আমাকে অবাক করে বললে
স্যার! ছাতা ধরেন, অসুখ করবে তো!
সবুজ রংয়ের ছাতাটি আমার হাতে গুঁজে দিয়ে অমিত রাস্তার ও পাশে দৌড়ে গেল।আমি কথা বলতে গিয়ে চুপ মেরে গেলাম। একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে আবার দৌড়াতে লাগল। আমি তখন ও সম্পূর্ণ ভীজে গেছি। যাকে বলে কাকভেঁজা।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। অমিত দৌড়াচ্ছে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে।
সকাল থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। কিছু টা কমে এলেও সূর্যের দেখা মিলেনি।
কলেজ থেকে বেরুতেই হঠাৎ ঝোপ-ঝাপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। রাস্তার পাশে কোথাও ঝাঁপি বা ছাউনির নিচে দাড়াঁবার সময়ই পেলাম না। পাচঁ মিনিট হাঠঁলে ;কাছেই মেস। তাই বাধ্য হয়ে বৃষ্টিতে ভিজেঁ হাঠঁছিলাম। আমি একা নই। আমার মতো রাস্তায় চলা অন্যদের ও একই অবস্থা।
তখনই অমিতের এ কান্ড। রাস্তার ওপাশ থেকে দৌড়ে এল। প্রথমে খেয়াল করিনি। কাছে আসতেই স্পষ্ট হল দৃশ্যটা। মনে হয় এইমাত্র স্কুল ছুটি হয়েছে। কাঁধে স্কুল ব্যাগ। হাতে ছাতা থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টিতে ভীজঁছে। অবাধ্য দুষ্ট বালকেরা বুঝি এরকমই হয়।

আমি প্রায়ই ভুলেই গিয়েছিলাম।
বারাক পাড়াঁ যাওয়ার পাকা সড়কের পাশে সেই হলুদ রংয়ের একতলা জমিদার বাড়ির কথা।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় বেশ পুরোনো। বাড়ির সামনে দুটি কৃষ্ণচূড়ার গাছ। দরজায় দাড়াঁলে ডাঁল-পালার ফাঁক গলে টুকরো টুকরো নীল আকাশ দেখা যায়।
অমিত তখন থ্রি- ক্লাসের ছাত্র। দিপা শুরুতেই বলেছিল ও খুব দুষ্ট। এক মাসের বেশি কোন শিক্ষক ঠিকতে পারেনি। আমি ও ঠিকব কীনা শুরুতেই সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু আমি টিকে গেছি। প্রায় ছমাস। ভাবলে নিজেই অবাক হই। দিপা আরো বলেছিল এই একটা ধরে রাখতে পারলে মেস খরচের চিন্তা করা লাগবে না। ওরা খুব প্রভাবশালী পরিবার। এই শহরে তাদের বেশ নাম ডাক। যদিও জমিদারি খুইয়েছে অনেক বছর আগে। চাইলে চাকরিও হয়তো জুটিয়ে দিতে পারে।
যদি ওদের নজরে পড়ে যাই। ওদের একটা মাত্র ছেলে বলে কথা। আমিও বেশ আশস্ত হয়েছিলাম। কপাল গুণে যদি একটা চাকরি জুটে যায়! না জুটলেও সমস্যা কি? মাস শেষে টাকা তো কম নয়। আমার কাছে এটা অনেক। বলতে গেলে টাকা বেশিই দিচ্ছে।
আমার প্রতিদিনকার রুটিন। বিকেল বেলা স্যান্ডেল জোড়া খুলে ঝটপট পায়ের ধূলো ঝেড়ে নেই। ইদানিং মাথায় চিরুনি চালাই। প্যান্ট – শার্ট ঠিক করে নিই। যদিও বাড়ির কাজের লোক ছাড়া দেখার কেউ নেই।
অমিতের বাবামার দেখা পাওয়া মুশকিল। ছুটির দিন ছাড়া কালেভদ্রে দেখা যায় । রাত করে বাড়ি ফিরে। দেখা হলেও কথাবার্তা তেমন হয়না বললেই চলে। আমি ও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সোজা অমিতের পড়ার রুমে। অমিত নেই। ঘরে কোথাও না কোথাও সে আছে। তার উপস্থিতি সেই জানিয়ে দেয়। পর্দার আড়াল থেকে হঠাৎ রং মেশানো জল ছিটাল আমার পিঠে। আমি অন্য মনস্ক ভাব করে বসে রইলাম । যেন কিছুই হয়নি। গা ভেজাঁ ভেজাঁ লাগছে। অস্বস্তিকর অবস্থা। তার এ কান্ডকারখানা আমি কিছু দিনেই শিখে গেছি। রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। দুজন ঝি টেনে-হিচড়ে চ্যাংদোলা করে নিয়ে এল। গুনধন ছাত্রের সে কী চিৎকার!
পালাই পালাই ভাব। যেন পারলে ঝি দুজন কে নিয়ে উড়ে যায়। কিছুক্ষণ আমার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঝড় থেমে যাওয়ার লক্ষণ। বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে ঝি দুজন চলে গেল।
আমি শান্তভাবে বলি, বস অমিত।
অমিতের চিৎকার, স্লামালিকুম মাস্টর!
প্রথম দিন আমার চোখ কপালে ওঠে গিয়েছিল। এ কোন গরুর পাল্লায় পড়লাম! এযে দেখি একটা চিড়িয়াখানার বাদঁর! কিছুদিন পর টের পেলাম এটা ওর রুটিন মাফিক অভ্যাস। অন্য শিক্ষকদের পালানো তত্ত্ব আমি কয়েক দিনের মধ্যে আবিষ্কার করে ফেললাম।
চুপচাপ চেয়ারে বসে থাকি কিছুক্ষণ। ওর কচিমুখের দিকে তাকালে বড্ড মায়া হয়। আমি ওর দোষ খুঁজে পাইনা। যে বাবামা রাতের পর রাত বাহিরে কাটায়। সন্তানের খোঁজ রাখেনা। সে ছেলের দোষ খোঁজা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়।
এসব ভাবনা দীর্ঘশ্বাসে নাক দিয়ে উত্তপ্ত হাওয়া ঠেলে বেরোয়।
আস্তে করে বলি। অমিত, পড়া শুরু কর।
সে দাঁড়ানো থেকে ধপাস করে ফ্লোরে পড়ে যায়। আবার উঠে চুপচাপ পড়তে শুরু করে। তারপর আধাঘন্টাও হয়নি। করুণ মুখে দুহাতে হাফপ্যান্ট চেপে ধরে,
মাস্টর, বাহিরে যাব। প্রসাব আসছে!
এরমধ্যে বাড়ির ঝি আসে চা নিয়ে। চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বলি, তাড়াতাড়ি এসো।
ফিরে আসে হাসি মুখে।মনে মনে ভাবি কিছু একটা হয়েছে। আমার স্যান্ডেল জোড়া জায়গা মতো থাকলেই ভালো। ওর মত করে আরো কিছুক্ষণ পড়াই। ঘড়ি দেখে উঠে পড়ি। দরজায় এসে আমার চোখ ছানাবড়া।
সত্যিই আমার স্যান্ডেল জোঁড়া নেই। যেই ভাবা সেই কাজ। আমি এদিক ওদিক তাকালাম। আশে পাশে কেউ নেই।
অমিত কে জিজ্ঞেস করতেই, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল!
কী জানি, আপনার পচাঁ স্যান্ডেল কই?
বাড়ির চাকর এসে খবর দিল, স্যান্ডেল জোঁড়া পাওয়া গেছে। রাস্তার ড্রেনে পড়েছিল।

সেদিনের কথা মনে হলে না হেসে পারিনা। টেনে-হিঁচড়ে
খাটের নিচ থেকে অমিত কে বের করা হল। যেন একটা ব্যাঙকে ট্যাং ধরে গর্ত থেকে বের করা হচ্ছে। বার বার সে গর্তের ভিতর লুকিয়ে যেতে চাইছে।
বললাম, এই অমিত! দেখ, তোমার জন্য চকলেট এনেছি। কোন উচ্চবাক্য নেই। নির্বাক। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। চকলেট গুলো টেবিলের উপর রেখে দিলাম।
ঠিক আছে, পড়তে বস।
কোন সাড়া নেই। জোর- পূর্বক বসানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম।
আবার সেই একই কান্ড! দাঁত কিজবিজ;মুখ ভ্যাংচানি।
নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। দিলাম, কষে এক চড়।
মার খেয়ে কেঁদে ফেলল। পুরোনো অভ্যাস। পোঁ- পোঁ করে ন্যাকামি কান্না। বুঝলাম না। বাচ্চারা কাঁদে ওয়াও – ওয়াও, ভেউ-ভেউ করে। আর কিনা সে কাঁদে পোঁ- পোঁ করে। মাঝে মাঝে ভাবি, ও ইচ্ছে করে এরকম করে।
তারপর শুরু হয় আরেক নাটক।
বই তার ছাত্র। সে হল শিক্ষক। আমার প্রত্যেকটি আচরণ, কথা বলার ধরণ, তাকানো ইত্যাদি অনুকরণ করে বই নামক অদ্ভুত ছাত্রের উপর। আমি হাসব না কাদঁব ভেবেই পাইনা। আমি যে তার সামনে বসা সেটা সে বেমালুম ভুলে গেছে।
এভাবে আর কতদিন! ধৈর্য্যর বাধঁ ভেঙে গেল। ছয় মাস তের দিন পর কাউকে না জানিয়ে এই টিউশনির ইতি টানলাম।
টিউশনি ছাড়ার কয়েকদিন পর অমিতের মায়ের সাথে দেখা। খোয়ার পাঁড় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। মুচির দোকানের পাশে। স্যান্ডেল এর ফিতে ছিঁড়ে গেছে। সেলাই করতে দিয়েছি। তখনই একটি জীপ গাড়ি আমার গা ঘেঁষে থামল। গাড়ির গ্লাস টেনে গলা বাড়িয়ে ইশাঁরায় ডাকলেন। চোখে সানগ্লাস। প্রথমে আমি চিনতে পারিনি।
কি মাস্টার! খবর কি?
কন্ঠস্বর শুনে আমার গলা শুকিয়ে গেল।
স্লামালিকুম আন্টি, ভালো আছেন?
ভাল। তোমার কোন খবর নেই। ব্যাপার কি?
আজ বিকেলে আসবে কিন্তু!
বিনয়ে আমার মাথা কাধ ছুঁয়ে ফেলেছে।
জীআন্টি, যাব।
গাড়িটি চলে যেতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। হা করে নিঃশ্বাস নিলাম অনেকদিন পর।
অমিতের ব্যাপারে কিছুই বলা হলনা। একটার পর একটা বিকাল চলে যাবে। জানি আমার আর যাওয়া হবে না। আমি তো পালিয়েছি সেই বাড়ি থেকে। যে বাড়ির দরজায় দাড়াঁলে কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁক গলে টুকরো-টুকরো নীল আকাশ দেখা যায়।শুনেছি উনি খুব জাদঁরেল মহিলা। একসময় রাজনীতি করতেন। পার্টি অফিসের লোকজনের ঘন ঘন যাতায়াত ছিল বাড়িতে। এ নিয়ে বেশ চমকপ্রদ গল্প ছড়ানো-ছিটানো আছে পাড়াঁ-মহল্লায়।
সেলাইয়ের কাজ শেষ। মজুরি দিতে গিয়ে টের পেলাম এই শহরে আমি কত নগন্য মানুষ! দরিদ্রতার ছাপ মানিব্যাগে স্পষ্ট। ফুটপাত ধরে হাঠাঁ ছাড়া উপায় নেই। এলোমেলো ভাবনার ভেতর সেই বৃদ্ধা মায়ের করুণমুখ।যেন জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ছবি মায়ের সারা শরীরে। জানতে ইচ্ছে করে বেকার যুবকের মুখচ্ছবি পৃথিবীর কোন জাদুঘরে ঠাঁই পেয়েছে। নাকি এধরনের কোন ছবি কোন শিল্পীই আকেঁনি আজ অবধি।মায়ের সাথে তেমন একটা কথা হয় না। ইচ্ছে করে ইদানিং ফোন দেওয়া কমিয়ে দিয়েছি। ফোন ধরেই কাঁদতে শুরু করে।
ভালো আছিস বাপ?
বাপ বলা ইদানিং মায়ের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরত্বের কারনেই কিনা কে জানে। জানার চেষ্টাও করিনা।
কি খাইছস?কি করছ? আমারে ফোন দিবি ক্যা? আমি তর কেউনা। তর দয়া মায়া কিচ্ছু নাই।
সত্যিই মায়ের এ কথাটা মনে হলে হাসি পায়। পরের নাড়ীছেঁড়া ধনকে থাপ্পড় দিয়ে বুঝিয়ে দেই। আমি কতটা পাষন্ড! দয়া মায়া কিচ্ছু নাই। কথা বলতে-বলতে মা কাঁদতে শুরু করে। তখন আমার দুটি চোখ ভীজেঁ ওঠে প্রবল হাহাকারে। প্রচন্ড রাগ হয় মায়ের প্রতি। বলি। কাঁদো বলেই ফোন করিনা । সাতপাঁচ কথা বলে মাকে মিথ্যা শান্তনা দেই। প্রচুর পড়াশোনা। সময় পাওয়া যায় না। অবাধ্য সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসা একটু বেশিই হয়।
এক সপ্তাহ পর।
দিপাকে ফোন দিলাম। সে এল সুন্দর একটা নীল শাড়ি পড়ে। দুজনে নিউমার্কেট থেকে দুটি গল্পের বই কিছু চকোলেট কিনলাম। দিপা বলল, কার জন্যে এ শিশুতোষ বই?এই সবুজ ছাতা অমিতের না?দিপার চোখে বিস্ময় ঝরে পড়ে। আমি বলি তোমার দেওয়া সেই দুষ্ট ছাত্রটির জন্যে। যে এভাবে দাঁত কিজবিজ ;ভেংচি কাটতো। দিপা মুখ লুকিয়ে হাসলো।
আমার হাতে অমিতের সবুজ ছাতাটি দেখিয়ে খুলে বলি সেই ঘটনা। দিপা কিছুটা অবাক হল। দিপাকে বলি জানো, আমি কোনদিন কল্পনাও করিনি। সে আজও ভীজেঁ কিন্তু আমাকে ভেজাঁয় না। বৃষ্টি তে ভীজেঁ প্রচন্ড জ্বর হয়েছিল আমার। পাচঁ দিন বিছানায় ছিলাম। অমিত সেদিন আমার জ্বরের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছিল।হেসে গড়াগড়ি। অথচ সেদিন আমাকে ভীজঁতে দেখে ছাতা ধরিয়ে নিজেই ভীজঁলো বৃষ্টিতে ।মনচোরার মন চেনা, এভারেস্ট জয়ের মতো।
ভাবছি দিপা, আগামীকাল থেকে ওকে আবার পড়াতে শুরু করব। তাই তোমাকে ডেকে এনেছি। আমার হয়ে তুমি অমিতের মায়ের সঙ্গে কথা বলবে।
সবুজ রং অমিতের খুব প্রিয়। তার সবুজ রঙের ছাতাটি আজ ফিরিয়ে দেব।
টেক্সি থেকে নেমে দুজনেই পুরোনো একতলা জমিদার বাড়িটির দিকে হাঠঁতে থাকি। এই তো সেই প্রিয় কৃষ্ণচূড়া গাছ। দরজায় দাড়াঁলে যার ডাল-পালার ফাঁক গলে টুকরো টুকরো নীল আকাশ দেখা যায়।অমিতের মা বারান্দায় গা এলিয়ে বসে আছেন। মলিন মুখ।চোখের নিচে কালচে দাগ। উসখো-খুসকো এলোমেলো মাথার চুল। এই কয় দিনে চেহারার কী অবস্থা! আমরা দুজনেই চমকে গেলাম। ভূত দেখলে মানুষ যে রকম চমকায়। ছল ছল চোখে এক নজর তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মনে হয় চিনতে পারেননি।
আমি একরাজ্যের বিস্ময় চোখে – মুখে – মেখে, সংকোচে নিয়ে বললাম, আন্টি, আমি নুসু জাদরান।অমিতের প্রাইভেট শিক্ষক।
তবুও তিনি চুপচাপ।
কিছুক্ষণ পর বললাম, আন্টি, অমিতের ছাতাটি ফিরিয়ে দিতে এলাম। আপনি চাইলে কাল থেকে ওকে আবার পড়াতে আসব। তবুও তিনি চুপচাপ।
আমি লজ্জিত ভঙ্গিতে দিপার মুখের দিকে তাকালাম। সে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির ঝি এসে আমাদের উদ্ধার না করলে এখান থেকেই হয়তো ফিরে যেতে হত। ড্রয়িং রুমে বসতে বলে বাড়ির ঝি চলে গেল।
আমি অমিত কে খুঁজছি। আজ হয়তো রংমেশানো জল চূড়বে না। কারণ সে তো জানেই না আমি যে আজ আসব। আজ শুধু দাঁত কিজবিজ; মুখ ভ্যংচানো ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা নেই। আমি ও দিপা দুজনেই হেসে ওঠব।
না কোথাও অমিতের সাড়া শব্দ নেই। সে কি কোথাও বেড়াতে গেছে?
ঝি এলেন চা-বিস্কুট নিয়ে। অমিতের কথা জিজ্ঞেস করতেই, ওনি কেঁদে ফেললেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই বাড়িতে আজ কী হয়েছে?
যা বললেন তা শোনার জন্য আমরা মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।
তিন দিন আগের কথা।
অমিত স্কুল থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমার বুকটা চ্যাৎ করে, কেমন হাহাকার করে ওঠল। আমি শুকনো জলের মাছের মত তরপাতে শুরু করি যেন।
সবুজ ছাতাটি হাতের মুঠোয় চেপে ধরি। শক্ত করে। চোখের জল লুকাতে দ্রুত হেঁটে বেরিয়ে এলাম কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়া মাড়িয়ে। একবারের জন্য ভুলেও পিছু ফিরে তাকাইনি।
আজ অনেক দিন হয়ে গেল।
কত নদীর কত জল, কত দিকে গড়াল। একদিন দিপাও কাকে যেন ভালবেসে চলে গেল। মা ও একরাতে ঘুমের মধ্যে চুপচাপ মরে গেলেন। প্রথম প্রথম, খুব কাঁদতাম। এখন আর কাঁদতে ইচ্ছে করে না। বয়স হয়েছে ঢের, তাই চলে যাওয়ার কত হিসাব এক জীবনে মনে রাখব? এনটিআরসি থেকে স্কুল শিক্ষক হিসেবে সুপারিশ
প্রাপ্ত হই। এত দিন এই পেশা কে ঘূণা করে অবশেষে এই পেশা নিয়ে আছি।

আজও বৃষ্টি এলে আকাশ ভেঙে। যদি কোনদিন বৃষ্টিতে ভীজঁতে যাই। কেউ একজন নাকি অনেক জন চুপি চুপি কানে কানে বলে।
স্যার! ছাতা ধরেন। অসুখ করবে তো!
আচ্ছা, বুকের ভেতর যে একটা অসুখ বাসা বেধেঁ আছে তা কোনদিন ও কী সারবে না?