প্রতিদিন বিকালে যখন ক্লারা ঘুমিয়ে যেতো তখন দাদিমা হাইডিকে তার রুমে ডাকতেন। তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। দাদিমা হাইডির পড়া শুনতেন। দিন দিন তার পড়ার উন্নতি হতে লাগলো। কিন্তু দাদিমা লক্ষ্য করলেন হাইডিকে পুনরায় অসুখী দেখাচ্ছে।
“হাইডি, মনে হচ্ছে তুমি কোনো ব্যাপারে চিন্তিত। তুমি কি স্রষ্টাকে এ ব্যাপারে বলেছো “তিনি হাইডিকে জিজ্ঞেস করলেন।

“জি দাদিমা। কিন্তু আমি আর তার কাছে প্রার্থনা করবো না। কারন তিনি আমার কথা শোনেন না।?

“মানে! তুমি কেন এ কথা বলছো?”
“কারন সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রতিদিনই আমি তার কাছে একটা জিনিসই চেয়েছি কিন্তু তিনি আমার প্রার্থনা কবুল করেন নি। কীভাবে তিনি আমার কথা শুনবেন? এই ফ্রাংফার্টে কত কত লোক বাস করে আর তারা সবাই একই সময় প্রার্থনা করছে।”

“না হাইডি, স্রষ্টার ব্যাপারে এভাবে চিন্তা করাটা ঠিক নয়। অবশ্যই তিনি একই সময়ে সবার কথা শুনতে পান। তিনি তোমার প্রার্থনা শুনেছেন আর তিনি তোমাকে সাহায্যও করবেন। সম্ভবত তিনি তা করবেন ভিন্নভাবে। দেখ, স্রষ্টা জানেন আমাদের জন্য কোনটা ভালো। তুমি অবশ্যই প্রার্থনা করতেই থাকবে।”

এই বাক্যগুলো হাইডিকে কিছুটা আশাবাদী করলো। এদিকে দাদিমার ফ্রাংফার্ট ছেড়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো। তাই তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে গেলেন। তার যাবার বেলায় ক্লারা ও হাইডির মন খারাপ হয়ে গেলো।

হাইডি এখন আর দাদিমাকে পড়ে শোনাতে পারে না। তাই সে পরদিন ক্লারাকে একটি গলাপ শোনচ্ছিলো। গল্পটি ছিলো একটি ছোটো মেয়ে ও তার দাদিমাকে নিয়ে। গল্পে দাদিমা মারা যায়।

“দাদিমা মারা গেছেন।” হাইডি কেঁদে ফেলে।
“আমি আর তার কাছে যেতে পারবো না। তিনি এখনো একটাও রোল খেতে পারেন নি।”

“এটা শুধুই একটা গল্প।” ক্লারা তাকে বললো। “ইনি তোমার দাদিমা নন।”

কিন্তু হাইডি আরও জোরে কান্না শুরু করলো। সে বুঝতে পারলো যে, গল্পটি সত্য নয়। তবে সম্ভবত সে চলে আসার পর দাদিমা মারা গেছেন। ঠিক এমন সময় মিস রোমার রুমে ঢুকলেন। তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, “এডেলহাইড, তোমার কান্না বন্ধ কর। যদি গল্প পড়তে গিয়ে তুমি আবার কান্নাকাটি করো তবে গল্পের বইটি তোমার থেকে একেবারে নিয়ে যাব।”

হাইডি চুপ হলো। তাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। বইটি তার কাছে খুব প্রিয়। পড়ার সময় সে আর কখনোই কাঁদেনি।

প্রতিরাতে হাইডি যখন ঘুমাতে যেতো তখন আল্মের একটি ছবি তার কল্পনায় ঘুরপাক খেতে থাকতো। তার চোখে সবকিছু ভেসে উঠতো। পাহার-পর্বত, সবুজ গাছপালা, তুষারাবৃত পর্বতমালা, ছোট কাঠের ঘর আর দাদার ছবি। তিনি কি এখনো জীবিত আছেন? সে ঘন্টার পর ঘন্টা জেগে থাকতো। প্রায়ই সে ফুঁপিয়ে কাঁদতো।

দিনের পর দিন যায়। হাইডি জানতো না যে এটা বছরের কোন সময় ছিল। তার শরীর শুকিয়ে গেছে। তার চেহারার উজ্জ্বল রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

সেবাস্টিয়ান তাকে ভালো ভালো খাবার খাওয়াতেন। কিন্তু সে খেতে চাইতো না। সে তখনও স্রষ্টার কাছে প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রার্থনা করতো যেন তাকে আল্মে ফিরিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু একসময় তার আশা দিন দিন ক্ষীণ হতে লাগলো।