সাম্প্রতিক কিছু কিছু ঘটনার জন্য সারা বিশ্বে ভারতের মুসলমানদেরকে নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ উদ্বেগ বাংলাদেশেও আছে। কিছুদিন আগে ভারতের পার্লামেন্টে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করা হয় (CAA)। এই আইনে সুস্পষ্টভাবে মুসলিমদেরকে অন্য ধর্ম থেকে ভিন্ন করা হয়েছে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে বিদেশ থেকে যে কোন ধর্মের লোক ভারতে আসলে ভারতে নাগরিকত্ব পাবে। কিন্তু মুসলিমরা পাবে না। অথচ ভারতের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক পার্থক্য করার কোনো অনুচ্ছেদ নাই।

এর বিরুদ্ধে সারা ভারতে মসুলমানরা আন্দোলন করছে। ভারতের অমুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ এই আইনের সংশোধনীর বিরোধিতা করেছে। ভারতের কংগ্রেস,তণৃমূল পার্টি ও অন্যান্য অনেক দল এই সংশোধনীর বিরোধিতা করেছে। কিন্তু বিজেপি সংখ্যাধিক্যের জোরে পার্লামেন্টে এটি পাশ করেছে। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। আশা করি একটি ভালো সমাধান ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট দিবে।

এর বিরুদ্ধে দিল্লিতে মুসলিম জনগণ ব্যাপক আন্দোলন করে। দিল্লির শাহীনভাগে কেবল মুসলিম মহিলারা হাজারে হাজারে বিক্ষোভে নামে এবং এক দুই মাস তারা রাস্তায় থাকে। সব নির্যাতন উপেক্ষা করে তারা রাস্তায় থাকে। ভারতের অন্য সব অংশে একইভাবে মুসলিম নারী পুরুষ এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির উত্তর-পূর্ব অংশে দাঙ্গা হয়। এ দাঙ্গায় শতাধিক মুসলমান নিহত হয়। তাদের সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়। তারা কিছু দিন ক্যাম্পে থাকে। এখন হয়তো তারা ঘরে ফিরে এসেছে। পুলিশ এ দাঙ্গায় সরাসরি পক্ষপাতিত্ব করে। অন্যদিকে বিজেপির এক নেতা এ দাঙ্গার মুল উসকানী দাতা। বিজেপির একটি অংশ দিল্লির বাহির থেকে লোক এনে এ দাঙ্গায় অংশ নিতে বাধ্য করে।

উপরোক্ত দুটি কারণে সারা বিশ্বে ভারতের মুসলমানদের নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নাকের ডগায় দিল্লির উত্তর-পূর্ব অংশে এ দাঙ্গা অবশ্যই চিন্তার বিষয়। যদি রাজধানীতে এরকম হতে পারে তাহলে রাজধানীর বাহিরে কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এখন আমি ইতিহাসের দিকে যাব। ১৯৪৭ সনে ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। ইংরেজ সরকার এবং মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের সমযোতার মাধ্যমে এই বিভাগ হয়। এপ্রসঙ্গে ভারতীয় স্বাধীনতা আইনে (ইন্ডিপেন্ডস এ্যাক্ট অব ইন্ডিয়া) উল্লেখ ছিল যে,স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে অমুসলিম সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকবে এবং ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকবে। মোটামোটি এটি পালিত হয়েছে। যদিও পুরোপুরি নয়। ভারতে মুসলিমবিরোধী অসংখ্য দাঙ্গা হয়েছে গত ৬০/৭০ বছরে। বিশেষ করে গুজরাটের দাঙ্গার কথা সবাই জানেন। সেখানে কয়েক হাজার মসুলমান হিন্দুদের হাতে নিহত হন এবং নারীরা ধর্ষিত হন। এ অবস্থার মধ্যেই ভারতের মুসলমানরা ছিল বা আছে। তারা খুব কম চাকুরী পায়। পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব খুব কম।

এখন আমি সমাধানের কথা বলব। সমাধান সহজ নয় এবং হবে তা বলা যায় না। এ সমাধান করতে হলে একদিকে বিজেপিকে তার উগ্র হিন্দুত্ববাদ ছাড়তে হবে। তারা জোর করে মুসলিমদের ধর্মান্তরিত করছে তা বাদ দিতে হবে (ঘরওয়াপসি বা ঘরে ফেরার নামে, অর্থাৎ হিন্দু ধর্ম হচ্ছে আসল ঘর। মসুলমানদের ঠিক আসল ঘরে ফিরে আসতে হবে) বিজেপির যোগ ব্যায়াম সবার উপর চাপিয়ে দেয়া বাদ দিতে হবে। কারণ যোগ ব্যায়ামে সূর্যকে প্রণাম করতে হয় তা মুসলমানেরা করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত কংগ্রেস তৃণমুল পার্টি,কমুনিষ্ট পার্টি মুসলিম বিদ্বেষের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। তারা একটি বড় শক্তি,কোনো অংশে বিজেপির চাইতে কম নয়। তৃতীয়ত মুসলিমদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এখন তাদের শিক্ষা বেড়েছে। এটা আরো বাড়াতে হবে। তারা সরকারী চাকুরী কম পায়। সুতরাং তারা বেসরকারী খাতে ব্যবসা এবং শিল্প গড়ে তুলবে। ভারতের মুসলমান সংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এটা বিশাল সংখ্যা এবং শক্তি। মুসলমানরা চাইলে সবকিছু করাই সম্ভব। তাদের মধ্যে এখন যোগ্য নেতৃত্বও রয়েছে। তাদের কয়েকটি রাজনৈতিক দল আছে। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে মুসলিম লীগ এবং অয়েল ফেয়ার পার্টি অব ইন্ডিয়া। ইসলামীপন্থী লোকেরা অয়েল ফেয়ার পার্টি গড়ে তুলেছে। এছাড়া রয়েছে জমিয়েতে উলামায়া হিন্দ।আলেমদের বিশাল সংগঠন। এছাড়া রয়েছে ভারতীয় জামায়াতে ইসলামী। যার কাজ ভারতের কোণায় কোণায় রয়েছে। তাদের আলাদা নারী ও ছাত্র সংগঠন আছে। তাদের নেতা একজন ৪৮ বয়সের ব্যক্তি এবং অত্যান্ত যোগ্য। এছাড়া ভারতে রয়েছে আরো অসংখ্য মুসলিম সংস্থা। এদের সম্মলিত চেষ্টায় ভারতের মুসলিমরা তাদের মান মর্যাদা ও অবস্থান ধরে রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।