জনাব সিম্যান দুই সপ্তাহ থাকার পর প্যারিসে ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে তিনি ক্লারাকে বললেন,
“শীঘ্রই তোমার দাদিমা তোমার সাথে থাকতে আসছেন।”
ক্লারা খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাইডিকে বললো, “দাদিমা একজন চমৎকার মানুষ।”

যখন জনাব সিম্যানের মা এলেন হাইডি তাকে এক নিমিষেই পছন্দ করে ফেললো।

তার সাদা চুলগুলো অত্যন্ত সু্শ্রী। আর চোখগুলো মায়ায় ভরা। এ চোখগুলো অনেক অভিঞ্জতা সম্পন্ন। এ বাড়িতে ঘটে যাওয়া সবকিছুই দাদিমা লক্ষ্য করলেন।

পরদিন বিকালে ক্লারা তার রোজকার অভ্যাসমতো ঘুমাতে গেলো। সে না ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত দাদিমা তার পাশে বসেছিল। তারপর তিনি হাইডির খোঁজ নিলেন। বসার ঘরে বা খাবার ঘরে হাইডি তখন ছিলো না। তাই তিনি মিস রোমারের কাছে গেলেন ও জিজ্ঞেস করলেন,

“শিশুটি কোথায়? আমাকে একটু বলোতো যখন ক্লারা ঘুমায় তখন ও কী করে?”

“সে কিছুই করে না। সে তার রুমে বসে থাকে। সে কখনোই ভালো কিছু করে না।“ তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন মিস রোমার।

“তাকে তার রুমে একা বসে থাকতে হয়! আহারে বাচ্চা মানুষ! তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো্ তার জন্য আমি কিছু বই এনেছি।” অবাক হয়ে নরম গলায় বললেন তিনি।

“বই? সে বই দিয়ে কী করবে?
সে একটা শব্দও পড়তে পারে না।
জনাব ক্যান্ডিডেট তাকে অনেক পড়িয়েছেন কিন্তু এখনো সে বর্নমালাও শিখতে পারেনি।”

“অবাক ব্যাপার। তোমার কথা আমাকে অবাক করেছে। সেতো দেখতে বোকা না। যাহোক, সেতো ছবিগুলো দেখতে পারবে। তাকে আমার রুমে নিয়ে এসো।” অবাক হলেন দাদিমা।

যখন হাইডি এলা, দাদিমা তাকে সুন্দর সুন্দর ছবির একটি বই দেখালেন। হাইডি ভাবলো এগুলো আসলেই চমৎকার। তারপর দাদিমা বললেন, “ও আমার বাচ্চা এখন তুমি আমাকে বলো তোমার পাঠগুলি তুমি কেমন শিখছো? তুমি নিশ্চয়ই অনেক শিখছো?”

“না দাদিমা।” হাইডি দুঃখের সাথে উত্তর দিলো। “আমি পারিনা। এ ছবিগুলো আমি আগেও দেখেছি।”

“তুমি পারো না? তুমি কী পারো না হাইডি?”

“আমি পড়তে পারি না। এটা খুব কঠিন।”

“আচ্ছা কেন তোমার এমনটা মনে হয়।”
দাদিমা কৌতুহলের সাথে জিজ্ঞেস করেন।

“পিটার আমাকে বলেছিল। সে এটা জানে। সে বার বার চেষ্টা করেও শিখতে পারেনি। এটা খুব কঠিন। পড়ালেখা সত্যিই খুব কঠিন।”

“সম্ভবত এটা পিটারের জন্য কঠিন। সে যাই হোক না কেন! কিন্তু শোনো হাইডি তোমার নিজের চেষ্টা করা উচিত। আমি নিশ্চিত যে কিভাকে পড়তে হয় তা তুমি শিখতে পারবে। যদি তুমি ভালোভাবে চেষ্টা কর। আর তুমি কি জানো যখন তুমি পড়তে শিখে যাবে তখন কী ঘটবে? আমি তোমাকে এই বইটা দিয়ে দিবো। তোমার নিজের জন্য।”

“দারুন!” হাইডি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করলো।

হাইডি এখনো তার পাঠ ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পারেনি। সে শুধুই বাড়ি যেতে চায়। কিন্তু সে জানে যে এটা এখন সে কাউকে বলতে পারবে না।

“এখানে সবাই আমাকে খুব আদর করে। আমি কীভাবে তাদের বলবো যে আমি বাড়ি যেতে চাই?” সে মনে মনে ভাবলো।

দাদিমা লক্ষ্য করলেন যে হাইডির মন ভালো নেই। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
“কি দাদু ভাই কী হয়েছে?”
“না দাদিমা আমি আপনাকে বলতে পারবো না।” বললো হাইডি।
“তুমি কি ক্লারাকে এ ব্যাপারে বলতে পাবে?”
“না, ক্লারাকেও না। আমি কাউকে বলতে পারবো না।”
“কিন্তু এমন একজন আছে যাকে তুমি বলতে পারবে। তিনি আমাদে স্রষ্টা। তুমি তার কাছে প্রার্থনা করো। তুমি তাকে বলো তোমাকে সাহায্য করার জন্য।” দাদিমা খুব ধীরে ধীরে বললেন।

হাইডির চেহারা খুশিতে উজ্জল হয়ে উঠলো। “আমি কি তাকে সবকিছু বলতে পাবো?”
“হ্যাঁ, সবকিছু।” বললেন দাদিমা।

হাইডি দ্রুত তার রুমে চলে গেলো। সে তৎক্ষনাত প্রার্থনা শুরু করতে চেয়েছিল।

প্রতি সন্ধ্যায়, হাইডি স্রষ্টাকে তার সমস্যা গুলোর কথা বলতো এবং এখন সে পড়ার সময় নিয়েও ভাবে। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ পর জনাব ক্যান্ডিডেট দাদিমার সাখে দেখা করেন। তিনি বললেন,
“একটা আশ্চর্য বিষয় ঘটে গেছে। আমি কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা।”

“হাইডি পড়তে শিখে গেছে? এটাইতো আপনি আমাকে বলতে চান, তাই না?

“হ্যাঁ, ঠিক তাই।” তিনি অবাক হলে ও আবার বললেন, “কিন্তু আপনি কি করে জানেন? সে খুব দ্রুত শিখে গেছে এবং ভালোভাবেই শিখে গেছে।”

দাদিমা তখনই ক্লারার বসার ঘরে গেলেন। সেখানে হাইডিও ছিলো। তার কোলে একটা বই খোলা আছে। সে ক্লারাকে একটি গল্প পড়ে শোনাচ্ছে।
ঐদিন রাতের খাবারের সময় টেবিলের উপর হাইডি তার প্লেটের পাশে একটি বড় বই দেখলো। বইটি সুন্দর সুন্দর ছবিতে পরিপূর্ণ।
দাদিমা হাইডিকে বললেন, “হ্যাঁ, বইটি এখন তোমার।”
“সব সময়ের জন্য? এমনকি যখন আমি বাড়ি যাবো তখনও?”
“অবশ্যই। এটা আজ থেকে তোমার। আগামিকাল থেকে আমরা পড়তে শুরু করবো।” বললেন দাদিমা।