাও পঞ্চাশের কোঠায় এসে ঠেকেছি। আয়মান ও আনজুম দুজনেই ঢাকা মেডিকেলে পড়ছে। জাহিন মাত্র এসএসসি পাশ করেছে। হয়তো শীঘ্রই আমি দুজন ডাক্তারের দেখা পাবো। কল্প জগতে যারা এক ভিন্ন জাতের মানুষ হয়ে আছে। সেই মহৎ মানুষকে আমি দুনিয়ার জগতে দেখতে চাই। যে কল্পনার রং মেখে আমি তাদের মানুষ করেছি, সেই রং-এ মানুষকে তারা কতটা রাঙাতে পারে। কেমন হয় তার আচরণ এটাই আমার আগ্রহের জায়গা।
আমি দৃঢ়তার সাথে একথা বিশ^াস করি, শিল্পী কখনো খারাপ হতে পারে না। সুরই তার মনের গতিকে বদলে দেয়। আমার গড়া শিল্পী কত বড় মানুষ হয় সেটি দেখতে উৎসুক হয়ে আছি। আনজুম আমাকে অনেক চমক দেখিয়েছে। তার লেখনী তার নিজস্ব পরিচয়। বাবার নাম দিয়ে তাকে চলতে হয় না। নিজের নামই তার পরিচয়। ওরা প্রমাণ করেছে সন্তান চাইলে বাবার মুখে হাসি ফোটাতে পারে। বাবা-মার হাসি কিনতে বেশি কিছু খরচ করতে হয় না। সন্তানের মঙ্গলেই বাবা-মার হাসি। যে হাসি বাবা-মার জন্য পরম বিজয়ের।
আমি ছোটকে নিয়ে একটু চিন্তায় পড়ে গেছি। এখনো ওর কোনো গতি হলো না। আয়মান বিষয়টি বুঝতে পারলো। ও আমায় বলল- বাবা, তুমি জাহিনকে নিয়ে চিন্তা করছো। আমি একটু এড়িয়ে যেতে চাইলাম। আর বললাম, তেমন কোনো বিষয় না। ঠিকই ও আমাকে ধরে নিল। বলল, তুমি তো এই শিক্ষা দাওনি। শুধু নিজের কথা ভাববো! অথচ স্বপ্ন দেখাচ্ছো মানুষকে নিয়ে ভাবতে। আর নিজের বোনটির কথা ভাবতে পারবো না? চিন্তা কোরো না বাবা। তোমার স্বপ্ন একদিন সত্যি হবে। এই মেয়েরাই তোমার মুখ উজ্জ্বল করবে। জাহিন অনেক মেধাবী। অত্যন্ত বিনয়ী। ওকে নিয়ে তুমি একটুও ভেবো না। ওর দু-দুটো বোন রয়েছে। আয়মানের কথায় আমি একটু স্বস্তি পেলাম। আর বললাম- মারে, তোর কথা শুনে খুব ভালো লাগল। আমাকে একটা চা করে দে। তোর হাতের চা কতদিন খাইনি।
ওদের পড়াশোনা নিয়ে আমরা পড়ে গেলাম মুশকিলে। মেয়েরা হলে উঠতে পারছে না। আবার আনজুম হলে উঠতেও চাইছে না। বাড়িতে জাহিন একা। ওকে রেখে গিয়ে কোথাও থাকব সে উপায় নেই। বাধ্য হয়ে জাহিনকে সাথে নিয়ে ঢাকায় বাসা করলাম। ভাবলাম, মাস ছয়েক কেটে যাক। এরপর আবার বাড়িতে ফিরে যাব। কিন্তু তা আর হলো না। আনজুমকে নিয়ে সমস্যার কোনো শেষ নেই। হলের খাবারে কোনোভাবে মানিয়ে নিতে পারছে না। গাদাগাদি করে থাকতেও চাইছে না। ছ’মাস ধরে জাহিন কলেজে যেতে পারছে না। এখন এটিও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওর মা এই বদ্ধ পরিবেশে থাকতে একেবারেই নারাজ। এভাবে আরো ক’মাস কেটে গেল। এখন আনজুমও একটু-আধটু মানিয়ে নিয়েছে। ওদিকে জাহিনের কলেজ থেকে ফোন করেছে। কেন ও কলেজে আসছে না। প্রিন্সিপাল মহোদয়কে ব্যাপারটি খুলে বললাম। তিনি তার অবস্থান থেকে সবধরনের সুযোগ দেবার আশ^াস দিলেন। বললেন, পরীক্ষাগুলো যেন ঠিকমতো দেয়। বাকি ব্যাপারগুলো সামলে নেবো। জাহিনের দিক থেকে একরকম হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এক বছর শেষ হলো। দ্বিতীয় বছরের একমাস অতিবাহিত হয়েছে। একদিন আনজুম নিজেই আমায় ডেকে বলল- বাবা, এভাবে আর জাহিনের ক্ষতি করা যায় না। আমরা ভাবছি, শীঘ্রই হলে উঠব। ম্যাডামের সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, বিষয়টি দেখবেন। আজ কাল এভাবে করে আরো দু’মাস চলে গেল। একদিন সন্ধ্যেবেলায় বইপত্র ও মালামাল নিয়ে দু’বোন হলে উঠল। বাসার মালিককেও আমরা ওদিন না করে দিলাম। ভদ্রলোক অগ্রিম মাসের জন্য আর কোনো ভাড়া রাখলেন না। তিনি বললেন, আপনি না বলার একদিনের মধ্যেই এক সাংবাদিক অগ্রিম করেছেন। অযথা আপনার কাছ থেকে কেন আমি পনের হাজার টাকা নেব? আপনি বরং ত্রিশ তারিখ বাসাটা ছেড়ে দিলেই হয়। আজ মাসের পঁচিশ তারিখ। তাই ভাবলাম, কদিন আগে যাওয়াই ভালো। ওদের যা দেওয়ার দিয়ে দিলাম। বাকি মালপত্র নিয়ে সাতাশ তারিখ বাড়ি আসলাম। বাড়িতে এসেছি তা-ও কয়েক বছর হয়েছে। এখন ওরা নিজেরাই বাড়ি থেকে আসা-যাওয়া করে। বেশ কিছুদিন হলো মেয়েদের কথা খুব মনে পড়ছে। কথা হয়, কিন্তু মন ভরে না। তাই ওদের অনেক করে বললাম, একবার বাড়ি থেকে দেখা করে যাও। আসতেই চাচ্ছিল না। শেষপর্যন্ত ওর মায়ের কারণে রাজি হলো।
পড়াশোনার বেশ চাপ। মাত্র কদিনের জন্য বাড়িতে এসেছে। সামনে ভাইভা। তাই ওদের আর ডিস্টাব করতে চাই না। এ কারণে বললাম- মা, এভাবে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। তোমরা বরং কাজে মনোযোগী হও। আমি আর তোমার মা মিলে ঘর সামলে নেব। জাহিন তো আছেই। ওর হাতের রান্নাটা এবার খেয়ে দেখবে। কী দারুণ! তোমাদের জিবে একেবারে হোটেল রুপসী বাংলার স্বাদ এনে দেবে। অনেকদিন ধরে বোনের হাতের রান্না খাওনি। এখন ও অনেক কিছু বাঁধতে জানে।
আমি আর কিছু না বলে রুমে চলে এলাম। ভেতরে রাতের খাবারের আয়োজন চলছে। ওর মা খাবারের এনতেজাম শুরু করে দিয়েছে। ওরা দুবোন খাবার টেবিলে বসল। পাশে জাহিন। ওর মা-ও বসেছে। একমাত্র আমিই বাকি। সবাই আমার অপেক্ষায়। আমি গেলেই খাবার গ্রহণ শুরু হতে পারে। তাই একটু তাড়াতাড়ি যাবার চেষ্টা করলাম। ছোটবেলা থেকেই এ পরিবারে এই রেওয়াজ ওরা তৈরি করেছে। আমাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই নিয়ম। উদ্দেশ্য আমাকে ঠিক সময় খাবার টেবিলে নিয়ে আসা। তাই সবাই বায়না ধরল মা-বাবাকে সাথে নিয়েই ওরা খেতে বসবে। আমি আর দ্বিমত করলাম না। ছোটবেলা থেকেই আদর-সোহাগ অনেক কিছু থেকেই ওদের বঞ্চিত করেছি। তাই কখনো ওদের মতে বাধা দেয়নি। ওরাও এমন আবদার করেনি যা আমাদের কাছে বিরক্তিকর বলে মনে হয়েছে। সবসময় ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলোই করেছে। মনে মনে ওদের এই কাজটি আমার খুব ভালো লাগল। ভাবলাম, ক্রমেই সমাজ থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। সন্তানরা বাবা-মাকে বোঝা মনে করছে। পরিবার থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। কেউবা পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। চারপাশের করুণ অবস্থা দেখে মনটা দুঃখে ভরে যায়।
আমি এসে বসলাম। বুঝতে পারলাম, জাহিনের খুব ক্ষুধা লেগেছে। বিকেলে কিছুই খায়নি। মুখটা তাই শুকিয়ে গেছে। জাহিনকে লক্ষ করে বললাম- ক্ষুধা পেয়েছে বুঝি? ও বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, শুরু করো তাহলে। আয়মান ও আনজুমকে বললাম, তোমরাও শুরু করো। ওর মা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এখনো প্লেটে হাত দেয়নি। আমি বললাম- কী হলো? শুরু করো। ও বলল- তোমাকে বাদ দিয়ে কবে একা বসেছি বলো? আমি বললাম- তা হয়তো কখনো বসনি। আজকে না হয় বসো না। আমিও যে তোমায় ছেড়ে বসিনি। বসতে ভালো লাগে না। ও আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে দিল। আমি বললাম- শুরু করি তাহলে।
মেয়েরা আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। আমিও ওদের দিকে তাকালাম। ওদের দুই বোনের মনের অবস্থা খুব একটা ভালো না। মুখে কেমন চিন্তার ছাপ। আমি বললাম, রেজাল্ট নিয়ে ভাবছিস? দেখ মা, অতসব ভেবে লাভ নেই। যা হবার তা হয়ে গেছে। চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিস নি। পরীক্ষাও ভালো হয়েছে। এখন সব উপরওয়ালার ইচ্ছে। তিনি যা চাইবেন তা-ই হবে। নিয়তির লিখন না যায় খ-ন। আশা করি, তিনি তোমাদের উপর রহম করবেন। আর যদি না-ও করেন তাতেও ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই। হয়তো এর চেয়ে উত্তম কিছু তোমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। ভরসা রেখো। আশাহত হয়ো না।
আমার কথায় ওরা একটু স্বাভাবিক হলো। খাওয়া শেষ করে একসাথে উঠলাম। কাল দু’বোন বিশ^বিদ্যালয়ে ফিরে যাবে। বাড়িতে খুব একটা পড়াশোনা হচ্ছে না। সামনে আরো কিছু পরীক্ষা রয়েছে। তাই জাহিনকে নিয়ে রুমে গেলাম। ওকে বললাম, মাগো একটু পানি দাও। ওষুধগুলো খেয়ে নি। জাহিন তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, একটু ভুল হয়েছে। তাই তাড়াতাড়ি ওষুধ-পানি নিয়ে আসল।

আমি আর ওর মা বসে আছি। পাশে জাহিন। যাবার আগের রাতে ওরা আমাদের সাথে গল্প করে। তাই এবার ভেবে রেখেছি, আমরাই গল্পটা শুরু করবো। কিছু দায়িত্ব নিয়ে কথা বলবো। ওর মা শুরুতেই বলতে আরম্ভ করলো। লক্ষ্য ওদের দুই বোন। বলল, আমাদের আর কোনো সন্তান নেই। তোমরা তিনটে মেয়ে। কখনো তোমাদের মেয়ে বলে ভাবিনি। ভেবেছি, সন্তান হিসেবে। তোমরা আজ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছো। দেখে ভালো লাগছে। জাহিন এখনো অনেক ছোট রয়ে গেল। ওকে সাথে নিয়ে তোমরা এগিয়ে যাবে। ওকেও পৌঁছে দেবে ওর লক্ষ্যের দিকে। জানি- জোর করে কাউকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না। যদি না সে এগিয়ে যেতে চায়। তোমার কখনো দায়িত্ব এড়িয়ে যাবে না। তবুও মা হিসেবে বলতে হয়। আনজুম বলতে লাগল- মাগো, তোমরা আমাদের শুধু মা-বাবাই নও, আমাদের পরম বন্ধু। আমাদের পারিবারিক শিক্ষা আমাদের ভালোবাসার বন্ধকে অটুট রাখবে। আমাদের ছোট বোনটি সবার অতি আদরে। তার কথা কি আমরা কখনো ভুলে যেতে পারি? ওর ভালো থাকায় আমাদের খুশি। প্রয়োজনে আজীবন ওর পাশে রইবো।
আমি বললাম- আর রাত বাড়িয়ো না। এখন ছেড়ে দাও। একটু বিশ্রাম নিক। সারাদিনে আর ঘুমাতে পারবে না। জাহিনকে রেখে যাও। ওর গল্প একবার শুরু হলে তোমাদের সারারাত ঘুমাতে দেবে না। আয়মান আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে দিল। আর বলল- অমন করে বলো না। ও কষ্ট পাবে। চুপি চুপি জাহিনও ওদের সাথে রওনা হলো। আমি আগেই জানতাম, ওকে রাখা যাবে না। ওরা ঠিকই নিয়ে যাবে। তাই আমি আর জোর করলাম না। বললাম- নিদ্রাহীন পাখিটাকে নিয়ে যাও! পরে বুঝবে। যাও যাও, নিয়ে যাও।
দু’বোন ঘুম থেকে উঠল। নামাজ সেরে আবারও একটু ঘুমিয়ে পড়ল। এখনো ভোরের রেশ কাটেনি। ওরা মা ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তা তৈরি করেছে। আমিও আগে থেকে তৈরি হয়ে আছি। বাসস্টান্ড পর্যন্ত ওদের ছেড়ে আসব। নাস্তা শেষ করে উঠতেই আমি বললাম- চলো, তোমাদের ছেড়ে আসি। আয়মান একটু রেগে গেল। তুমি কেন কষ্ট করে যাবে? আমি বললাম- সে তুমি বুঝবে না। এতে তোমার বাবার অনেক ভালো লাগবে। ওরা বুঝতে পারল আমার মনের কথা। বলল- চলো তাহলে। আমি ওদের সাথে এলাম। ওরা বাসে উঠে বসলেও আমার বাসায় আসতে মন চাইছে না। আমি বারবার ওদের দিকে উঁকি মেরে তাকাচ্ছি। ওরাও তা দেখছে। তবুও আমায় চলে যেতে বলছে না। ওরা জানে, ওদের জন্য এই প্রতীক্ষাটা আমার জন্য পরম আনন্দের। গাড়ি চলতে শুরু করল। ওরাও হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল আমায়। আমি ওদের দিকে এক নাগাড়ে তাকিয়ে আছি। কষ্টে যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ছে। মনে হচ্ছে আমার হৃদয়টা ভেঙ্গে যাচ্ছে। জানি কেন এমন হয়। পাথরের মানুষটি কীভাবে এত কোমল হৃদয়ের অধিকারী হলাম! অনেক কষ্টে বাসায় ফিরে এলাম। আমার স্ত্রী দেখে বলল- তোমার এই ছেলেমানুষী কবে যাবে। আমি বললাম, এ যে আমার জীবনের সাথে মিশে গেছে। আঁচল দিয়ে আমার চোখের জল মুছিয়ে দিল। আর বলল- তুমি ফ্রেশ হয়ে এসো। আমি খাবার দিচ্ছি। খাবার খেয়ে জাহিনের বাবা ঘুমিয়ে পড়ল। আমি বললাম- তুমি আজকে কোথাও বের হয়ো না। তা হয় না গো। স্ত্রী হিসেবে আমার এই সামান্য আবদার তুমি রাখতে পারবে না। ওভাবে বলো না। আমাকে যে আজ বেরোতেই হবে। মনটা ভালো লাগছে না।
বেশ ক’দিন হলো মেয়েরা ঢাকায় অবস্থান করছে। মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। যদিও ওরা সবসময় আমাদের খবর রাখে। হঠাৎ ফোন করে আনজুম বলল- মা, তোমরা আমাদের জন্য দোয়া করো। আমি বললাম- হঠাৎ দোয়া চাওয়া হচ্ছে। কারণটা জানতে পারি। কিছুদিনের মধ্যে হয়তো ওদের রেজাল্ট বেরোবে তাই। আয়মান নাকি বেশি চিন্তা করছে। ফোনটা নিয়ে আমি বললাম, আল্লাহর উপর ভরসা রেখো। তিনিই তোমাদের বিজয়ী করবেন। মনে হলো আমার কথায় ও একটু স্বাভাবিক হয়েছে। একথাও বললাম, ভালো-মন্দ যা-ই হোক না কেন আমাদের জানাবে। আমরা তোমাদের ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।
মেয়েকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিলাম ঠিকই কিন্তু নিজেই অস্থির হয়ে উঠলাম। ভাবলাম, একবারে যদি ভালোয় ভালোয় সব হয়ে যেত। মনের চিন্তাটাও দূর হতো। ওদের মুখে বিজয়ের হাসি ফুটতো। সার্থক হতো জীবনটা। নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে রাতটা কেটে গেল। সারারাত দুজনে ঘুমোতে পারিনি। কী ভেবে জাহিনও আমাদের কাছে চলে এসেছে। ছোট্ট মেয়ে। তবুও আমাদের সান্ত¡না দিচ্ছে। অনেক ভালো লাগছে ওর কথাগুলো। দেখো বাবা, আপুরা অনেক ভালো করবে। মিছে মিছে তোমরা দুশ্চিন্তা করছো। আমি ওর মায়াবী হাসিতে মুগ্ধ হয়ে বললাম, তাই যেন হয়। তাই যেন হয়।
আজও ভোরবেলা জামায়াতে ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়েছে। এখনো বাসায় ফেরেনি। বেলা প্রায় দশটা হয়ে গেল। আমি ফোন করে করে বিরক্ত হয়ে গেলাম। শেষপর্যন্ত ফোন ধরলো। আমি বললাম, বলতো কী হয়েছে? খুব মোলায়েম কণ্ঠে বলল, শরীরটা ভালো লাগছে না। তাই নামাজ শেষে মসজিদে একটু ঘুমিয়ে পড়েছি। খবর শুনেছ! কী খবর? গতকাল রেজাল্ট বেরিয়েছে। ওরা অনেক ভালো করেছে। তাই জানা মাত্রই ফোন করেছে। ভেবেচিন্তে বলছো তো? আয়মান-ই আমায় একথা বলেছে। আনজুমও তোমায় বেশ কয়েকবার ট্রাই করেছে। পায়নি।
তোমার স্বপ্ন আজ সার্থক। তোমার দু-মেয়ে ডাক্তার। আমি দম নিয়ে মসজিদের বারান্দায় বসে পড়লাম। আর নামাজের নিয়তে সিজদায় মাথাটা নত করে দিলাম। মনে মনে তাঁকে বললাম, মানুষ চেষ্টা করলে তাকে বঞ্চিত করো না। তোমার বিচার বড়ই ন্যায়সঙ্গত। কাজ না করে যারা ফল পেতে চায় কেবল তারাই তোমায় বৃথা অভিযোগ দেয়। আমি হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে গেলাম। মনিকে কাছে ডেকে বললাম- তোমার দোয়া কবুল হয়েছে। পূরণ হয়েছে তোমার স্বপ্ন। আজ যে আনন্দের দিন।
বহুদিন ধরে ভাবছি কোথাও বেরিয়ে আসবো। যদিও ওর মা বারবার বলছিল শীঘ্রই মেয়েদের পোস্টিং হবে, ওরা বাড়িতে আসছে। আর তুমি থাকবে না তা কী করে হয়। ভেবো না তুমি। মেয়ের চেয়ে আমার কাছে এখন বন্ধুর জীবনের দাম অনেক বেশি। একটি মৃত্যু পথযাত্রী মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে আমার বাড়ি থাকাটা খুব বেশি জরুরি নয়। তাই মেয়েদের জানিয়ে আমি বন্ধুকে দেখতে গেলাম। ওরা আমার ব্যবহারে একটুও অখুশি হলো না। ওখানে থেকে জানতে পারলাম দু’বোনের পোস্টিং হয়েছে। আমিও অনেকদিন ধরে এখানে পড়ে আছি। আমার এই বন্ধুটি ভাগ্যহত মানুষের একজন। যার সবকিছু থাকতে কিছুই নেই। ছেলেরা তার খবর নেয় না। স্ত্রী তাকে ছেড়ে অনেক আগেই চলে গেছে। এক মানবেতর জীবন যাপন করছে সে। আমাকে পেয়ে ও দারুণ খুশি হলো। ওর ভালোবাসার টানে আমি ওকে ছেড়ে আসতে পারছি না। কীভাবে একটা অসহায় মানুষকে এভাবে ফেলে আসা যায়!
আগের চেয়ে ও কিছুটা সুস্থ হয়েছে ঠিকই তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। আমিও তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যদি আর কিছুটা দিন থাকতেও হয় থেকে যাব। ওকে সুস্থ করে নিয়েই ফিরবো। বেশ কিছুদিন ধরে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার কথা ভাবছি। এতদিন পরিবেশ ছিল না তাই নিতে পারিনি। এবার নিয়ে যাব। হাতেও টাকাকড়ি তেমন একটা নেই। সামান্য যা নিয়ে এসেছিলাম তা-ও প্রায় শেষ।
কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ওকে নিয়ে গেলাম। তখন বেলা দুইটা। লাঞ্চ আওয়ার চলছে। পুরো হাসপাতাল ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আমি আর ও আউট ডোরের পাশে দুটো চেয়ারে বসে আসি। কম বয়স্ক একজন নার্স এসে বলল, ডাক্তার দেখাতে চান। আমি বললাম, হ্যাঁ। তাহলে আসুন। টিকিটটা দিন। আমি বললাম- মা, আসতে দেরি হয়েছে। টিকিট কাউন্ডার বন্ধ। তাই টিকিট কাটতে পারিনি। মেয়েটি বলল, আপনি বসুন। আমি দেখছি। আমি আর ও বসে রইলাম। মেয়েটি একটি টিকিট নিয়ে এলো। টিকিটের জন্য ওকে দশটা টাকা দিলাম। মেয়েটি বলল, আপনারা আমার সাথে আসেন। আমি সাহস করে বললাম, এখন তিনটে বাজে। উনি কী রোগী দেখবেন। মেয়েটি হেসে দিয়ে বলল, ম্যাডাম কখনো রোগী ফিরিয়ে দেন। যতক্ষণ তিনি হাসপাতালে আছেন রোগী দেখবেন। তার বলাই আছে রোগী আসলে যেন ফিরে না যায়।
আমি আর ভিতর গেলাম না। ওকেই পাঠিয়ে দিলাম। রোগী ও। সবই যখন বলতে পারছে আমার যাবার কী প্রয়োজন। সাময়িক কিছু ওষুধপত্র লিখে ডাক্তার আমাকে ডেকে পাঠালেন। কারণ ওর বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। আমি সালাম দিয়ে ভেতর প্রবেশ করলাম। মেয়েটি আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। আমি চিনতে পারলাম ওকে। রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। এবার আমি মুখ ফুটে বললাম, আমার স্বপ্ন জয়ের আনন্দ আমাকে এভাবে তিনি দেখাবেন আমি কখনো ভাবতে পারিনি। আমার বন্ধু আশরাফকে বললাম- আশরাফ, ও আমার মেয়ে আয়মান। আশরাফ আমার দিকে ফিরে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
হঠাৎ বাড়ি থেকে ফোন এলো। তুমি সেখানেই থাকো না কেন কালকের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে। আমি আয়মানের মায়ের কথায় অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লাম। কী এমন হয়েছে? কেন এত জরুরি তলব? আশরাফকে আয়মানের হাতে দিয়ে বললাম- ও আমার বন্ধু। আজ থেকে তোমার বাবা। যার ছেলেমেয়ে থেকেও নেই। তুমি ওর দেখাশুনা করবে। আমি বাড়ি থেকে ফিরে তোমার সাথে এ বিষয়ে কথা বলব। আমি ব্যস্ত হয়ে ফোন করলাম আনজুমের মাকে। তুমি তো কখনো এরকম করো না! আজকে তাহলে কেন? ও বলল, তুমি তাড়াহুড়ো করো না। সবই ঠিক আছে। কিছু চমক রেখেছি তোমার জন্য। মনে মনে ভাবলাম, কী চমক আবার দেখায়। যে বারেই চমক দেখিয়েছে কিছু-না-কিছু ঘটিয়েছে। তাই এবারের চমক নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়লাম।
রওনা হলাম বাড়ির উদ্দেশে। পথ যেন কিছুতেই ফুরাতে চায় না। সন্ধ্যে হয়ে এলো। ঠিক এমন সময় নিজ জেলায় পা রেখেছি। আমার আর বাড়ির মাঝে দূরত্ব এখনো পাঁচ কিমি। শরীরে আর সইছে না। বড়ই ক্লান্ত লাগছে। মনে হচ্ছে পথে কোথাও বসে পড়ি। কিন্তু চমক আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সন্ধ্যার কিছু সময় বাদে আমি বাড়ির দরজায় পৌঁছলাম। তাকিয়ে দেখি, বাড়ির ভিতর কোনো আয়োজন চলছে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। কী উপলক্ষ্যে এই আয়োজন। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই সোজা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আনজুম আমার কাছে দৌড়ে আসল। সাথে ওর কয়েকজন বান্ধবী। যারা সদ্য ডাক্তার হয়েছে। যাদের নাম আমি ওর কাছে আগেই শুনেছি। আনজুমের সাথে আমাদের জেলাতেই সবার পোস্টিং। কিছুটা অবাক হলাম। অবশ্য এর নেপথ্যের কাহিনিও জানতে পারলাম। সাথে এই শহরের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। আমি সবাইকে দেখে চমকে গেলাম। এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না, আসলে কী হচ্ছে।
গফুর মিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান। আমার অত্যন্ত সৎজন। তিনি আমার হাত ধরে জানালেন- ভাই, আমরা একটি বিশেষ উদ্দেশে এখানে একত্রিত হয়েছি। আমি বললাম- ভাই গফুর, ওভাবে না বলে সহজে আমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ভাই, না বোঝার কিছুই নেই। তোমার মেয়ে ওর বান্ধবীদের নিয়ে আমার কাছে গিয়েছিল। যাতে আমরা সবাই মিলে এলাকার গবির-দুখী অসহায় মানুষের জন্য কিছু একটা করি। তাই ভাবলাম, এলাকার বিত্তবানদের নিয়ে আমরা একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবো। যেখানে স্বল্প ও সাশ্রয়ী মূল্যে মানুষ চিকিৎসা পাবে। যারা অসহায় তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হবে। আমি বললাম, এতো দারুণ খবর। আমি বললাম- গফুর ভাই, এই দারুণ আইডিয়াটা কার মাথা থেকে এলো। গফুর হেসে দিলে বলল, যার স্বপ্ন ছিল মানুষের মন জয় করার। আমি তখনি বুঝতে পারলাম।
তবুও আমি গফুরকে বললাম, এতো কম টাকার ব্যাপার নয়। গফুর হেসে দিয়ে বলল, ওরা যদি বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিতে পারে। আমরা সবাই মিলে একটা হাসপাতাল করে দিতে পাবো না? আমাদের অন্তরটা কি এতই সংকীর্ণ হয়ে গেছে? আল্লাহ তো ধনসম্পদ কম দেননি। মানব সেবায় কিছুটা দান করে গেলাম।