একবার আড্ডা হচ্ছিলো বন্ধুদের সাথে। সেখানে ডঃ মাহবুব হাসান, আমাদের সাংবাদিক বন্ধু বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী, উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, “মাত্র ক’ বছর আগে আমরাই কয়েক বন্ধু সকালবেলা পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে এসে নিজেরাই দুষ্টুমি করে ভাবলাম পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে খেলে কেমন হয় এবং তা শুরু করলাম। বেশ মনে ধরল সবার। কয়েক বছর পর এখন দেখছি এটা শুধু ব্যবসায়িক বিষয় নয়, আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে! হায়রে, আমাদের সংস্কৃতি!

উনার মত জ্ঞানী সাংবাদিকের কথায় আমার অন্য একটি ইতিহাস মনে পড়ে গেলো। শেখ দরবার আলমের একটি গবেষণা সমৃদ্ধ লেখায় পড়েছিলাম এই ইতিহাস। পাক-ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশদের আগমনের পর নবান্নের উৎসবে একটি নতুন অনুষ্ঠান যোগ করল কলকাতার বাঙালিরা। নবান্নের অনুষ্ঠানে লাল চামড়ার ব্রিটিশ সাহেবদের ডেকে এনে তাদের মনোতুষ্টির জন্য একটি পূজার অনুষ্ঠান শুরু করলো। এই পূজার নাম দেয়া হল “সাহেব পূজা”। বছরের পর বছর সাহেব পূজা চলল এবং ধীরে ধীরে সাহেবদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেবদেবী স্থাপন করা শুরু হলো। যুক্ত হলো কুমারী পূজা এবং পরবর্তীকালে কয়েক দিন ব্যাপী ধর্মীয় এই উৎসবের নাম দেয়া হলোঃ দুর্গা পূজা। সাহেবের জায়গায় মা দুর্গা বসলেন, মহিষাসুরের গল্প যুক্ত হলো। যুক্ত হলো লক্ষ্মী কার্তিক গণেশ এবং অন্য দেবদেবী। শতবর্ষ না যেতেই সেটা বাঙালি হিন্দুদের ধর্মীয় আচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলো। মাত্র কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে নতুন আবিষ্কৃত একটি অনুষ্ঠান এখন হয়ে গেছে বাৎসরিক সরকারি ছুটি দেওয়ার মতো হিন্দু ধর্মের অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি উৎসব। হ্যাঁ, এটাই এখন এতদঞ্চলের হিন্দু সংস্কৃতি।

নব্বই দশকের শুরুতেই আমার সুযোগ হয়েছিল মারাঠাদের দেশে যাওয়ার। সেখানে গিয়ে দেখলাম ওরা অর্থাৎ মারাঠি হিন্দুরা “গনেশ পূজা” করে অত্যন্ত ধুমধামের সাথে, কিন্তু দূর্গা পূজা পালন করে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম দুর্গাপূজা একান্তই বাঙালি হিন্দুদের ধর্মাচার। দেওলালীর আর্টিলারি সেন্টারে চাকরিরত কয়েকটি বাঙালি পরিবারকে খুব ছোট আকারে দুর্গাপূজা পালন করতে দেখেছি। তখন বুঝতে পারলাম, যে কারণেই হোক না কেন ব্রিটিশ সাহেবদের মনোরঞ্জন এবং তোষামোদ করার প্রয়োজনে বাঙালি হিন্দুরা যে দুর্গাপূজার সৃষ্টি করেছে তা ভারতের অন্য অঞ্চলের অন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রয়োজন বা প্রসঙ্গ ছিল না। মহারাষ্ট্রে হিন্দুরা অত্যন্ত ধুমধামের সাথে গনেশ পূজা করে থাকে। ইতিহাস খুঁজে জানলাম, এটা শুরু হয়েছে মহান মুঘল বাদশা আওরঙ্গজেবের সময় শিবাজীর কৌশলী প্রয়োজনে। মহারাষ্ট্রের দেওয়ালিতে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় আমি পরিতক্ত দুর্গ দেখেছি যা শিবাজীর দুর্গ নামে পরিচিত। শিবাজী ছিল বিদ্রোহী এবং মোগল শক্তির দাপটে সমতল এলাকায় তার পক্ষে বসবাস করা সম্ভব ছিল না। যদিও রবীন্দ্রনাথও শিবাজীকে “ছত্রপতি শিবাজী” হিসেবে মহিমান্বিত করেছেন কিন্তু মূলত শিবাজি ছিল বিদ্রোহী গেরিলা কমান্ডার। তার পক্ষে কখনোই শাসন করা সম্ভব হয়নি। তবে তার পুত্র শম্ভুজী ওই এলাকায় কিছুদিন শাসন ক্ষমতা ভোগ করেছিল। রাজ শক্তির কাছে বারবার পরাজিত হয়ে শিবাজীকে দলবল নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের দূর্গেই থাকতে হতো। গণেশ পূজার সময় গণেশের মূর্তি নিয়ে ধর্মীয় মিছিলের ছদ্মাবরণে শিবাজী তার দলবল নিয়ে জনগণের মধ্যে আসার সুযোগ পেত। মোগল শাসকরা অন্য ধর্মের অনুসারীদের কখনোই ধর্মীয় কাজে বাধা দিতো না। এই ধর্মীয় স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে মারাঠারা নিজেদের মধ্যে গনেশ পূজা ব্যাপকভাবে অর্থাৎ ধুমধামের সাথে পালন করা শুরু করেছে বলেই জেনেছিলাম। এখনো মহারাষ্ট্রে প্রধান দেবতা গণেশ। হ্যাঁ, গণেশ পূজাই মারাঠাদের প্রধান সংস্কৃতি।

এই যদি হয় এতদঞ্চলের তথাকথিত সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ইতিহাসের ভিত্তি, তাহলে বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং লোকাচার অনুযায়ী নিজেদের অর্থাৎ বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে গুছিয়ে নিলে কি হয়? কেন সংস্কৃতির নামে আমাকে আমার বিশ্বাসের বিরোধী কিছু কাজ সম্পাদন করতে হবে? স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের তো কোন প্রকার আত্মপরিচয়ের সংকট থাকার কথা নয়! আমার মনে হয় এ বিষয়ে আমাদের, সদ্য স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের, চিন্তাভাবনা করা উচিত।