“শিক্ষা কোন সুযোগ নয়। শিক্ষা কোন ব্যবসায়িক পণ্য নয়। শিক্ষা কোন ব্যক্তিগোষ্ঠী বা ধনতান্ত্রিক সমাজের বিষয়বস্তু নয়। শিক্ষা সবার মৌলিক অধিকার। এ মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন ও যুগোপযোগী করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।” পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবী ছিল এটি।ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবধানকে উপেক্ষা করে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক এক অবিশ্বাস্য ভৌতিক ও অযৌক্তিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় যা সৃষ্টি লগ্ন থেকেই নব্য সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী মনোভাব পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর চালু করে।
সা¤্রাজ্যবাদী মনোভাব প্রথম প্রকাশ পায় পূর্ব পাকিস্তানিদের মুখের ভাষার উপর আঘাতের মাধ্যমে। এরপর একে একে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নিশ্চিহ্ন করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে। তবে কয়েক বছরের মধ্যে তার বুঝতে পেরেছিল পূর্ব পাকিস্তানিদের শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একদিন তারা জেগে ওঠবে এবং পশ্চিমা শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। এর ধারাবাহিকতায় আইয়ুব খান শরীফ কমিশন গঠন করেন।
শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে পূর্ব পাকিস্তানিদের শিক্ষা অর্জনের যে পথ তৈরি হলো স্বাধীনতার পর তা নানা সময়ে নানা পথ ধরে পথে ও বিপথে গমন করে অনেকটাই আজ পথহারা। জাতির বুদ্ধিজীবী ও জাতি গঠনের কারিগর বা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষেরা ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সম্পর্কে কতটুকু সচেতন তা নিয়ে সংশয়ের বহু কারণ থেকে যায়। এ প্রসঙ্গ নিয়ে বর্তমান ছাত্র সমাজের কাছে তুলে ধরা রাষ্ট্রের প্রতিটি মাধ্যমের কাজ, কেননা এর নিগূঢ় তাৎপর্য উপলব্দি করার মাধ্যমেই আমরা কেবল স্বপ্নের দেশ গড়ে তুলতে পারবো।
সামরিক জান্তা আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট আঙ্গিকে আনার লক্ষ্যে শিক্ষাবিদ এস এম শরীফের নেতৃত্বে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন করেন ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৮ সালে যা শরীফ শিক্ষা কমিশন নামে পরিচিত। ১৯৫৯ সালের আগস্টে কমিশন শিক্ষার আমূল পরিবর্তনের সুপারিশ করে রিপোর্ট প্রকাশ করে যা সম্পূর্ণরূপে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার এক নীলনক্সা মাত্র।
এমন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি শিক্ষার্থীরা ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালে ধারাবাহিক আন্দোলন করে তেমন ফল পায়নি। কিন্তু পরের কৌশল ও আন্দোলন নাড়িয়ে দেয় পশ্চিম পাকিস্তানের দম্ভ ও ষড়যন্ত্রকে। বিশেষ করে ১৯৬১ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম বার্ষিকী পালনের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আগ্রাসী নগ্ন মনোভাব প্রকাশ্যে প্রকাশ করে আইয়ুব সরকার। এ সিদ্ধান্ত সব শ্রেণির শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের একসাথে কাজ করার মঞ্চ তৈরি করে দেয়।
শরীফ কমিশনের বিদ্বেষমূলক বিষয়গুলো হলো: ১. ধর্মীয় শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। (কিন্তু এখানে উল্লেখ করা হয়নি যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী নয় তাদের কি করণীয়। ফলে সাম্প্রদায়িক মনোভাব ফুটে ওঠে এ রিপোর্ট ও সুপারিশে।) ২. আবাসিক মাধ্যমিক স্কুল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উৎসাহ দান করতে হবে। (এটিও অর্থনৈতিক বিচেনায় সাংঘর্ষিক, কেননা আবাসিকের পুরো খরচ মিটানোর মত সে সময়ে প্রায় শতভাগ পূর্ব পাকিস্তানির পক্ষে অসম্ভব ছিল।) ৩. মাধ্যমিক স্তরে বাংলার পরিবর্তে ইংরেজি বাধ্যতামূলক। ৪. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যয় শিক্ষার্থীকে ষাট শতাংশ মিটাতে হবে। ৫. উচ্চ শিক্ষা স্পষ্টকরে কেবল মাত্র ধনীক শ্রেণির জন্য নির্ধারিত করা হয়। (এদু’টি সুপারিশের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষিত-দক্ষ জনসমষ্টির চেয়ে শ্রমিক শ্রেণির জনসমষ্টি তৈরি করা।)
৬. উচ্চ শিক্ষার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি কেন্দ্রিয় সরকার করবে। ৭. ১৯৫২ সালের সালাম-রফিক-বরকত-শফিউলের রক্তের বিনিময়ে ভাষা অধিকারকে সুকৌশলে পাল্টে দেয়ার জন্য বাংলা ভাষার কিছু অক্ষরকে পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়। ৮. শিক্ষকতা একটি সৃজনশীল ও মুক্তমনের পেশা, সেখানে শিক্ষকদের ১৫ ঘন্টা কাজের বিধান প্রস্তাব করেছিল। (এ প্রস্তাব অমানবিক ও আন্তর্জাতিক লেবার আইনের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।) ৯. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেয়া হলো। এমন আরো বেশ কিছু অসঙ্গতিপূর্ণ ধারা ও প্রস্তাবনা পেশ করে শরীফ কমিশন।
১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের ধারাবাহিক বিচ্ছিণœ আন্দোলন তেমন আশার সঞ্চার করতে পারেনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী পালনে নিষেধাজ্ঞা ছোট-বড় সব ছাত্র সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হবার তাগিদ দেয়। আর এ তাগিদ আরো অনুভব হয় ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বিনা কারণে গ্রেপ্তারের কারনে। ৩১ জানুয়ারি চারটি ছাত্র সংগঠন মধুর কেন্টিনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সালে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত করে। এরপর থেকে শরীফ কমিশসের বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে নিয়মিত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দিনে দিনে আইয়ুব সরকার দানবের মত আচরণ শুরু করলো এবং এ দানবীয় আচরণের বিপক্ষে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ সালে দেশের প্রতিটি ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক-পেশাজীবী সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালিদের শিক্ষা তথা ভবিষ্যৎকে রক্ষার জন্য সামরিক নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে আসলে পাক হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিতে বাবুল, ওয়াজিউল্লাহ ও গোলাম মোস্তফা নামের ভিন্ন পেশার তিনজন মারা যায় এবং কমপক্ষে দু’শ পঞ্চাশ জন আহত হয়। টঙ্গীতে সুন্দর আলী নামে আরো একজন শহীদ হন। এ জীবনোৎসর্গ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের আরেকটি স্তম্ভ তৈরি করে।
দুঃখের বিষয় হলো স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছর পরও এদেশের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কেউ এর তাৎপর্য কেউ বুঝতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা বিরাজমান সর্বত্র। এমনকি শিক্ষক-শিক্ষার্থী-শিক্ষাবিদ-শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কেউ এ দিবসটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য জানা আছে কিনা সন্দেহ থেকে যায়।
গত দু’দশকে বাংলাদেশে শিক্ষা বেশ লাভজনক পণ্য হিসাবে বিবেচিত। এর লাগাম টেনে ধরার কোন প্রচেষ্টা যেমন দেখা যায় না তেমনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়বানের কোন উদ্যোগও নেই। শিক্ষা সিলেবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাস অনেকাংশেই উপেক্ষিত। কোন কোন সিলেবাসে অর্ন্তভূক্ত হলেও সেটি কেবল লোক দেখানো।
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে আন্দোলন শুরু হয় এবং বিশ্ব মোটামুটিভাবে নারীর সমঅধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণে সমর্থ হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ আরো পিছনে এগিয়ে চলছে। যেসব জায়গায় নারীর বিচরণ রয়েছে সেগুলি নারীর যোগত্যা প্রমাণের সুযোগের কারণে নয় বরং নারীর প্রতি এক ধরণের করুণাময় দৃষ্টির কারণে। অথচ এসব বিষয়েও ছাত্ররা আন্দোলন করেছিল সে সময়ে।
ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া সেসময়ে আইয়ুব সরকার শুরু করেছিল, কিন্তু আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে ছাত্ররা রাজনীতি করতে স্বক্ষম হয়েছিল। কিন্তু গত তিন দশকে বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রনে আছে বলে এদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা সব ধরণের অধিকার বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্ত্বশাসনাধীন থাকার কথা থাকলেও কেন্দ্রিয় সরকারের অধীনেই নিয়ন্ত্রিত। ফলে সর্বত্রই কেবল অনিয়ম এবং শিক্ষকরাও পাঠদানের পরিবর্তে তোষামদের রাজনীতিতে ব্যস্ত।
পরিশেষে এভাবে বলা যায় পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা যেভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ ও পশ্চাৎপদ করার ষড়যন্ত্র করেছিল, তা তৎকালীন ছাত্ররা রুখে দিযেছিল এবং বাঙালিকে উদ্ভুদ্ধ করেছিল স্বাধীনতা পথে হাটতে। কিন্তু স্বাধীনতার পর স্বার্থবাদী মহল শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে শিক্ষার নামে বাণিজ্যিকীকরণ, তোষামদী রাজনীতি, নিপীড়নমূলক স্বার্থবাদী গোষ্ঠী তৈরি করা এবং দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিহীন এক পরনির্ভরশীল জাতি তৈরিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের মূল দায়িত্ব নিতে হবে দেশের সব স্তরের শিক্ষকদের এবং গণমাধ্যমকে।