আমাকে দুর্বল করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো চোখের পানি। আমি যতই শক্ত হয়ে থাকি কারো চোখের এক ফোঁটা পানি আমাকে নিমিষে গলিয়ে দিতে পারে। তবে এই পানি হতে হবে হৃদয় নিংড়ানো। আর এই চোখের পানি চেনার ক্ষমতাও আমার আছে ইনশাআল্লাহ্।
১মে (মৌলভীবাজারের, কমলগঞ্জ উপজেলার) শমশেরনগরের দৌলতপুরের প্রায় ৭০ বছর বয়সের এক বৃদ্ধা রোসনা বেগম একটি শিশুকে সাথে নিয়ে ভিক্ষার জন্য আসেন। বৃদ্ধাকে বললাম, এই সময়ে ভিক্ষা করতে আসছো কেন? বৃদ্ধা হাউমাউ করে কেঁধে বললেন তাঁর কেউ নেই। সাথে থাকা ৮ বছরের শিশুটিকে নিয়ে ২দিন থেকে না খেয়ে ক্ষিদার যন্ত্রনায় রোজা রেখে এই প্রচন্ড রোদে ভিক্ষায় বেরিয়েছেন। বৃদ্ধার চোখের পানি আর মুখের কথায় নিজের অজান্তেই আমার চোখের কোনে পানি চলে আসে। বৃদ্ধার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনে তাঁর কথার ভেতরে আমি কোন মিথ্যা বা ছলনার আবাস পাইনি। বৃদ্ধা আমাকে বলেছেন কারো কাছ থেকে কোন ত্রাণ বা সহযোগীতা তিনি পাননি। একদিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না, এই দিন তাদের কলোনিতে ত্রান দেয়া হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। আমি বিভিন্ন ভাবে তাকে প্রশ্ন করে বার বার তাঁর কথার ভেতরে কথার সত্যতা জাচাই করেছি।
বৃদ্ধার কথায় ব্যথিত হয়ে ১ মে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। বৃদ্ধার সাথে কথোপকথনের ভিডিও আমার আছে থাকলেও তা প্রকাশ করিনি বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকায়। আমি কখনো চাই না আমার কোন কাজে সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হোক। কারো কোন উপকার করতে না পারলেও সমাজে অশান্তি সৃষ্টির কারণ হতে চাই না।
যাক, ফেসবুকে পোস্টটি দেবার পর সবুজ (Zahedul Islam Sobuz) নামক এক ভাই কমেন্টে বললেন- এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। মহিলাটি রেল কলোনিতে থাকেন, কলোনির প্রত্যেকটি ঘর ২/৩ বার করে ত্রাণ পেয়েছে।
শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের (দৌলতপুর এলাকার) সদস্য আজিজুর রহমান চৌধুরী (Azizur Rahman Chowdhury) সাহেব কমেন্ট করেছেন, মহিলাটি দৌলতপুর গ্রামের নয়, এমনকি ৫নং ওয়ার্ডেরও নয়। সঠিক তথ্য নিয়ে পোস্ট করা উত্তম নতুবা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে।
শমশেরনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়াম্যান হাফিজুল (হাফিজুল হক চৌধুরী স্বপন) ভাই বলেছেন, এত ত্রাণ দেয়ার পরও যারা পেয়ে অস্বীকার করে এদেরকে ভবিষ্যতে আর না দেয়াটা সমুচিত জবাব হবে।
এছাড়াও আরো নেগেটিভ ভিন্ন ধরনের কয়েকটি কমেন্ট হয়েছে। কমেন্টগুলো পড়ে আমি থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। এই কমেন্টগুলোর কোন জবাব দেইনি তাঁর কারণ হলো আমি সরজমিনে তদন্ত না করে বৃদ্ধার কথার উপর বিশ্বাস করে লিখে পোস্টটি করেছিলাম। যদিও অনেক ভেবে চিন্তে বিশ্বাস করেছিলাম তবুও এই গুরুপূর্ণ ব্যক্তিদের মন্তব্যে নিজের উপর আস্তা হারাতে বসেছিলাম। তাই গতকাল ইফতারের পর সংবাদ কর্মী আলমগীর (Alamgir Hossin) ভাইকে সাথে নিয়ে এই বৃদ্ধার বাড়ি খোঁজে বের করে সরজমিন তদন্ত করতে যাই। বৃদ্ধার বাড়ীতে আমার উপস্থিতিতে বেশ কিছু মানুষও জড়ো হয়ে যান। এবং মহিলাসহ উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকে আমি বিষয়টির সত্য-মিথ্যা জাচাই-বাঁচাইয়ের সমূহ চেষ্টা করেছি। উপস্থিত প্রতিটি মানুষই বৃদ্ধা কিছু পাননি বলে সাক্ষি দিয়েছেন। এছাড়াও আরো অনেক তথ্য উঠে এসেছে তাদের কাছ থেকে। তবে এখানে অন্য প্রসঙ্গে যাবো না।
বৃদ্ধার এহেন অবস্থার সত্যতা নিশ্চিত হয়ে শাহজালাল ট্রাভেলস্ এন্ড ট্যুরস্ (সিলেট) এর স্বত্বাধিকারী মোজাম্মেল হোসেন রুবেল (Md Muzammel husan) সাহেবের সহযোগিতায় আমি বৃদ্ধাকে কিছু দিনের খাবার উপহার দিয়েছি এবং বাকী রমজান মাসের খাবার পরবর্তীতে পৌঁছে দেবো বলে ভিক্ষায় যেতে নিষেধ করে এসেছি। কারণ এই সময়ে কেউ ভিক্ষায় যাও শুধু ভিক্ষুকের সমস্যা নয় সমাজ ও রাষ্ট্রিয় সমস্যা।
তদন্তে মহিলা কিছু না পাওয়ার কারণ খোঁজতে গিয়ে যা পেলাম তা হলো, বৃদ্ধার স্বামী মারা গেছেন। ছেলে সন্তান নেই। তাঁর কোন ভিটে মাটিও নেই। আগে অন্যত্র থাকতেন। এইটা (বর্তমানে যেখানে আছেন) মূলত তাঁর মেয়ের বাড়ি। এই মেয়ে এবং মেয়ের স্বামীও মারা গিয়েছেন ছোট্ট একটি ছেলে সন্তান রেখে। মেয়ে মারা যাবার পর বৃদ্ধা এই এতিম শিশুটির লালন পালনের দায়ীত্ব নিয়ে মেয়ের ভিটাতে তারেক নামক মেয়ের এই শিশুটিকে নিয়ে থাকেন এবং শিশুটিকে সাথে নিয়ে ভিক্ষা করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। বর্তমানে তিনি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। কিন্তু ৩-৪ বছর থেকে চেষ্টা করেও এখানকার ভোটার হতে পারেননি। আর ভোটার না হওয়ার কারণেই ইউপি সদস্য তাকে এখানকার বাসিন্দা বলতে পারেননি!
একটি ইউনিয়ন পরিষদে একজন চেয়ারম্যান থাকেন। এই একজন মানুষের পক্ষে ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়া সম্ভব নয়। আর সম্ভব নয় বলেই একটি ইউনিয়নকে ৯টি ভাগে ভাগ করে ৯জন সদস্য দেয়া হয়েছে। তাই প্রত্যেক ইউপি সদস্যের দিব্যচক্ষু থাকতে হবে। প্রত্যেক ইউপি সদস্য যদি তাঁর ওয়ার্ডকে নিজের পরিবার হিসাবে দেখেন তাহলে এই ওয়ার্ডের মানুষ অনাহারে থাকতে পারেন না।
বৃদ্ধা রোসনা বেগম সম্পর্কে আমার তথ্যটি মিথ্যা বলে যারা মন্তব্য করেছেন এবং ভুল তথ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছি বলে মন্তব্য করেছেন তারা যদি আমার লেখা পড়ার পর বৃদ্ধার খোঁজ নিয়ে সত্য-মিথ্যা জাচাই করে মন্তব্য করতেন তাহলেই প্রকৃত অভিভাবকত্বের বহিঃপ্রকাশ হতো।
এভাবে সারা দেশব্যাপি আমাদের চোখের সমানে বিবেকের আড়ালে অসংখ্য রোসনা আর এতিম তারেকেরা অনাহারে ধুকে ধুকে মরছে। আসুন, যেই সময়ে কুকুরগুলোকেও খোঁজে খোঁজে বের করে খাবার দেয়া হচ্ছে সেই সময়ে ভোটারের হিসাব করে নয়, মানুষ হিসাবে মানুষের পাশে দাঁড়াই। হিংসা-বিদ্বেষ আর ক্রোধকে জ্বালিয়ে দিয়ে ভালোবাসায় এগিয়ে যাই।
পরিশেষে এই ৭০ বছরের নিঃস্ব বৃদ্ধা রোসনা বেগম ও এতিম শিশু তারেকের জীবন রক্ষার্থে বৃদ্ধার জাতীয় পরিচয়পত্রটির সমস্যা সমাদান করে দিয়ে তাদেরকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করে দেবার জন্য কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (Uno Kamalganj) ও শমশেরনগর ইউপি চেয়ারম্যান জনাব জুয়েল আহমেদ এর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।