সোশ্যাল মিডিয়ায় আল মাহমুদ বলতে গেলে খালি মাঠে গোল খাচ্ছেন। বেশ কিছু দিন যাবত একেকজন একেক রকম পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকেই আল মাহমুদকে না কবি হিসেবে সাব্যস্ত করার আপ্রাণ খসরত করে যাচ্ছেন। এইসব পোস্টে ব্যক্তিত্বহীন কিছু মানুষ রাজনীতির নোংরা শব্দ উগড়ে দিয়ে তৃপ্তি পাচ্ছেন। কবি নামধারী কিছু রুচিহীন কিছু মানুষ অরুচিকর মন্তব্য করে যাচ্ছেন। এদের কমেন্টের ভাষা দেখে উত্তর দিতে অনেকের রুচিতে বাঁধবে। কবিতার আলোচনা হবে শালীন শব্দে, শৈল্পীক নিয়মে। তাই হয়তো অনেকেই ইচ্ছাকৃত নিরব। আল মাহমুদ কবি।বাংলাভাষার অন্যতম কবি। তাকে ইচ্ছে করলেই কেউ মুছে দিতে পারবে না। আল মাহমুদের বিপক্ষে যেমন আছে পক্ষেও আছে। আমরা মনে করি পক্ষবিপক্ষ বড় কথা না।কথা বলতে হবে সত্যের পক্ষে। অনলাইনে এই তর্কটা এক তরফা হচ্ছে। কারো পোস্টে যেয়ে তর্কাতর্কি আমারও ভালো লাগে না। তাই নিজের আইডিতে কিছু কথা বলছি। কারো নাম উল্লেখ ছাড়াই বয়ান করতে চেষ্টা করছি। আল মাহমুদ কোন ফেরেস্তা বা সাধু পুরুষ নন। তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতেই পারে।হবেই। সেটি হবে শালীনভাবে।কিন্তু কেউ যখন বলেন “তিনি তার শ্রেষ্ঠ কবিতা ও গল্পগুলি লিখেছেন রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারের আগে।”

এই ভ্রষ্টাচারটা কী? তিনি আগে যে দল, দলের আদর্শ লালন করতেন তা থেকে সরে আসা? পরবর্তীতে যে বিশ্বাসে স্হিত হলেন সেটা? আল মাহমুদ প্রসঙ্গে এই দাবীর উত্থাপনকারীরা কমিউনিজমের অনুসারী। আপনি যদি আপনার মত আর পথকে সত্য সরল মনে করে দৃঢ়তার সাথে আল মাহমুদকে পথভ্রষ্ট বলতে পারেন আল মাহমুদ কেন আপনাকে বিভ্রান্ত, আর পথভ্রষ্ট বলতে পারবেন না? আপনি যখন নিজের দল, পথ, মত, বিশ্বাসকে সঠিক মনে করে অন্যের পথ, মত, বিশ্বাসকে বাতিল করে নিজেকে প্রগতিশীল দাবী করেন তখন আল মাহমুদ আপনাকে উগ্র, সংকীর্ণ, হীন, সাহিত্যের অসত মন্তব্যকারী ভাবতেই পারেন। আল মাহমুদ একজন মুসলমান হিসেবে আল্লাহতে বিশ্বাস, পরকালীন হিসাবের ভয় তার থাকাই উপযুক্ত। একজন কবি তার বিশ্বাসের জায়গায় ফিরে আসাকে আপনি বললেন পথভ্রষ্ট তখন এদেশের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান আপনাকে কী বলতে পারে ভাবতে পারেন। রাজনৈতিক অবস্হানই কমিউনিজম বা বামদের অবস্হান কি? তাদের চিন্তা চেতনাইবা কি বিস্তারিত জানতে গবেষণার দরকার আছে? এদেশের সচেতন মুসলমানরা জানে বামেরা গ্রহণ করেছে কালচারালী হিন্দু ইজমকে। তারা নামে মুসলমান হিন্দুয়ানী কালচারে অভ্যস্ত।

রাজনীতি সচেতন একজন মুসলমান তাদেরকে পরিপূর্ণ মুসলমান বা ইসলামের বন্ধু মনে করে না, শত্রু জ্ঞানই করে। নিজের পক্ষ ছাড়া অন্য সব বাতিল প্রগতিশীলতাতো উদার, মুক্ত চিন্তা না এটাকে বলা যায় প্রগতী সাম্প্রদায়িকতা। বস্তুত তারা মুখে উদার, মুক্ত বুলি আওড়ালেও মনে মনে উগ্র এবং সাম্প্রদায়িক। তারপর তিনি আল মাহমুদের নষ্ট হওয়ার সূচনার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন তার লেখা আগে খুব ভালো ছিল। কিন্তু খারাপ হওয়া শুরু করল “যখন থেকে তিনি জিয়া, এরশাদ, জামাতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক এবং পদের সুবিধা পেতে ও নিতে শুরু করলেন,” তখন থেকে। তার উৎকৃষ্ট লেখা তিনি লিখেছেন “তার আগে” অর্থাৎ তাদের কাছ থেকে এইসব সুযোগ সুবিধার নেয়ার আগে।

কেনরে ভাই? সুযোগ সুবিধার জন্য যদি লেখক সত্তার ক্ষতি হয় তাহলে একা আল মাহমুদের হবে কেন? আরো কতজনেরইতো হওয়ার কথা।কেউ কেউতো প্রকাশ্যে বলে আমি অমুকের কবি। আরও একদাপ এগিয়ে নির্লজ্জ অরুচিকরভাবে বল আমি অমুকের দালাল কবি। তাদের নিয়েতো কিছু বলেন না। কবি সুফিয়া কামালকে আমরা কবি হিসেবেই সম্মান করি। তিনি কায়েদে আযমের নামে অগনিত কবিতা লিখেছেন বলেতো কেউ তাকে নষ্ট বলে চিহ্নিত করেন নাই। নির্মলেন্দু গুণ, শামসুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রমুখেরা সরকারের সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পরও মহান! শুধু কবির চরিত্র নষ্ট হবে কেন রাজনীতিবিদের চরিত্র নষ্ট হয় না? আপনাদের গুরু স্হানীয় নেতারা যখন ক্ষমতার ললিপপ চুষতে নিজের অস্তিত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে কতকিছুই করে তাদের নিয়ে কিছু বলছেন? যাক কবি ও কবিতাতেই ফিরে আসি।

কথা বলা কোন দোষের না। কথা বলা যাবে কবিতা নিয়ে।কথা বলা যাবে কবিকে নিয়ে। কিন্ত যখন শিল্প ও সাহিত্যের নামে একপাক্ষিক ও আক্রোশ চর্চা হয় তখন কথার পিঠে কথা আসে। আপনারা বলছেন সুযোগ সুবিধার কারণে তার লেখার মান নিম্নমুখী হয়েছে। এটি কেবল আল মাহমুদে সীমিত কেন? এরশাদের, খালেদার হাত থেকে যারা নজরানা নিয়েছে তাদের বিষয়ে মুখ বন্ধ না রেখে খুললে তালিকা আরও অনেক লম্বা হবেতো। হচ্ছে না কেন? তারা আপনাদের ছায়াতলে আছে বলে? আর সরকারী উপঢৌকনে যদি আল মাহমুদের পঁচন ধরে সেটা এরশাদ থেকে কেন? তিনিতো এ সুযোগের ভাগীদার হয়েছিলেন আরো আগে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়কালে। কি সাংঘাতিক! আল মাহমুদতো তাহলে আরো আগেই মরে শেষ!

সততার সাথে, দৃঢ়তার সাথে লিখতে পারবেন বঙ্গবন্ধু সরকারের সুযোগসুবিধা ভোগ করে কবি আল মাহমুদ পথভ্রষ্ট হয়েছিলেন, আল মাহমুদ নষ্ট হয়েছিলেন। মূলত আপনারা কী বুঝাতে চান সরকারী সহযোগীতা না দলীয় সহযোগীতা? যদি সরকারী সহযোগীতায় আল মাহমুদ দুষ্ট হন তাহলে আপনাকে ব্যাখ্যার সূত্রপাত এরশাদ থেকে করলে হবে না মহোদয়। শিল্পকলা থেকে করতে হবে। আর যদি দলীয় দৃষ্টি থেকে বলেন আল মাহমুদও আপনাকে বলতে পারেন তুমি বেটা সাড়ে তিন ডজন বাম করতে পারলে আমি ডান করতে পারব না কেন? রাজনীতিতো রাজনীতিই।আর আপনাকে দলিল দস্তাবেজসহ প্রমাণ করতে হবে আল মাহমুদ কোন দলের কোন নেতা। আল মাহমুদ কবি। তিনি কি তার জীবদ্দশায় কোন দলের নেতা ছিলেন? আদর্শিকভাবে একজন মানুষের একটা পছন্দ থাকা আর দলীয় নেতা কর্মী হওয়ার ফারাকটাও আপনারা জানেন।

“তার আগের লেখা এবং পথভ্রষ্ট হবার পরের লেখার গুণগত মানে এবং সংবিত্তিতে আকাশ-পাতাল তফাত প্রমাণ করে দেয় যে নষ্ট মানুষের দ্বারা উন্নত সাহিত্য সৃষ্টি হয় না।” পথভ্রষ্টের ব্যপারে কিছু কথা বলেছি। তার লেখার গুনগত মানটা আপনারা কোন দৃষ্টিকোন থেকে নির্ণয় করেছেন তা পরিস্কার করেননি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে রাজনৈতিক দৃষ্টিতেই বিচার করেছেন। সাহিত্যের বিচার এভাবে নির্ণিত হয়নি। এটি সংকীর্ণ বিচার পদ্ধতি। দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রেও আল মাহমুদ আর আপনারা এক জায়গায় নাই। এখানেও আপনাদের সাথে মিলবে না। না মিললেই নষ্ট হয়ে গেছে এটি হীনমন্যতা।

আকাশ পাতাল তফাতটা কার সাথে তুলনা করেছেন? আল মাহমুদকে দিয়ে আল মাহমুদ? আগের আল মাহমুদ আর পরের আল মাহমুদ গুনে মানে কমবেশি হতেই পারে। পৃথিবীর ক‘জন লেখক আছে যে তার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমানতালে লিখে যাচ্ছেন! সারাজীবনে অমর রচনাতো হাতেগোনাই হয়। সাবেক মতে থাকলেই যে তার লেখার অবনতি হত না তার কি গ্যারান্টি আছে? আর যদি বলেন না শিল্পের সঙ্গায়, অন্য কারো তুলনায় তিনি ম্রিয় মান তাহলে এভাবে ঢালাও মন্তব্য করলে হবে না। আল মাহমুদ এক জীবনে বহু লিখেছেন তার মধ্যে কিছুও যদি টিকে যায় তবেই লেখক জীবন ধন্য। এটি বিচার করবে মহাকাল। আপনি বা আপনারা বাতিল করার টিকাদারী মনে হয় পাননি বা কেউ দেয়ওনি। যদি তাই হয় নানাজন নানাজনকে এক খোঁচায় বাতিল করে দেবে। শব্দ শুধু একজন লিখতে জানে না প্রতিপক্ষেরও বাতিল করার শব্দ লিখার কায়দা জানা। এইভাবে কাঁদা না ছুঁড়ে শিল্পকে শিল্প দিয়ে বিশ্লেষণ করুন। আল মাহমুদ যা লিখবেন সব সোনালী কাবিন হলেতো মহামানবের সীমাকে অতিক্রম করে ফেলতেন। এটা হয় না। তাই বলে তিনি নষ্টও হয়ে যাননি।

“নষ্ট মানুষদের দ্বারা উন্নত সাহিত্য হয় না” চরম বিদ্বেষ এবং একরোখা কথা। আপনার আলোচনার সূত্র ধরে কথা বললে নষ্ট হওয়ার উতস পাই সরকারী আনুকূল্য। এই আনুকূল্যকে নষ্ট হওয়া ধরলে বাংলা সাহিত্যের বিগত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে বড় বড় সাহিত্যিকদের নাম উচ্চারণ করতে হবে এবং বাতিল করে দিতে হবে বিশ্ব সাহিত্যের বহু শক্তিমান লেখকের সৃষ্টিকে। শেক্সপিয়র সরকার পক্ষের লোক ছিলেন গুন্টারগ্রাস রাজনীতির মানুষ ছিলেন। এজরা পাউন্ট, ইলিয়েটের সৃষ্টিতে ধর্ম আছে তারপরও তাদের সৃষ্টি মহত। আল মাহমুদে যদি সৃষ্টির এই মহত্ত না থাকে তাহলে ঝরে যাবে।কাল তাকে গ্রাস করে ফেলবে। কেউ রাখতে পারবে না।কিন্ত আপনি বাতিল করলে শিল্পের যথাযথ নিয়মে বলতে হবে। রাজনীতির শ্লোগানে বাতিল করে দিলেতো প্রতিপক্ষ থেকেও পাল্টা শ্লোগান আসবে।

আল মাহমুদের বিশ্বাস এবং তার পক্ষদের কাছেতো নষ্টতে আছেন আপনারাই। বিশ্বাসী মানুষ, রুচিশীল মানুষের ভাবনা আর অবিশ্বাসী বিকৃত রুচির মানুষের ভাবনা এক না। এই জন্যই একদা যে আল মাহমুদ মৃত্যুর পর হতাশায় ভাবতো কবরে ঘাস ছাড়া আর কিছু নাই তিনিই আবার চিন্তা বিশ্বাসের কারণে ভাবনার পরিবর্তনে মৃত্যুর পর দেখেন পরকাল, হিসাব, নিকাশ। সাহিত্যে তার প্রতিফলন তার সততা।ভন্ডামী না। ভন্ডামী হত ইসলামে ফিরে আসার পরও সাবেক চিন্তায় রচনা করতেন সাহিত্য।

আল মাহমুদ মুসলমান তারপর কবি। তার পূর্বের অবস্হান থেকে ফিরে আসায় শিল্পে ও চিন্তার পরিবর্তন ও প্রকাশ পাওয়া স্বাভাবিক। ব্যক্তি জীননেও তিনি চর্চা করছেন ধর্ম।একটা ছবিতে দেখা যায় তার কবি বন্ধু শামসুর রাহমান খাচ্ছেন আর আল মাহমুদ নামাজ পড়ছেন।এটা তার প্রাকটিস, অন্তর দেখার দায়িত্ব মানুষের না শ্রষ্টার। আল মাহমুদ কবি।ইসলামিস্ট হননি বলতে কী বুঝালেন? তাকে ইসলাম প্রচারক হওয়াতো জরুরি না।

আল মাহমুদ বুঝতে পেরেছিলেন সদ্য স্বাধীন দেশে রাজনীতির নামে শ’য়ে শ’য়ে গুপ্ত হত্যা কোন বিবেকবান মানুষের কাজ না। এটি নষ্টদের কাজ।তাই নষ্টদের ভীড় থেকে বেরিয়ে আসলেন শান্তির আশায় বিশ্বাসের ছায়াতলে। আজ তার মৃত্যুর পর নষ্টদের মুখেই উচ্চারিত হচ্ছে আল মাহমুদ নষ্ট হয়েগেছেন শব্দ। অথচ নষ্ট আল মাহমুদ নষ্টদের ছেড়ে এসেছিলেন আলোর পথে।

ব্যক্তি আল মাহমুদ দোষেগুনে মানুষ। তার দোষ থাকলে বলা যাবে না এমন কথা কেউ বলেনি। তার জীবন কর্ম আলোচনা করলে দোষগুন প্রকাশ হবে। আমরা মনে করি রাজনৈতিকভাবে প্রথম জীবনে ছিলেন নিষিদ্ধদের সাথে। প্রথম জীবনের আদর্শ ছিল বিভ্রান্তির। পরবর্তীতে শামিল হয়েছিলেন বিশ্বাসীদের কাতারে। কিন্ত তিনিতো কোন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী ছিলেন না। আল মাহমুদ কোন দলের নেতা বা কর্মী ছিলেন এমন প্রমাণ কী কারো কাছে আছে?

রবীন্দ্রনাথের কবিতার বা সৃষ্টির আলোচনা যখন করা হবে তখন শিল্পের ব্যাকরণ মেনেই করতে হবে। ১৯০৫ সাল বাঙালী জাতীর স্বপ্ন পূরণের সাল। মুসলমান বাঙালীর গৌরব ফিরে পাওয়ার সাল। বহু কাঙ্ক্ষিত বঙ্গভঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ নিজের জমিদারীর স্বার্থেই, হিন্দু জাতীয়তাবাদের স্বার্থে বঙ্গভঙ্গের বিরুধীতা করলেন। লিখলেন বিচ্ছেদে কাতর হয়ে আমার সোনার বাংলা। বঙ্গভঙ্গের পথপরিক্রমায় বহু পথ পাড়ি দিয়ে আমরা অর্জন করলাম স্বাধীনতা। আমাদের গৌরবের বিরুধীতা কারী,বিচ্ছেদে বিলাপকারীর রচনাকে এ জাতী গ্রহণ করতে দ্বিধা করেনি। শিবাজি উতসব কবিতায় কবি কি চাইলেন? বিশাল ভারতে বহু ভাষা, বহু ধর্ম সব একপাশে রেখে তিনি গেয়ে উঠলেন-
“একধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন
করিব সম্বল।
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক কন্ঠে বলো
“জয়তু শিবাজি’।
মারাঠির সাথে আজি, হে বাঙালি, এক সঙ্গে চলো
মহোৎসবে সাজি।”

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের এসব কথা যেহেতু লিখা আছে আলোচনা হবেই। এটি ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ। ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের আরো কত কথাইতো আছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী, প্রচারক ও পীর । তার কবিতা-গানে উপনিষদ, বেদ, মহাভারত, রামায়ণের ছড়াছড়ি। সেজন্য রবীন্দ্রনাথকে পথভ্রষ্ট বলেন না কেন?

কেউ কেউ বলে পতিতালয় ছিল তাদের ব্যবসার অংশ। ব্যক্তি চরিত্র আলোচিত হয় তবে যেভাবে তারা আল মাহমুদকে খারিজ করে দেয় সেভাবে কিন্ত রবীন্দ্রনাথের কবিত্বকে বাতিল করে না। রবীন্দ্রনাথের এই কয়টা পঙক্তি আলোচনা করলে কী ভয়ংকর বিশ্লেষণ দাঁড়ায়? মারাঠারা তদানিন্তন ভারতকে নরকে পরিনত করেছিল। সেই মারাঠা সেনাপতি শিবাজিকে তিনি ইশ্বর মানলেন। তারপর সব ভাষা, ধর্ম, জাতীকে উচ্ছেদ করে এক হিন্দু রাষ্ট করার আশা ব্যক্ত করলেন। এর চেয়ে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা আর কী হতে পারে? তবু তিনি কবি। শিবাজি উতসব লিখেও রবীন্দ্রনাথ যেমন কবি বখতিয়ারের ঘোড়া লেখায় যদি কারো হৃদয়ে ক্ষরণ হয় তবু আল মাহমুদ কবি। সবচেয়ে বড় কথা হল কে কবি, কে কবি না তা নির্ধারণ করবে সময়। কেন কবি না, কেন কবিতা না এসব বিশ্লেষণ করতে হয় শৈল্পীক যুক্তি তর্কে। কবি কোন দলের কমিটির মনোনিত পদবীধারী না। যে দুজন বসে নির্দেশ দিয়ে কমিটি থেকে বহিষ্কার করে দিবেন। রাজনীতির মাঠে বস্তির ছেলের ফালতু শ্লোগানে দু পয়সার দাম থাকলেও থাকতে পারে। সাহিত্যে গলাবাজির কোন দাম নাই।

তারা আল মাহমুদকে প্রথমেই দু খন্ড করে। প্রথম খন্ড যখন তাদের সাথে ছিল। আল মাহমুদ সমগ্রের প্রথম খন্ডকে বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নেয়। দ্বিতিয় খন্ডের কোন আলোচনা না করেই একবাক্য সবার আগে আল মাহমুদকেই নষ্ট বলে ফতোয়া দিয়ে ঐ সকল মুক্তমনা, প্রগতিশীলেরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ উচিৎ ছিল কবির কবিতাকে তুল্যমূল্যে বিচার বিশ্লেষণ করা। আমরা মনে করি কোন কবি শত শত পঙক্তি রচনা করার পর যদি একটি পঙক্তিও অমর হয় তাহলেই কবি জীবন স্বার্থক। আপনাদের বিদ্বেষে আল মাহমুদ তার দ্বিতীয় জীবনের সব কবিত্ব খুইয়ে ফেললেও যেহেতু বলেন তিনি কেবল সোনালী কাবিনের কবি তাই জেনে রাখুন সোনালী কাবিনের জন্যই তিনি আধুনিক ও মহান। সত্য কথা হল সমগ্র আল মাহমুদকে কোন সুবিবেচক, সুসাহিত্যিক,উদার বাংলাভাষী অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখাবেনা। কবিকে অস্বীকার করার খসরত করবে মুর্খ এবং হিংসুকেরা।

… … … … … … … … … … … … … … … …

জাকির তালুকদারের পোস্ট, যে পোস্টের বিরপীতে উপরোক্ত লেখাটি নির্মাণ হয়েছে

কবির কবিতাই যদি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হয়, তাহলে এদেশের একশ্রেণীর লোক রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কি না তা জানতে প্রাণপাত করে দিচ্ছেন কেন?
এজরা পাউন্ড রেডিওতে নাৎসিদের পক্ষে কথিকা পাঠ করতেন বলে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন কেন?
অথচ আল মাহমুদের বেলায় তার সুবিধাবাদিতা, মিথ্যাচারের বিষয়ে কথা বলা যাবে না কেন?
তিনি তার শ্রেষ্ঠ কবিতা ও গল্পগুলি লিখেছেন রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারের আগে। যখন থেকে তিনি জিয়া, এরশাদ, জামাতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক এবং পদের সুবিধা পেতে ও নিতে শুরু করলেন, তার আগে। জামাত বলত, তারা ইসলামের কথা বলে তাই প্রগতিশীলরা তাদের বিরোধিতা করে। যদিও এখন সবাই জানে জামাত ইসলাম প্রচারের দল নয়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে কোনো ফ্যাসিস্ট পথ অবলম্বনের দল। সেই একই দোহাই দিয়ে পার পেতে চেষ্টা করেছেন আল মাহমুদ। তার আগের লেখা এবং পথভ্রষ্ট হবার পরের লেখার গুণগত মানে এবং সংবিত্তিতে আকাশ-পাতাল তফাত প্রমাণ করে দেয় যে নষ্ট মানুষের দ্বারা উন্নত সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। আল মাহমুদ ইসলামিস্ট হননি। হয়েছিলেন সুবিধাবাদী।
গতকাল তাঁর একটি বই পড়লাম। নিজের অবস্থানের সপক্ষে যুক্তির নামে ফালতু সব প্রসঙ্গের অবতারণা। বইটি লিখেছেন তিনি ২০০১-২০০৬ সময়কালে। পাতায় পাতায় খালেদা জিয়ার গুণগান। শেখ হাসিনার গুণগান গাইতে গাইতে মুখে ফেনা তুলে ফেলা যে সুবিধাবাদী লেখক-কবিদের আমরা দেখতে পাই, তাদের অব্যবহিত পূর্বসূরি যে আল মাহমুদ, তা এই বইটা পড়ে বোঝা গেল।