কবিতার বৃষ্টি

তোমার মুখে কবিতার বৃষ্টি
অঝোর ধারায় বর্ষিত হয় –
ফসলের মাঠে বিরুৎ উদ্ভিদ
বৃষ্টিস্নাত হয়ে
নতুন জীবন খোঁজে।
কী করে এতো জীবন দাও তুমি!
কী অদ্ভুত ভঙ্গিমা তোমার!
পিয়ানোর টুং টাং
মৃত্যুঞ্জয়ী সুরে রক্তকোষে
কাঁপন ধরায় –
কী অপূর্ব মহিমা তোমার!
জীবনের ভারে নুইয়ে পড়া
ক্লান্ত-শ্রান্ত পথিকপ্রবর
কেমন থমকে দাঁড়ায় –
এ কোন সুরে?
ছন্দের ঢেউ ভাঙ্গে অতলান্ত
সাগরের বুকে
কবিতার বর্ণমালায়।
এতো প্রাণ, এতো শক্তি তুমি
কী করে যোগাও!
ভাটার শূন্যতায় জোয়ারের টান
বয়ে আনো অঝোর ধারায় –
কবিতার বৃষ্টিতে॥
……………………………………………

শুভ সকাল

শুভ সকাল, সবার তরে সকাল শুভ হোক
সত্যিগুলোর ফুল ফুটুক আজ, মিথ্যে বিলীন হোক।
মিথ্যে মিথ্যে খেলা এখন সত্যি বলে চালায়,
বুকের ভেতর কষ্ট জমে বিবেক তখন জ্বালায়।
অবিশ্বাসের চাকায় পিষে বিশ্বাসগুলো দলে
ভাগ্যাকাশে ‘আঁধাররেখা’ ভবিতব্য বলে।
আর কতকাল চলবে এমন আঁধার রাতের খেলা
নতুন দিনের নতুন আলোয় আনব নতুন বেলা।
ঊষা রবির মিষ্টি আলো যাক ছুঁয়ে যাক মন
সব অশুভ দূর হয়ে হোক শুভ-র সম্মিলন!
……………………………………………

হাওরনামা

ধান গেল, মাছ গেল, গেল শত হাঁস
তার সাথে বন্যায় মরণের ফাঁস !
হাওরের মানুষের রোনাজারি শুনি,
দুঃখ-শোক-কষ্টের বলিরেখা গুণি।

কোথা থেকে দৈত্যি বান ছুটে এল,
বাঁধ-ভাঙ্গা জোয়ারে সব কেড়ে নিল।
লাখো লাখো মানুষের নির্ঘুম রাত –
বাঁধ-ভাঙ্গা রুখে দেবে কোটি কোটি হাত।

মালিকের দরবারে বিলাপের সুর –
এক ফোঁটা রহম কি দূর-বহুদূর !
ক্ষমা করে দাও প্রভু ছোট-বড় পাপ,
কী জানি কি পাপরাশির এই অভিশাপ !

মানবতা ছুটে চল অসহায় দ্বারে –
দু’মুঠো অন্ন দাও শত অনাহারে।
জীবন নিয়ে রাজনীতি এখানে নয়,
অন্তরের ভালোবাসা অন্তরেই হয়।
……………………………………………

জলের জগত

রহস্যময় জলের জগত
স্বপ্ন কিছু নয়,
মহান রবের সৃষ্টিকলার
তুলনা কি হয়?

লক্ষ কোটি প্রাণের মেলা
আজব রঙ্গসাজ,
ভেবেছে কেউ এমন জগত,
রূপের কারুকাজ!

.
জলের জগত আরেক জীবন
আরেক দুনিয়া,
আল্লাহপাকের শান দেখো ভাই
চক্ষু খুলিয়া।

সাগর তলায় গড়ে দিলেন
রত্নেরই ভাণ্ডার,
আহার খোঁজার ভয় কিরে আর
রবেরই বান্দার!

শোকর মানি ওগো মালিক
আলহামদুলিল্লাহ,
কী অপরূপ সৃষ্টি লীলা –
সুবহানাল্লাহ !!
……………………………………………

গণকান্না!
(১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের স্মরণে)

ভাই হারিয়ে, বাপ হারিয়ে, বোন হারিয়ে, মা-
আছিমনরা সবাই মিলে কাঁদছে দেখ না!
ঊনত্রিশ এপ্রিল, একানব্বই ভয়াল কালো রাত,
পড়লে মনে আজও আমার হয় যে অশ্রুপাত!

প্রাণ হারাল সাপ-খোপেরা, প্রাণ হারাল পাখি-
আরও গেল মহিষ, গরু, রইল কি-বা বাকি!
ঘর গেল, চালা গেল, গাছ-গাছালি সব
কোথায় গেল পাখ-পাখালির নিত্য কলরব?

জলের দোলায় দুলনি দোলে ছোট্ট শিশু মেয়ে-
কখন যে তার প্রাণটি গেল, কে দেখেছে চেয়ে?
আরও আছে লাশের বহর কিশোর, যুবা, বুড়ো
কে-বা কাহার ভাই-বেরাদর, কে-বা কাহার খুঁড়ো!

দশ-বারো ফুট খাড়া হয়ে আসল জলের তোড়-
তারই সাথে হাওয়ার আঘাত হানল মরণ-ফোঁড়!
কেয়ামতের ছোট্ট স্বরূপ দেখল মানুষেরা,
আল্লাহপাকের শক্তিলীলা বুঝল মুমিনেরা।

স্বজন-হারার কান্না আজও দুটি কানে বাজে,
গলাগলির করুণ বিলাপ শুনি হৃদয় মাঝে।
ভয়াল রাতের বিভীষিকায় ভুক্তভোগী জন-
জীবন-মরণ এই লড়াইয়ে ছিলাম সর্বক্ষণ !!
……………………………………………

মে দিবস

“দিও না শুকাতে
শ্রমিকের গায়ের ঘাম
তার আগেই দাও তার
শ্রমের মূল্যমান”…

প্রিয় নবীর এ বাণী
কতই না অমিয়!
বিদায়হজে বলেন তিনি
সবাইকে শুনিও।

ইতিহাসের ম্যাগনাকার্টা
সেই সে ভাষণ,
এর আগে কে বলেছে
বল না এমন।

ইসলাম শান্তি আনে
সর্বক্ষেত্রের-
অধিকারের কথা বলে
সব মানুষের।

‘মে দিবস’ পালন হয়
শ্লোগানে, ভাষণে-
শ্রমিকের জীবনে তা
কি-বা সুখ আনে!

প্রিয় নবীর নির্দেশ সবে
করো গো পালন,
‘মে দিবস’ সার্থক, সফল
হবে আজীবন।
……………………………………………

আমাদের গ্রাম

আকাশের সাথে জলের মিতালি সবুজের হাতছানি
ঐ চেয়ে দেখ মায়াময় রূপ আমাদের গ্রামখানি
সবুজে সবুজে জড়াজড়ি করি
মোর গৃহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ামমতার বাঁধনে বুঝি-বা বাঁধিয়াছে প্রাণখানি॥

সুখ-দুখ ভরা জীবনগুলো মিলিয়া মিশিয়া রয়
গাছেদের সাথে, পাখিদের সাথে কত না কথা কয়
নদীর জলে জীবিকার টানে
নৌকা ভাসিয়ে কত কি যে আনে,
কালের সাক্ষী রহিয়াছে যেন দূরের তালগাছখানি॥

এই গাঁয়ের পরতে পরতে হাজারো স্মৃতির ডালি –
হাতড়িয়ে খুঁজি মোর শিশুকাল, জীবনের সুতো-বালি
দূর হতে আজো হাতছানি দেয়
সবুজের মায়ায় বুকে টেনে নেয়,
এ মাটি আমার মায়ের মত, রেখে যাই দেহখানি॥
……………………………………………

হে সমুদ্র

হে সমুদ্র,
তুমি আমার মনকে অতলে হারিয়ে
দিয়েছো, হৃদয়কে করেছো বিশাল!
আমি এখন আকাশ ছুঁতে পারি,
মেঘেদের ওপারে খুঁজে নিই নীড়
ডানা মেলে ওড়ি শ্বেতশুভ্র পরিদের সাথে
পাখিদের কূজনে শিল্পীর কণ্ঠ সাজাই।
সীমাহীন দিগন্তে চেয়ে রই যতো –
উথালপাথাল ঢেউয়ে হু হু করে মন,
কি যেন নেই, কি যেন নেই –
মনে হয় শুধু;
আমাতেই হারাই আমি যে তখন!

হে বিশ্বমালিক, কী সীমা তোমার!
দৃষ্টির পরিধি ক্লান্ত হয়ে ফেরে
অস্ফূটে ফোটে মহিমা বাণী:
সুবহানআল্লাহ!
এ আকাশ, সাগর, তারকারাজি
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সবই মহা সৃষ্টিমালায়!
তোমার অস্তিত্বের শেষ যে কোথায়
জ্ঞানীগুণীজনের জ্ঞানেই হারায়।
যতো দেখি তাই তব ‘সৃষ্টি বলয়’
নুয়ে আসে শির তোমার পায়ে –
কবুল করো ইয়া রাহমান,
আমি যে পাপী, আমি যে নাদান !!
……………………………………………

শৈশব

এই সেই পথ রেললাইন দুটো সমান্তরাল চলা –
মোর শিশুকাল লুকিয়ে হেথায় হাজারটি কথা বলা।
গাঁয়ের সবুজ গাছেদের সাথে করেছিনু কত ভাব
পাতায় পাতায় লেপ্টে আজও হৃদয়-ছবির ছাপ!
মাটির কণা জলের সাথে কাদা করি মাখি গায়ে –
ঢেউয়ে ঢেউয়ে হেলেদুলে যাই তালের গাছের নায়ে।
ডুবসাঁতারে মাছেদের সাথে কানাকানি করেছি কত
সেইসব স্মৃতি ভুলিব কেমনে মনে পড়ে অবিরত।
পাখপাখালির শত কলরব আজও কানে বেজে যায়
মোরগডাকা ভোরগুলো আজ কোথায় হারাল হায়!
ঘুঘুডাকা সেই উদাস দুপুর স্মৃতির অতলে খুঁজি –
চান্নি পসরে উঠোনে বসিয়া কিসসা হবে না বুঝি।
নাড়াক্ষেতে সবে বিকেলবেলায় খেলেছি গোল্লাছুট
চিৎপটাং হয়ে কাদা মাখামাখি, হাসিতে কুটকুট!
আজও মন চায় ছোট্টটি হয়ে দামাল ছেলেটি রই
মাগো আজ তুই হারালি কোথায়, বন্ধুরা সব কই??