লেখাটি পড়ার পর আমি চমকে উঠি ! তারপর আবার পড়ি এবং কান দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। আদতে, যে-কোনো লেখাই আমাকে পড়ার সাথে-সাথে কান দিয়ে শুনতে হয়। অন্যতায়, লেখার বিষয়বস্তুটি আমার মনের উপর দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়না।

বলছি একটা কবিতার কথা। কবি সরকার আমিনের ‘আমিন খেলতে গেছে’ কাব্যগ্রন্থে ‘কেউ নেই তোমার?’
নামিয় এই কবিতাটির কয়েকটা লাইন পড়া যাক—
‘হঠাৎ করে মরে গিয়ে বীরত্ব দেখাতেই পার/ কিন্তু ভাবার চেষ্টা করো/ তাতে বাতাসের কিচ্ছু যায় আসে না/ নক্ষত্র ঠিক আগের মতোই মুখচোরা ভঙ্গিতে লুকিয়ে থাকবে আকাশে/ দলছুট কিছু ঢেউ অকারণে গোত্তা খাবে নিঃসঙ্গ কোনো নৌকার সাথে/ কেবল তোমার গোপন সেলফোনে বেজে ওঠবেনা অন্তরঙ্গ কলার টোন/ এই বেকুব; ওঠ ঘুম থেকে; মুখ ধুতে যা/নিজে থেকে মরে যাওয়াটা একটা বোকামি/ কারণ কিছুকাল পর এমনিতে মারা যাবে তুমি।’

এখন কে না-বুঝে থাকবেন, আমার চমকে উঠা এবং কবি’র বলার বিষয়টি। আমরা নিশ্চয় জানি যে, প্রত্যেকটি বিষয় বা ঘটনার দুটো পিঠ থাকে— প্রথমটি আনন্দদায়ক, দ্বিতীয়টি দুঃখজনক। দুঃখজনক কোনো কিছুই আমাদের কাম্য নয়। তবুও আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে এলোমেলো করে দিয়ে কিছু-না-কিছু দুঃখজনক বিষয় ঘটেই চলেছে। যদিও অনাগত সময়ের উপর আমাদের হাত নেই, তা সত্ত্বেও, আমরা আমাদের মেধা, বিবেক, পরিশ্রম ও কর্মপ্রচেষ্টা দিয়ে অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে পারি— যা অনাগত সময়ের উপর আমাদের লক্ষ্য বিস্তারে সক্ষম। এইসব চিন্তা-ভাবনা বা প্রচেষ্টা আমাদের সকলের লক্ষ্য হওয়া কর্তব্য হলেও, কেবল যাদের নিজের জীবনের প্রতি গভীর প্রেম আছে, যারা কোনো কিছুতেই পরাভব মেনে নিতে পারে না, যারা নিজের অনিঃশেষ আত্মবিশ্বাসের উপর স্থির থেকে বার-বার সফল হবার চেষ্টা করে, তারাই মেনে চলে।

এখন একটু বিরতি নিয়ে, আমাদের পাঠিত, কবিতার শেষ চরণটিতে ফেরা যাক—

‘কারণ কিছুকাল পর এমনিতে মারা যাবে তুমি।’ আমদের সবারই জানা আছে— মৃত্যু জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়। এটা স্বীকার করার কোনো উপায় আছে কি— আমি, তুমি, আমরা কোনো দিনই মারা যাবো না ? উত্তরটা যদি ‘না’ হয়, তবে এই যে জীবন এবং মৃত্যুর মাঝখানে এই বেঁচে থাকা, এটা কী শুধুই খাওয়া-দাওয়া আর ঘুমানোর জন্যে ? একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখা যাক, উত্তরটা কী আসে !

হয়তবা সেখান থেকেই পাওয়া যেতে পারে আমাদের এই জীবন যাপনের কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য বা তার লক্ষ্য। জীবনে আনন্দের প্রয়োজন আছে। আর এই আনন্দ বেঁচে থাকার ভেতর শাখা-প্রশাখা মেলে রেখেছে । একটা ঘটনা বলা যাক, কিছুদিন আগে আমি ভীষণ হতাশায় ভুগছিলাম। আমার কাছে জীবন থেকে মৃত্যু ঢের কাম্য ছিল। আমি প্রভূত মনস্তাপ নিয়ে এক বিকালে হাঁটতে বেরোই, একা। রাস্তার দু’ধারে দেখতে পাই অজস্র বনোফুল। বড়-বড় চোখ নিয়ে অপরুপ ঢঙে তাকিয়ে আছে আমারই দিকে। সামনে এগুতেই দেখি অনেকগুলি রঙিন প্রজাপতি এ-ফুল থেকে ও-ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। তারপর, আমি স্থির হয়ে বসে পড়ি রাস্তার ঢালুতে। সামনে বিস্তৃত ধানিজমি, একটানা সবুজের প্রলেপ; এইসব দীর্ঘসবুজের বুকে যেন আঁকা, একটি প্রশস্ত-জলনালি— অতিদূর গিয়ে মিশেছে। আমার দৃষ্টি তার শেষ খুঁজে পায় না। আমি ওঠে দাঁড়াই। হাঁটতে থাকি। সবুজপ্রলেপটির শেষাংশে যাকে একটি ছোট নদী বলে বিভ্রম হয়— নীরবে, তার পাড়ে এসে বসি। অসংখ্য চেনা-অচেনা পাখি ঢালুতে পোঁতা বাঁশ, ডালের ডগায় বসে-বসে দারুণ এক নির্লিপ্ত মন আর উৎসুখ দৃষ্টি নিয়ে একে-অপরে ভাবের বিনিময় করছে। মাঝে-মাঝে দু-একটা এদিক-ওদিক ফস করে উড়ে যাচ্ছে । কখনো-বা হঠাৎ একটা পাখি জলে ডুব মেরে কিংবা জলে উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠোঁটের আগায় ধরে আনা ছোট্ট একটি মাছ শিকারের আনন্দ চিকনসুরে সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছে । এইসব দেখে আমি নিজের অজান্তেই হেসে উঠি । আনন্দের ঘোরে নিজেকে আবিষ্কার করি— সতেজ,অফুরন্ত। বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পাই। আরো বাঁচতে ইচ্ছে করে। মনে-মনে ভাবতে থাকি— বেঁচে আছি বলেই তো জলনালিটির মতো এঁকেবেঁকে, হৃদয়ের মাঝে দূর থেকে বহুদূর কোনো প্রান্তে মিশে যাচ্ছে প্রকৃতির এই আনন্দের শীতল-উৎপাত।

যাইহোক, কবির কথার প্রসঙ্গ ধরে আমি মৃত্যুর কথা বলতে যাচ্ছিলাম। মাঝখানে কথার খেই হারিয়ে কোথায় যেন চলে গেলাম ! আচ্ছা, আপনারা কী কখনো কোনো পশুপাখীর আত্মহত্যার খরব শুনেছেন? আমি কিন্তু শুনিনি। যদি কেউ বাজপাখীর জীবনবৃত্তান্ত জেনে থাকেন, দেখবেন— তাদের জীবনকাল মোটামুটি ৭০ বছর। জীবনের মাঝপথে তাদের ঠোঁট আর পায়ের নখগুলো যখন দীর্ঘ হয়ে বেঁকে যায়, তারা আর শিকার করতে পারে না ! তাদের এই মাঝ-জীবনের মুমূর্ষতা এবং ক্লিষ্টতায় ন্যুব্জ হয়ে পড়া থেকে পরিত্রাণ পেতে, কিংবা বেঁচে থাকার অদম্য প্রয়াসে, কোনো পাথরে ঘষে-মেজে ঠোঁট আর নখগুলোকে পূর্ববৎ তীক্ষ্ণধার করে শিকারের মাধ্যমে, প্রবল দাপটের সাথে তারা শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এই হল বেঁচে থাকার নিগূর প্রয়াস!

বাজপাখির কথাটা আমার মনে পড়ল এইতো সেদিন, যখন ফেজবুকে দেখলাম একটি মেয়ে তার প্রবাসী-স্বামীর সাথে মনমালিন্যের জের ধরে কোনো এক হাসপাতালের পাঁচতলা থেকে সদ্যজাত বাচ্চাটিকে ফেলে দিয়ে, নিজেও লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করল। এই ধরনের খবর প্রায়শই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়।
বড় আপসোস লাগে, বড় অশান্তি লাগে মানুষের এইসব নির্বুদ্ধিতা দেখে। একটু নিরপেক্ষভাবে ভেবে দেখলে কেমন হয়— যে যা কখনোই ফেরত দিতে পারবে না, বা সেটা তার সাধ্যের বাইরে, তার জন্যে এমন অফেরতযোগ্য কোনোকিছু বিসর্জন দেয়া নিরেট বোকামি বৈ কিছু নয় কী ? যে তার আত্মহত্যার কারণ, সে যেমন পরোক্ষভাবে দোষী, আত্মহত্যাকারী ও সমান দোষী! শুধু সমান বলব কেনো, আমি হলপ করে বলতে পারি, সে হাজারগুণ বেশি অপরাধী। অপরাধী এইজন্য বলব যে, সে নিজের সাথে সর্বোচ্চ অবিচার করেছে।আফসোস, অন্ততপক্ষে বাজপাখীর জীবন থেকেও যদি যৎসামান্য শেখা যেতো। আমি মনে করি, আত্মহত্যাকারী যে-ই হোক, সে জীবনের কাছে প্রতারক ও ধোঁকাবাজ। কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম, বইটির নাম এখন মনে পড়ছে না ‘আত্মহত্যাকারী চূড়ান্ত ও পরম শয়তান। যে লোকটি নিজেকে খুন করছে, সে আসলে পুরো একটি ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস করছে।’ আমার লজ্জা হয়, এইসব খবর পড়তে বা শুনতে । যেখানে এই পৃথিবীতে কোনো পশুপাখী নিজেকে নিজে খুন করার সংবাদ আমরা পাই না, সেখানেই কিনা এমন নিকৃষ্ট কাণ্ড! তাও আবার সৃষ্টির গৌরবে গৌরবান্বিত মানবজাতীর ভেতর।
ঘটনাটি আদ্যন্ত পত্রিকায় পড়ে, এখন আমি নিজেকেই নিজে একটা প্রশ্ন করে উঠলাম, এই যে মেয়েটি আত্মহত্যা করল, তাকে পড়াশুনা শিখিয়ে, আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলে বিয়ে দেয়া কি তার বাবা-মা’র কতর্ব্যের মধ্যে ছিল না ? আমার মনে হয়, ঘটনার কারণ শোনার পর, যদি মেয়েটি আত্মনির্ভরশীল হতো, তবে এই ছোট্ট নিস্পাপ বাচ্চাটি এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হতো না। বরং সে দিব্যি তার মায়ের কোলে খেলেধুলে বড় হয়ে উঠত। আমরা প্রার্থনা করব, আর একটি জীবনও যেনো এই সুন্দর পৃথিবী থেকে এভাবে হারিয়ে না যায় । সবার মাঝেই জীবনের বোধ সঞ্চার হোক। এই পৃথিবীর আলো, পানি, বাতাসে সমান ভোগাধিকার সঞ্চালনের মাধ্যমে স্বাভাবিক মৃত্যুতেই যেনো আমাদের আরেকটি উত্থান হয়। একটি অনন্ত যাত্রার শুভ সূচনা হয়।

প্রিয় কবি সরকার আমিনের আরেকটি কবিতার মাধ্যমে ইতি টানতে চাই—

‘এক কাজ করো/ দুঃখগুলো প্যাকেট করে প্রশান্ত মহাসাগরে ফেলে দাও/ পেছনে সবকটা জাহাজ দাও ডুবিয়ে মনে মনে/ আগুন ধরিয়ে দাও প্রতিটি অস্ত্রাগারে/ ছাই থেকে জন্ম নিক নতুন হাওয়া নতুন আদম/ তারপর সংগম/ হতে পারে প্রাণের খেলা/আরেকটা কাজ করতে পার/ নিজেকে মেলে ধরো জরাসন্ধ জলে/ধুয়ে ফেলো চুল,দাঁত,নখ,নুনু,ঠোঁট/অতঃপর নিস্পাপ মনে হেঁটে যাও ঘর কিংবা শ্মশানের দিকে’

জয় হোক মানবজন্মের…