বাংলা সাহিত্য লোকে কাজী নজরুল ইসলামের অভিধা তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’। তাঁর এই উপাধি ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং সাধারণের মধ্যে এককভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ক্ষণজন্মা এই কবি পুরুষকে কেবলমাত্র বিদ্রোহী কবি হিসেবে চিহ্নিত করলে নি:সন্দেহে তাঁর কবি মানস খন্ডিত করা হবে। কেননা নজরুল বিদ্রোহী কবি একথা যতটা সত্য, ততটাই সঠিক তিনি প্রেমের কবি। তাঁর কাব্যে সংগ্রামী চেতনা এসেছে নিপীড়িত- নির্যাতিত মানুষদের জাগানোর প্রয়োজনে, যা ছিল সময়ের দাবী; পাশাপাশি মুখরিত হয়েছে প্রেমের চিরন্তন বানীতে, যা শ্বাশত কালের মানব হৃদয়ের আবেদন।

বলা য়ায় নজরুল কাব্যে প্রেম ও দ্রোহ এই দু’টি সত্ত্বা সর্বদা তীর্যক ধারায় প্রবাহমান। আর এই বক্তব্যের পরিপূর্ণ যৌক্তিকতা মেলে “ মর এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণতূর্য ” বিদ্রোহী কবিতার এই একটি মাত্র পঙক্তি থেকেই। নজরুল কাব্যে এই দ্বিসত্ত্বার সরস প্রাণবন্ত উপস্থিতি প্রসঙ্গে সমালোচক ড: আহমদ শরীফ বলেছেন, “একই হৃদয় বৃত্তির দু’টো দিক: উচ্ছ্বাস উত্তেজনায় ঝাঁপিয়ে পড়া আর কেঁদে লুটানো- আগুন জ্বালানো আর অশ্রু ঝরানো”। (নজরুল কাব্যে প্রেম) কাজী আব্দুল ওদুদ লিখেছেন,“ যিনি খ্যাতি লাভ করলেন ‘বিদ্রোহী’ রুপে কাব্য লক্ষীর প্রসাদ অজস্রভাবে তিনি লাভ করলেন প্রেম-সংগীতের রচয়িতা রূপে”। (নজরুল ইসলাম)

আমরা দেখি নজরুল যখন ইংরেজদের শাসন-শোষণ-অত্যাচার এবং সামাজিক ও ধর্মীয় অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার তখন তাঁর পৌরুষ আপোষহীন, অগ্নিঝরা বানী শানিত। এখানে তিনি পাহাড়ের মত স্থির, অবিচল। পাথরের মতো কঠিন, কঠোর। কিন্তু কবির মন যখন প্রিয়ার ভাবনায় মগ্ন, প্রিয়তমার জন্য ব্যাকুল তখন তিনি বড়ই অস্থির, বড় বেশি নরম, কোমল। এ যেন পাহাড়ের গাঁ বেয়ে কঠিন পাথর ছুঁয়ে ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়া র্ঝনার মতো। তাই যখন তিনি সংগ্রামী তখন তাঁর দৃপ্ত উচ্চারণ:
“আমি মানি নাকো কোন আইন
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি,
আমি র্টনেডো,
আমি ভীম ভাসমান মাইন।
…. …. …. …. ….
আমি বেদূঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কর্নিশ।”
(বিদ্রোহী, অগ্নিবীণা)

কাউকে পরোয়া না করা এই কবিই গানের সুরে আকাঙ্খিত নারীকে আহবান করেছেন,“ মোর প্রিয়া হবে এসো রানী”। অথবা না পাওয়ার চরম বেদনায়, অপ্রাপ্তির ব্যর্থতায় প্রেমিক কবি অবুঝ শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠেছেন:

“গভীর দুখের কাঁদন কেঁদে শেষ করে দেই এই আমারে।
যায় না কি মা আমার কাঁদন তাহার দেশের কানন পারে?”
(অবেলার ডাক, দোলনচাঁপা)

নজরুল কাব্যে প্রেম এসেছে সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য; যেখানে চাওয়া ও অতৃপ্তি, মিল ও বিরহ সাধারণভাবে সাধারণের মধ্যে চিরকালীন প্রেমের রূপ পেয়েছে। প্রেমের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে আইডোলজি অর্থাৎ আদর্শায়িত প্রেম, তা নজরূল কাব্যে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। প্রেমিক কবি অত্যন্ত বেদনাতুর। প্রিয়াকে পাওয়ার প্রতিযোগীতায় কোন প্রতিদ্বন্ধি তাঁর কাম্য নয়। কিন্তু নজরুলের প্রেম তো আমাদের চোখের সামনের প্রতিদিনের ঘটে যাওয়া মানব-মানবীরই প্রেম। যেখানে পাওয়ার আনন্দ আছে, হারানোর বেদনা আছে, ঈর্ষা আছে, প্রতিহিংসা আছে,মান-অভিমান আছে; যা নজরুলের কাছে ছিল অসহনীয়। তিনি সব কিছুর উর্ধ্বে প্রিয়াকে একান্ত নিজের করে চেয়েছেন। না পেলে কেঁদেছেন। শপথ নিয়েছেন তবুও ভালোবেসে যাওয়ার:
“আজ চোখের জলে প্রার্থনা মোর
শেষ বরষের শেষে,
যেন এমনি কাটে আসছে জনম
তোমায় ভালোবেসে।”
(শেষ প্রার্থনা, দোলন চাঁপা)

কিন্তু দ্রোহী নজরুলের এই কোমলতা খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রতিবাদী কবির অগ্নি- হুংকারে কেঁপে ওঠে জরা- মিথ্যা, শাসক- শোষক। শৃংখলিত-অবহেলিত-বঞ্চিত-শোষিত-অধিকার হারা-অন্ত্যজ শ্রেণী মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি বজ্র-সুকঠিন। এখানে তাঁর কাছে ক্ষমা নেই, চোখের জল নেই বরং তাঁর রুদ্র আহবান:
“ টুটি চিপে মারো অত্যাচারে মা
গলহার হোক নীল ফাঁসি”
(রক্তাম্বর ধারিনী মা, অগ্নিবীণা)
অথবা,
“প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায়
তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায়
তাদের সর্বনাশ।”

প্রেমিক কবি নজরুল যুগ যুগ ধরে প্রিয়াকে খুঁজেছেন। হয়তো পেয়েছেন, হয়তো বা আবার হারিয়েও ফেলেছেন। কবি কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়ঃ
“যুগে যুগে আমি হারায়ে প্রিয়ারে ধরনীর কূলে কূলে
কাঁদিয়াছি যত, সে অশ্র“ কিগো তোমাতে উঠেছে দুলে?”
(কর্নফুলী, চক্রবাক)

এই যুগ-যুগ ব্যাপী হারানো অথবা যুগ-যুগান্তরের চোখের জল ধূমকেতুর রূপে ফিরে এসেছে কবির বিদ্রোহী চেতনায়। কবিকণ্ঠঃ
“আমি যুগে যুগে আসি,আসিয়াছি পুন: মহা বিপ্লব হেতু
এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু।”
(ধূমকেতু, অগ্নিবীণা)

এক দিকে প্রেম অন্য দিকে দ্রোহ; এক হাতে গোলাপ অন্য হাতে অস্ত্র- নজরুল কাব্যে এ এক বিস্ময়কর বিচিত্র সংযোজন। কবির এই বৈচিত্র্যময়তার ভেতরে আরো একটি ব্যাপার লক্ষ্যনীয়, তা হলো তাঁর সর্বগামীতা অর্থাৎ বিশ্ব-ব্রম্মান্ডে যাবতীয় উপাদান নিয়ে এসেছেন তাঁর কাব্যের অজর-অমর-অক্ষয় বানীতে। হোক তা প্রেমের কিংবা দ্রোহের। তাই দেখি দ্রোহী কবি উঠে গেছেন “মহা বিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি; চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি”। আবার প্রেমিক কবি গুবাক তরুর সারি দেখে বলেছেন “তোমাদের পাতা মনে হতো যেন সুশীতল করতল-আমার প্রিয়ার”। (গুবাক তরুর সারি, চক্রবাক)

বস্তত নজরুল ছিলেন মানবতার কবি, মানব হৃদয়ের কবি। তাঁর বিদ্রোহাত্মক কবিতায় আছে মানবতার জয়গান; প্রেমের কবিতায় আছে অমৃত সুধা। আলোচক আব্দুল কাদের লিখেছেন, “এই বিশ্বকে অন্যায়-অসাম্য ও অশান্তি বিরহিত এক ভূখন্ডে পরিনত করার জন্যই নজরুলের কণ্ঠে হয়েছে তূর্যনিনাদ! এই ধূলির ধরায় বেহেশ্তের অমৃত ঝরাতেই নজরুল তাঁর বাঁশরীতে করেছেন প্রেমের সুরের সাধনা। সৈনিক ও প্রেমিক এই দুই রূপেই নজরুল বাংলা সাহিত্যে ও সঙ্গীতে দিয়েছেন অসাধারণ সৃষ্টিশীলতার পরিচয়”। (নজরুল কাব্যে প্রেম ও সংগ্রাম)

আমরা বলতে পারি বাংলা কাব্য সাহিত্যে নজরুলের এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কবিকে একটি বিশেষ র্মযাদার আসন দান করেছে। যেখানে তিনি একা-অদ্বিতীয়-প্রতিদ্বন্ধিহীন। প্রেমিক নজরুল বিদ্রোহী নজরুল, চিরস্বরণীয়, চির অম্লান।