ভূমিকা:

যখন লোকজন সুইজারল্যান্ডের কথা ভাবে তখন তারা তুষারাবৃত পর্বতমালার কথাও ভাবে। অনেক লোক হাইডির কথাও ভাবে। সুইস ছোট মেয়েটির গল্প, যে পর্বতে বাস করতো। এ গল্পটি একশত বছরেরও বেশি সময় আগে জার্মানে লেখা হয়েছিল। কিন্তু সবসময় লোকজন এটা পড়ে আসছে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায়।

লেখিকা, জোহান্না স্পাইরি ১৮২৭ সালে সুইস আল্পসের হিজরেল নামক এলাকার একটি ছোট খামারি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সেখানে তার তিনবোন ও দুই ভাইয়ের সাথে বেড়ে ওঠেন। হাইডির মতো তিনিও সুন্দর পর্বতগুলোকে ভালোবাসতেন। তার পিতা ছিলেন একজন গ্রাম্য ডাক্তার। বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য জুরিখে যান। ১৮৫২ সালে তিনি বার্নহার্ড নামে এক আইনজীবীকে বিয়ে করেন। তাদের একটা সন্তান ছিলো। যাকে ডাকা হতো বার্নহার্ড নামে। ছেলেটি ২৯ বছর বয়সে ১৮৮৪ সালে মারা যায়।

ছেলেটির বাবাও তার কিছুদিন পরে একই বছরে মারা যান। জোহান্না স্পাইরি ১৯০১ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জুরিখেই অবস্থান করেন। তিনি তার ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত বই লেখা শুরু করেননি। হাইডি লেখা হয় ১৮৮০ সালে যখন তার বয়স ৫৩ বছর। এটা তখন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। তার আরো কিছু বই ছিলো যার কোনটিই হাইডির মতো জনপ্রিয় হয়নি।

হাইডি পিতামাতাহীন এক শিশু। সে তার দাদার সাথে বাস করতে আসে যখন তার বয়স মাত্র ৬। তার দাদা একজন কঠোর অসুখী মানুষ। যিনি সবাইকে ঘৃণা করেন। এ কারণে তিনি পর্বতের ওপরে একা বাস করা পছন্দ করেন। পাশেই একটা গ্রাম আছে কিন্তু তিনি গ্রামের লোকের সাথে কথা বলেন না। হাইডি কি তাকে পরিবর্তন করতে পারবে?

হাইডি তার দাদার সাথে এবং তার দুই সুশ্রী ছাগল, স্নোয়ী ও ব্রাউনি’র সাথে বাস করতে ভালোবাসে। সে পিটার ও তার পরিবারের সাথেও বন্ধুত্ব করে। তারাও পর্বতের উপর বসবাস করে।

কিন্তু সে চিরকাল পর্বতে থাকতে চায় না। সে ফ্রাঙ্কফার্টে যায়। সেখানে সে নতুন এক বন্ধুকে পায়। নাম তার ক্লারা। সে খুব দরিদ্র আবার হাঁটতেও পারে না। হাইডি ফ্রাঙ্কফার্টে ক্লারার চমৎকার বাড়িতে অনেক নতুন বিষয় শেখে। কিন্তু সে শহরে থাকতে পছন্দ করে না। সে পছন্দ করে সুইজারল্যান্ডের পর্বতগুলো। এটাই সে জায়গা, যেখানে আমরা তার কথা ভাবি।

একশত বছর আগে, শিশুদের জন্য লেখকরা তাদের গল্পগুলোতে একটা পাঠ শিক্ষা দিতে চাইতেন। জোহান্না স্পাইরি তার পাঠকদের দেখাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, একটা ছোট শিশুও অন্যদের সাহায্য করতে পারে এবং তাদের সুখী করতে পারে। হাইডি কি এ সত্য প্রকাশে সক্ষম হয়েছে? সম্ভবত তাই। আমরা যখন তার কাহিনী পড়ি আমরা তাকে বাস্তব বলে বিশ্বাস করি। কারণ এতে পরিপূর্ণ জীবন আছে। আমরা পিটারকেও নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে থাকি। যদিও সে মোটের ওপর এতো ভালো নয়।

হাইডি এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুতোষ কাহিনী। (অবশ্য শুধু শিশুরাই তা উপভোগ করে না।) একে নিয়ে সিনেমা ও টেলিভিশনের জন্য ছবিও তৈরি হয়েছে। হাইডির গল্প পড়ার চেয়েও বেশি লোক তা উপভোগ করেছে।

হাইডি_জোহান্না স্পাইরি : সৃজনানুবাদ-রেজা কারিম পর্ব-১

সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার একটি ছোট গ্রাম। নাম ডরফ্লি। গ্রামের চারপাশে পর্বতে ঘেরা উঁচু উঁচু অনেক পর্বত। পর্বতগুলো তুষারে ঢাকা। গ্রামের সবচেয়ে কাছের পর্বতটির নাম আল্ম।

আল্ম পর্বতের অনেক উঁচুতে ছোট্ট একটি কাঠের ঘর। একজন বৃদ্ধ মানুষ দুটি ছাগল নিয়ে সেখানে বাস করতো। লোকজন তারে আল্ম অপা বলে ডাকতো। গ্রামের লোকজনের সাথে তার অনেক ঝগড়া হতো। কিন্তু একসময় গ্রামের সবার সাথে সে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। লোকজন তাকে নিয়ে অবাক করা গল্প বলতো। যখন সে যুবক তখন সে তার বাবার সমস্ত সম্পত্তি হারায়। সে গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যায়। সেখানে সে কী করতো তা কেউই জানতো না। এক সময় সে ফিরে আসে। সাথে একটা পুত্র সন্তান নিয়ে আসে। কিন্তু তার স্ত্রী সম্পর্কে কেউ কিছু জানতে পারেনি।

তার পুত্র টোবিয়াসকে সবাই পছন্দ করতো। সে ডরফ্লিতে কাজ করতো। সেখানেই গ্রামের একটি মেয়েকে সে বিয়ে করে। তার স্ত্রীর নাম এডেলহাইড। তাদের কোল জুড়ে এলো একটি কন্যা সন্তান। মায়ের নামের মত তার নামও রাখলো এডেলহাইড। তারা তাকে সবসময় হাইডি বলে ডাকতো।

টোরিয়াস যখন মারা যায় তখন হাইডির বয়স মাত্র এক বছর। একটা ঘরে কাজ করা অবস্থায় তার মাথায় বড় একটি কাঠের টুকরা পড়ে। মাথা ফেটে টোবিয়াস সেখানেই মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুতে এডেলহাইড প্রচন্ড ভেঙে পড়ে। কিছুদিনের মধ্যে সেও মারা যায়। হাইডি তখন পিতামাতাহীন এতিম। তার দাদা আল্ম অপা তার দায়িত্ব নিতে চায়নি। কারণ হাইডির বয়স মাত্র এক বছর। তখন সমস্যা হলো তাহলে তাকে কে দেখাশোনা করবে।

এডেলহাইডের একজন বোন ছিল। তার নাম ডেটে। সে ডরফ্লির নিকটবর্তী একটি ছোট শহরে থাকতো। অবশেষে ডেটে এসে হাইডিকে তার সাথে নিয়ে গেলো তাকে লালন পালন করার জরন্য। কিন্তু ডেটে তাকে সারাজীবন পালন করতে চায়নি। হাইডির ছয় বছর বয়সের সময় ডেটে একজন জার্মান মহিলার সাথে দেখা করলো। ঐ মহিলা ডেটেকে ফ্রাংফাটে তার বাসায় কাজের প্রস্তাব দিলেন। ফ্রাংফাট একটি বড় শহর। ডেটেও সেখানে যাওয়ার জন্য উৎসাহ বোধ করে। কিন্তু হাইডির কী হবে।

“আমি হাইডিকে তার দাদার কাছে দিয়ে আসবো, সে ভাবলো।” সেই তার দেখাশোনা করতে পারবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। জুন মাসের কোনো একদিন ডেটে হাইডেকে ডফ্লিতে নিয়ে আসে। সে গ্রামের ভেতর দিয়ে হাইডেকে একপ্রকার টেনে হিঁচরে নিয়ে আসে। কারণ সে মানুষের অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়নি। তারপরো এক মহিলা তাকে দেখে ফেলে এবং চেঁচিয়ে বলে “ডেটে, এ তোমার বোনের মেয়েটি না? তাকে কই নিয়ে যাচ্ছ?” “আল্ম অপার কাছে নিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হয় তিনি এখন ওর দেখাশোনা করতে পারবেন। আমি ফ্রাংফাটে একটি কাজ পেয়েছি।” বললো ডেটে।

“কী বললো।” আশ্চর্য হলো মহিলাটি। “ঐ অদ্ভূত বৃদ্ধ লোকটি; যে কখনো কারো সাথে কথা বলে না, কখনো চার্চে যায় না? সে কীভাবে এই শিশুটির যত্ন নেবে? তুমি তাকে তার কাছে রেখোনা।”

ঐ মহিলার কথা শোনার পরও ডেটে সেখানে থামেনি। তারা পর্বতে আরোহন করলো। রৌদ্রতাপ ছিল প্রখর আর হাইডির চেহারা রক্তিম হয়ে উঠলো। সে তৎক্ষনাৎ তার প্রত্যেকটি কাপড় পরতে লাগলো। তিনটি পোষাকের প্রতিটিই। একটির উপরে আরেকটি। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর তারা পর্বতের উপর ছোট কাঠের ঘরে পৌঁছলো। ঘরটিতে একটি ভাঙা দরজা ও ছাদে অনেক ছিদ্র ছিল।

“ওটাই কি আমার দাদার বাড়ি?” হাইডি জিঙ্ঞেস করলো।
“না তার বাড়ি আরও উপরে।”
“ঐটা গোট পিটারের বাড়ি।” ডেটে বললো।
“গোট পিটার কে?”
“সে মারা গেছে। তার স্ত্রী ও তার বৃদ্ধ মা সেখানে থাকেন। তার ছেলেও সেখানে থাকে। তার নামও গোট পিটার। সে প্রতিদিন গ্রাম থেকে ছাগল নিয়ে পর্বতের উপরে তাদের ঘাস খাইয়ে বেড়ায়।”

তারা আল্ম পর্বতের উপর গেলো এবং অবশেষে তারা অন্য একটি কাঠের বাড়িতে পৌঁছলো। এটা আগেরটা থেকে অনেক ভালো। ঘরের সামনে একজন বৃদ্ধলোক বসেছিল। তার দাড়ি দীর্ঘ ও সাদা। চোখ দুটি কঠিন।

“সুপ্রভাত আল্ম অপা। আমি টোরিয়াস ও এডেলহাইডের মেয়েকে নিয়ে এসেছি।” ডেটে বললো।

“সে আমার কাছে কী করবে?” আল্ম অপা বললো।

“আমি তাকে পাঁচ বছর লালন করেছি। এখন আপনি তার যত্ন নিবেন।”

“কিন্তু তার যদি মন খারাপ হয় আর তোমার জন্য কাঁদে তখন আমি কি করবো?”

“তখন আপনি নিজেই তার উত্তর খুঁজে নেবেন। লোকজন আপনাকে একজন খারাপ বয়স্ক লোক হিসাবেই জানে। কিন্তু একজন খারাপ বৃদ্ধ লোকেরও তার নিজ নাতনীর দেখাশোনা করা উচিত।”

আল্ম অপা দাঁড়ালেন। তিনি রাগান্বিত হলেন আর ডেটে পিছু ফিরলেন। আর তখনই আল্ম অপা চেঁচিয়ে বললেন, “শিশুটিকে রেখে তুমি যাও। আর তোমার আসার প্রয়োজন নেই।”
“তাহলে বিদায় হাইডি।” ডেটে বিদায় জানায়। আর অনেক দ্রুত সে পাহাড় বেয়ে নামতে থাকে। সে যা করতে চেয়েছিল তা করেছে। কিন্তু সে ব্যাপারটিতে খুশি হতে পারেনি।