হাত বাড়ালেই ভালোবাসা। কথাটা শুনে যে কারোরই চোখ কপালো উঠবে। ভালোবাসা কি এতোই সহজ ! হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়? কিন্তু আমি তো তাই দেখে এলাম ভারতের মেঘের রাজ্য খ্যাত মেঘালয়ের রাজধানী ও পাহাড়ি শহর শিলংএ।

হ্যাঁ, ওখানে ভালোবাসা মিলে প্রায় ৮ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় সারি সারি পাইন গাছের ছায়া ঘেরা পথে। যেখানে মেঘেদের ছুটাছুটি, রোদের কানামাছি খেলা আর পাহাড়ের গায়ে ঝর্ণার দাপাদাপি সেখানে ভালোবাসা থাকবে নাতো কি থাকবে ? প্রিয়জনকে নিয়ে যারা ওই মেঘের রাজ্যে গিয়েছে তারা প্রকৃতির প্রেমে হারিয়ে যেতে বাধ্য। সেইসাথে প্রকৃতির প্রেমের সাথে সাথে মানব-মানবীর প্রেমের গভিরতাও বেড়ে যায় বহুগুণে। অনেকেই বলে, প্রেম নাকি স্বর্গে থেকে আসে। প্রকৃতি তো স্বর্গেরই সৃষ্টি। আর মানুষ তো প্রেমে পড়ে প্রকৃতির রূপ তার প্রিয়ার মাঝে দেখে। যেমন, মেঘ কালো চুল, আকাশের মতো হৃদয়, ঝর্ণার মতো শীতল বুকের পাঁজর ইত্যাদি।

স্রষ্টার সৃষ্টি জীব মানুষ। তারপর এই মানুষের জন্য প্রেম-ভালোবাসায় মত্ত থাকতে সৃষ্টি করেছে প্রকৃতি। ভারতের সেই মেঘালয় রাজ্যের অপরূপ প্রকৃতির প্রেমে যেকোনো মানব সন্তান মোহিত হবেই, হারিয়ে যাবে ক্ষণিকের জন্য হলেও। সেইসাথে মানব-মানবীর প্রেমের গভীরতা আরো বেড়ে যাবে সেই চোখ ধাঁধানো সব-স্রষ্টার সৃষ্টি দেখে। হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে কল কল শব্দে আছড়ে পড়ছে ঝর্ণা। মেঘের উপরে উঠা ওই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে মেঘ ধরার অনুভূতি কেবল লেখনীর মাধ্যমে বোঝানো সম্ভব নয়। হাত বাড়িয়ে সে ভালোবাসা পেতে হলে যেতে হবে সেই মেঘ রাজ্য খ্যাত মেঘের দেশ পূর্ব ভারতের ‘মেঘালায়ে’।

আমি আমার স্ত্রী রত্না ও ছোট ছেলে রাফসানকে নিয়ে মাত্র চার দিনের জন্য ২০১৯ সালের ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ঘুরে এলাম মেঘ রাজ্যের সেই মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এ। শিলং শহর থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী বৃষ্টিপাত খ্যাত চেরাপুঞ্জির দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমটার পথ। কিন্তু সে পথে যেতে যেতে খাসিয়া পাহাড় ঘেরা আঁকাবাঁকা পথে প্রায়ই মেঘরা এসে আছড়ে পড়ে চলন্ত পথের পাহাড়ের গায়। চলতি পথের পিচঢালা পথে সাঁ সাঁ করে যখন আমাদের ট্যুরের গাড়ি ছুটে যাচ্ছিল তখন পথমধ্যে মেঘ আছড়ে পড়ে। এসময় থেমে যেতে হয় ক্ষণিকের জন্য। গাড়ি থেকে নেমে মেঘের ভিতর হেঁটে চলার আনন্দ বা অনুভূতি যেন স্বর্গরাজ্যের কোন পথে হেঁটে চলছি।

এছাড়া বড় বড় পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলা ঝর্ণার কলকল শব্দ আপনাকে ডাকবে আফিমের নেশার মতো। ঠিক থাকতে পারবেন না ওই শব্দ শুনে। ক্ষণিকের জন্য হলেও ছুটে যাবেন সেই ঝর্ণার বুকে। হাত দিয়ে তুলে আনবেন প্রেয়সীর জন্য মুঠো ভরে ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি। প্রেয়সীর গায় ছিটিয়ে দিয়ে ভালোবাসায় সিক্ত হবেন দু’জনায়। সে এক অন্যরকম অনুভূতি, অন্য রকম ভালোবাসার ছোঁয়া। চেরাপুঞ্জির সেভেন সিস্টার খ্যাত ফলস বা ঝর্ণার মোহনীয় রূপ আর এই মেঘ এই বৃষ্টি যেকোনো ভ্রমণ পিপাসুদের মনে দারুন প্রেম জন্মায়। সে প্রেমে থাকে না কোনো কৃত্রিমতা। কেবলই প্রকৃতি আর ভালোবাসা মিশে একাকার। শিলং শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে মনোরম পার্ক। পাহাড় ঘেরা পার্কের ভিতর রয়েছে ছায়া ঘেরা নানা স্থান, লেক, দৃষ্টিনন্দন কাঠের ব্রিজ, ফুল বাগান আর লেকের ঠান্ডা ও স্বচ্ছ জলে বোটিং। সে পার্ককে ‘প্রেম-যুগল’ পার্ক বললে একবিন্দুও ভুল হবে না। শিলং এর সকল প্রেমিক-পেমিকারা ছুটে যায় তার ভালোবাসার মানুষকে অন্তরঙ্গ কিছু সময় কাছে থাকতে। তাই এখানে ব্যাচেলর ও বয়স্ক বা সিনিয়র সিটিজেনদের খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে শিশুরা থাকে তাদের মা-বাবার সাথে।

এছাড়া শিলং এ রয়েছে অগনিত প্রাকৃতিক লেক। পাহাড়ের গা-ঘেষে বয়ে চলা এ লেকের পানি কোথাও নীল, কোথাও কালো আবার কোথাও একেবারে স্বচ্ছ। কিছু কিছু লেক আছে যেখানটায় বোটিং করে শেষ করতে দুই থেকে তিনদিন লাগবে।

শিলং শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মাউলিলং ভিলেজ যেতে পহাড়ের চূড়ার রাস্তার পাশে টাইটানিক ভিউ পয়েন্টে গিয়ে দাঁড়ালে মনে হবে আপনি মেঘের সাথে উড়ে বেড়াচ্ছেন। টাইটানিক ছবির সেই ‘জ্যাক’ আর ‘রোজ’ হয়ে প্রিয়তমাকে নিয়ে মেঘের সাথে ভেসে বেড়াতে পারবেন। ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে পারবেন এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাউলিলং ভিলেজে। সেখান থেকে প্রায় ১ শত ফুট নিচে নেমে গাছের শিকরে প্রাকৃতিক ভাবে তৈরী ‘রোট ব্রিজ’ এ হাঁটতে পারবেন সেই আমাজান জঙ্গলের অনুভূতি নিয়ে। ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে চলা ঠন্ডা জলের জলরাশি যেন ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়ে যায় সেখানে আসা পর্যটকদের।

তাই ভালোবাসা হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইলে ঘুরে আসুন শিলং এ। চেরাপুঞ্জির সেই বিস্ময়কর ফলস বা ঝর্ণার কাছে গিয়ে মেঘের সাথে ধাক্কা না খেলে তো আপনার বেড়ানোটাই ব্যর্থ। সেভেন সিস্টার খ্যাত ঝর্ণা থেকে ছিটিয়ে পড়া জলরাশি এবং নদীতে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলরাশির কলকল শব্দের পানিতে পা ভেঁজালেই ভালোবাসা যেন সিক্ত হয়ে উঠে নতুন করে। শিলং এর একমাত্র প্রাকৃতিক প্রাচীন গুহার ভিতরে ঢুকে অন্ধকারে ভয়ে শিহরিত না হলে প্রেম কিভাবে শক্ত হবে ? এসময় দু’জনের হাত যেনো আরো শক্ত করে ধরে প্রেমকে জাগিয়ে তোলা হয় নতুন করে।

শিলং শহরে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়কে বলা হয় শিলং পিক। ওই শিলং পিকের সমতল ভূমির সবুজ মাঠে বসে মাথা ঘেষে মেঘেদের ছুটাছুটি দেখে নিজেকে রাঙিয়ে নিবেন ভালোবাসার রঙে। সেইসাথে পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠে দেখতে পাবেন পুরো শিলং শহর। যেন কোন চিত্রকার প্রকৃতির গায় এঁকেছেন মনের মাধুরি মেশানো রঙে। শিলং এর পথে চলতে চলতে পাহাড়ের দু’পাশের সারি সারি পাইন গাছের ছায়া আর হিম শিতল বাতাসে একটু পর পর কুয়াসার মতো জল এসে কখন যে আপনাকে আলতো ছুঁয়ে যাবে তা দেখতে বা বুঝতেই পারবেন না। শুধু অনুভূতিতে বুঝবেন মেঘ আপনাকে ছু’য়ে গেল। আর দিয়ে গেলো উষ্ণ ভালোবাসা।

শিলং শহরের ভিতরেও রয়েছে বেড়ানোর চমৎকার অনেক জায়গা। ওইসব জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখতে সময় নিতে হবে কমপক্ষে সাত দিন। রবি ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত দেবদারু গাছের ছায়া ঘেরা বাড়ি, এলিফেন্ট ফলস বা হাতির ঝর্ণা, লেডি হায়াদ্রি পার্ক, ডন বস্কো মিউজিয়াম, উমিয়াম লেক, ক্যাথিলিক চার্চ, গলফ কোর্স, ওয়ার্ডস লেক ইত্যাদি।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং এর মনোরম দৃশ্যের জন্য প্রাচ্যের স্কটল্যান্ডও বলা হয়। কারণ এখানে গরম বলতে কিছু নেই। শীত মৌসুমে প্রচন্ড শীত আর গ্রীষ্মকালে মেঘ-বৃষ্টির কারণে কিছুটা শীত অনুভূত হয়। তাই বছর জুড়েই এখানে শীতকাল বলা চলে। গরম পড়লেও তা শহরজুড়ে পাইন গাছের ছায়ায় সে গরম সহ্যের মধ্যেই থাকে। আর এখানে বৃষ্টি কখনও বলে কয়ে আসে না। তাই শহরের অনেককেই সবসময় ছাতা হাতে এবং শিশুদের গরম কাপড় পড়ে স্কুলে যেতে দেখা যায়।

আমার স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে যখন শিলং শহর থেকে বেড়িয়ে পরছিলাম তখন বার বার পেছন ফিরে মনে হচ্ছিল প্রকৃতির ভালোবাসার মেঘগুলো আমাদের পিছু নিয়ে বিদায় জানাচ্ছে আর আবারও শিলং আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। শিলং শহর থেকে গুয়াহাটির দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। এরমধ্যে বেশির ভাগ রাস্তাই পাহাড়ের গা ঘেষে আঁকাবাঁকা পথ ছুটে চলে সোজা উত্তরে গুয়াহাটির নিচু পথে। তবে পুরো রাস্তায় এখন ফোর লেইন করায় মন ছুঁয়ে যায় সে পথের ছুটে চলা।

তাই দেরি না করে বেরিয়ে পড়ুন আর বেড়িয়ে আসুন প্রকৃতির ভালোবাসা ছড়ানো মেঘের রাজ্য খ্যাত মেঘালয়ের রাজধানী বন-পাহাড় আর ঝর্ণা-মেঘের শহর শিলং এ। আর নিজের জন্য নিয়ে আসুন সেই প্রকৃতির ভালোবাসার ছোঁয়া। ছড়িয়ে দিন নিজের প্রিয়জনের মাঝে।