মতিউর রহমান মল্লিক (১৯৫০-২০১০)কে নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিল তাঁর জীবদ্দশাতেই। কিন্তু সময় আমাকে সেই সুযোগ করে দেয় নি। আজ অস্তবেলায় বসে অস্তমিত এই নক্ষত্রকে খুঁজতে বসে কতোটাই বা নাগাল পাবো আল্লাহই ভালো জানে। স্মৃতি অনেকটা পারদের মতো। উপযুক্ত লগ্নের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঠিকই গলিয়ে পড়ে অবলীলায়। ছাত্রজীবনের সবুজ তারুণ্যের দীপ্তির কাছে পশ্চিমা ঝড়ের বেগে ধ্রুপদী আবেগ যেমন ম্লানিমায় ভোগে তেমনি ওই ছেঁড়াপালেই জুড়েছিলাম হয়তোবা মায়াচর। সময়ের সামান্য জলোচ্ছ্বাসেই যা হারিয়ে যায় অতলে। এই কঠিন সত্য বোঝে না বলেই তরুণেরা রঙীন ফানুসে বুঁদ হয়ে থাকে। মল্লিক ভাই এ ধরনেরকথা বলতেন প্রায়ই। গ্রামে যখন ছিলাম তাঁর গানের টানে বিমোহিত ছিলাম। গ্রামে গঞ্জে ইসলামী সঙ্গীত বলতে ‘গজল’ বোঝানো হত। এই গজল কিন্তু ইমাম গাজ্জালি, রুমি, হাফিজ, আত্তার কিংবা ওস্তাদ আমির খসরুর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নয়।যে সঙ্গীত হালকা মেজাজের কিংবা লঘু হলেও গম্ভীর রসের মিশ্রণে সিক্ত অনন্য শৈলীতে ঋদ্ধ। আধুনিক পরিভাষায় যাকে ‘তারানা’ বলা হয় সেগুলো আসলে এরফানি বা আধ্যাত্মিকতার রসে জারিত কিছু পংক্তিমালা। আলাসতু বিরাব্বিকুম-এর চেতনায় লালিত স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির মিলনাকাঙ্ক্ষার ভাবাবেগে সিক্ত সেইসব গজল।কিন্তু এই গজল আল্লাহ কিংবা নবীর শানে হামদ নাত বা নাশিদ কিংবা ইসলামের মহান কোনো ব্যক্তিত্বের জীবন অথবা টুকরো জীবন কাহিনীর আবেগি সুরেলা প্রকাশমাত্র। ওয়াজ মাহফিল, খানকা, দরবারের মতো ইসলামি জলসায় সাধারণত এই গজল গাওয়া হতো।প্রকৃতপক্ষে ভাব-ভক্তিমূলক ওই গানগুলোকেই গজল বলে জানতাম আমরা। আমাদের গণমাধ্যমগুলোতেও কিন্তু এক ধরনের মিউজিকশূন্য ‘ভক্তিমূলক” গান হিসেবেই পরিবেশিত হতো। গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ মিউজিককে ‘অপবিত্র’ কিংবা ‘পবিত্রতা’ পরিপন্থি ভাবতেন কিনা জানি না। ধর্মীয় কোনো বিশেষ দিবসে এইসব মিউজিকশূন্য ভক্তিমূলক গান বাজানো হতো। এগুলোকে গজল বলা হতো না। গজল সম্পূর্ণ ভিন্ন-কথায়, আঙ্গিকে, সুরে, আবেগে। ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠির মাঝে এই গজলের গ্রহণযোগ্যতা ছিল ইবাদাতের মতো মানে শুনলে কিংবা গাইলে সওয়াব হবে-এরকম পর্যায়ের। এই গ্রহণযোগ্যতার জন্য কিনা জানি না,উপর্যুক্ত মনীষীদের পর আরবি,ফার্সি, উর্দু, হিন্দি ইত্যাদি ভাষার মতো বাংলা ভাষাতেও অনেকেই গজল লিখতে উদ্বুদ্ধ হলেন। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও লিখেছেন এরকম অসংখ্য গজল। দুই গজলের মাঝে অবশ্য মিল এবং অমিল দুটোই আছে। উভয় শ্রেণীর গজলেই প্রেম মুখ্য। এরফানি গজলের প্রেম অপার্থিব আর আধুনিক গজলে অপার্থিব প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পার্থিব প্রেমের রসও। যার ফলে তরুণদের মাঝেও এই গজলের জনপ্রিয়তা বেশ চোখে পড়ার মতো।
আমার শৈশবে গ্রামীণ পর্যায়ে ক্যাসেট প্লেয়ার, টেপ-রেকর্ডার কিংবা টেলিভিশনের প্রচলন ততোটা হয়ে ওঠে নি। সে কারণে মাহফিল কেন্দ্রিক গজলগুলো অহরহ বাজতে তেমন শোনা যেত না। ক্যাসেট প্লেয়ারসহ টেপ রেকর্ডার ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্যাসেট শুনতে অভ্যস্থ ছিলাম। শুনতাম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজও। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। গ্রামের অগ্রজ প্রতিবেশিমোশাররফ হোসেন ভুঞার সঙ্গে ছিল আমার সুন্দর বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক। বন্ধুত্বে তিনিই ছিলেন অগ্রগামী। তবে আমার এক কাজিন-নাম নাইবা বললাম-এ ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রাণীত করেছিল আমাকে। সাহিত্যের পাশাপাশি সঙ্গীত-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আমাদের মন-মাননিক সাম্য ছিল তখনও। আমরা দেয়াল পত্রিকা করতাম গ্রামের সবকটা হাইস্কুলে। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দ্বৈত কবিতা লিখতাম মানে এক লাইন আমার এক লাইন ওর কিংবা একই লাইনে দুজনের শব্দ প্রয়োগ ইত্যাদি। কবি আহসান সাইয়্যেদের লেখাও ছিল সেইসব দেয়ালিকায়।কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমানসহ এ পাড়ার তরুণ কবিদের পাশাপাশি, বুলবুল সরওয়ার, সোলায়মান আহসান, আসাদ বিন হাফিজের কবিতার সঙ্গে তখন থেকেই পরিচয় আমার। সেই সুবাদেই আমি সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য বুঝতে কৌতূহলী হয়ে উঠি।এক বন্ধুর ক্যাসেট প্লেয়ার দীর্ঘদিন ছিল আমার কাছে। আরেক বন্ধু মূলত অগ্রজ-সাইফুল ভাই-য়ের কল্যাণে মল্লিক ভাইয়ের গানের সঙ্গে পরিচয় হয়। বাদ্য-বাজনা ছাড়া কী অসাধারণ কথায় সমৃদ্ধ গান-একেবারে ভিন্ন মাত্রা, আঙ্গিক ও সুর। সমবেত কণ্ঠেই ছিল বেশি। ইকো দিয়ে গাওয়া সেইসব গানকীরকম একটা স্পন্দন জাগাতো হৃদয়ের গভীরে। রবীন্দ্র নজরুল শুনে অভ্যস্থ এই আমার মনের শুকনো অথচ পলিময় চরেও এই নতুন ধারার গান যেন চারা গজানোর মতো সবুজ হয়ে উঠলো। আমি শুনতে থাকলাম ক্যাসেট, শুনতেই থাকলাম।একর পর এক। খরায় মাটিচাপা ফসলের বীজ হালকা বৃষ্টির আদুরে পরশ পেলে যেভাবে জেগে ওঠে তেমনি করেই মনে হলো আমার ভেতর জমে থাকা বিচিত্র শব্দ ধীরে ধীরে কবিতার পলিময় রসে অর্থবহ হয়ে ওঠার চেষ্টায় মাথা গজাতে লাগলো। ছড়া-গান-কবিতারা একে একে বেড়ে উঠতে লাগলো। যেন তারা আমাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ভেদ করবে আকাশের ছাদ।
মল্লিক ভাইয়ের গানের ক্যাসেট শুনে শুনেএই স্বপ্নিল প্রতিভার প্রেমে পড়ে গেলাম। সে সময় অবশ্য সাইমুমের ক্যাসেটই ছিল মল্লিক ভাইয়ের গানের ক্যাসেট। এর বাইরেও যে ছিল না তা নয়। তবে পুরো ক্যাসেট জুড়েই থাকতো মল্লিকের গান। দু-তিনটে গান অন্যদেরও থাকতো।
দুই ধারার গজলের বাইরে এ এক অনন্য গানের ধারা-যে ধারার সঙ্গে তখন পর্যন্ত মিল ছিল না অন্য কোনো সঙ্গীতের। ধ্রুপদী সঙ্গীত মানে শাস্ত্রীয় গান আর গজলের সঙ্গে মল্লিকের গান যে আলাদা বৈশিষ্ট্যের-সেটা যে-কোনো সচেতন শ্রুতিতেই ধরা পড়ে যেত।কিন্তু গানের ধারা যাই হোক-কীসে তার সাফল্য? আমার তো মনে হয় মনোসাম্য সৃষ্টির মাঝেই সঙ্গীতেরসাফল্য। সেখানে যন্ত্রের কিংবা তাত্ত্বিক-মন্ত্রের স্থান যেমন আছে তেমনি আবার খুব একটা নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। মল্লিকের গান শুনলে যে-কেউ মনে করবে এ যেন আমার মনেরই কথা বলছে। সে কারণেই মল্লিকের গান শ্রোতার মনের আঙিনা দখল করেছে সহজেই। মনোরাজ্যে এই সংক্রমণ প্রক্রিয়ায় যন্ত্রের প্রয়োগ কই! যে যন্ত্র গানের শ্রুতিকে প্রস্তুত করে মল্লিকের গান সেই যন্ত্রকে উত্তীর্ণ করে গেছে কথার ঐশ্বর্যে।
মল্লিক প্রেমে হাবুডুবু আমি যখন ঢাকা ভার্সিটির বাংলা বিভাগে ভর্তি হই, তখন পরিচয় ঘটে আমার সহপাঠী সালেহ মাহমুদের সঙ্গে। সে একাধারে কবি এবং কথাশিল্পীও। কবিতার সঙ্গে আমার কিছুটা ঘর-গেরস্থালির ইঙ্গিত পেয়েসে আমাকে একদিন নিয়ে গেল আমার স্বপ্নের রাজ-আবেগ মল্লিক ভাইয়ের কাছে ‘কলম’ অফিসে। মল্লিক ভাইকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক বাজার মতো আমার ভেতর ক্যাসেট বাজতে শুরু করে দিলো একের পর এক: আম্মা বলেন ঘর ছেড়ে তুই যাস নে ছেলে আর… এ আকাশ মেঘে ঢাকা রবে না… ঈমানের দাবী যদি কোরবানি হয়… সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও… ইত্যাদি। এসব গান সে সময় কতোটা উদ্দীপনা সৃষ্টি করতো চিন্তা-চেতনায় তা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ ব্যাপার।সেই দুর্বার চেতনার ঢেউ আমার মনের ভেতর এখন তোলপাড় সৃষ্টি করছে। আমি কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।কথা বের হচ্ছিল না মুখ থেকে। আল মাহমুদীয় আবেগ খেলে যেতে লাগলো প্রাণের গহীনে: “কোনদিন আমি দেখব কি কোনকালে সেই মুখ সেই আলোকোজ্জ্বল রূপ”।কোনোদিন আমি মল্লিক ভাইকে দেখবো-এরকম চিন্তাও ছিল না আমার।এখন আমি তাঁর সামনে, বই আর পত্রিকাসহ বিচিত্র হাবিজাবিতে ভরাতাঁর এলোমেলো টেবিলের সামনের চেয়ারে, বসে। সালাম দিলাম। মল্লিক ভাই একবার আমার দিকে তাকালেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন। মল্লিক ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে করতে আমার পরিচয় দিল মাহমুদ।কোনো আবেগ নেই। কোনো কৌতূহল নেই। নতুন মেহমানের প্রতি বাড়তি কোনো ভালোবাসার প্রকাশও নেই। স্বপ্নের ভুবনে যে কিনা কল্পিত ছবি এঁকে এঁকে সাজিয়েছে হৃদয়ের ক্যানভাস সেই শিল্পীর প্রতি কোনো মোহ নেই। আমি অবাক হয়ে গেলাম।কিছুটা আক্ষেপও যে মনের সমুদ্রে অযথা ঝড় তোলে নি তা হলফ করে বলা কঠিন। নাশতা করলাম। কলম পত্রিকার একটা কপি দিলেন আমাকে। বিদায় নিয়ে ফেরার সময় বললেন: ‘লেখা দেবেন’। আমি যেন লেখা দেয়ার জন্য সুদূর গ্রাম-গঞ্জ, ঢাকা ভার্সিটি ক্যাম্পাস, টিএসসি মাড়িয়ে ওনার অফিসে এসেছি আর কি! অথচ বললাম: জি, ঠিক আছে মল্লিক ভাই! নাম ধরে এই প্রথম মল্লিক ভাইকে সরাসরি ডাকলাম। ভাসা কপাল আর শ্যামল কপোলের প্রান্তসীমা জুড়ে শ্মশ্রুর কালো কালো খোঁচা ঘাসবিচালির মতো। মাথার পেছন দিকে আঁচড়ানো হালকা লম্বা চুল আর গায়ে হাফ হাতার সাধারণ একটি ফতোয়া। সব মিলিয়ে স্মার্ট যদিও তবু রাস্তাঘাটে দেখা হলে নিশ্চয়ই হকার কিংবা রিকশাচালক না ভাবলেও অন্তত ‘মল্লিক ভাই’ ভাবতে কষ্টই হতো আমার। শেখসাদী’র বহুলশ্রুত গল্পটির কথা মনে পড়ে গেল: পোশাকের জীর্নতার কারণে যিনি সমাদৃতি পান নি। পরে পোশাকের আভিজাত্য নিয়ে সাদরে গৃহীত হলেতিনি সকল খাবার জামার পকেট, আস্তিনের মধ্যে ঢেলে দিয়েছিলেন বলে বর্ণনায় পাওয়া যায়।সবক পেলাম: প্রতিভা পোশাকে থাকে না, থাকে মেধা ও মননে। চেয়ার ছেড়ে উঠে অফিসের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন আমাদের। যেন আমরা কোনো বিশেষ অতিথি! ভালোই লাগলো। মনের তারে সুর উঠলো: কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো, সে কথা তুমি যদি জানতে…