হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতোই লোকটির পিছনে একদঙ্গল ছেলে মেয়ে। মোষের বাঁকানো কালো শিং এর বিশাল শিঙা। এতে অদ্ভুত গম্ভীর পুঁ-ও -ও, পুঁ-ও-ও স্বরে পরপর কয়েকটি ফুঁক দিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে লোকটি। বিচালির পাশঘেষা এঁকেবেঁকে চলা মেঠোপথ ধরে তার পিছু নেয় দঙ্গলটি। লোকটির একহাতে শিঙা। অন্যহাতে ধাতব নির্মিত ত্রিশূল। ত্রিশূলের ত্রি-ফলার সংযোগস্থলে ঝালাই করে লাগানো একগুচ্ছ চিকন ধাতব রিং। যে জন্য হাঁটার সময় ঝনঝন আওয়াজ হয়। মাটিতে পাড় দিয়ে পুতে দাঁড় করানোর সময়ও ঝনাৎ করে শব্দ করে ওঠে ত্রিশূলটি। তার পরনে কালো রঙের ঢিলেঢালা বিশাল আলখেল্লা। দুই বগলের নিচে বড় করে হাতাকাটা আলখেল্লাটি লম্বায় হাঁটুর নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর নিচে তার পরনে লুঙ্গি বা পাজামা আছে কি না তা বুঝা যায় না। মাথায় ধূসর-সাদা লম্বা বাবড়ি চুল প্রশস্ত কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত। চুলের উপর গেরুয়া রঙের প্রকা- পাগড়ি। ভাজপড়া কপালের মধ্যদেশে সিঁদুরের মোটা দাগ। স্ফিত দুটি সুরঙ্গ বিশিষ্ট বড়সড় নাকের নিচে কালো ঠোঁটজোড়া। আফ্রিকা অরণ্যাঞ্চলের আদিবাসীদের ঠোঁটের মতো মাংসল-প্রশস্ত। উঁচ্চতায় ছয় ফুটের অধিক হবে। সারা অবয়বে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অথচ এ গ্রামের সকলেই গত দেড়যুগ যাবৎ একই চেহারায় দেখে আসছে তাকে। লম্বা লম্বা জানু দুটির নিচে চামড়া হাঁসলি মোরগের গলায় ঝুলে থাকা লেদলেদে ঝুঁটির মতো কিছুটা ঝুলে পড়েছে। কুনোইর নিচে হাতে ও হাঁটুর নিচে পায়ের উপর মোটা মোটা রগগুলি বেশ স্পষ্ট। হাতের কুনোই ও পায়ের টখনির উপর রাবারের চারগুচ্ছ টিলেঢালা বাতের বালা। হাতের কব্জির উপরও পিতল কিংবা কাসার দুটি মোটা বালা। তর্জনীসহ দুই হাতের কনিষ্ঠা, অনামিকা, মধ্যমা প্রায় প্রতিটি আঙুলের গিটের উপর বিভিন্ন ধরণ ও আকৃতির অনেকগুলি আংটি। তামার, পিতলের, ঘোড়ার নালের আংটিগুলিতে রতœ পাথর, অষ্টধাতু, কৃষ্টাল ইত্যাদি বিচিত্র রকমের পাথর বসানো। অনামিকা ও মধ্যমায় একাধিক আংটি। জুতোবিহীন খালি পায়ের লম্বা বৃদ্ধাঙুল দুটিতেও পড়ে রেখেছে দুটি পিতলের আংটি। লম্বা গলায় পড়ে রেখেছে বড় বড় গোটার বেশ ক‘টি রুদ্রাক্ষের মালা। মালাগুলি তার বক্ষ প্রদেশের উপর দিয়ে একেবারে নাভি বরাবর নেমে এসেছে। বাম কাঁধে ঝুলানো রঙচটা লাল সালুর বিশাল ঝোলা।
কিছুদূর এগিয়ে আবারও হাতের ত্রিশূলটি মাটিতে পুতে দাঁড় করাল। ঝনাৎ করে শব্দ হল একটি। থুতনীটি টান করে অদ্ভুদ ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকাল। হাতের শিঙার সরু প্রান্তটি নিজের দু‘ঠোঁটের উপর স্থাপন করে গলার রগ দু‘টি ফুলিয়ে টেনে টেনে ফুঁক লাগাল শিঙায়। বিকট পুঁ-ও -ও, পুঁ-ও-ও স্বর চৈত্রের আকাশের দিকে কিছুটা উত্থিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশের স্থির বাতাসে। লোকটির অনুগামী ছেলে মেয়ের দঙ্গলটা তখন তার চারপাশে দাঁড়িয়ে রইল। তাদের সকলের কৌতুহলী দৃষ্টি উপরের দিকে তার ঐ বিশালাকৃতির কালো শিঙাটির দিকে। শিঙায় বিকট শব্দ হলে পরে কিছু ভয় ও আতঙ্কে চারদিকে সরে গিয়ে তার চারপাশে বৃত্তাকরে দাঁড়াল। তখনো তাদের কৌতুহল মাথা উঁচিয়ে অদ্ভুত বেশভূষার বিরাটকায় লোকটির দিকে। ইতোমধ্যে শিঙায় ফুঁকের আওয়াজ পেয়ে আরো নতুন কিছু ছেলে মেয়ে হিরালী আইছেরে বলে উচ্চকন্ঠে রব তুলল। যার যার বাড়ির ঢালপথে দৌঁড় দিয়ে দিয়ে বিচালি পাড় হয়ে এসে যোগ দিল আগের দঙ্গলের সাথে। চৈত্রের গনগন রোদে হিরালীর কপালের ভাঁজের উপর ঘামের রেখা স্পষ্ট হয়। গ্রামের সাধারণ কিষাণ কিষাণিরাও এলো তার কাছে। তাদের কারো হাতে কালো কায়তন, পানির জগ বা মগ। তবে সকলেই এক বা দুই মুষ্টি সর্ষে নিয়ে এলো। তারা হিরালীর কাছে আগামীবর্ষের শিলাপাত, বজ্রপাত ও ঝড় বৃষ্টি কি পরিমাণ হতে পারে তা জানতে চায়লো। হিরালী ভাবী বৎসরের একটা মোটামুটি রকমের পরিমাণ নির্দেশ করে ভবিষতের একটা ছায়াচিত্র প্রদান করল। সমবেত উপস্থিতি তার কথা আগ্রহের সাথে শ্রবণ করল। তার কথায় কৃষকগণের মনে বিস্ময়, ভয় ও আশ^াস মিলে ত্রিগুণাত্বক এক অদ্ভুত ভাবের প্রবাহ প্রবাহিত হলো। সকলে হিরালীকে নিজেদের স্বজন মনে করে তাকে প্রীতির চোখে দেখলো।
সামনে বৈশাখ মাস। মাঠে মাঠে বোরো ধান ক্ষেতে থোর আসতে (শীষ বের হওয়া) শুরু করেছে। সর্ব প্রকার আপদ-বাল্লা, বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময় পাকা ধানের ক্ষেতে হিল (শিলাবৃষ্টি) পড়া থেকে ধানকে রক্ষা করার জন্য হিরালীর সর্ষেপড়া অত্যন্ত জরুরী। কেউ কেউ তাদের তরজার বেড়া ও বাঁশের পাল্লার (খুঁটি) উপর ছন বা টিনের চালা যেন তুফানে বা ঝড়ে পড়ে না যায় তার জন্য সর্ষেপড়া নেন। কেউ কেউ তাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সর্বপ্রকার রোগ বালাই; বিশেষ করে বৈশাখ-জেষ্ঠ মাসের ঠাডা পড়ার (বজ্রপাত) হাত হতে রক্ষা করার জন্য তার কাছ থেকে কালো কায়তনপড়া নেন। পানিপড়াও নেন অনেকে। হিরালী অস্পষ্ট ভাষায় বিরবির করে কিছু একটা মন্ত্রপাঠ করেন। এরপর হাতের জগ ও মগের পানিতে বা সর্ষের উপর মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কয়েকটি ফুঁক দেন। মন্ত্রপাঠ করতে করতে কালো কায়তনের মধ্যেও সুন্দর এক ধরনের বুনন সৃষ্টি করেন এবং মাথা ডানে বায়ে নাড়িয়ে তাতে বড় করে কয়েকটি ফুঁক দেন। যে সব ছেলে মেয়েদের বাজুতে বা কোমরে কায়তনপড়া বাধতে হবে তাদের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ফুঁক দেন এবং তাদের মা-বাবাকে কায়তন বাধার নিয়ম শিখিয়ে দেন। যারা যারা পানি, সর্ষে ও কায়তনপড়া নেন তারা সকলেই হিরালীকে সামান্য হাদিয়া দিয়ে থাকেন। হাদিয়া স্বরূপ কেউ দেন সামান্য ক‘টি টাকা আবার কেউ দেন গাবের রস দেওয়া বেতের তৈরি পোড়াতে করে নিয়ে আসা এক-আধসের চাল।
এভাবে হেলাল মাস্টারের মা আমেনা বেগমও তার আদরের নাতির জন্য কায়তনপড়া ও মাঠে তার স্বামী মারা যাবার আগে রেখে যাওয়া দু‘খন্ড জমির বুরো ধানের জন্য সর্ষেপড়া আনতে চেষ্টা করেন। যাকনা, একপোড়া চালইতো লাগে। লাগলে লাগুক। কিন্তু তাতে বাঁধসাধে হেলাল মাস্টার। তার যুক্তি হলো, ‘মা কেন তোমরা এসব আজগুবি ব্যপার সেপারে বিশ্বাস করো। ঝড়-তুফান, বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি হয় প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে। মানুষ গাছ কেটে বন উজার করছে। দেশে পঁচিশ পার্সেন্ট বনের স্থলে নয় পার্সেন্ট বনও অবশিষ্ট নেয়। বন কেটে, ফসলি জমি নষ্ট করে অপরিকল্পিত ঘর-দুয়ার ও কলকারখানা তৈরি করছে তারা। সেজন্য বাতাসে বাড়ছে কার্বনডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। গ্রীণ হাউস এ্যাফেক্টে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। সেখানে হিরালীর পানিপড়াতে কি আসবে যাবে! যত্তসব প্রাচীন কুসংস্কারের চিন্তা-ভাবনা।’
হেলাল মাস্টার গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক। লেখাপড়া শিখে উচ্চ শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার মনের অভ্যন্তরে। কিন্তু হঠাৎ তার বাবার অসুস্থতা ও পরে মৃত্যুতে সেই স্বপ্নে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তার অর্থনৈতিক অবস্থা। ছোট তিনটি ভাই ও বোনের লেখাপড়াসহ মায়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে তার উপর। হেলাল কি সে দায়িত্বই পালন করবে না নিজের লেখাপড়াই চালিয়ে যাবে। সামান্য দু‘খন্ড বোরো জমির ধানে তাদের চার-পাঁচ মাসের খোরাকিই চলে না। এর উপর সকলের বাদবাকি খরচ জোগাবে কোথা থেকে! অর্থচিন্তার সর্বনি¤œ সূচকে এসে হেলালের মনে তখন চরম হতাশা। চোখে সর্ষেফুল দেখতে লাগলো সে। ইতোমধ্যে তার ইন্টারমিয়েট পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো। হায়ার সেকেন্ড ডিভিশনে সে পাশ করে। মনের ভেতর উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও চরম অর্থসঙ্কটের কারণে তার আর পড়ালেখার পাঠ এগোলো না। তখন শিক্ষক নিয়োগের সুযোগে সে সহকারি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে । পরে আমেনা বেগমের পছন্দমতো মেয়ে শাহেদার সাথে বিয়ে হয় তার। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ না করতে পারলেও তার চিন্তা চেতনায় সে একজন আধুনিক আদর্শবান শিক্ষক। গ্রামের ছাত্রদের পড়ালেখার জন্য তাদের অভিভাবকসহ সকলকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেওয়াকে সে তার নৈতিক দায়িত্বজ্ঞান করতো। যদিও তখন আর বেগম রোকেয়ার আমলের অন্ধকার অবস্থায় ছিল না, তথাপি অভিভাবকগণ তাদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়ানোর বিষয়ে ছিলো একেবারেই পিছুটান। তাদের ধারণায় বদ্ধমূল নারীশিক্ষা একপ্রকার পাপের বিষয় বলেই। মেয়েরা ঘরে থাকবে। তাদের বাংলা-ইংরেজি শেখার দরকার কি? মেয়েদের তারা পাঠাতো ওস্তাদির কাছে কিতাব ও কোরান শরীফ শিক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু একজন বিজ্ঞানমনস্ক উন্নত চিন্তার মানুষ হিসেবে হেলাল মাস্টার নারী শিক্ষাকে একান্ত প্রয়োজনীয় ও আবশ্যকীয় বিষয় বলে জ্ঞান করতো। তাই কখনো কখনো মেয়ে শিক্ষার উৎসাহ-উদ্দীপনা দিতে গিয়ে দু‘একবার কারো কারো হাতে নাজেহালও হতে হয়েছে। তার উপর হিরালীসহ, ডায়রীয়া-কলেরার হাত হতে বাঁচার জন্য ওলাবিবির নামে গাওয়াইল্লা শিরনি দিয়ে কলাপাতায় ভোগ দেয়া, গুটি বসন্ত রোগমুক্ত থাকার জন্য শীতলাদেবীর নামে ভোগ দেয়া কিংবা এ অঞ্চলে কারো কুষ্টরোগ হলে সেটা যে পাপের ফসল নয়; সে সব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে বুঝাতে গিয়ে কারো কারো বিরাগবাজনও হয়ে আছে হেলাল মাস্টার।
আমেনা বেগমের যুক্তি হলো ‘বাবারে বিশ্বাসে মুক্তি মিলে, তর্কে বহুদূর। তাছাড়া গ্রামের অনেকেই বলা-কওয়া করে যে তুই ঐ হিরালীর সর্ষেপড়াকে বিশ্বাস করিস না বলে এবং বছর শেষে তাকে নজরানা স্বরূপ ক্ষেতের তোলা ধান (বিশেষ নিয়তে আলাদা করে রেখে দেয়া ধান) দেসনি বলেই গত বছর ঘরে আনার দুই, তিন দিন আগে হিল (শিলাবৃষ্টি) পড়ে মাঠভরা পাকা ধান সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আর আব্বাসের মার এতবড় ডাঙ্গর পোলাডার উপরেও ঠাডা (বজ্রপাত) পড়েছিল। বিধবা বেওয়া মহিলার একমাত্র যক্ষের ধন ছিল পোলাডা।’ প্রতিবাদ করে হেলাল মাস্টার-‘মা তুমি এসব আজগুবি কথা কোথায় শুনতে পাও? কারা বলে এমন উদ্ভট অবাস্তব কথা?’
নারে বাবা আমি কইকি দশজনের সাথে একালগে মরেও লাভ। গ্রামের সকলের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কি তুই একা পারবি?
না মা, সকালের সাথে এক হয়ে মরার সখ আমার নাই। বরং সকলে বুঝতে পারে না যে বিষয়গুলি সেগুলি যুক্তি দিয়ে তাদের বুঝানো ও জ্ঞানদান করাই আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য।
রাতে তার স্ত্রী শাহেদাও বুঝায় তাকে। দেখ, গ্রামের সকল মানুষের চিন্তা-ধারা একরকম। সেখানে তুমি একা কিভাবে তাদের চিন্তার পরিবর্তন ঘটাবে। পাগলি নদীর সমস্ত পানিকে কি তুমি এক বস্তা চিনি ঢেলে মিষ্টি করতে পারবে? পারবে না। বরং তোমার চিনিগুলিই নষ্ট হবে।
হোক নষ্ট তথাপি আমি আমার বিবেকের কাছে হেরে গিয়ে তাদের সকল অন্ধ বিশ^াসকে মেনে নিতে পারব না।
সুতরাং যে কথা সে কাজ, সকলে সর্ষেপড়া আনলেও হেলাল মাস্টার তা আনেনি। তার মাকেও এসব আনতে দেয়নি।
যারা এনেছে তারা সকলেই সর্ষেপড়ার কিছু অংশ স্ব স্ব ধান ক্ষেতের চারকোণে হিরালীর বাতলে দেয়া নিয়ম মাফিক দিয়ে এসেছে। আর বাদবাকি কিছু রেখে দিয়েছে দুর্যোগ সময়ে ব্যবহারের জন্য। ব্যতিক্রম করেছে একমাত্র হেলাল মাস্টার। সে ক্ষেতের কোণে কেবলমাত্র সর্ষেপড়া দেয়নি তা নয় উপরন্ত চৈত্রমাসের কাঁঠফাটা রোদের হাত হতে মাথা বাঁচাতে ছাতা উঁচিয়ে বেরো জমির ভালমন্দ দেখতে গিয়েছে। ধানক্ষেতের আইল দিয়ে ছাতা মাথায় হেঁটে যাওয়াকে গ্রামের মনুষ যেখানে আসন্ন বিপদ-বাল্লা জ্ঞান করে, সেখানে তাদের সাতপুরুষের বিশ^াসকে মাস্টার বৃদ্ধাঙুলি দেখাল। সে সবের কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করল না সে!
চৈত্র মাসের দ্বিতীয় পক্ষ। গ্রামের পূর্ব দিকে একেবারে পাগলি নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত বুরো ধানের মাঠ। অনন্য সুন্দর শস্য পরিপূর্ণ মাঠের উপর দিয়ে শেষ বসন্তের মলয়ানিল মৃদু-মন্দ গতিতে প্রবাহিত হচ্ছিল। সুপক্ক বোরো ধানের অভিনব তরঙ্গায়িত লালচে রঙের অবস্থা সন্দর্শন করে প্রায় প্রতিটি কৃষকের মনে আপ্লুত আনন্দের ঢেউ খেলতে লাগল। দিগন্ত বিস্তৃত ধানের মাঠের দিকে তাকিয়ে তাদের মনে হলো লক্ষী যেন তার অনন্ত ভান্ডার তাদের চোখের সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন। আর এজন্য সে সময় গ্রামের কৃষকগণ তাদের সম্বৎসরের খাদ্য বোরোধান কিভাবে ঘরে তোলে আনতে পারে সেজন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কৃষকগণ স্ব স্ব বাড়ির সামনের বিচালিতে কোদাল চালিয়ে পরিস্কার করতে লাগল। আগাছা পরিস্কার করে কোদালে ছিলে ছিলে মাটি সমান করার পর কৃষক বধূ ও মেয়েরা কূর হতে আগে থেকে তোলে রাখা লেয়ন (কাদামাটি) দিয়ে লেপেপোছে চাতাল তৈরি করল। চৈত্রের গনগন রোদে চাতাল শুকিয়ে টনটনে হল। পাগলি নদীর তীরে জালশুকার কামার বাড়িগুলি ব্যস্ততায় সরগরম হয়ে ওঠল। দিনমান টানা টুংটান টুংটান শব্দ শোনা যেতে থাকল। সেখান হতে কৃষকরা নতুন কাস্তে কিনে আনল। এবং পুরাতন কাস্তেগুলিকে আল কেটে ধারালো করে আনল। মেঘনা নদীর পশ্চিমে আলগিবাহান্নগর বাজার হতে তারা ধান লওয়ার জন্য বাঁশ-বেতের তৈরি টুকরি, পাতি বা ওরা, ধানের আটি বহন করার জন্য নতুন ভার এবং ধান সংরক্ষণের জন্য ঢোল-জাবার কিনে আনল। আর সময় সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশের ভাব বা রঙ বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। কারণ চৈত্রের এ শেষ সময়টাতে এসেই কৃষকের মনে আনন্দের পাশাপাশি আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়। কেন না তখন যে কোন সময় ঝড়সহ শিলাবৃষ্টি হতে পারে। শিলাপাত ও প্রবল ঝড়ের ঝাঁপটা বোরো ধানের প্রভূত ক্ষতি সাধন করে। সুপক্ক বোরো ধানের উপর শিলাপাত হলে বা প্রবল ঝড়ের ঝাঁপটা লাগলে শিলের আঘাতে ও বাতাসের ঘাত-প্রতিঘাতে পাকা ধানগুলি ডাঁটা হতে খসে গাছের গোরাস্থিত কাঁদায় পড়ে যায়। তখন সেই দুর্যোগকালে কৃষককুল হিরালীর দেয়া সর্ষেপড়ার বাদবাকি অংশ ঘরের দুয়ারের সামনে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের উপর ছিটিয়ে দিতে থাকে। শিলাবৃষ্টি হলে কৃষকবধূরা সর্ষেপড়ার সাথে সাথে ঘরের মসল্লা পিসার পাটা-পুতাকেও বাইরে ফেলে রাখে। সেই বিপদসঙ্কুল সময় গ্রামের সিংহভাগ মানুষ ঐ হিরালীর অদ্ভুত মন্ত্র ও সর্ষেপড়ার উপর আস্থা স্থাপন করে শিলাপাত ও বজ্রপাত হতে নিস্কৃতি পেতে চেষ্টা করে। শিলাবৃষ্টি হতে ধান রক্ষা হলে বৈশাখ-জেষ্ঠ দুই মাস ধান লওয়া ও থুওয়ার সময় হিরালী পুনারয় একাধিক বার আসে। তখন তার সাথে আরো একজন ভারবাহী শ্রমিক থাকে। কৃষকগণ তাদের স্ব স্ব জমির উপর ভিত্তি করে হিরালীর নজরানা স্বরূপ টুকরিতে করে ধান প্রদান করে।
গত বছরের মতো এবারো গ্রামের মানুষের পাকা বোরো ধান ঘরে তোলার সময় হলো। বৈশাখের মাত্র শরু হল। চৈত্রের অসহ্য মার্ত্ত- তাপে ধরণী দগ্ধ প্রায় হয়ে উঠেছিল। আর তখন বৈশাখের প্রথম সপ্তাহের কোন এক অপরাহ্নে
ঈষাণ কোণাতে আকাশমন্ডলে প্রথমে দু‘চারটি ক্ষুদ্র মেঘখন্ড মিলিত হয়ে গ্রামের কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। দেখতে দেখতে সেই সামান্য কয়েক খন্ডমেঘ পশ্চিম-উত্তর গগন আবৃত্ত করে চপল চমকের সঙ্গে সঙ্গে গভীর গর্জনে পৃথিবী কাম্পিত করে প্রত্যেক কৃষকের প্রাণে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে থাকলো। এবং সেই খন্ডমেঘ হতে বাতাসের বেগ বৃদ্ধি পেতে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই শো শো গর্জনে বাতাস বয়তে লাগল। চারদিক হতে মানুষের গগণভেদী চিৎকার শোনা গেল। বিকট শব্দ করে ভাঙতে থাকলো গাছপালাগুলি। কুন্ডলি পাকানো বাতাসের উপর উড়তে থাকলো খড় ও দু‘একটি টিঁনের চালা। প্রকৃতি তার ভয়াল রূপ ধারণ করলো। সমস্ত পৃথিবী যেন ধুলোর অন্ধকারে ছেয়ে গেল। এরপর ঝড়ো হাওয়াসহ শিলাবৃষ্টি হতে থাকলো।
কৃষককুল তাদের ঘরবাড়ি রক্ষাসহ মাঠের পাকা বোরো ধানকে ঝড় ও শিলাবৃষ্টির হাত হতে বাঁচানোর জন্য হিরালীর দেওয়া সর্ষেপড়ার বাদবাকি অংশ ঘরের দুয়ারের সামনে শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের উপর ছিটিয়ে দিল। কৃষকবধূরা সর্ষেপড়ার সাথে সাথে ঘরের মসল্লা পিসার পাটা-পুতাকেও বাইরে ফেলে রাখল। সেই বিপদসঙ্কুল সময় গ্রামের সিংহভাগ মানুষ ঐ হিরালীর অদ্ভুত মন্ত্র ও সর্ষেপড়ার উপর আস্থা স্থাপন করে শিলাপাত ও বজ্রপাত হতে নিস্কৃতির মানসে চেষ্টা করল। কিন্তু প্রকৃতি তার আপন গতিতে তান্ডব চালিয়ে আশপাশের গ্রামসহ পুরো অঞ্চলটিকে বিরানভূমিতে পরিণত করল। চারদিকে বেশকিছু গাছপালা ও বাড়িঘর ভেঙে চুরমার করে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করল। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের গগণবিদারী চিৎকারে ভারি হয়ে উঠলো সন্ধ্যার বাতাস। মানুষ বুঝতে পারল যে, মাঠের পাকা ধানের সিকি পরিমাণও আর অবশিষ্ট নেয়। কারণ ঝড়ের সময় বিজলি চমকালে আতঙ্কিত হয়ে তারা দেখেছে উঠোনে শিলাবৃষ্টির শুভ্র স্তর। আর টিনের চালের নিচে যারা ছিলো তারা তো শিলার কর্ণবিদীর্ণ আওয়াজে স্তব্ধ হয়েই গিয়েছিল। যা-ই হোক ঝড়ের ঝাঁপটায় জুবুথুবু মানুষগুলি প্রচন্ড উৎকন্ঠার মধ্য দিয়ে কোন রকমে রাতটি অতিবাহিত করল। ভোর বেলায় তারা দেখল মেঘমুক্ত আকাশ, প্রকৃতি নীরব-নিস্তদ্ধ। খোলা আকাশের নীচে অসংখ্য অসহায় নারী-পুরুষের বুকফাঁটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাস-প্রকৃতি গুমরে গুমরে কাঁদছিল। কারণ পুরো মাঠের পাকা ধানে সিকি ভাগ ধানও আর বাকি রইল না। স্বপ্নের পাকা ধানক্ষেত পরিণত হলো বিরানভূমিতে। শোনা গেল বিকেলে ঝড়ো হাওয়ার সময় মাঠ থেকে গরু-বাছুরসহ বাড়ি ফেরার সময় বজ্রপাতে কান্দাপাড়ার একটি রাখাল ছেলে ও দুটি গরু প্রাণ হারিয়েছে।
কৃষককুলের এমন চরম দুর্গতির জন্য হেলাল মাস্টারকে দোষারূপের বিষয়টি এবার আর আড়ালে-আবডালে থাকলো না। প্রকাশ্য এবং তার জবাবদিহিতার প্রর্যায়ে চলে এলো। প্রথমে গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান তার চ্যালা-চামুন্ডাদের নিয়ে হিরালীর নজরানা না দেয়া ও তার নিয়ম-নীতির প্রতি অবজ্ঞার বিষয়টি প্রধান শিক্ষক সাহেবের কাছে বিচারের আকারে উপস্থাপন করল। এবং পরে তার বদলির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণসহ মাস্টারকে গ্রামছাড়া করার অভিমত ব্যক্ত করল। এতটুকু ব্যবস্থা গ্রহণ করেই কেবল পঞ্চায়েতরা নিস্ক্রান্ত হলেন না। তারা মাস্টরের মা আমেনা বেগমকে বাড়িতে গিয়ে শাসিয়ে দিয়ে বললেন, শোনে রাখ হেলাল মাস্টারের মা, আমাদের ঘটে যাওয়া দুর্গতির জন্য গ্রামের সকলেই হিরালীর প্রতি তোমার ছেলের অবজ্ঞাকে দায়ী করছি। এ জন্য তোমার ছেলের অপরাধের শাস্তির বিধান আরো কঠিনতর করতে পারতাম। তবে তা না করে সে গ্রামের ছেলে হিসেবে তার প্রতি সদয় হয়ে আমরা তাকে গ্রামছাড়ার নির্দেশ দিয়ে গেলাম। ভালই যেন সে গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়। নয়লে আমরা আরো কঠিন হতে বাধ্য হবো। সে-ই সাথে তোমাদেরকেও যেন সাথে করে নিয়ে যায়। আর তোমাদের বাড়ি ও মাঠের দু‘খন্ড জমি পঞ্চায়েত প্রধানের দায়িত্বে থাকবে। কখনো এগুলি বিক্রি করা গেলে তুমি এসে তার মূল্য নিয়ে যেও।
পঞ্চায়েতদের এসমস্ত সিদ্ধান্তের কথা শোনে হেলাল মাস্টার প্রতিবাদ করার কথা চিন্তা করলেও আমেনা বেগমের অনুরোধে এবং বিশ্বাসীরা যুক্তিহীন হয় তাই এধরনের অন্যায় রায়কে হেলাল মাস্টার মেনে নিতে বাধ্য হন।
ভূ-গর্ভসমান অন্ধকারের মধ্যে হেলাল মাস্টারের সামান্য আলো ছড়ানোর ক্ষীণ প্রচেষ্টা অরণ্যরোদনে পরিণত হলো।
জগতের নিয়ম জগত চলে, জীবনের নিয়মে জীবন। জীবন তো আর বসে থাকে না। সময়ের হাত ধরে গ্রামের মানুষের জীবন হতেও অনাহারে-অর্ধাহারে কেটে যায় আরো একটি বছর। পরের বছর চৈত্রমাসে আবার হিরালী এলো গ্রামে। হেলাল মাস্টারের পরিবারবিহীন গ্রামের সকলেই হিরালীর পূর্বোক্ত সকল নিয়ম মেনে বৈশাখের পাকা ধান কাটার অপেক্ষায় থাকলো। সকলের মনেই এক ধরনের বিশ্বাস কাজ করছিল যে, পরপর দু‘টি বছর প্রকৃতি তাদের উপর রুষ্ট ছিলো হেলাল মাস্টারের কারণে। সে কারণে মাস্টার গ্রামছাড়া হয়েছে। এবার নিশ্চয় প্রকৃতি তাদের প্রতি সদয় আচরণ করবে। এবং হিরালীর উসিলায় খোদা তাদের মাঠের পাকা ধানসহ সর্বপ্রকার বাল্লা-মসিবত থেকে রক্ষা করবেন। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ তখনো শেষ হয়নি। দু‘একজন কৃষক তাদের দু‘একটি জমিতে কেবল কাস্তে চালিয়েছে। হিরালীও সেদিন সাথে ভারশ্রমিকটিকে নিয়ে তার নজরানা নেওয়ার জন্য শুধু প্রথম কিস্তি এসেছে। কিন্তু বিধির লীলা বোঝা ভার। সেদিনও পূর্বোক্ত বছরের ন্যায় প্রথমে ঈষাণ কোণাতে আকাশমন্ডলে দু‘চারটি ক্ষুদ্র মেঘখন্ড মিলিত হয়ে গ্রামের কৃষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। দেখতে দেখতে সেই সামান্য কয়েকটি খন্ডমেঘ ঝড়ো হাওয়াসহ শিলাবৃষ্টিতে রূপ নিল।
কৃষককুল হিরালীর দেয়া সমস্ত নিয়ম যথাযথ পালন করল। কিন্তু তাদের স্বপ্নের পাকা ধান রক্ষা করতে পারল না। উপরন্তু রাত শেষে তারা দেখতে পেলো বিকেলে ঝড়ো হাওয়ার সময় নজরানার ধানসহ ভারবাহী শ্রমিকটিকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মাঠ পাড় হতে গিয়ে বজ্রপাতে শ্রমিকটিসহ প্রাণ হারিয়েছেন হিরালী।