ঐদিন সন্ধ্যায় পিটার ছাগলগুলো ডরফ্লিতে নিয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ের পাদদেশে অনেক লোকের ভিড় দেখলো। তারা একত্রে দাঁড়িয়ে কিছু একটা দেখছে। এটা ছিল ঐ হুইলচেয়ারের ভাঙা অংশগুলো।

“তুমি কি মনে কর এটা বাতাসের কাজ?” একজন মহিলা বললেন।
“হতে পারে। আবার এও হতে পারে যে কেউ একজন এটা ঠেলে ফেলে দিয়েছে। সে বিপদে পড়বে। এটি অনেক দামী চেয়ার। ফ্রাংফার্টের ঐ ভদ্রলোক পুলিশও পাঠাতে পারেন ঘটনার তদন্দ করার জন্য।” এক ব্যক্তি উত্তর করলো।

পিটার তাড়াতাড়ি যেতে লাগলো। তার চেহারায় ভয়ের সুস্পষ্ট ছাপ।

ক্লারা প্রতিদিনই বেশি বেশি হাঁটতে লাগলো। সে তার দাদিমাকে আসার জন্য চিঠি লিখলো। চিঠিতে সে তার হাঁটতে পারার কথা কিছুই লিখেনি। দাদিমার কাছ থেকেও একটি ফিরতি চিঠি এলো। তিনি দুই দিনের মধ্যে ডরফ্লিতে আসছেন।

ডরফ্লি থেকে চিঠিটা পিটারই নিয়ে এলো। আল্ম অপার হাতে চিঠিটা দিয়েই সে দ্রুত চলে গেলো।

“ইদানিং পিটারের আচরন কেমন যেন অদ্ভুত। সে ঠিক তার ছাগলগুলোর মতোই ভীত। যেমনটি তারা লাঠির ভয়ে ভীত থাকে।” বললো হাইডি।

“সম্ভবত সে আমার লাঠির ভয়ে ভীত। কোনো একটা কারনতো আছেই।” বললেন আল্ম অপা।

দাদিমা ঘোড়ায় চড়ে এলেন। আল্ম অপা, হাইডি ও ক্লারা কাঠের চেয়ারে বসেছিল। দাদিমাই প্রথমে বলে উঠলেন,

“ক্লারা।” তিনি তাকে দেখে অবাক হলেন ও বললেন, “তোমাকে তো হুইল চেয়ারে দেখছিনা। তোমাকে মলিন ও ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে না। এটা কি সত্যিই তুমি, ক্লারা?”

হাইডি ও ক্লারা দাঁড়ালো। তারা দাদিমার দিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো। দাদিমা তার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তিনি ক্লারাকে চুমা দিলেন। তারপর হাইডিকে চুমা দিলেন। শেষে তিকি ক্লারাকে আবারো চুমা দিলেন। তিনি আল্ম অপার দিকে ফিরলেন। তার গলার স্বর ভেঙে গেলো। তিনি ভাঙা গলায় তাকে ধন্যবাদ জানালেন। “আমার ছেলের আজই আসা উচিত। আমি প্যারিসে একটি টেলিগ্রাম পাঠাবো। আমি এটি কিভাবে পাঠাতে পারি?”

“আমি পিটারকে ডাকছি।” বললেন আল্ম অপা। তিনি গলা ছেড়ে পিটারকে ডাকলেন। তিনি এত জোড়ে ডাকলেন যে তার স্বর পর্বতে প্রতিধ্বনিত হলো। অনেক দূর থেকে শোনা গেলো। অল্প সময় পরেই পিটার দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাজির হলো। আল্ম অপা তাকে ডরফ্লিতে পাঠালেন টেলিগ্রাম করার জন্য। পিটার তাই করলো।
জনাব সিম্যান তখন প্যারিসে ছিলেন না। তার ব্যস্ততা শেষ হয়েছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ক্লারাকে সারপ্রাইজ দিবেন। এই মূহুর্তে তিনি ডরফ্লি থেকে আল্ম ওপরে উঠছিলেন। পথে তিনি একটি বালককে দৌঁড়িয়ে নামতে দেখলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বালক এটাই কি হাইডিদের বাড়িতে যাবার পথ?”

বালকটি দৌঁড়ে পালাতে চাইলো। বালকটি ছিলো পিটার। সে আগন্তুক লোকটিকে ফ্রাংফার্ট থেকে আসা পুলিশ ভেবেছিল। দৌঁড়াতে গিয়ে সে একটি পাথরের সাথে হোচট খেলো। সে পাহাড়ি পথে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। অনেকটা ক্লারার চেয়ারের মতো। সে বেশি ব্যথা পায়নি তবে টেলিগ্রামটা হারালো। সে ধীরে ধীরে আবার উপরে উঠে এলো।

আল্ম অপার বাড়িতে আগন্তুক ব্যক্তিটি ক্লারার সাথে কথা বলছিলো। পিটার তা দেখে সরে পড়তে চাইলো। আল্ম অপা তাকে ডাকলেন, “এখানে এসা, পিটার।”

তারা সবাই তার দিকে তাকালো। অতগুলো চোখের দৃষ্টি সে সহ্য করতে পারলো না। এমনিতেই সে অনুশোচনায় ভুগছে। তাই সে এ ব্যাপারটি আর গোপন রাখতে পারলো না। তার মুখ দিয়ে অকপটে বেরিয়ে এলো সত্য কথাটি। সে বললো,

“এটি বাতাসের দ্বারা হয়নি। আমি করেছিলাম। আমিই চেয়ারটি নিচে ফেলে দিয়েছিলাম।”

“আরে এতো সেই আশ্চর্য বালকটি যে সবার ভয়ে ভীত। সে কী বলতে চায়?”
বললেন জনাব সিম্যান।

“সে বলছে যে সেই ক্লারার চেয়ারটি পর্বতের উপর থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিল।” আল্ম অপা উত্তর দিলেন।

“সত্যিই কি সে তা করেছিল? যা হোক তারপরেও তাকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। সে ক্লারাকে অনেক সাহায্য করেছে।” বললেন জনাস সিম্যান।

পিটার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। লোকটি তাহলে তার ওপর অখুশি নন। এমন কি তিনি পুলিশও নন।

জনাব সিম্যান আল্ম অপার দিকে ফিরলেন।
“আমি একজন ধনী ব্যক্তি। কিন্তু আমি যা চেয়েছিলাম তা কিনতে পারিনি। আপনি আমাকে তা দিয়েছেন। আমি আপনাদের কীভাবে ধন্যবাদ জানাবো? হে আমার বন্ধু আমি আপনাকে কী দিতে পারি?”

“আমার চাহিদার সবই আমার আছে।” বললেন আল্ম অপা। তারপর নরম ও কান্না জড়িত গলায় বললেন, “কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আমি খুব চিন্তিত। আমি মারা গেলে হাইডির আর কেউ থাকবে না। আপনি কি তার দেখাশুনা করবেন?”

“অবশ্যই হাইডিতো ক্লারারই বোন। আজ থেকে আমার দুই মেয়ে। হাইডি, তোমার কোনো আবদার আছে?”

“জ্বি, আমি একটা জিনিস চাই। পিটারের দাদিমার জন্য একটা বিছানা। ঠিক ফ্রাংফার্টে আমার যে বিছানাটি ছিল সেরকম।” ঝটপট উত্তর দিলো হাইডি।

“ঠিক আছে, আমরা খুব সুন্দর একটা বিছানা পাঠিয়ে দেব। সাথে ভালো খাবার ও শীতের কাপড়।” মুচকি হেসে বললেন দাদিমা।

“ওহ, আজকের দিনটা কতই না চমৎকার। সারপ্রাইজে ভরা একটি দিন।” হাইডি উল্লাসে ফেটে পড়ে।

“হুম।” বললেন জনাব সিম্যান। এরপর তিনি ক্লারার দিকে তাকিয়ে বললেন “আজ আমিই সবচেয়ে অবাক হয়েছি। এমনটি কখনো হয়নি। আর এসব কিছুই হয়েছে আল্ম অপা ও হাইডির জন্য।” “আমরা গর্বিত আমাদের বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য।” বললেন দাদা।
“স্নোয়ির জন্যও। সে আমাদের চমৎকার দুধ দেয়।” বললো হাইডি।