প্রিয়া কলেজের সেরা সুন্দরী মেয়েদের মধ্যে একজন। সে সব সময় নিজের রূপ নিয়ে গর্ববোধ করে। তার রূপের আকর্ষনে প্রভাবিত হয় অনেকে। কেউ কেউ সমর্পন করে তার প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু সে কোন দিন কারো ভালোবাসার ফাঁদে পা দেয়নি। সব সময় বট বৃক্ষের মত মাথা উঁচু করে থাকে।
প্রিয়ার বাবা তার জন্য অতিসাধারণ পরিবারের একটি ছেলেকে পছন্দ করেন। ছেলেটির শরীরের রঙ কালো হলেও দারুন নম্র স্বভাবের। তাকে পছন্দ করার আরও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ আছে। ছেলেটি জীবনে পড়াশুনার সময় ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। তারপর ছেলেটি কলেজের নিয়োগের প্রাথমিক পরীক্ষায় সফল হয়েছে। ইন্টারভিউয়ের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ এই পরীক্ষায় সফল হলেই সে কলেজের অধ্যাপক হবে।

প্রিয়া ছেলেটিকে মোটেই পছন্দ করেনা। সে কত স্বপ্ন দেখেছে তার স্বামী হবে যেমন সুদর্শন পুরুষ তেমনি তার ভালো থাকবে আর্থিক অবস্থা। কিন্তু ছেলেটি তার বিপরীত। বাড়ির সকলের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয় প্রিয়া। কারণ তার তো কোন প্রেমিক নেই যে তার সাথে পালাবে। তার ভেতর ভেতর অনুশোচনা হয় যদি সে অহংকার না করে আগে থেকে একটি ছেলে খুঁজতো তাহলে এমন অবস্থা হত না। নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা হচ্ছে। তার চোখের সামনে সব কিছু যেন ঘন কালো আবরন ঘিরে ধরেছে। স্মৃতির ছেঁড়া পাতা গুলি এলো মেল ভাবে ছড়িয়ে পড়ে মনের পর্দায়। আর তার মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে কি ভাবে মুখ দেখাবে বন্ধু বান্ধবীদের? তার সব স্বপ্ন তাসের ঘরের মত এক মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল।

বিয়ের প্রথম রাতে ছেলেটিকে কাছে দেখার পর তার মনের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠে। আর সেই আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে চাই ছেলেটিকে এবং তার পরিবারকে। ছেলেটি প্রথম দিন কিছু মনে করে নি। ভেবেছে বাড়ি ছেড়ে এসেছে বলে সে এমন করছে। কিন্তু যতই দিন যায় যেন প্রিয়ার মনের ভেতর আগুন আরও অনেক গুণ বেশি হয়ে জ্বলতে থাকে। যেন পরিণত হয় এক ভয়ংকর জন্তুতে।

ছেলেটির ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট বের হয় কিছু দিন পর। আর তাতে সে অসফল হয়। তা শুনার পর প্রিয়া আর সে বাড়িতে থাকার ইচ্ছা করেনা। কি দেখে থাকবে সে। কিবা পাওয়ার আছে ছেলেটির কাছ থেকে। তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। যেন সে কারাগারে বন্দি। সে চাই মুক্তি সেই কারাগার থেকে। তাই তার জন্য ছেলেটির উপর করে অনেক অনেক নির্যাতন। কিন্তু সব নির্যাতন নীরবে মাথা পেতে নেই ছেলেটি। তা ছাড়া কোন উপায় নেই। ছেলেটি তো প্রিয়ার বাহ্যিক কোন চাহিদা পূরণ করতে পারেনা টাকার অভাবে। তবে সব সময় সে তার সাথে ভালো ব্যবহার করে। কোন দিন কোন ছোট কথাও বলেনি। কিন্তু এ সব প্রিয়ার মনের ভেতর প্রভাব ফেলতে পারেনি। অপরাধীকে তো শাস্তি পেতে হবে। একটা আয় নেই বিয়ে করেছে। একে বারেই অপদার্থ। এ সব মনে মনে ভাবে প্রিয়া।

ছেলেটির পরিবারের লোকজন বুঝতে পারে প্রিয়ার মানসিক অবস্থা কত ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। তাই তাকে তালাক দিতে বলে। কিন্তু সে তার পরিবারকে বলে মানুষের বিয়ে একবার হয়। আমি মনে করি সে একদিন নিশ্চয় বুজতে পারবে আমাকে। সে দিন থেকে আমরা নতুন ভাবে শুরু করব সংসার। আর যদি সে ছেড়ে চলে যায় তাহলে আমি একা থাকবো চিরকাল। কোন দিন অন্য কোথাও বিয়ে করবো না। যে সব কথা শুনার পর পরিবারের অপজনেরা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। বলে তোর যা ইচ্ছা কর।

কয়েক মাস কোন রকম এভাবে অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রিয়া ছেলেটিকে ছেড়ে চলে যায় তার বাপের বাড়ি। ছেলেটি যেন পাগলের মত ঘুরে বেড়াতে থাকে এদিক-ওদিক। সব সময় প্রিয়ার প্রতিচ্ছবি তার চোখের সমানে দেখতে পায়। আর সে যেমন ধরতে যায় তখন এক মুহূর্তে বিলিন হয়ে যায়। এই ভাবে কাটতে থাকে তার দিন। তার নিজেকে এত নগন্য মনে হয় যে তার বাড়ির পাশের রিক্সাওলার থেকেও থেকেই নগন্য। রিক্সাওলাও কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে। সে পারেনা তার স্ত্রীর সামান্য চাহিদা পূরণ করতে। তখন সে ভাবে তার বেঁচে থেকে লাভ কি? সে আত্মহত্যা করার জন্য মারিয়া হয়ে উঠেছে। যেন তার ভাগ্যের চাকা কাদায় আটকে গেছে যা শত চেষ্টার পরও নড়ানো যায়না। আবার মনে করে আত্মহত্যা করলে তো সব শেষ। পৃথিবীর প্রত্যেকটা উপাদান ধিক্কার দেবে আমাকে। বলবে কাপুরুষ তাই সে আবার জেগে উঠে।

হটাৎ করে ছেলেটির বাড়ি যায় সোনালী। সোনালী তার ছোট কালের খেলার সাথী। সোনালি তার প্রতিবেশী ছিল। তারা এখন বড় শহরে থাকে। ছেলেটির শরীরের অবস্থা দেখে বুজতে পারে তার কোন না কোন সমস্যা হয়েছে। সে জানে তার কোন সমস্যা হলে তার একটা মানসিক অস্থিরতা দেখতে পাই। যা সে এখন দেখছে। সে জানতে চাই তার সমস্যা কি? প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও পরে সব বলতে শুরু করে। চোখের জল গাল বেয়ে মাটিতে পড়ে। যেন তার দুঃখের বাঁধ ভেঙেছে যা তৎক্ষণাৎ মেরামত করা সম্ভব নয়। সোনালী সব কথা শুনার পর সে ভরাকান্ত হয়। আর তাকে অনেক বুঝবার পর ছেলেটিকে তাদের শহরে নিয়ে যায়। যা খরচ হবে সোনালী দিবে। চাকুরী পেলে সব টাকা পরিশোধ করে দেবে। আসলে সোনালী তাকে কিছু দিন সময় দিলে সে সফল হবেই। আর সোনালি পরামর্শে সেখান থেকে সে আবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

অপর দিকে প্রিয়া তার বাড়ি যাওয়ার পর ভাবতে থাকে ফেলে আসা জীবন নিয়ে। সে কি কোন ভুল করেছে? নাকি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উত্তর যায় হউক। বাড়িতে কেউ তাকে দেখতেই পারেনা। সবাই তাকে দায়ী করছে। ছেলেটি একবার অসফল হয়েছে বলে সে কোন দিন সফল হবে না তা তো আর ঠিক নয়। তাই সে বাড়ি থেকে তার দিদির বাড়ি চলে যায়।

ছেলেটি কিছু দিন পর আবার ইন্টারভিউ দিতে যায়। আর সে দেখতে পায় তার স্যার ইন্টারভিউ নিতে এসেছে। স্যার আশ্চর্য হয়ে যায় যে তার চাকুরী এখনো হয়নি। আসলে ছেলেটি ছিল ওই স্যারের প্রিয় ছাত্র। স্যার তার চাকরি না পাওয়ার করুন অবস্থা দেখে বলে বাড়ি যা। এবার তোর চাকুরী হবেই। আমি সব ব্যবস্থা করব।

সময় মত ফলাফল বের হয়। দেখে সে সফল হয়েছে এবং তার চাকুরি হয় পাশের কলেজে। তখন সে যেন বেঁচে থাকার পথ পায়। যেন সফলতার ঘাটে সুখের নৌকা লেগেছ। চোখের সামনে সুখের শহর দেখতে পাচ্ছে। সুখের পায়রা গুলি ডানা মেলে উড়ে আকাশের দিকে। ছুঁয়ে ফেলে যেন চাঁদকে। আর তার চিৎকার করে বলার ইচ্ছা হচ্ছে আমি আর ডাসবিনে পড়ে থাকা নোংরা আবর্জনা নয়। সফলতার উজ্জ্বল ইমারত। যেন তার আটকে থাকা ভাগ্যের চাকা চলতে শুরু করেছে দ্রুত গতিতে। সোনালী যেন তার ভাগ্যের চাকা চলতে সাহায্য করেছে। তাই সে সোনালীর কাছে চির কৃতজ্ঞ।

প্রিয়া কিছু দিন যাওয়ার পর দিদির বাড়ি থেকে ফিরে আসে। আসলে দিদির বাড়িতে তো আর বেশি দিন থাকা যায়না। মান সম্মানের একটা ব্যাপার আছে। তাই সে স্থির করে যে সে নিয়মিত কলেজ যাবে এবং ডিগ্রি শেষ করবে। সে তার বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ করে। সে জানতে পারে কয়েক জন নতুন অধ্যাপক নিয়োগ হয়েছে। তাদের মধ্যে এস.আই স্যার অনেক মেধাবী। সব কিছু যেন মন মত বুঝিয়ে দেয়। যেন বন্ধুর মত সব কিছু বলতে পারে সবাই। তাই কয়েক দিনের মধ্যে সকল ছাত্রছাত্রী তার ফ্যান হয়ে গেছে।

কয়েক দিন পর প্রিয়া কলেজে যায়। কিন্তু যেতে দেরি হয়ে যায়। দেখে তার ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। তাই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আসতে করে বলে- আসতে পারি স্যার। তার কন্ঠ স্বর শুনার পর এস.আই স্যারের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরন জাগে। সে তাড়াতাড়ি তার দিকে তাকায়। আর অপ্রস্তুত ভাবে বল- আসো। কারণ মেয়েটি আসলে তার স্ত্রী প্রিয়া। যেন সবার সামনে চিৎকার করে বলে দেখ আজ আমি আজ হয়েছি। এর পর তোমার সকল চাহিদা পূরণ করতে পারব। চলো বাড়ি চল।কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে তার স্ত্রী যদি মেনে না নেয়। সে তো তাকে স্বামী হিসেবে মানেনি কোনদিন। এমন কি সে তাকে নগন্য ভেবে ছেড়ে চলে গেছে। তাছাড়া সে তো এখন স্যার। সুতরাং তাকে সংযত থাকা উচিত। তাই সে কোন রকম নিজেকে সংযত করে আবার পড়াতে শুরু করে।

স্যারের দিকে তাকিয়ে প্রিয়াও আশ্চর্য হায়ে যায়। স্যার তো তার স্বামী সফিকুক ইসলাম। আগে বুজতে পারেনি এস.আই স্যার যে তার স্বামী যখন বান্ধবীদের মুখে শুনেছিল। আসতে আসতে সে ক্লাসের ভেতরে শেষ বেঞ্চে বসে। লজ্জায় যেন তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। যাকে সে স্বামী হিসাবে স্বীকৃতি দিতে চাইনি সে আজ তার সকল বন্ধু বান্ধবের ফেবারিট স্যার। অথচ তার স্বামী কোন দিন একটিও ছোট কথাও বলেনি তাকে। যার পরিচয় বন্ধুদের সামনে কি ভাবে দেবে ভাবছিল সে তো আজ জনপ্রিয় অধ্যাপক।

প্রিয়ার এক এক বার মনের ভেতর গর্ব হচ্ছে। সে তো তার আমার স্বামী। আমাদের এখনও তালাক হয়নি। প্রয়োজন হলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিব। কিন্তু আবার আশঙ্কা হচ্ছে সে যদি তাকে আপমান করে। না গ্রহণ করে। নানান প্রশ্ন মনের ভেতর বিচরণ করছে। তবে তার বাবার সিদ্ধান্তটি অকপটে স্বীকার করছে যে আসলেই তার স্বামী কালো সোনা যা সে চিনতে ভুল করে ছিল। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে ছেলেটির দিকে।