তখন আশ্বিন মাস। ধানের শিষে দুধ এসেছে। সকাল-সন্ধে রোদের রংও সোনালি হতে শুরু করেছে। মা বলছে, চাঁদ দেখে আয়। আজ শেষ রোজা। কাল ঈদ।

আনন্দে আটখানা হয়ে ছুটছি। ভারি মজা! ভারি মজা! কাল ঈদ! ঈদের নামাজ পড়তে যাব। গ্রামের ছেলে-বুড়ো অনেকেই ছুটছে চাঁদ দেখতে। গ্রামের বাইরে তাহালাডাঙা নামে একটা উঁচু ঢিপিতে উঠে চাঁদ দেখব। বাঁকা, ক্ষয় হওয়া কাস্তের মতো একফালি চাঁদ ভেসে উঠবে। একমাসের সিয়াম শেষে ঈদের সওগাত নিয়ে উদয় হবে চাঁদ। ঘরে ঘরে ঈদের সালাম করতে যাব দলবেঁধে। সবার কাছে দোয়া নিতে হবে। ঘরে ঘরে কতরকমের খাবার তৈরি হবে। সবাই খাবার জন্য বারবার বলবে। ঘুরতে ঘুরতে অনেক বেলা হয়ে যাবে।

ভাবতে ভাবতে চোখ পানিতে ভরে গেল। তখন বারো বছরের বালক। অ্যালজেব্রা করতে ভয় পাই ঠিকই, কিন্তু ইতিহাসে তো বেশ সড়গড়। বাবার “বিষাদসিন্ধু” পাঠ শুনতে শুনতে কারবালা, ফোরাত নদী, এজিদ, জয়নাব, হোসেন-হাসেন সকলেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। রোজার ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে দাদা ও দাদির খাবারে ভাগ বসাই। রোজা রাখার সংকল্প করেও দুপুর গড়ালে আর পেরে উঠি না। হাফ-রোজা নিয়েই ইফতার করি। দোয়াটা শিখিয়ে দাও না দাদি?

দাদি বারবার বলে দেয়, তবু রোজ ভুলে যাই। মুখস্থ করি, আবার ভুলে যাই। প্রথমটা কী দাদি?
তাহালাডাঙায় অনেকের সঙ্গে আকাশে চেয়ে তন্নতন্ন
করে চাঁদ খুঁজছি, কোথাও দেখছি না। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। অবশেষে ফসির-ভাই-ই প্রথম দেখতে পেল। বলল, ওই তো চাঁদ! আস্সালামু আলাইকুম!
আমরাও সকলে মিলে বলতে লাগলাম : আস্সালামু আলাইকুম।
চাঁদ দেখে সে কী আনন্দ! সবাই প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে এল। সবাই বলতে লাগল : কী মজা! কী মজা! কাল নতুন জামা প’রব!

আমার যে নতুন জামা নেই! আমি কী প’রব? একছুটে ঘরে এসে দেখি, দাদি নামাজ শেষ করে তার জায়নামাজের পাটিখানা তুলে রাখছে। মা তখনও নামাজ পড়ছে। আমি অপেক্ষা করতে পারলাম না, মায়ের উপরে আছড়ে পড়লাম। কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলাম, সবাই কাল নতুন জামা প’রবে, আমার জামা কই? আমি কী প’রব?

মা নামাজ শেষ করে দু’চোখ মুছল। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, আমরা বকরীদে কিনে দিব। এখন যে ধান উঠেনি বাবা! কী দিয়ে কিনব?

আমি জেদ ধরে কাঁদতে লাগলাম নতুন একটি জামার জন্য। পরনের একটি হাফ-প্যান্ট আছে যা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখি। তাতে কোনোরকম চলে যায়। জামা বলতে কিছুই নেই। পাড়ার এক মহিলা মুম্বই শহরে ঝি-এর কাজ করতে গিয়ে আনা পুরোনো কালো রঙের একটি জামা দিয়েছিল। সেটি গায়ে দিয়ে আমি স্কুলে যাই। ওইটিই প’রে আমাকে ঈদের ময়দানে যেতে হবে? সবাই যে নতুন নতুন প’রবে!

কিছুতেই নিজেকে মানাতে পারলাম না। বহুক্ষণ কেঁদে কেঁদে চোখ দুটো লাল হয়ে গেল। দাদি বলল, আমাকে জামা কিনে দিবে তবে পরবের পর। দাদা বলল, ঘুটিং কুড়িয়ে বিক্রি করে তবেই কিনে দিবে।

কাঁদতে কাঁদতে ঈদের ময়দানে একধারে বসেছিলাম সেদিন। নামাজ শেষে মোনাজাত করার সময় বারবার বলছিলাম : হে আল্লাহ, আমাকে একখানা নতুন জামা দাও! আমি আর কিছু চাই না!

সেদিন বাড়ি ফিরেও ঘরের ভেতর প্রায় আত্মগোপন করে ছিলাম। কাউকেই ঈদ মোবারক জানাতে যাইনি। অভাবের সংসারে সামান্য যা-কিছু আয়োজন হয়েছিল তা মুখে তুলেও দেখিনি। একটি জামার জন্য এত অভিমান কেন? “হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান” তখন পড়ে ফেলেছি, কিন্তু মহান হবার শিক্ষা পাইনি। ঈদের খুশিকে দুঃখের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে আমি অন্তর্হিত অসহিষ্ণু বালক হয়ে উঠেছি।

আজও যেখানেই থাকি, ঈদের দিন সেই ময়দানেই নামাজ পড়তে যাই। আর সেই জায়গাটিতেই অভিমানাহত বারো বছরের বালকটিকে একটি পুরোনো রংচটা জামা গায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। চোখ ছাপিয়ে যায় পানিতে। ওই বারো বছরকে কিছুতেই আমি বড়ো করে তুলতে পারি না।